মায়ার জাল

ফাহমিদা খানমঃ

“”আমি কোথাও বেড়াতে যাবো না জামিল ”
“মানে কি বলছো এসব? তোমার কি ধারণা আছে কতো কষ্ট করে আমি সময় বের করেছি? “”
“”তাই বুঝি? তা কষ্ট করার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করলেই পারতে “”
হতভম্ব জামিল স্ত্রী লিজার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন এ কোন লিজা? বড় অচেনা লাগছে ওকে। আগে কতো কি আবদার করতো? শুধু জামিলকে কাছে পাবার জন্য অভিমান করতো। কতো বছর হলো সব ছেড়েছে? একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে লিজা। লিজার বদলে যাওয়াটা সবাই খুব বলার পরই জামিল সময় বের করে ইউরোপ ঘোরার প্ল্যান বের করেছেন। কি এমন হলো লিজার? বিয়ের বারো বছর পুর্তিতে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন, এখন কি হবে? বন্ধুবান্ধব সবার কাছেই হাসির খোরাক হয়ে যাবো আমি। কবে, কখন, কিভাবে লিজা এতো বদলে গেলো!!!!!!
জামিলের মুখের উপর না বলতে পেরে আজ আমার খুব আনন্দ লাগছে। ঠিক কতো বছর উপেক্ষার পর আমি বদলেছি জামিল বুঝুক, জানুক। বারো বছর কি খুবই অল্প সময়? বিয়ের পর থেকেই জামিল কেবল ব্যবসা নিয়েই পড়ে থাকতো, ওর নিজস্ব ভুবন আর ব্যবসা ছাড়া কোন জগত ছিলো না। প্রতিনিয়ত আমার চাওয়াগুলো ধাক্কা খেয়ে আমার কাছেই ফেরত আসতো, আমার ব্যবসায়ী স্বামীর কাছে এসব আবেগের মুল্য কখনো ছিলো না, এসব তার কাছে ন্যাকামো মনে হতো। আমার সবকিছু তার বাড়াবাড়ি মনে হতো।
“”আজ পুর্ণিমা, চলো ছাদে যাই জামিল ”
“”এইটা আবার আলাদা করে দেখার কি জিনিস? “”
“ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, চলো রিক্সার হুড ফেলে দুজনে ঘুরি “”
“”উদ্ভট কথা বলবে না, এইসব আমার কাছে বিরক্তিকর “”
“”জামিল আমার বান্দরবন দেখার খুব শখ প্লিজ নিয়ে চলো না? “”
“”কাজ ফেলে যাবার মতন সময় আমার নেই, এক কাজ করো বোনদের সাথে নিয়ে যাও, খরচ আমি দেবো “”
বিয়ের পর একটা মেয়ে তার স্বামীকেই পাশেপাশে চায়, বিয়ের আগের জীবন আর পরের জীবন সম্পুর্ণ আলাদা—আমি জামিলকে বারবার বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। আমার মান অভিমানের জামিলের কিছুই প্রতিক্রিয়া হতোনা। ব্যবসা আর নিজের ভূবনের বাহিরে কখনওই বের হয়নি জামিল বরং তার পছন্দ-অপছন্দ আমার উপর চাপিয়েছে । আমি সব মেনেছি, ভেবেছি একদিন নিশ্চয় বদলাবে। হ্যাঁ বদলেছিল বটে! ছেলে আয়ানের জন্মের পরে ওর ব্যবসার পরিধি আরো বাড়িয়েছিল নিরাপত্তার জন্য। আমিই একসময় নিজেকে বদলেছি, খোলসে গুটিয়ে নিয়েছি। বিয়ের পর থেকেই ওর ব্যস্ততা দেখে দেখে আমি ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কোথাও দাওয়াত থাকলেই সেজেগুজে অপেক্ষায় থাকতাম জামিলের, প্রায় ফোন করলেই এক রেকর্ড শুনতাম–“”আমি অসম্ভব ব্যস্ত, প্লিজ তুমি একাই চলে যাও “”
প্রথম প্রথম একাই যেতাম, সবাই জিজ্ঞেস করতো —-“কিরে একা এসছিস ক্যান “”
মুরুব্বীরা আরো একধাপ এগিয়ে বলতো —“”বিয়ের পর মেয়েদের জামাই ছাড়া আসতে হয়না মা “”
একসময় স্বামীর ব্যস্ততা সবাই বুঝে করুণার চোখে দেখা শুরু করলো, সবার আহা শোনার চেয়ে আমিও ব্যস্ততার অজুহাতে সব এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে দিলাম আর এখন আয়ানের পিছনেই লম্বা সময় চলে যায়। স্কুল, খাওয়া, পড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি।
“”লিজা তোমাকে বলতেই হবে কেন তুমি যাবেনা? “”
“তুমি নিজে খুঁজে বের করো জামিল ”
“আমি কি তোমাকে বাদ দিয়ে ইয়ার বন্ধুদের সময় দিয়েছি?””
“”আমিতো তোমাকে কোন অভিযোগ জানাইনি “”
“তাহলে কিসের জন্য তুমি আমার সাথে যাবেনা? “”
“”আমি কিছুই বলবো না, দেখি তুমি নিজ থেকে কতটুকু বুঝো? “”
জামিলের মুখের উপর এই কথা বলেই লিজার রুম থেকে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে জামিলের মনে হলো অকৃতজ্ঞ মেয়েমানুষ । আমি কি আমার নিজের জন্যই এসব করেছি নাকি! ইস টিকেটের পিছনে কতো টাকা যে গেছে! আচ্ছা ধরে নিচ্ছি এতদিন সময় দিতে পারিনি তাতে কি এমন হয়েছে! তোমার বোনেরা, কাজিনেরা কেউ কখনো ইউরোপ দেখেছে!!! নিজেকে সৌভাগ্যবতী করার বদলে সব তুচ্ছ করো! কিসের এতো অহংকার! এই দুনিয়ায় টাকাই সব, অন্য যেকোন মেয়ে এটা পেলেই সারাজীবন কৃতজ্ঞ হতো। এই অকৃতজ্ঞ মেয়েমানুষ নিয়ে আমি এতদিন সংসার করলাম?
“আমি যে সবাইকে জানিয়েছি বিয়ের ১২ বছর পুর্তিতে বউকে সারপ্রাইজ দিচ্ছি তুমি কি বুঝতে পারছো আমি সবার চোখে হাসির খোরাক হয়ে যাবো? ”
“”একদিন আমিও হয়েছিলাম,তুমি ফিরেও তাকাওনি? ”
“”তুমি কি তার প্রতিশোধ নিচ্ছো? “”
“”নাহ,আমার বয়স, মন আর সেই ঘুরার আগ্রহ হারিয়ে গেছে ”
“বস্তাপচা সেন্টিমেন্ট নিজের ভিতরেই রাখো লিজা “”
জামিলের অস্থিরতা দেখে আমার খুব মজা লাগছে, একদিন এই অস্থিরতায় আমিও ভুগেছি, আমার চাওয়াগুলো তুচ্ছতার দেয়ালে বাড়ি খেয়েছিল। জামিল কি ভেবেছিলো!! ইউরোপ যাবো শুনে আমি ধিনধিন করে নাচবো আর সবাইকে ফোন করে খুশীর খবর জানাবো!!!!!!
পাশের রুম থেকে শুনতে পেলাম জামিলের কণ্ঠস্বর “”দুলাভাই আপনি আর বড় আপা আজ সন্ধায় আমাদের বাসায় আসবেন,খুব জরুরী দরকার “”
অনেকদিন আগের কথা মনে পড়ে গেলো। দুলাভাই আর বড় আপুর আন্ডারস্ট্যান্ডিং বেশ ভালো, দুলাভাই সব কাজেই আপুর সাথে পরামর্শ করে ——এই কথাটা একদিন বলার পর জামিল উত্তর দিয়েছিলো —–“”তোমার দুলাভাইয়ের কোন পার্সোনালিটি আছে নাকি? বউয়ের কথায় যে পুরুষ চলে, সে কি কোন পুরুষ নাকি? ”
আজ সেই দুলাভাইয়ের কাছেই হাতপাতা!!!!সময় কি অনেক বড় হাতিয়ার!!!!
লিজার মতো নরম মেয়ে এতো অমনোনীয় কিভাবে হলো?
“কেন তুমি নিজের সিদ্ধান্তে অটল লিজা? “”
“”সবকিছুর জন্য সময় থাকে জামিল, বিয়ের পর থেকেই আমি বারবার আহত হয়েছি, তুমি কেবল ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছ, আমার দিকে ফিরেও চাওনি “”
“আমি সংসারের জন্যই এসব করেছি ”
“”বেঁচে থাকতে হলে অর্থ-বিত্তের দরকার, খুব দরকার জামিল কিন্তু বয়স, মন বড় দামী । আমার সেই দিনগুলো কি ফেরত দিতে পারবে তুমি? “”
“আমি এখন তোমাকে সময় দিতে চাইছি তুমিতো জেদ ধরে বসে আছো লিজা “”
“”আমাকে সময় দেয়া নয় তুমি সবাইকে দেখাতে চাইছ বউ নিয়ে তুমি ইউরোপ ভ্রমণে যাচ্ছো, কখনো জানতে চেয়েছ আমি কি চাই? কতো রাত আমি অপেক্ষায় থেকেছি দুজনে সুখ দু:খের পাটি বিছিয়ে গল্প করবো, তোমার সময় হয়নি “”
“আমি যদি অর্থের পিছনে না দৌড়াতাম আজ এই বাড়ি গাড়ির মুখ দেখতে না ”
“”আচ্ছা তুমি কি জানো আমার প্রিয় খাবার কি? আমার কি করতে ভালো লাগে? একসাথে দুজন আছি বারো বছর তবুও কতো অজানা দুজন! “”
“”সব মেয়েরাই শাড়ি -গহনাগাঁটি, বাড়ি, গাড়ি চায় —-আমি তোমাকে সব দিয়েছি ”
“সংসারের সবাইকে এক ছাঁচে কেন ভেবেছিলে ? আমি শুধু তোমাকেই চেয়েছিলাম জামিল। আমার বয়স, মন, সময়গুলো হারিয়েই গেছে চিরতরে “”
হতভম্ব জামিলের মুখে আর কথা বের হয়না। সত্যি ইতো লিজা কখনওই কিছুর জন্য আবদার করেনি। কতোটা আশাহতের বেদনা লিজাকে বদলে দিলো?
জীবনে বেঁচে থাকার জন্য অর্থের দরকার, খুব দরকার তবে অর্থের পিছনে দৌড়াতে গিয়ে জীবনের মলাটটাই সাদাকালো হয়ে গেলে সে অর্থ কাজে আসবেনা। লিজাদের স্বপ্নভঙ্গ হয় তবুও এক অলীক মায়ার জালে লিজারা বন্ধী, ইচ্ছে করলেই এই জাল ছেঁড়া যায়না।

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী