বিশ্বাস আধুনিকতা ও গণমাধ্যমসংস্কৃতি

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ: জীবন মানেই সংস্কৃতি। জীবনের গতিপথের সাথে এরও রঙ বদলে যায়। কালকে ধারণ করেই এর পথচলা। যাত্রাপথেও রয়েছে খানিকটা বৈচিত্রময়তা। ভাষাকে বাহন করে এগিয়ে যায় সাহিত্য আর সাহিত্য ধারন করে জীবনবোধ এবং জীবনবোধের বর্হিপ্রকাশই সংস্কৃতি। অধুনাবিশ্বে পারমানবিক যুদ্ধের চেয়ে সাংস্কৃতিক চিন্তার যুদ্ধ কোন অংশেই কম নয়; বরং পারমানবিক অস্ত্র মানুষকে দৈহিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে পক্ষান্তরে সংস্কৃতির অস্ত্র মানুষের চিন্তা, মনন এবং স্বপ্নগুলোর বিবর্তন ঘটিয়ে নৈতিক অবক্ষয়ের মাধ্যমে শেকড়কাটা কিংবা বনসাই বৃক্ষ বানিয়ে ক্ষুধা তৃষ্ণায় নিঃশেষ করে দেয়। আক্রান্ত মানবগোষ্ঠী বিশ্বাস আর প্রত্যয় নিয়ে সত্যিকার মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা তো দূরের কথা, বেড়ে ওঠার স্বপ্ন পর্যন্ত ভুলে যায়; আর এটা হঠাৎ মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রনাদায়ক।

সংস্কৃতির নিয়ামক শক্তি হলো বিশ্বাস। যেহেতু বিশ্বাসের উপাদানেই রুচিবোধের অবয়ব গঠিত হয়; আর রুচিবোধের বর্হিপ্রকাশই সংস্কৃতি, সেহেতু প্রকারান্তরে বিশ্বাসই সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। জীবনের প্রতিটি বাক অর্থাৎ রুহের সৃষ্টি, মাতৃগর্ভ, জন্ম বেড়ে ওঠা, মৃত্যু পুনরুত্থান অবশেষে জান্নাত অথবা জাহান্নাম এসব বিষয়ে পরিপুর্ণ বিশ্বাস থাকলেই একজন মানুষ তার রুচিবোধকে বাক ঘুরানোর উপযোগী করে গড়ে তুলতে প্রয়াস চালাতে চেষ্টা করবে, আর যদি বিশ্বাসী না হয় কিংবা বিশ্বাসের মাত্রা যদি অন্যরকম হয় সে প্রভাবও রুচিবোধে পড়বে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বাস যত গভীর হবে তার আলোকেই তার রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যাবে। পরকালীন জবাব দিহিতা ও তার উত্তোরণের ব্যাপারে যদি নির্ভেজাল ও খাঁটি বিশ্বাস থাকে তবে সে তার রুচিবোধকে অন্যায় মুক্ত রাখতে অবশ্যই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হবে; এটা জীবনের একান্ত বিষয় থেকে শুরু করে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সংস্কৃতি, এমন কি আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী পর্যন্তও হোক না কেন। সুতরাং সংস্কৃতির ভিত্তিই হলো দৃঢ় বিশ্বাস বা আস্তিকতা কিংবা খাঁটি নাস্তিকতা। কেননা যারা নাস্তিক তারাও প্রকৃতি নামক একটি শক্তিকে বিশ্বাস করে। আরো সহজভাবে বলা যায়, যার বিশ্বাস যে দার্শনিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তার রুচিবোধ তথা সংস্কৃতিও সেই আদলে গড়ে উঠে।

সাংস্কৃতিক পার্থক্য মূলত বোধবিশ্বাস ও রুচিবোধের পার্থক্যের কারণেই হয়ে থাকে। যেমন- আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের জীবনবিধান। আমাদের বোধবিশ্বাস ও রুচিবোধ ইসলামের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সুতরাং আমাদের সংস্কৃতি হতে হবে ইসলামী সংস্কৃতি। যে ব্যক্তি হিন্দু তার বিশ্বাস ও রুচিবোধ  হবে তার ধর্ম অনুযায়ী। অনুরূপ ইয়াহুদী, খৃষ্টান, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মের অনুসারীদের সংস্কৃতি হবে স্ব-স্ব ধর্ম অনুসারে। যেহেতু এক এক ধর্মের লোকদের এক এক বোধ বিশাস ও রুচি সেহেতু সংস্কৃতিও হবে আলাদা আলাদা এটাই যুক্তির কথা।

মুসলমানদের মুলমন্ত্র তাওহিদ বা একত্ববাদ। পক্ষান্তরে অন্যদের মধ্যে কেউ বা ত্রিবাদে বিশ্বাসী, আবার কেউবা বহুদেবতা বা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী। এটাই হল আমাদের সাথে অন্যান্যদের মৌলিক পার্থক্য। এছাড়া বাহ্যিক পার্থক্যও প্রচুর, যেমন পথে ঘাটে হাটে মাঠে স্কুল কলেজ মাদ্রাসায়, অফিস আদালতে একজন মুসলমানের সাথে আর একজন মুসলমানের দেখা হলে সালাম বিনিময় করা হয়। মহানবি (স.) কর্তৃক শিখানো কথা ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ (আপনার উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।) ইসলামের দৃষ্টিতে সালাম দেওয়া সুন্নত আর জবাব দেওয়া ওয়াজিব। সালাম গ্রহীতার চেয়ে সালাম দাতাই অধিক সওয়াব লাভ করে থাকেন। পক্ষান্তরে যারা হিন্দু তারা তাদের ধর্মীয় নিয়মে আদাব কিংবা নমস্কার বলে থাকেন। তাদের মধ্যে ‘ওম শান্তি’ বলারও রেওয়াজ ছিল। কেউবা ইংরেজিতে গুড মর্নিং, গুড ইভনিং কিংবা গুড নাইট বলে থাকেন। ইহুদীরা সেলোম বলেন যার অর্থও শান্তি।

কোন কাজ শুরু করতে হলে প্রথমে ‘বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বলে শুরু করা আমাদের সংস্কৃতি। কেননা মহানবি (স.) এভাবেই কাজ শুরু করার পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন। পক্ষান্তরে হিন্দুরা ঈশ্বরের নামে খৃষ্টানরা গড এর নামে শুরু করে। তবে আমাদের মত এ ব্যাপারে তাদের কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা আছে বলে জানা যায় না। কোন ধর্মীয় সভা বা আলোচনা সভা শুরুর পূর্বে কোরআন তেলাওয়াত করা আমাদের সংস্কৃতি। পক্ষান্তরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কোন সভা বা আলোচনা সভা শুরুর পূর্বেই তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে তেলাওয়াত করা তাদের সংস্কৃতি মনে করেনা। ইদানিং অবশ্য ভারতে হিন্দুদের অনুষ্ঠানের শুরুতে গীতা পাঠ করা হয় যদিও বৃটিশ ভারত এমনটা করেনি।

ভোরে ফজরের সুমিষ্টি আজান শুনে আমাদের ঘুম ভাংগে। দৈনিক পাঁচবার মুয়াজ্জিন সুললীত কণ্ঠে আজান দিয়ে মুসলিম মিল্লাতকে নামাজের জন্য ডাকেন, এটা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। যে কোন মুসলিম বসতিপূর্ণ এলাকাতেই আজানের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস; আনন্দে নেচে ওঠে মুমিন হৃদয়। কবি কায়কোবাদের ভাষায়

কে ঐ শুনালো মোরে আজানের ধ্বনি
মরমে মরমে সেই সুর
বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ নাচিল ধমনী।

বাতাসের তালে তালে ভেসে আসা এ আজানের সুরে যেন এক অমৃত শুধা অনুভব করা যায়। কোন মুসলিমই পারে না এ আজানের সমালোচনা করতে। আজান শুনে আমরা মসজিদে ছুটে যাই নামাজের জন্য, এটা আমাদের সংস্কৃতি। পক্ষান্তরে হিন্দুরা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালায়, এটা তাদের সংস্কৃতি। মন্দিরে কিংবা গীর্জায় ঘন্টা বাজানো অন্যান্যদের সংস্কৃতি। হিন্দুরা গোসলের সময় পুকুর কিংবা নদীতে পূর্বদিকে মুখ করে সূর্যকে নমস্কার করে এটাও তাদেরই সংস্কৃতি।

পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ
দিন যত গড়াচ্ছে আধুনিকতা ‘ওয়েষ্টার্ণ কালচার’-এর ফ্যাশনে উত্তর আধুনিকতার নামে প্রকারান্তরে চিন্তা ও বাহ্যিকতায় পশ্চিমাবিশ্বের একজন সম্মানিত সদস্য হিসেবেই নিজেদেরকে মানিয়ে নিচ্ছি; এমনকি পশ্চিমা সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে ভাবতে গর্ববোধ করছি। মুসলিম সংস্কৃতির মূলকথা ঈমান বা বিশ্বাস হলেও পশ্চিমাবিশ্ব সংস্কৃতি বলতে চিত্তবিনোদনের উপায়কেই উপস্থাপিত করে থাকে। কেননা বিশ্বাসের ভীতে আঘাত করতে বাধা যতটা প্রকট হবে, চিত্তবিনোদনের নামে অশ্লিল গান, নৃত্য, নগ্নতা, উলঙ্গপনা প্রভৃতির নেশায় বাগিয়ে নেয়া ততটা কঠিন নয়। তাইতো মর্ডানিজম, সোসালিজম তথা আধুনিকতা ও সামাজিক আভিজাত্যের খোলসে যুবক-যুবতীর নগ্নতা, লিভটুগেদার, নারী দেহের উলঙ্গ প্রদর্শনী এসব নির্লজ্জতা ও রুচিহীনতাকে শিল্প সৌকর্যের নান্দনিক বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়ে থাকে। সে প্রেক্ষিতে খেলাধুলা থেকে শুরু করে যে কোন আনুষ্ঠানিকতায় যে যত নগ্নতা প্রদর্শন করতে সক্ষম সে তত অভিজাত, উন্নত, উত্তরাধুনিক ও মুক্ত সংস্কৃতির স্বার্থক শিল্পী হিসেবে বিবেচিত। নারীদেহের নগ্ন উপস্থাপনাকে আধুনিক শিল্পের নান্দনিকতার পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে কবিতায়, গল্পে, প্রবন্ধে, নাটকে, সিনেমায় কিংবা অন্য কোন বিনোদন অনুষ্ঠানে স্বার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সত্যিকার অর্থে শয়তান ছড়িয়ে পড়ে নারী সৌন্দর্যের নান্দনিকতাকে নগ্নতার চিত্রে উপস্থাপিত করে নৈতিক পদস্খলনকে বাহন বানিয়ে। সেখান থেকে জন্ম নেয় স্বার্থ, সুখ ও বিলাসবাদী দর্শন; আর তার ভিত্তিতেই ছড়িয়ে পড়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, নিজেকে বিকশিত ও ভোগের সাগরে নেবার প্রাণান্তকর প্রয়াস।

বিশ্বাস সব সময়ই পরিবর্তনশীল। তাই মনের সামনে বিভিন্ন চিত্র প্রদার্শিত হতে হতে যেটা হৃদয়গ্রাহী ও মনে ক্রিয়াশীল হবে সেটার প্রতিই সৃষ্টি হবে বিশ্বাস। বিশ্বাস সৃষ্টির প্রধান বাহন প্রচার বা মিডিয়া। ইসলামে একে দাওয়াত বলে সম্মোধন করে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কাজ বলে ঘোষণা করেছে। সে হিসেবে মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা ছিল মুসলমানদের হাতে। অথচ বিশ্বব্যাপী তথ্য প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক মিডিয়ার নিয়ন্ত্রন এখন পুরোদমে পাশ্চাত্য জগতের অমুসলিমদের হাতে। পৃথিবীর সবচে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সংস্থা এসোসিয়েট প্রেস বা এপির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল বা ইউ পি আই একটি মার্কিন বার্তাসংস্থা। রয়টারের ঠিকানা বৃটেন এবং এ এফ পির সদর দপ্তর ফ্রান্সে। এ চারটি বার্তা সংস্থাই বিশ্বের সংবাদ প্রবাহের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ ছাড়াও বিবিসি, সিএনএন, স্কাই নিউজসহ ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সবগুলো কেন্দ্রই অমুসলিমদের দখলে। যে সব মানুষ উন্নয়নশীলবিশ্বে নিজেদের মতলব হাসিলের মত কাজ করতে করতে স্থানীয় জনগণের বোধ বিশ্বাস তথা স্বকীয় সংস্কৃতির বৃক্ষের শেকড়কাটার কাজ করছে এ সকল মিডিয়া তাদেরকে উদারপন্থী, মানবতাবাদী ও দেবতার আসনে আসীন করতে যথাসম্ভব সকল প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। পক্ষান্তরে উন্নয়নশীলবিশ্বে তথা বিশেষত মুসলিমবিশ্বে যখন প্রকৃত দেশ প্রেমিক ও স্বাধীনচেতা কোন দেশ বা দলের বিরুদ্ধে নির্যাতন চলে কিংবা কোন দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানগণ যখন নির্যাতিত হয় তখন তারা সে বিষয়ে নিঃচুপ থাকে কিংবা তাদের কর্মসূচী ও অবস্থাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে সালমান রুশদি, তসলিমা নাসরিন কিংবা দাউদ হায়দারের মতো মুসলিম নামধারী ব্যক্তিদের টাকা বিনিময়ে খরিদ করে স্বজাতীয় মুসলামনদের বোধবিশ্বাসে আঘাত হানে তখন তারা এ কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবধিকার বলে সমর্থন ও মদদ যোগায়। অবশ্য এটা তাদের দোষের কিছু নয়, কারণ তাদের মিডিয়া তাদের কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তারা বিশ্বমানবতাবাদী হিসেবে নিজেদেরকে উপস্থাপন করতে চায়, তখনই এ বেদনা বেশী অনুভূত হয়।
বর্তমানবিশ্বের ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিচয়দানকারী ইউরোপ-আমেরিকাসহ মহাশক্তিবর্গ ঠান্ডা লড়াইয়ের হেকমতে জাতিতে জাতিতে, মানুষে মানুষে, দেশে দেশে ছড়িয়ে দেয় অনৈক্য ও অবিশ্বাসের বিষবাষ্প। সেই হেকমতের স্বীকার হয় মিন্দানাওসহ ফিলিপাইনের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, মিয়ানমারের আরাকান, ভারতের কাশ্মীর, পার্শ¦বর্তী আফগানিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন, ইরাকসহ অসংখ্য মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। সভ্যতার স্বর্ণযুগে এসেও অর্ধশতাব্দী থেকে সুসভ্যজাতি রক্তের হোলিখেলা দেখছে এ সব অঞ্চলে। এছাড়াও তাদের হেকমতি গণতন্ত্র এবং মানবতাবাদের খোলসে নিজেদের কর্তৃত্বকে বিশ্বব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও পরিশীলিত পন্থায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সভ্যতা বিধংসী পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধা করছেনা। সভ্যতার লীলাভূমি ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন এবং আফগানিস্তানে গণতন্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতে এসে তারা হিংস্রতার সকল প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে দ্বিধা করেনি। ফিলিস্তিন, আরাকান ও কাশ্মিরের স্বাধীকার আন্দোলন পরিচালনা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, ইরাকমুক্তি আন্দোলন শুধু নয় বরং সাদ্দাম হোসেনের বেঁচে থাকাটাও সন্ত্রাস; তাই সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলতেই হলো। এছাড়া ইসলামের প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরব, ইরান, মিশর, সিরিয়া, তুরস্ক, আলজেরিয়া, বসনিয়া, চেচনিয়া, আজারবাইজান, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াতেও কালো থাবা বিস্তারের সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রেখেছে। কম্পিউটারের উৎকর্ষতার সুযোগে মিডিয়ার দৌরাত্মে তারা এখন বিশ্বমোড়লের ভূমিকায়। বিশেষকরে রাশিয়ার পতনের পর আমেরিকা বৃটেনকে সঙ্গী করে একক আধিপত্য বিস্তারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। মানচিত্র ভেদে তাদের পারিকল্পনাও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় গৃহীত। মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত শিয়া-সুন্নীসহ মাজহাবী বিভেদ সৃষ্টি, সাদা কালোর বৈপরিত্য, আধুনিকতার নামে ইসলাম বিমুখতার ফ্যাশনে ইসলামের ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে বিচ্ছিন্ন করে মুসলিম বিশ্বের ফাটল তৈরীতে তারা পুরোপুরিভাবে সফল হয়েছে। উসামা বিন লাদেনকে পকিল্পিতভাবে হিরো বানিয়ে তার বিরোধীতার যুদ্ধে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবহার করছে। এক আরব রাষ্ট্রকে আরেক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা ব্যবহার করেছে। অবশেষে পাকিস্তান ও বাংলাদেশকেও ব্যবহার করতে চাচ্ছে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে। স্বাধীন সত্তা আজ মুসলমানদের কাছে স্বপ্নের বিষয়। মসজিদের মধ্যে বিশ্বাসী সংস্কৃতির চর্চা লক্ষ্য করা গেলেও সমগ্র জীবনে তাদেরই কর্তৃত্ব। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বকবি ডক্টর আল্লামা ইকবালের কথাই স্মরণ করতে হয়। তিনি মনে করেন ‘এ দুনিয়ার জীবনে যারা রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অন্য জাতির অনুকরণ করে, অনুসরণ করে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যারা পরাধীন, স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ও জাতি হিসেবে যাদের পরিচয় নেই, স্বাধীনতা লাভ ও এর রক্ষার দায়িত্ববোধ যাদের চিন্তা চেতনায় নেই, এমনকি যাদের রুহ বা আত্মা স্বাধীন জীবন বোধ থেকেও বঞ্চিত তারা চিরমৃত, অনন্ত-অসীম সুখ-শান্তি লাভ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মূলত পরাধীন জাতি মৃতের চেয়েও নিকৃষ্ট।’ ইকবালের সমকালীন পরাধীনতা ও বর্তমান পরাধীনতায় বাহ্যত উপনিবেশিকতার পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও মূলত বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার সুবাদে পরাধীনতার চিত্র একই বরং আরো মারাত্মক। বিশ্বাসে, নিঃস্বাসে, চিন্তা চেতনায় এমন কি জীবন যাত্রাতেও যখন তাদেরই মত ও পথ তখন ভৌগোলিক স্বাধীনতাও পরাধীনতারই আরেক রূপ বৈকি।

শুধু প্রচারের ক্ষেত্রেই নয়, ইলেকট্রনিক্স কিংবা প্রিন্টিং মিডিয়ার বিনোদন মাধ্যমগুলোরও টার্গেট মুসলমানদের ঐতিহ্যগত লোকবিশ্বাস ও মূল্যবোধের মুলোৎপাটন করা। সাংস্কৃতিক জীবনে এ অভাব পূরণে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। কেননা সাহিত্য একদিকে বিনোদন মাধ্যম অন্যদিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ার। কিন্তু ইদানিং সাহিত্যের মূল প্রতিপদ্য বিষয় যেন পরকীয়া প্রেম, প্রেমের নামে নষ্টামী এবং বিশ্বাসের শেকড় কেটে দেয়া। এ সবের পাশাপাশি অনেক লেখক ইসলামকে অপ্রগতিশীল বা প্রগতির অন্তরায় বলে চিহ্নিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সেইসাথে অশ্লিলতার ইজারা নিয়ে ব্যাঙের ছাতার মত গজে উঠছে অসংখ্য নগ্ন পত্র পত্রিকা। নারীর উলঙ্গ দেহ ছাপিয়ে যুব সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে তারা।

বিনোদন মাধ্যমগুলোর অনাতম হলো চলচ্চিত্র, রেডিও টেলিভিশন এবং প্রিন্টিং মিডিয়া। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, গোটা বিনোদন মাধ্যমই ইসলামের ক্ষতি সাধনের জন্য বদ্ধপরিকর। সিনেমাগুলোতে অর্ধ উলঙ্গ বাংলা ছায়াছবি দিয়েও আর মন ভরছে না, তারা এখন খোলাখুলি ময়দানে উলঙ্গ হিন্দী, ইংলিশ প্রভৃতি ছায়াছবি প্রদর্শনীতে নেমেছে। এগুলো ছবিতে নাকি কাটপিসও সংযুক্ত করা হয়ে থাকে। মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ নৈতিক চরিত্রকে এভাবেই ধ্বংস করা হচ্ছে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, চিত্তবিনোদনের মাধ্যমসমূহকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে মুসলমানদেরকে শিকার করার জন্য। নৈতিকতার পদস্খলনের ভয়ে মুসলমানগণ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলসহ মিডিয়ার দিকে শ্রমশক্তি বিনিয়োগ না করার ফলে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিনোদন মাধ্যম মুসলিম মিল্লাতের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ হয়ে উঠেনি। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম, টাইটানিক যাত্রীদের মত অজান্তেই মুসলমানদের ঘরে ঘরে পশ্চিমা সংস্কৃতির বিষবাষ্প আনন্দ চিত্তে ঢুকে পড়েই ক্ষান্ত হয়নি বরং মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এতটাই প্রভাবিত করেছে যে, মুসলমানের সন্তানেরাও জাতে উঠার জন্য পশ্চিমা সংস্কৃতির আদলে নিজেদেরকে গঠিত করতে ব্যস্ত। মুসলিমবিশ্বের এ অধঃপতিত চেহারা থেকে ভিন্ন নয় বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী।

মুসলিম অধ্যূষিত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। অথচ সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনায় এর আকাশ মাটি কোনটিই স্বাধীন নয়। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের শিকার এ দেশের সংস্কৃতি। এ দেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র বিনাশ, জঙ্গীবাদ সৃষ্টির মধ্যদিয়ে ধর্মীয় চেতনাকে বিকৃতকরণ, ঐতিহ্য চেতনায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গুপ্তচর বৃত্তি, সাবোটোজ বা নাশকতামূলক তৎপরতা পরিচালনা, দেশের ভেতর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত জিইয়ে রাখা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনাশ, অর্থনৈতিক বাজার দখল, প্রাকৃতিক সম্পদের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দান ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কুটনৈতিক চাপ প্রয়োগ, ছাত্র, রাজনীতিবিদ, সামরিক, বেসামরিক আমলা ও বুদ্ধিজীবীদের মগজ ধোলাই এবং মগজ ক্রয়, তথ্য সন্ত্রাস ও তথ্য প্রবাহে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি উপায়ে আগ্রাসন প্রক্রিয়া কার্যকর করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রিন্টিং ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া যথা- পত্র- প্রত্রিকা, সাহিত্য সামগ্রী এবং রেডিও-টিভি-সিনেমাসহ স্যাটেলাইট প্রযুক্তিকে তারা যথাযথভাবে কাজে লাগাচ্ছে। বেসরকারীভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা পত্র-প্রত্রিকা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই সরাসরি বিদেশের আর্থিক সহায়তায় স্বার্থসিদ্ধির জন্য নৈতিকতা বিবর্জিত সংস্কৃতি চর্চায় রত।

বিদেশী মোড়লদের সাহায্য-সহযোগিতায় দেশী সংস্কৃতিসেবীরা এ দেশে সংস্কৃতির দু’টো ধারা চালু করেছে। একটি খোদাহীন সংস্কৃতি, অন্যটি দেশজ মোড়কে অপসংস্কৃতি। এ দেশের মানুষ ধর্মীয় চেতনাবোধ সম্পন্ন হওয়ায় খোদাহীন সংস্কৃতিকে খুব বেশী প্রশ্রয় দেয়নি। কিন্তু প্রগতিশীল দেশজ ও বাঙালী সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতির বিষবাস্প এদেশবাসীকে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলেছে। তারা বাঙালী ও দেশজ সংস্কৃতির নামে অতিপ্রগতিশীল হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রকারন্তে খোদা বিমুখ সংস্কৃতিরই প্রকাশ ঘটাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ব্যক্তি মানুষ ও সমাজবদ্ধ মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি দুভাবে প্রকাশ পায়। একটি দেশজ সংস্কৃতি এবং অপরটি আদর্শগত সংস্কৃতি। এ দুটি বিষয় একই সঙ্গে ব্যক্তি ও সমাজে চর্চা হতে পারে; যদি একে অপরের মধ্যে দ্বন্দ সংঘাত সৃষ্টি না করে। যেমন- শাড়ি-লুঙ্গি পরিধান বাংলাদেশী জনগণের দেশজ সংস্কৃতির অন্তর্গত হলেও এগুলো কোন ধর্মের মানুষের ব্যাপারে বিরোধ সৃষ্টি করে না। কিন্তু আদর্শ জাত সংস্কৃতি রীতিমত বড় রকম বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা এই বিরোধ হার-জিতের উপর একটি জাতিসত্বার অস্তিত্ব নির্ভর করে। বস্তুত, দেশ সংস্কৃতি জন্ম দেয়না; দেশবাসী যে সংস্কৃতির সৃষ্টি করে দেশ তা ধারণ করে। অতীতের পৌত্তলিক কৃষ্টি অধ্যুষিত আরবে এবং অগ্নি পূজকদের দেশ ইরানে আজ ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে। দেশতো একই রয়েছে, সংস্কৃতি বদলে গেছে। এ বাংলাই একদিন জৈন সংস্কৃতির প্রধান্য ছিল; পরে বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রাধান্য সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি কয়েকদিন হিন্দু সংস্কৃতিও আরোপিত হয়েছিল। আজ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির জয়জয়াকার চলবে এটাই স্বাভাবিক। এর ছায়াতলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান সংস্কৃতিও বিদ্যমান থাকবে। কারণ ইসলামের উদার শান্তির ছায়াতলে সবাই ঠাঁই পায়।
সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে তোলার জন্য বাংলাদেশে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। নাস্তিক্যবাদ, পূঁজিবাদ, বিকৃত ধর্মীয় ও কুসংস্কারবাদী মতবাদ এর উপর আঘাত হেনে চলেছে নানা ভাবে। ভারতীয় এজেন্টরা এদেশে শুরু করেছে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো। বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে এদেশের মানুষকে বিদেশী মনোভাবাপন্ন করে তুলবার চেষ্টা চলছে। যাকে বলা চলে, আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে এটিই হলো সংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রধান প্রচেষ্টা। এ সংস্কৃতির মাধ্যমে আল্লাহ রাসুলের সরাসরি বিরোধিতা না করে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও প্রগতির নামে অশ্লীলতার প্রসার ঘটিয়ে নৈতিক অবক্ষয়ের বিষ ছাড়াচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নেয়া এবং এর পাশাপাশি ইসলামী সংস্কৃতির কোন মডেল না থাকায় দেশবাসী এ সংস্কৃতিকে গোগ্রাসে গিলছে, কেননা এ সংস্কৃতিসেবীদের অনেকেই মুসলমান নামধারী। তাদের নির্মিত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে আল্লাহ্ ও রাসুল (সা.) নামও উচ্চারিত হয়। অথচ এ সংস্কৃতি যে নৈতিকতার জন্য কত বড় মারাতœক তা আজও কারো বোধগম্য হয়নি।
সংস্কৃতির এমন সংকটময় মুহূর্তে আমাদের নিজেস্ব সংস্কৃতি চর্চার গতিবেগ তাদের চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে সামনে এগুনো দরকার। অথচ এখনও আমরা নিজেদের সংস্কৃতির স্বরূপ নিয়ে সংশায়িত। আমরা কারা, আমাদের সংস্কৃতি কোনটি, এর প্রকৃতিই বা কেমন- এসব বিষয়ে আজো আমাদের পরিচ্ছন্ন ধারণা নেই। আজ অপসংস্কৃতি যখন ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে গোটা জাতির আহার যোগাচ্ছে (?) তখন তার উচ্ছিষ্টাংশ নিয়ে আমরা গবেষণা শুরু করেছি যে, এটা কেমন ধরনের ফল, জাতিসত্ত্বাকে বাঁচানোর জন্য আমাদেরকে এর বিকল্প কোন ফলের গাছ রোপন করতে হবে কিনা? এতে কেউ প্রয়োজন অনুভব করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চায়, কেউবা সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সংশায়িত হয়ে বিদায়াতের ফতুয়া দিয়ে ইসলামকে জাতি সামনে অত্যন্ত কঠিন ও ভয়ের বস্তু হিসেবে তুলে ধরছে।
পক্ষান্তরে যারা জাতিসত্ত্বাকে বাঁচানোর তাকিদে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি তারাও ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ। ইসলামী মূল্যবোধের গান হলে তার গণ্ডি কতটুকু হবে? মিউজিক চলবে কিনা? চললে কেমন ধরনের মিউজিক ব্যবহার করা যাবে? নাটকে নারী চরিত্র চলবে কিনা? কবিতা ও সাহিত্যে প্রেম বিষয়ক কিছু বৈধ কিনা ইত্যাদি, ইত্যাদি প্রশ্ন। এতে কেউবা গানে মিউজিক, নাটকে নারী চরিত্র ও সাহিত্যে প্রেমকে অবৈধ ঘোষণা করছি, কেউবা মনে করি যে, আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে এগুলো ছাড়া সংস্কৃতি চর্চাই সম্ভব নয়। ফলে আজও আমরা জাতির সামনে সংস্কৃতির কোন মডেল দাঁড় করাতে পারিনি।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে তৈরী হয়েছে হাজারো ছিদ্রপথ, তাই সমকালীনবিশ্বেও প্রতিযোগিতামূলক আধুনিক জ্ঞান অর্জনের কোন বিকল্প নেই, সেটা হোক মিডিয়া কিংবা বিনোদন মিডিয়া। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে শরিয়াতের আধুনিক গবেষণা এখন সময়ের দাবী। ১৯২৬ সালে এক বক্তৃতাতে জ্ঞান অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করে ইকবাল বলেন, “যারা নিজেরা সংবাদপত্র পড়তে অপারগ তারা যেন অন্যদের কাছ থেকে শুনে নেয়, কেননা সমকালীন বিশ্বে যে সব জাতি কর্মতৎপর রয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশ জাতিই মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে।’ খুদী দর্শনের মাধ্যমে তিনি জ্ঞানে ও ধ্যানে আত্মাকে এতটা প্রখর করতে বলেছেন যে-

কর উন্নত সত্তা এমন
যেন তক্দির লেখার আগে
শুধান আল্লাহ বান্দাকে : বল্
কি বাসনা তোর হৃদয়ে জাগে।
(ফররুখ আহমদ অনূদিত)

প্রতিরোধ প্রয়াস
ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়নি, এ কথা বলাও ঠিক হবে না। সারা দেশে ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া বিদ্যমান। ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী সংস্কৃতিসেবীরা আন্তরিকভাবেই প্রচলিত অপসংস্কৃতির বিরোধী। অশ্লিলতা, বেহায়াপনাকে পারিবারিক ঐতিহ্যগতভাবেই মুসলিম সমাজে অপছন্দনীয়; সেইসাথে ইসলামী চেতনায় উজ্জীবিত ছাত্র ও যুবকদের পক্ষ থেকেও বিভিন্নভাবে একাজকে ত্বরান্বিত করার প্রয়াস চলছে। অন্যদের তুলনায় অতি সামান্য আকারে হলেও তাদের প্রচেষ্ঠায় মহানগরীসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরে বেশ কিছু এনজিও এবং সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠেছে যারা সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ চায়। তাদের মাধ্যমে কিছু জাতীয় ইস্যু পালন ছাড়াও অপসংস্কৃতির প্রতিরোধে সাহিত্য সামগ্রীসহ গান ও নাটকের বেশ কিছু অডিও ভিডিও ক্যাসেটও প্রকাশিত হয়েছে, যদিও তা পুরোপুরি আধুনিক মানের হয়ে ওঠেনি। আধুনিক প্রকাশনী, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র, আলমানার অডিও ভিজ্যুয়াল সেন্টার, আইসিএস প্রকাশনী, স্পন্দন অডিও ভিজ্যুাল সেন্টার, বাংলাদেশ সংস্কৃতিকেন্দ্র, চট্টগ্রাম সংস্কৃতিকেন্দ্র, রাজশাহী সংস্কৃতিকেন্দ্রসহ সারাদেশে জেলাভিত্তিক সংস্কৃতিকেন্দ্রসমূহ ছাড়াও বিশ্বাসী চেতনার অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এ অংগনে বেশ কাজ করে যাচ্ছে।

ছাত্র যুবকদের মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে ‘সমন্বিত সংস্কৃতি সংসদ’ সারাদেশের সাহিত্য, নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়ে গঠিত। এদের মধ্যে ঢাকার সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠী, অনুপম, উচ্চারণ শিল্পী গোষ্ঠী, বিপরীত উচ্চারণ, চট্টগ্রামের পাঞ্জেরী, রাজশাহীর প্রত্যয় ও বিকল্প, বগুড়ার সমন্বয়-সম্মিলন-মাহী, খুলনার টাইফুন, বরিশালের হেরাররশ্মি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যতিক্রম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেশ কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠনের অবস্থা অনেকটা ভাল। এ সংগঠনগুলোতে নিয়মিত সাহিত্য সভা, লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনা, নাটক মঞ্চায়ন ও সঙ্গীতচর্চা প্রভৃতির ক্ষেত্রে আশার আলো ছড়াতে সমর্থ হয়েছে।
দক্ষতা ও যোগ্যতার ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলেও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব ও নিজেদের আস্থাহীনতা যেমন পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে তেমনি অর্থনৈতিক সংকট, আলাদা নাট্য মঞ্চ সংকট, তথ্য সন্ত্রাসে বিভ্রান্তি হওয়া, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের বাঁধা, আধুনিক প্রযুক্তির অজ্ঞানতা, সর্বোপরি সংস্কৃতির সঠিক মডেল না পেয়ে এ অভিযানে বিজয়ের টার্গেট না হয়ে আতœরক্ষামূলক অবস্থান নেয়া হয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার ফলে এ প্রয়াস সাধারণ জনগণের মাঝে কাংখিত আবেদন সৃষ্টিতে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। সেক্ষেত্রে নিুোক্ত সমস্যাসমুহের সামাধান জরূরী।

১.     সংস্কৃতির সঠিক ধারণা উপস্থাপন করে এটাকে উভয় জগতের মুক্তির উসিলা হিসেবে গ্রহণ করা।
২.     দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংস্কৃতিকেন্দ্রসমূহকে আরো সহযোগিতা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় অঞ্চলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে উন্নতমানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ।
৩.     সময়োপযোগী জীবন ঘনিষ্ঠ স্ক্রিপট তৈরি এবং যথাযথ মনসম্মতভাবে উপস্থাপন এখন সময়ের দাবি। বিশ্বাসকে সমুন্নত রেখে আধুনিকতাকে গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই। তবে নিজেদের মৌলিকত্বকে বিসর্জন দেবার কোন সুযোগ নেই। কারণ আমরা শুধু শিল্পের জন্যই সংস্কৃতি করিনা; বিশ্বাসকে আরো মজবুতকরণের প্রয়াসেই আমার এ পথে এগিয়ে যাওয়া।
৪.     বিভাগীয় শহর ছাড়াও দেশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রসমূহে নিজস্ব বলয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়তে উৎসাহিত করা। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকসহ উন্নতমানের লেখক থাকলেও উল্লেখযোগ্য হারে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া জরুরী।
৫.     সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সাহিত্য প্রকাশনার কোন বিকল্প নেই। বিভাগীয় শহর ছাড়াও দেশের বিভাগীয় অঞ্চল হতে প্রকাশিত সাহিত্যের সকল কাগজই অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বিশেষত বিজ্ঞাপন সংকটে সঠিকভাবে প্রকাশিত হতে পারছেনা। তাই এ বিষয়ে আরো চিন্তা করা প্রয়োজন।
৬. প্রকাশিত সাংস্কৃতিক উপকরণগুলিকে ক্রয় ও উপহার সামগ্রীর আওতায় আনতে হবে। বিভিন্ন উপলক্ষ এবং উৎসবাদিতে আমাদের বিশ্বাসের লেখকদের বই-পত্রপত্রিকা, সিডি-ভিসিডি প্রভৃতিকে উপহার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করে এর প্রচার, প্রসার ও বিপণণ বাড়াতে হবে।
৭. আন্তঃসংগঠন ও সংস্থাসমূহের মধ্যকার যোগাযোগ অনেকাংশে কমে গেছে। সাংস্কৃতিক বিজয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চাইলে প্রতিযোগিতার মানসিকতা মাথায় রেখেই এ যোগাযোগ অবশ্যই আরো বাড়াতে হবে।
৮. সাংস্কৃতিক অংগনে পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। মিডিয়ার বিভিন্ন অংগনে নিজেদের পেশাদারিত্বের অবস্থান তৈরির মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সংস্কৃতিকর্মীদের মনে রাখতে হবে যে, আমার জায়গা তৈরির জন্য আমাকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে; কেউ আমাকে জায়গা তৈরি করে দিয়ে টেনে নিয়ে সেখানে বসাবে না। টেনে বসিয়ে দিয়ে কখনো যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হয় না। সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের আসন তৈরিতে নিজেদের মিশন-ভিষণ এবং যোগ্যতার কোন বিকল্প নেই। তবে এ ক্ষেত্রে পরামর্শ ও সহযোগি হাতের অভাব হবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী। তারা অপসংস্কৃতি চায় না; সুস্থ মননশীল সংস্কৃতি চায়। এটা না পেয়ে ঝুঁকে পড়েছে অপসংস্কৃতির দিকে। বিদেশীদের অর্থ সাহায্য ও উৎসাহ উদ্দীপনায় সংস্কৃতিসেবীরা সুক্ষ্মভাবে ইসলামী আকিদার শেকড় কেটে দিচ্ছে। তাই ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসীদেরকে নিজস্ব আকিদার ভিত্তিতে আলাদা প্লাটফর্ম গড়ে তোলার দরকার। অতিস্বত্ত্বর সংস্কৃতির মাপকাঠি তৈরী করে আস্থা ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সমমনা সংগঠনসমূহের সমন্বয় গড়ে তুলে বিজয় নেশায় নতুন উদ্দীপনাসহকারে কাজে নামতে হবে। সেইসাথে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম তৈরীর তত্ত্বাবধানসহ গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য আরো বাড়ানো দরকার। মিডিয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি আন্তরিক হওয়া জরুরী। বিশ্বাসী চেতনায় বলিয়ান হয়ে সকল প্রকার স্বার্থান্ধতা ও  ছোটখাট মতপার্থক্য ভুলে সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের সফল উপায় বের করতে হবে। তবেই আতœার বিকাশ ও নতুন উদ্যমে জাগরণ তৈরী করা সম্ভব। এপ্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ভিত্তিতে জ্ঞানচর্চা আরো বৃদ্ধি করে যোগ্যতার ভিত্তিতে জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মজবুত সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বুদ্ধিজীবি ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে পারলেই সামনের পথ আরো পরিষ্কার হবে। ফররুখ আহমদের ভাষায় :

ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও হে মাঝি সিন্দবাদ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী