অসহায়ত্ব

ফাহমিদা খানমঃ 

“মা আমি অর্নবকে নিয়ে বেরুচ্ছি ”
“আজ কি সেইদিন লিয়া? ”
“হুম আমার স্বাধীন হবার দিন ”
“আরেকবার ভাবলে হয় না? কেউ সহজভাবে নিচ্ছে না ”
“এখানে ভাবাভাবির কিছুই নেই, আমাদের দুজনের মানুষিকতা বনছে না বলেই আমরা আলাদা হয়ে যাচ্ছি ”
“সংসার ভাংগা কি এতোই সহজ লিয়া? “”
“একটা অসম সম্পর্ক দিনের পর দিন টেনে নিয়ে যাওয়া কঠিন ,যেটা তুমি এতকাল বয়ে এসছো মা ”
লিয়ার যাওয়ার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমি চাইনি, একদম চাইনি মেয়ের ডিভোর্স হোক। সবাই আংগুল তুলে বলবে ডিভোর্সি মেয়ে! কিন্তু লিয়া এসবের ধার ধারে না। পায়ের নীচের খুঁটি মজবুত বলে নাকি যুগই বদলে গেছে!!!!
দীর্ঘদিনের অব্যবহারে আমার মরচেপড়া তারগুলোয় সুর বেজে উঠলো। সময়ে নাকি সব ক্ষত সেরে যায়, আমার কেন যায়নি!!! কষ্টগুলো আজো সেইরকম তাজা! যেনোবা ছুঁলেই রক্ত ঝরবে অবিরত।
“মেয়ের সাথে ন্যাকাপনা শেষ হলে নাস্তা দিয়ে যাও ”
লিয়া, অর্নবের বাবা আনিসের চিৎকারে হুঁশ ফিরলো, এক্ষুনি নাস্তা না দিলে চেঁচানি আর ভাঙচুর শুরু হবে। চুলা থেকে সদ্য নামানো রুটি আর তরকারী দিতে হয়, আজো ভুল হলে মাফ নেই। নাস্তা নিয়ে টেবিলে দিলাম।
“,তোমার গুণবতী কন্যাকে বলে দিবে আমার বাসায় থাকতে হলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডা, রাত করে বাড়ী ফেরা আর গ্রুপ বেঁধে ঘুরতে যাওয়া চলবে না ”
“মেয়ে কি ছোট? নিজের ভালমন্দ বোঝার বয়স হয়েছে ওর ”
“খবরদার আমাকে জ্ঞান দিবা না, নিজের পছন্দে বিয়ে করছে এখন আবার ছেড়েও দিচ্ছে! আমার মান সম্মানের কথা মেয়ে ভাবেনি ”
“তুমি বিয়ে দিলেই যে সেই বিয়ে ভালো হতো সেটাই কি করে বলি? হয়তো লিয়ার কপালে এটা লিখা ছিলো। ”
“গুণী মেয়ে ভালই তালিম দিচ্ছে না! আজকাল ভালই কথা শিখছো ”
“এই মেয়ে নিয়ে আগে গর্ব করতে, এখন আমার হয়ে গেলো? “”
“শোনো আমি যতদিন বেঁচে আছি এই সংসারে সব আমার কথামতো চলবে ”
“লিয়া, অর্ণব দুজনেই এখন চাকুরী করে, সংসার কিন্তু ওরা দেখে ”
“এই সংসারে আমি যা বলবো তাই আইন ”
“আর কতো সংসারের চুড়ায় থেকে সবাইকে কঠিন শাষনে রাখবে? বাচ্চারা বড় হয়েছে “”
“দরকার হলে তুমি আর তোমার ছেলেমেয়ে বের হয়ে যাবে, আমার সংসারের সবকিছু আমার পছন্দানুযায়ী চলবে ”
কতো সহজে বলে দিলো আমার সংসার! ৩২ বছর সংসার করার পরেও আমাদের হতে পারলাম না অথচ এই সংসারে আমি শ্রম দিয়েই যাচ্ছি এতকাল!
বিয়ে হয়ে আসা অব্ধি সামান্য ভুল করলেই শ্বাশুড়িমা বলতো —-“মা কোন কাজকাম শিখাইয়া পাঠায়নি ”
চোখ ফেটে পানি চলে এলেও বিপদ—-“কাজকাম পারো না আবার চোখে পানি আইনা দেখাও শ্বাশুড়ি জ্বালায় না? ”
উনিশ বছরের মেয়েটা বুঝেছিলো সংসারে কেউ আপন হয়না। দুই ননদ, দেবর সাথে থাকলেও সবাই ভুল ধরতেই আগ্রহী ছিলো, আর স্বামী!!!!! সেও আপন ভাবেনি। সংসারের বড় ছেলে তাই শাষনকর্তা ছিল।
শ্বাশুড়িমা বাসি কিছুই খেতেন না, প্রতিবেলা ফ্রেশ রান্না করতে হতো।
“মা আজ রাতে ডাল আর ডিমভাজি দিয়ে চালাই? “”
“ক্যান ঘরে কি কিচ্ছু নাই? “”
“শরীরটা ভালো লাগছে না মা ”
“দেখি কাছে আসো,জ্বর আসলো কিনা? ”
দুবার স্ট্রোক করার পর মা সব ভুলে যেতেন, কখনো ঝাড়ি, কখনো আদর করতেন , ভাত খেলেও ভুলে যেতেন। রাতে লিয়ার বাবা আনিস বাসায় ফিরলে বিচার দিতেন —–“আনিস তোর বউ আইজ সারাদিন আমারে খাওন দেয় নাই ”
আনিস চেঁচিয়ে বাসা গরম করে ফেলতো, গায়ের দিকে তেড়েফুঁড়ে আসতো। সাথে নিয়ে ঘর করলেও নিজের স্ত্রী কে চেনার,বোঝার চেয়েও কেবল দায়িত্ব চাপিয়েছে। সবার সামনেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, ব্যঙ্গ করে নিজের পৌরষবোধ প্রকাশ করেছে।আমি যে কষ্ট পাই—-এই বোধই কখনো জন্মায়নি। শ্বাশুড়ি মা বরং মাঝেমধ্যে বলতেন –“–কষ্ট পাইস না, বাপের মতন হইছে। বাঁশের ঝাড় সব একই ”
দুই ননদের বিয়ে হলো, দেবর পড়তো, বাসায় সবসময় মেহমান লেগেই থাকতো, মাঝেমাঝে হাঁপিয়ে যেতাম আর ভাবতাম আনিস একদিন বুঝবে আমাকে। কতো বোকা ছিলাম!!! অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতাম। ধীরেধীরে বয়স বেড়েছে, আমিও স্থির হয়ে গেছি। মায়ের মৃত্যুর আগেই দেবর বিয়ে করলো, আলাদাও হয়ে গেলো । কতো কিছু বদলে গেলো —-আনিস শুধু বদলায়নি।
লিয়া, অর্ণব ছোট বেলায় ভালো রেজাল্ট করলে ওর বাবা, ফুফুরা, চাচা খুব গর্ব করতো, স্বামী কে ডিভোর্স দিচ্ছে বলে এখন আমার মেয়ে হয়ে গেছে।
সন্ধায় দুইজন একইসাথে ফিরলো।
“তোদের চা -নাস্তা দেই? ”
“উঁহু নাস্তা নিয়েই এসেছি , তুমি বসো মা আজ আমি চা বানাই ”
“মাত্রইতো ফিরলি লিয়া ”
“তুমি যে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতে সারাদিন কাজ করো, তোমার রেস্ট লাগেনা মা? ”
“এক কাজ করি আপু —-আজ আমি কফি বানাই? খবরদার মা তুমি কিন্তু কিছুই বলবে না। “”—–হাসতে হাসতে অর্ণব বললো।
“অর্ণব তোর বাবাকেও ডাক ”
“ডিয়ার মা তুমি কি ভুলে গেছো বাবা মানেই কেবল শাষন! সামান্য ভুল করলেই তুমুল মার? আমাদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেও অনেক খেয়েছ মা ”
দুই ছেলেমেয়ের কাছে বাবা মানেই কঠিন শাষন, বাবা মানেই ভয়, বাবা দুরের মানুষ। সংসারের প্রধান হয়ে কেবল শাষনকর্তা হয়েই থাকা।
সামাজিকতার পোশাক বড় ভারী তাই কেউ কেউ খুলে ফেলতে পারেনা, আজীবন কেবলমাত্র বয়েই বেড়ায় মিথ্যা বিজ্ঞাপনের মতন। লিয়ারা সাহসিনী তাই ছুঁড়ে ফেলার সাহস রাখে। ভুল না সঠিক ঠিক করবে সময়। বেশীররভাগ মেয়েরাইতো অসহায়ত্বের মুখে লম্বা জীবন কাটিয়ে দেয় সামাজিকতা আর লোকলজ্জার ভয়ে।

২/২/১৮

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী