‘জীবনের কলরব’ মিছে নয়

আবু এন এম ওয়াহিদঃ 

ছাত্রজীবনে সিলেট অথবা ঢাকা শহরে কিংবা বাংলাদেশের অন্য কোনো প্রান্তে গরিব মানুষের কর্মময় নাগরিকজীবন কাছ থেকে দেখার যে সুযোগ পাইনি তা নয়; পেয়েছি, দেখেছিও অনেক, কিন্তু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখিনি, যাকে বলে ‘পর্যবেক্ষণ’, তা করতে পারিনি, করিনি। করিনি দুই কারণে – প্রথমত, অল্প বয়সে আমার চিন্তা শক্তি দুর্বল ছিল, দূরদৃষ্টি ছিল না, অন্তর্দৃষ্টি তো নয়-ই; দ্বিতীয়ত, জীবনকে গভীরভাবে বোঝার ও অনুভব করার সামর্থ্যও তখন অর্জন করিনি। বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে, জীবনে চলার পথে, চলতেফিরতে পথেঘাটে অনেক কিছু দেখেছি, অনেক কিছু শিখেছি। পরিপক্কতা, বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা বেড়েছি কিনা জানি না, তবে অনুভূতি তীক্ষè হয়েছে, মানুষের জীবন ও জীবনবোধ সম্বন্ধে আমার স্পর্শকাতরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এসবের সুবাদে আজকাল যখন কোনো খেটে খাওয়া, দিন-আনা দিন-খাওয়া শহুরে মানুষকেকর্মরত অবস্থায় দেখি, তখন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াই, শ্রদ্ধাভরে তাঁকে সালাম জানাই, কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকি, আপাদমস্তকঅবলোকন করি, তাঁর শরীরের বিন্দু বিন্দু ঘাম এবং চোখেমুখে প্রকাশিত ক্লান্তির আড়ালেআত্মতৃপ্তি ও প্রশান্তির এক ঝাঁক সোনালী আলোকরেখা দেখতে পাই!

ভাবি, তাঁরই মায়ের গর্ভে আমারও তো জন্ম হতে পারত! আমার ভাগ্যলিপি তাঁর চেয়ে করুণও হতে পারত, আর হলেই বাকরার কী ছিল? ক্ষতিই বা কী ছিল? আমি কি ওই মানুষটির চেয়ে খুব একটা ভালো আছি? সুখে আছি?সুখের সংজ্ঞাই বা কী? এক জনের উপযোগিতা, সুখ, শান্তি ও আনন্দ কি আরেক জনের সঙ্গে তুলনা করা চলে? দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের মাঝে এসবনিয়ে তর্কবিতর্কের শেষ নেই!প্রাসঙ্গিক হলেওসে তর্কে আমি যাব না, গিয়ে খুব একটা লাভও নেই, কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানব জীবনে যত বড় বড় ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে তার ওপর ব্যক্তির কোনোই নিয়ন্ত্রণ থাকে না;আর তাই বাদবাকি মামুলি বিষয়াদি নিয়ে পেরেশানি করার কী-ই বা যুক্তি থাকতে পারে? জীবনকে জীবনের মতই দেখা উচিৎ, সুখ-দুঃখ সব কিছু সব সময় সমানভাবে হাসিমুখে বরণ করা নেওয়াই ভালো, ইংরেজিতে যাকে বলে, ‘ Coming to terms
with life. .’

তত্ত্বকথা বাদ দিয়ে এবার মূল কথায় আসা যাক। আজ আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি বাস্তব জীবনেরনতুন এক অভিজ্ঞতার ডালি নিয়ে। এ অভিজ্ঞতা আমার জীবনোপলব্ধিতে এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়ে গেছে। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও একটি স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাওয়াতি বক্তৃতা উপলক্ষে এবারকার শীতের ছুটিতে আমি ভারতের মুম্বাই গিয়েছিলাম। যে ‘মুম্বাই’-এর পটভূমিতে শাহরুখ খান ও মাধুরী দীক্ষিতকে রূপালী পর্দায় নাচতে দেখা যায়, এ মুম্বাই সে ‘মুম্বাই’ নয়; এ মুম্বাই ভিন্ন এক মুম্বাই। এবার এই মুম্বাইয়েরই এক কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলাম একাধারে ৫ দিন। এই সুযোগে প্রাচীন ওই বন্দর নগরীর ফুটপাথের পানের দোকানদার আব্দুল খালেক ও তাঁর মত আরো কয়েকজন অতি সাধারণ মানুষের সাথে আমার ‘অসাধারণ’ সাক্ষাৎ ঘটেছে! ‘অসাধারণ’ বলছি এ জন্য যে, একই রকমের মোলাকাত ও মোয়ামেলাত এর আগে আমার অনুভূতিকে এমনভাবে নাড়া দেয়নি, হৃদয়কে ছুঁয়ে যেতে পারেনি। মুম্বাইয়ে দেখেছি আধুনিক নাগরিক জীবনের বিচিত্র এক চিত্র; দেখেছি রাস্তায় নিচুতলার মানুষের চলাচল; তাঁদের বেচাকেনা, কর্মচাঞ্চল্য ও তাঁদের জীবনের বহুমাত্রিক গতিময়তা। আর এসব নিয়েই রচিত হয়েছে আমার আজকের এই ক্ষুদ্র কাহিনি।

মুম্বাইতে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল ছত্রপতি শিবাজীআন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিকটে চার তারকা ‘হলিডে ইন’ হোটেলে।অভিজাত হলেও হোটেলটির অবস্থান কোনো অভিজাত এলাকায় নয়; দেখলাম, এর চারদিকে সাধারণ গরিব মানুষেরই বসবাস। হোটেলের গা ঘেষে পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু দু’টো দালান।বাহির থেকে দালানগুলোর ময়লাযুক্তজরাজীর্ণ দশা ও তাতে বসবাসকারিদের জীবনমানের চালচিত্র দেখে মনে হলোসেখানেগরিব মানুষরাই থাকেন, বড়জোর তাঁদেরকেনি¤œমধ্যবিত্ত বলা যায়, এর বেশি কিছু নয়। পূর্বদিকে হোটেলের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি সরু গলি, গলির উল্টোদিকে একটি মাঝারি আকারের বস্তি। বস্তিটি খড়কুটোর তৈরি ঝুপড়ি ঘরের সমাহার নয়, বরং সেগুলো এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা অতি পুরনো, কোথাও ভেঙ্গে পড়া, কোথাও ক্ষয়ে যাওয়া ইটের দেয়ালের ওপর কোনো রকম দাঁড়িয়ে আছে। সেই সব ঘরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেসব হতভাগা নারী-পুরুষসংসার পেতেছেন তাঁদের মাথার ওপরে আছে জং ধরা পুরনো টিনের ছাউনি। হোটেলের রুম থেকে বড় কাচের জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায়, টিনের ছাদে জায়গায় জায়গায় রঙ বেরঙের প্লাস্টিক বিছিয়ে তার ওপর এলোপাতাড়ি ইট-পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে প্লাস্টিকের আবরণঝড়বাতাসে উড়ে পড়ে না যায়, ঘরে বৃষ্টির পানি অঝোরে না ঝরে। চিপা গলির নাম ‘কুর্লা ওয়েস্ট’, তার উল্টো দিকে বস্তির অন্য পাশ দিয়ে সোজা চলে গেছে শহরের একটি ব্যস্ততম চওড়া রাস্তা -যার নাম ‘সাকিনাকা’।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই আমি মুম্বাইয়ের ব্যস্ত নগরজীবন সরজমিনে দেখার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়তাম। ‘কুর্লা ওয়েস্ট’ ও ‘সাকিনাকা’-ই ছিল আমার দৈনন্দিন ভ্রমণের পথ। কর্মচঞ্চল মানুষের ভীড় ঠেলে ঠেলে উভয় সড়ক ধরে আমি নিয়মিত মাইল খানেক হাঁটতাম।কোনো ভাঙ্গা ঘরের দুয়ারে, তার আশেপাশে – ফুটপাথে, কিংবা ঘরের পেছনেলোকজনের বিকিকিনি দেখতাম; ওই সব জায়গায় জোয়ান-বুড়ো, নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের নানা কর্মকা- উপভোগ করতাম; দোকানীদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম; মাঝে মাঝে কোনো ভাসমান দোকান থেকে নিজের জন্য কলা, কমলা, ইত্যাদি কিনেছিও। তাঁদের সঙ্গে কথা বলারও চেষ্টা করেছি, কিন্তুউর্দু-হিন্দিতে আমার দৈন্যতার কারণে কার্যকরভাবে ওই সংগ্রামী মানুষগুলোর সাথে ভাবের কোনো আদান-প্রদান হয়নি। এ সীমাবদ্ধতাকে মাথায় রেখেই এবার বলছি, মুম্বাইয়ের রাজপথে, কাদের সাথে আমার দেখা হয়েছে, সেখানে আমি কী কী দেখেছি, জীবনের পাঠশালা থেকে কী পাঠ নিয়েছি, কী-ই বা শিখেছি?

‘কুর্লা ওয়েস্ট’ একটি চিকন এক লেনের ‘ওয়ান ওয়ে’ সড়ক, কোনো রকম একমুখী হয়ে একটি মাত্র গাড়িই চলতে পারে। তবে এক কালে চললেও আজকাল এ রাস্তা দিয়ে আর তিন বা ততোধিক চাকার যন্ত্রচালিত কোনো যানবাহন চলাচল করে না, করতে পারে না। কেবলই চলে ঠেলাগাড়ি, ভেন্ডিং কার্টও বাইসিক্ল; আরঅগনিত মানুষের পদচারণা তো আছেই; কদাচিৎ চলমান মোটরবাইকে দু’এক জন যাত্রীর দেখা পাওয়া যায়। এর মানে ঐতিহাসিক মুম্বাই নগরীরওই রাস্তাটি মরে গেছে। তলদেশে জমাটবাঁধা পলি, বৈর্জ্য নিক্ষেপ ও পানি দূষণের ফলে বাংলাদেশের অসংখ্য নদী যেমন মরে গেছে, মুম্বাই নগরের একটি চলমান রাস্তা হিসেবে ‘কুর্লা ওয়েস্ট’-ও সেভাবে মরে গেছে। মরার কারণ স্বরূপ আমি যা দেখেছি তা ভাষায় বর্ণনা করা বড়ই কঠিন।

মূল রাস্তা যেমনই থাকুক, তার দু’পাশে দু’টো ফুটপাথ আছে, কিন্তু ফুটপাথের অবস্থা রাস্তার চেয়ে আরো করুণ। ফুটপাথ ধরে পথচারীদের হাঁটাচলা করার কোনো উপায় নেই। এর ওপরে আছে পানের দোকান, চায়ের দোকান, আরো আছে রসের দোকান; এখানে রসিকজনরা রস খেতে আসেন, তাঁরা পয়সা দিয়ে রস কিনেন, দিন-দুপুরে এক হাতে কপালের ঘাম মুছেন, আরেক হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক গেলাস ঠা-া রস খান – ঘন মিষ্টিমধুর আখের রস। দোকানের সামনে এমন কাস্টমার কখনো বেশি, কখনো কম, সব সময় থাকেনও না, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, রসের দোকানে বিনে পয়সার খদ্দেররা সব সময় ভীড় করে থাকে, তারা ভনভন করে ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়ে, আবার বসে, যত্রতত্র বসে, রসওয়ালার রসালো শরীরেও বসে, রসিয়ে রসিয়ে আখের রস খায়। কেউ তাদের বাধা দেয় না, তাড়া করে না।মাছি, সে তো মাছি নয়, এ যেন ব্যস্ত জনজীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, একটি অলঙ্কার, এ যেন সৌন্দর্যের এক কৃষ্ণকায় প্রলেপ!

এই ফুটপাথ কারো জন্য মুনাফার দোকান, কারো জন্য কেনাকাটার জায়গা, কারো জন্য ঘরের বারান্দা।এখানে এমন ঘটনাও বিরল নয় যে, ঘর থেকে বের হয়েই ফুটপাথে শিশুরা খেলছে, গুড়-মুড়ি খাচ্ছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে, গলা ছেড়ে কাঁদছে। কারো জন্য এই ফুটপাথ নির্মাণসামগ্রীরাখার নিরাপদ গুদাম। কেউ থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন, ইট, বালু, পাথর, ইত্যাদি। কারো ঘরে জায়গা নেই, তিনি তাঁর ভাঙা মোটর সাইকেল, ছেঁড়া বাক্স, ব্যবহার অনুপযোগি সোফাসেট সযতেœ তুলে রেখেছেন ফুটপাথের ওপর। এ ছাড়া কোথাও কোথাও স্তুপাকারে জমে আছে ¯্রফে ধুলোবালি ও ময়লা-আবর্জনা, যেখানে মাছি ঘোরাঘুরি করে, ক্ষুধার্ত কুকুর উচ্ছিষ্ট খুঁজে, কাকের দল কা কা করে ওড়াউড়ি করে,কখনো মানুষ,কখনো কুকুরের ভয়ে তাদের ন্যায্য হিস্যায় ভাগ বসাতে পারে না।

আরো মজার ব্যাপার, হয়তো বা কোনো পাখির বিষ্ঠা থেকে ফুটপাথের কোনো ফাটলে গজে উঠেছে একটি ছোট্ট বটের চারা।কে বা কারা চারাগাছকে সেবাযতœ দিয়ে বড় করেছেন। পুজারিরা বটের গোড়ায় দেবতার আসন পেতেছেন, মূর্তি বসিয়েছেন, পুজোর ব্যবস্থা করেছেন। বটের গোড়ায় ফুটপাথের ওপর ছড়িয়ে আছে পুজোর অর্ঘ্য নানা জাতের,নানা বর্ণের শুকনোফুল। এ-ভাবে সরকারি ফুটপাথে গড়ে ওঠেছে বেসরকারি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপাসনালয়। রাস্তায় অগনিত ব্যস্ত মানুষের পথচলা, চলতে চলতে কেনাকাটা, নাগরিকজীবনের নানা কর্মচাঞ্চল্য এবং পুজো-অর্চনা এমনি করে একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে মুম্বাইয়ের রাজপথে। এমন দৃশ্য পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে, অন্য কোনো নগরীতে আছে কিনা আমার জানা নেই।

যে-সব দোকানীর একটু আধটু নাগরিক জ্ঞান ও বিবেকবিবেচনা আছে, তাঁরা তাঁদের দোকানের সামনে, ডানে-বাঁয়ে কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে রেখেছেন, একটু হলেও মানুষজনদু’কদম হাঁটতে পারেন, সেখানেও দেখেছি অন্য উপসর্গ, অন্য সমস্যা। জনমানুষের পায়ে চলার পথে কোথাও পড়ে আছে সিমেন্টের চ্যাপ্টা ব্লক, কোথাও বা পুরনো টায়ার। ফুটপাথে এগুলো কি অকারণে পাতা হয়েছে? না, তা নয়, এরও যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এ-সব দিয়ে ফুটপাথের ‘পটহোল’ ও ‘ম্যানহোল’-এর উন§ুক্ত মুখ ঢেকে রাখা হয়েছে। কী ডান, কী বাম, দু’দিকের ফুটপাথের এই একই অবস্থা। এ-সব আবরণের পরও নজরে পড়ে, কোনোখানে ফুটপাথের ইট ক্ষয়ে গেছে, কোথাওবা কেউ ‘মহামূল্যবান’ ইটগুলো তুলে নিয়ে গেছেন, কে জানে, হয়তো বা ওই সব ইট দিয়ে হেঁশেলে চুলো বানিয়েছেন, মনের সুখে ভাত রান্না করে খাচ্ছেন। ফুটপাথ থেকে ইট খোয়া যাওয়া দেখে পথ চলতে চলতে একা একা হাসলাম, মনে পড়ল আতাউর রহমান স্যারের রম্য রচনা, ‘আমারটা আমি লইয়া গেলাম’।‘কুর্লা ওয়েস্ট’-এর ফুটপাথের নিত্য দিনের এমনই চিত্র! রাস্তা পরিষ্কার করার কেউ নেই। করুণ এ অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় যেন নগরের কোনো পিতা নেই, মাতা নেই, ভ্রাতা নেই, নেই কোনো নগর সরকার!

বিকেল ঘনিয়ে এলে রাস্তা দিয়ে ছুটে রীতিমত জন¯্রােত। আপিস-ফেরৎ মানুষ দলে দলে রওয়ানা দেন আপন আপন ঠিকানায়। আর বোঝাই যায় না, হঠাৎ কী করে, কোথা থেকে এত দোকানীরা এসে ভীড় করেন, দোকান বসান, পশরা সাজানএকেবারে মূল রাস্তার ওপর। কেউ আলু-পেঁয়াজ-টমেটো বেচেন, কেউ কলা-মূলো, ফলফলাদীর দোকান খুলেন, কারোকারবার ফুচকা-চটপটির, কেউ জামাকাপড় টুপি নিয়ে বসেন, কেউ জুতো সেলাই করেন, কেউ তালা মেরামতে ব্যস্ত, রাস্তার ওপর কারো চুলো দাউ দাউ করে জ্বলছে – রান্না হচ্ছে ভাত-তরকারি, কারো দোকান থেকে ধেয়ে আসছে ধোঁয়া আর তার সাথে চিকেন-কাবাবের পাগল করা খুশবু, খেতে বড় লোভ হত, কিন্তু সাহস পেতাম না অসুখ-বিসুখের ভয়ে, কষ্ট করে জিহ্বার জল সামলাতাম মুম্বাইয়ের রাজপথে। কারো দোকানে ক্রেতাদের লাইন লেগেই আছে, আবার কারো দোকানে কেউ নেই। ষোলো-সতেরো বছরের একটি ছেলে, কার্টে আইসক্রিম ও ফালুদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোনো কাস্টমার নেই।শীতের সন্ধ্যায়ফালুদা খাবে কে? এ কথা কে বোঝাবে অবুঝ ওই ছেলেটাকে?

সবচেয়ে ব্যস্ত পানের দোকান – দেদারসে চলছে পানের খিলি ও বিড়ি-সিগ্রেট, আব্দুল খালেকের দম ফেলার সময় নেই, এক জন চায় পানের খিলি তো আরেক জন তামাক পাতা, তিনি নিজেও নিজের কাস্টমার, অনবরত পান চিবোচ্ছেন, তাঁর সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম, একে তো ভাষার সমস্যা, তারপর তাঁর কি সময় আছেঅজানা পথিকের সাথে কথা বলার? তবু দয়া করে নামটা বললেন আর জানালেন,তিনি উত্তর প্রদেশ থেকে এসেছেন।আব্দুল খালেকের একটি ছোট্ট ক্যাস বাক্স আছে, তার তালাচাবিও আছে। আকারে ইঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দৈনিক কত কামাই হয়? প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে এমন একটি হাসি দিলেন, মনে হলো, জগতে আব্দুল খালেকের চেয়ে বুঝি সুখী মানুষ আর কেউ নেই! ব্যস্ততায় পানের পরেই চায়ের দোকান – আদাকুচি ও দুধ-চিনিতে জ্বাল দেওয়া ঘন সোনালী রঙের চা।চাওয়ালারা কেউ কেটলি ব্যবহার করেন না, চা বানানো হয় এলুমিনিয়মের ডেগচিতে, তাঁদের একখানা ছাঁকনিও নেই, পাতলা কাপড়ে চা ছাঁকা হয়, ফুটপাথের এই চা খুবই জনপ্রিয়, খুবই মজাদার, রাস্তায় খাইনি, তবে হোটেলের ক্যাফেতে আসুদা হয়ে খেয়েছি মুম্বাইয়ের ‘চা মাসালা’। সন্ধ্যায় বাতি জ্বলে, আর রাস্তায় মেলা বসে, মুম্বাইয়ের ‘কুর্লা ওয়েস্ট’ যান চলাচলের সড়ক, নাকি বাংলাদেশে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা- তফাৎ নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়!

রাস্তায়, ফুটপাথে ময়লা-নোংরা-আবর্জনা, দুর্গন্ধ, মশা-মাছি যাই থাকুক না কেন, সবই স্থির হয়ে চাপা পড়ে থাকে চলমান মানুষের পায়ের তলে। এগুলো নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই, নেই কোনো আক্ষেপ কিংবা ভ্রƒক্ষেপ। ছোটবেলা থেকেই এসব দেখে দেখে তাঁরা অভ্যস্ত, পথের জঞ্জাল তাঁদের স্বাভাবিক জীবনেরই অংশ, ময়লা-আবর্জনাকে তাঁরা এভাবেই দেখেন। তাই, দিনের শেষে ঘরফেরা ব্যস্ত নাগরিকদের চোখেমুখে এসবের কোনো চিহ্ন ধরা পড়ে না। তাঁদের দেহে ক্লান্তি থাকে বটে, কিন্তু দিনের শেষে বাজারবেসাতি হাতে নিয়ে বউ ছেলেমেয়ের কাছে ফেরার আনন্দ তাঁদের চেহারায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, হাসিমাখা মুখগুলো আলো ঝলমল করতে থাকে। এভাবে ব্যস্ত ও কর্মময় নাগরিক জীবনের কর্মচাঞ্চল্য ও গতিময়তার কাছে পথের ময়লা, মলিন হয়ে যায়, গৌণ হয়ে থাকে। জীবনের চঞ্চলতা ও উদ্দামতার কাছে বাকি সব ক্লেশকষ্ট, বিড়ম্বনা, ও ঝামেলা ক্ষণিকের জন্য হলেও হার মানে। ওই মুহূর্তে রবি ঠাকুরের কথা,

‘…সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব…’

অসার মনে হয়। মুম্বাইয়ের পথে জীবনের এ জীবন্ত কলবর, এর বহুমাত্রিক গতিময়তা, বিচিত্র বাস্তবতা ও চলমান উচ্ছলতা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।

পুনশ্চ: মুম্বাইয়ের সামান্য যেটুকু আমি দেখেছি তা নিয়েই লেখাটি লিখেছে। এর ওপর ভিত্তি করে, পুরো মুম্বাই এরকম, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।

ডিসেম্বর ২৭, ২০১৭

 

The Author is an Economics Professor and an Academic

Journal Editor  in the U.S. 

Email: wahid2569@gmail.com

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী