প্রসঙ্গ: পিইসিই এবং জেএসসি


সালমা তালুকদারঃ  গতকাল পর্যন্তও এভাবে চিন্তা করিনি। তবে ব্যাপারটা মাথায় ঘুরছিলো অনেকদিন থেকেই। পিইসি, জেএসসি পরীক্ষা অন্য অনেকের মতো আমিও কখনো ভালোভাবে নেইনি। আজকে সকালে প্রথম আলো পত্রিকায় পিএম এর একটা কথায় মস্তিস্ক নড়ে চড়ে বসলো। সাথে অতীত চিন্তার কিছুটা প্রতিফলন।
গতকাল মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধাণমন্ত্রী পিইসি এবং জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা উত্থাপন প্রসঙ্গে আদালতের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছেন, “জরুরী মামলা শুনানির সময় নেই। এই সমস্ত খুচরা জিনিস নিয়ে সময় কাটানো কেন?”
গত বছর আমার বড় ছেলে পিইসি দিয়েছিলো। এ বছর মেয়ে দিচ্ছে। আমি একজন গার্ডিয়ান হিসেবে প্রতিদিন পরীক্ষা কেন্দ্রে যাওয়া হতে শুরু করে বাচ্চার মাধ্যমে কেন্দ্রের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছি। শিক্ষকদের অবস্থা, আমার সন্তান ছাড়াও পরীক্ষার্থী অন্যান্য শিশুদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করেছি। সেই জায়গা থেকে এবং পিএমের একটা বাক্যের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো পজিটিভ কথা বলতে চাই।

যত বড় করে দেখছি ব্যাপারটা আসলে কি তত বড়? অনেকদিন ধরেই মিছিল মিটিং মিডিয়া এই দুটো পরীক্ষা নিয়ে তোলপাড় করছে। এমনকি সংসদেও এই প্রসঙ্গটা উঠেছে। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী কত সহজভাবে বলে ফেললেন ছোট বিষয়। উনি কি একবারও ভাবেননি এই কথাটায় ওনার ভাবমূর্তি নষ্ট হতে পারে!? ভাবেননি । কারণ পিএম জানেন আসলেই এটা ছোট বিষয়। বড় করছে কোমলমতির শিশুদের অভিভাবকেরা। আমাদের হুজুগে বাঙ্গালী কেন বলা হয় জানেন? কারণ আমরা ভাবী কম বলি বেশি। আর যে কোনো কিছুর পজিটিভ দিক দেখার চাইতে নেগেটিভ দিকটা আগে দেখি। যদি ভেবেও নেই যে সন্তানের উপর চাপ সৃষ্টির কথা ভেবে আমরা এই দুই পরীক্ষার বিপক্ষে কথা বলি। কিন্তু সন্তানের উপর চাপ সৃষ্টি কেন করছি আমরা? নিজেকে একটু প্রশ্ন করি তো। আমরা কথায় কথায় বলি, “এখনকার বাচ্চাগুলো অনেক পাকনা। বেশি বোঝে। এই বয়সে আমরা কত বোকা ছিলাম!”কথাটা কিন্তু সত্য।

আমরা দশম শ্রেনীতে যা বুঝতাম এখন পঞ্চম শ্রেনীর বাচ্চারা তারচেয়ে বেশি বোঝে। আমাদের সময় পরীক্ষাভীতী আমাদের ছিলো। এখনও পরীক্ষাভীতী আমাদেরই আছে। বাচ্চাদের না। আমরা অভিভাবকরা পরীক্ষাভিতী বাচ্চাদের ভেতর ঢুকিয়ে দেই আমাদের আচরণের মাধ্যমে। আজকে শুনলাম একজন গার্ডিয়ান তার সন্তানকে পরীক্ষায় বসতে দেননি কারণ তার সন্তান শেষ মডেল টেস্ট টাতে ভালো রেজাল্ট করতে পারেনি। অথচ পরীক্ষার কেন্দ্রের পরিবেশ পরীক্ষার্থীদের জন্য অনেক অনুকূল। এই পরীক্ষাটাকে যদি আমরা পঞ্চম শ্রেনী থেকে ষষ্ঠ শ্রেনীতে উন্নিত হওয়া হিসেবে চিন্তা করি খুব কি ক্ষতি হবে? মাঝে শুধু কথা থাকে কেন তাহলে এত কোচিং? রেজিস্ট্রেশন ,ফর্ম ফিলাপের ধাক্কা?

আমি বলবো এটা একটা প্র্যাকটিস হয়ে গেল শিশুদের জন্য। এরকম বোর্ড পরীক্ষা তো আরো হবে ভবিষ্যতে তাই না? এটা একটা বোর্ড পরীক্ষা। বিশাল কিছু হিসেবে কেন চিন্তা করছি আমরা? কেন বাচ্চাগুলোর মধ্যে ভয়ভীতি ঢুকিয়ে দিচ্ছি? যারা কোচিং করাচ্ছেন তারা কেন করাচ্ছেন তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। আমি আমার বাচ্চাদের শিক্ষকের কাছে পাঠাই কারণ ওরা ঘরে পড়তে চায় না তাই। কোনো রকম বল প্রয়োগের জন্য পাঠাই না। যারা বিদ্যালয় ছাড়া শিক্ষকের কাছে পড়াতে চান না তারা বাসায় বসে সন্তানদের বই রিডিং পড়ান তাহলেই তো আর কিছু লাগবে না। বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী কি সব শ্রেনীতে পাশ করে? করে না। তাহলে কি করে আশা করি বোর্ড পরীক্ষায় পাশ করবে? ব্যাপারটা একটু পজিটিভ ভাবে চিন্তা করি। আমরাই কিন্তু বেশি ভয় পাচ্ছি আর সন্তানদের ভয় দেখাচ্ছি। ব্যাপারটা এমন যে দোষ করবো বড়রা আর ঢাল হিসেবে সামনে রাখবো ছোটদের। ছোটদের খেলাধুলার সময় আমরা নষ্ট করছি। লেখাপড়া না। বাচ্চা পরীক্ষার হল থেকে বের হওয়া মাত্র প্রশ্ন দেখতে চাই। কত নাম্বারের উত্তর দিল আর কত ছেড়ে দিলো তাই নিয়ে অস্থির হয়ে যাই। অথচ এই আমরাই কিন্তু কথায় কথায় বলি রিজিক তো আল্লাহ্র হাতে।যদি তাই হয় তাহলে আমরা সন্তানকে প্রেশার দিয়ে পড়িয়ে কি ডাক্তার ইন্জিনিয়ার বানাতে পারবো?

যাই হোক সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আমি শুধু বলতে চেয়েছি পিইসি জেএসসি নিয়ে এত মাথা ব্যাথা না নিয়ে কোমলমতি শিশুদের শিশুকাল ঠিক রেখে খেলাধুলার পাশাপাশি লেখাপড়া করাতে থাকি। এত সিরিয়াস হওয়ার আসলে কিছু নেই। ওদের সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শেখাই। আমি নিজেও যে কোন পরীক্ষার ঘোর বিরোধী। ভবিষ্যতে শিক্ষা ব্যাবস্থার আমূল পরিবর্তন আমিও চাই। তবে বর্তমানে আমাদের কাজ হচ্ছে প্রথম, দ্বিতীয়, এ +, গোল্ডেন এ + এর চিন্তা থেকে শিশুদের সরিয়ে নৈতিক আদর্শ দিয়ে সন্তানদের মানুষ করা। অনেক বড় অফিসার হয়ে বাবা মা এর মুখ উজ্জ্বল করা সন্তান যেন কোনো এক সময় ধর্ষন বা খুন মামলার আসামী না হয়।
আশা করি আমার এই লেখাকে কেউ চাটুকারীতা বা কোনো উদ্দেশ্য প্রনোদিত লেখা মনে করবেন না। প্রথমেই বলেছি গতকাল পর্যন্ত আমিও এভাবে চিন্তা করিনি। ধন্যবাদ।

লেখকঃ প্রাক্তন প্রভাষক; বাংলা বিভাগ; নর্থ ওয়েস্টার্ন কলেজ

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী