একপেশে চিন্তা করা কিংবা কারো একটা ঘটনা শুনে নিজেকে ভিক্টিম ভাবা কিংবা সমগ্র একটা জাতিকে দোষারোপ করা আমাদের জন্য সাধারণ একটি ঘটনা। কেউ হয়ত দেখলো অমুকের শ্বাশুড়ি ভালো না, অমনি সমগ্র শ্বাশুড়ি খারাপ, কেউ দেখলো অমুকের স্বামী/স্ত্রী তমুক কাজ করেছে, অমনি সমগ্র নারী/পুরুষ জাত টা কেই তুলোধুনো করে ফেলে! অনেক সময় স্বাভাবিক ব্যাপার গুলিও কোন নেগেটিভ কথা শুনে নেগেটিভ ভাবে ডিল করে সম্পর্ক খারাপ করে ফেলি আমরা। সম্পর্ক ঠিক রাখার অন্যতম মূলনীতি হল মায়া মমতা,আবেগীয় দিক ঠিক রাখা। নিজের প্রতি মায়ার চেয়ে অন্যের প্রতি মায়ার ভাগ বেশি রাখা। এই সিরিজে সাধারণ কিছু অভিযোগ, সমস্যা গুলির অপর প্রান্ত দেখানোর জন্য ছোট একটা চেষ্টা থাকবে শুধুমাত্র।

এক প্রান্ত আমাদের সবার জানা, অপর প্রান্তের কতটুকু ভাবি দেখা যাক।

মুদ্রার উলটো পিঠ – ১ সিনারিও – স্বামী অফিস থেকে আসে প্রতিদিন মাগরিবের আগে। এসেই নামাজ পড়ে নাস্তা চান তিনি। পেলে খুশি, না পেলে অভিযোগ, কখনও রাগ। চিন্তাও করে দেখেন না সারাদিন কত কষ্ট করে স্ত্রী ঘর টা গুছালো, পরিষ্কার করলো, রান্না করলো। তার ও তো বিশ্রাম প্রয়োজন!! সবসময় একই ভাবে কি একই সময়ে নাস্তা দেয়া সম্ভব?? পান থেকে চুন খসলেই কেন কথা শুনিয়ে দেয়?? মায়ের বাসায় কোনদিন এসব করে অভ্যস্ত নয় সে। সেটা কি স্বামী জানেন না???? একটু পিছনে আসি – ভার্সিটি থেকে বিকালে এসেই ব্যাগটা টেবিলে ছুড়ে বিছানায় শুয়ে পড়তো মেয়ে। দুপুরের খাওয়া ভালো হয় নি বলতে বলতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতো মা কি রান্না করেছেন দেখার জন্য। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে দেখেন মা যা রেঁধেছেন সেটা তার পছন্দের খাবার না। রাগ করে সেদিন সে আর বিকালে খায় নি। পরের কিছু দিন মা তার মেয়ের আবদার অনুযায়ী পছন্দসই সব খাবার রান্না করে খাওয়ান। এবার মেয়ে খুশি। রাগ করে সেদিন যে খায় নি সেদিন সে বুঝে নাই সারাদিন তার মা কত কষ্ট করেছিলেন!! দুটো ঘটনা কিন্তু কম বেশি একই কিন্তু চরিত্র গুলি ভিন্ন শুধু। আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর বড় অভাব। মা কে ভালোবাসি, মা আপন তাই আবদার, ক্ষোভ ঠিক ই মায়ের সাথে দেখাতাম কিন্তু যখন স্বামী সেই ক্ষোভের জায়গা দেখান তখন আমাদের কাছে আমাদের আচরণই অপরিচিত ঠেকে। সারাদিন বাইরে থেকে আমাদের আশা থাকে ঘরে এসে শান্তি পাবো, সব ঠিক পাবো। এবার সেটা স্কুল, ভার্সিটির ছাত্রীই হোক আর অফিস ফেরত ক্লান্ত স্বামীই হোক সবার আশা একই থাকে। আবার এই স্ত্রীই যখন সময়ের আবর্তনে মা হন বাচ্চা স্কুল ফেরা মাত্রই তাকে পরিষ্কারে ব্যস্ত হন, ব্যস্ত হন তার খাওয়ার প্রতি। মাথায় থাকে সন্তান ক্লান্ত। সন্তান আজ এটা খাবে না, ওটা খাবে না বললেও রাগের চেয়ে মুখ্য হয় সন্তান কোনটা খাবে।

মা-মেয়ে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অবশ্যই এক না। কিন্তু পয়েন্ট হল এখানে মায়া মমতা। স্বামীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন। তার রাগের কারণটা বুঝা প্রয়োজন। তার রাগে মনে কষ্ট পেলেও সেটা তখন শো না করে চুপ থাকাই শ্রেয়। পরে সুযোগ বুঝে স্বামী কে সরি বলা যায়, কিংবা বুঝানো যায় যে সবকিছু সামলে উঠতে কষ্ট হচ্ছে, সময় দিতে তাকে। হয়ত স্বামী নরম হতে পারেন কিংবা হলেও তিনি না দেখাতে পারেন। এখানে ‘কি পেলাম?’ ‘এত করেও তার মন পেলাম না!’ এসব বাক্য মাথা থেকে দূর করা প্রয়োজন। স্ত্রীর প্রতি মন থাকে না এমন পুরুষ নেই কিন্তু তারা এক্সপ্রেসিভ না। মন না পেলে আবদার, ক্ষোভ, অভিমান গুলি আসতো না তার মনে। ভেবে দেখা উচিত স্ত্রী নিজে সারাদিন বাইরে থেকে, বসের ঝারি শুনে, জ্যামে বসে থেকে, গাড়ির ধোয়া খেয়ে, ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত শরীরে বাসায় এসে কি চাইবেন? নারী পুরুষের চিন্তা ভাবনা, চাহিদা ভিন্নরকম। কিন্তু ক্লান্তি দুজনেরই লাগে। চাকুরীজীবী স্ত্রীরা ভালোই বুঝেন স্বামীর ক্লান্তির হিসাব। সব মানুষ এক নয়। স্বামী রিএক্টিভ হলেও তার প্রতি মায়া নিয়ে ঘটনাটা ব্যাখ্যা করা যায় যে তিনি কেন এমন করলেন! ‘আমি সব করেছি, তাও তিনি এমন করেন ‘ – এরকম চিন্তাও শয়তানের ওয়াসওয়াসা ছাড়া কিছু না। স্পাউসের দোষ থাকলেও যদি শুধরানোর উপায় না থাকে তাহলে সমাধান যা সেটাই করতে হবে। মনে রাখবেন ঝগড়া বাড়ালে ঝগড়া বাড়বে। উদ্দেশ্য হল সংসার সুখের করা,সুখে থাকা। এবার তার জন্য দোষী না হয়েও যদি নিজেকে দোষী বলতে হয় তাহলে তাতে ইগো বিসর্জিত হবে, সুখ না। যদি মনে হয় ঝগড়া করলে ভালো হবে, সম্পর্ক যাক চুলোয় তাহলে ‘কেন আমি ই সবসময় কম্প্রোমাইজ করব?’ এই ধরনের কথা মাথায় আনতে পারেন। আপনি যদি ভাবেন ‘ও সবসময় এমন করে ‘ তাহলে এটাও মাথায় রাখবেন যে আপনিও তাহলে প্রতিবার ই একই ভাবে বিহেইভ করে যাচ্ছেন, ভুল রিপিট করছেন। আপনার মতো একই চিন্তা আপনার স্বামীও করতে পারেন। একটা দড়ি দুইদিক থেকে টানলে সেটা ছিঁড়বেই। সম্পর্কতে হারজিত আনবেন না। এখানে হেরে যাওয়াও জেতারই নামান্তর।