“সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে সর্বজয়া নারী যখন এগিয়ে চলে”

সালমা তালুকদারঃ 

কিছুদিন আগের ঘটনা।
অবাক হয়ে দেখছিলাম নারী চরিত্রটিকে।কখনো এই টেবিল।কখনো ঐ টেবিল দৌড়োচ্ছেন।খাবার তদারকি করছেন।তিনি আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া।আজকে তার একমাত্র ছেলের বিয়ে।সবাই ঠিক ঠাক মতো খাচ্ছে কিনা দেখছেন।আমার পাশে একটু দাঁড়িয়েছিলেন।জিজ্ঞেস করলাম।কেমন আছেন?সব ঠিক আছে?বলতে যাচ্ছিলেন কিছু একটা।কিন্তু বলার আগে চারপাশে চোখ বুলাতে গিয়ে চোখে পরলো তার একমাত্র স্বামীকে। দেখতে ছোট খাটো,ব্যাক্তিত্বহীন পুরুষ মানুষটির উপস্থিতি টের পেয়ে থেমে গেলেন।নতুন করে আর কিছু জানা হোল না।কিন্তু যতক্ষন ছিলাম তেরো বছর আগের দেখা লোকটির স্বভাবের সাথে বর্তমানের দেখা লোকটির বিন্দুমাত্র পার্থক্য দেখলাম না।আর নারী চরিত্রটিও সেই আগের মতো ধৈর্য্য আর মমতার এক মূর্ত প্রতীক।

যখন একসাথে ছিলাম তখন দেখতাম কি কষ্ট আমার সেই আত্মীয়ার!স্বামী বিভিন্ন নারীতে আসক্ত।ছেলে মেয়েও জানে বাবার এ হেন কু কৃত্তির কথা।মেয়েটাও ভালো নেই।চাকরী করে তবু স্বামীর আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত।একবার মেয়েটির বাসায়ও গিয়েছিলাম।দেখে এসেছি তার নিজের আর স্বামীর আলাদা বিছানা।আলাদা ঘর।তখন একটা কথাই মনে হয়েছিলো”মায়ের কপাল বুঝি মেয়েরাই পায়।”মা মেয়ে নিজের নিজের সংসারে ভালো নেই।কিন্তু যখন দুইজন একসাথে হয়ে গল্প করে তখন ওরা অনেক ভালো থাকে।এবং নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ চলে,”থাক, সময় যাক।লোকটা তো একদিন বৃদ্ধ হবে।শরীরের জোড় কমবে।তখন ঠিকই পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়বে।”একবারও ভাবে না বয়স তো তাদেরও হচ্ছে।রোগ তো তাদের শরীরেও বাসা বাঁধছে।

একদিন দুপুর বেলা গিয়েছিলাম আমার ঐ আত্মীয়ার বাসায়।বাসা একদম ফাঁকা।কেউ নেই।কে থাকবে!মেয়ে তার শ্বশুরালয়ে আর ছেলে হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করে।কলিংবেল দিয়েই যাচ্ছি।দরজা আর খুলছে না।ভাবছি চলে আসবো কিনা।এরকম সময় দরজাটা খুলে গেলো। বিধস্ত চেহারা।কি হয়েছে জানতে চাওয়ার সাথে সাথে ঝর ঝর করে কেঁদে দিলেন।বললেন,”জানো সালমা আমি গোসল করতে গিয়েছিলাম বাথরুমে।বের হয়ে পুরো ঘর হাঁটছিলাম।কেন হাঁটছিলাম জানি না।কলিংবেলের শব্দে হঠাৎ টের পেলাম আমি একদম উলঙ্গ।গায়ে একটাও কাপড় নেই।আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?”তার এই প্রশ্ন আজও আমার কানে বাজে।তাকেই আজ দেখছি ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন।লোকজন খাওয়াচ্ছেন।ভালো কি আছেন?না,ভালো নেই।বেঁচে আছেন।

মা,মেয়ে কেউ নিজেদের সংসার ছাড়েনি।এরকম হাজারো মেয়ে আছে আমাদের দেশে।কে তার খবর রাখে।কেন রাখবে।আর রেখেই বা কি করবে।মানুষ অভ্যস্থ একটা সংসার দেখতে।ঘর দেখতে।সেই ঘরের মানুষ গুলো কেমন আছে সেটা গূরুত্বপূর্ণ নয়।গূরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সংসারটা টিকে আছে কিনা।আমিও সংসার ভাঙা দেখতে অভ্যস্থ নই।ভালো লাগে না মাসুম বাচ্চা গুলোকে বাবা মা ছাড়া আলাদা দেখতে।তাই বলে কি এই যে, তিলে তিলে নিজেকে শেষ করে দিতে হবে! মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলে কি আমাদের কোনো মূল্য নেই! স্বামী যদি মানুষ হতে পারে তাহলে তো আমরাও মানুষ।যারা এভাবে কষ্ট করে স্বামীর ঘর করছেন তাদের জন্য আমার এই লেখা।আমরাও মানুষ।এক স্বামীর ঘর করবো বলে যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাহলে নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগাকে স্বীকৃতি দিয়েই বাঁচতে হবে।জীবনটা তো একেবারেই ছোট।এই ছোট জীবনটাকে নষ্ট করার অধিকার সৃষ্টিকর্তা আমাদের দেননি।একজন নারীর মধ্যে অনেকগুলো মমতাময়ী চরিত্র বিদ্যমান থাকে।সবচেয়ে বড় কথা একজন নারী একজন মানুষ জন্ম দিতে পারে।সৃষ্টিকর্তা তাকে অসীম ধৈর্য্যের অধিকারী করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।তাই বলে এই না যে নিজের সুখ জলান্জলি দিয়ে শুধু মমতার পাহাড় হয়ে বসে থাকতে হবে।

কোনো নারী যদি তার ধৈর্য্যকে কাজে লাগিয়ে স্বামীর ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় থাকে সেখানে আমার কোনো সমস্যা নেই।আমার সমস্যা তখনই, যখন দেখি নারীটি একসময় অধৈর্য্য হয়ে পড়ছে।নিরুপায় হয়ে একসময় আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে।আমার সমস্যা সেখানেই,যেখানে দেখি স্বামীর সংসার আঁকড়ে থাকার কারণে কোমলমতি শিশুগুলো কষ্ট পাচ্ছে।না পাচ্ছে তারা বাবার আদর।না পাচ্ছে মাকে।মা সারাদিন কাঁদবে নাকি সন্তানকে সময় দিবে!আমার ঐ আত্মীয়টি ততোদিন ভালো ছিলেন না যতদিন মনের কষ্ট মনের ভেতর পুষে রেখেছেন।যখনই তিনি ভেন্টিলেশনের জায়গা খুঁজে পেয়েছেন তখন তিনি নিঃশ্বাস নিতে পেরেছেন।বাঁচতে শিখেছেন।তার অপদার্থ স্বামীকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শিখেছেন।অথচ লোকে বলে নিজের কষ্ট মুখ ফুটে কাউকে না বলাটাই নাকি ভালো।বললে মানুষ ছিঃ ছিঃ করবে তাই বুক ফেটে মরে যাওয়া ভালো।তবু মুখ বন্ধ রাখতে হবে।তাই বলে এমন কোনো বিশ্বাস করার মতো বন্ধু নেই, যাকে নিজের কষ্ট শেয়ার করা যায়!যাকে ধরে একটু মন খুলে কান্না করা যায়?আমি দেখেছি যেসব নারী সমাজের লোক চক্ষুর ভয়ে কাউকে কিছু না শেয়ার করে নিরবে কষ্ট সহ্য করে।তারাই একসময় আত্মহননের পথ বেছে নেয়।চারপাশে চোখ বোলালে এরকম ঘটনা অহরহ চোখে পরে।অথচ সময় কিন্তু বসে থাকে না।আমার সেই আত্মীয়া বাঁচতে চেয়েছিলেন।মনের কথা বলতে পেরেছিলেন।বিবেক খাটিয়ে চলতে শিখেছিলেন।তাই জীবন যুদ্ধে তিনিই আজ বিজয়ী।সময় গেছে।সন্তান দুটো বড় হয়েছে।মাকে যেমন বুঝতে শিখেছে তেমনি সাপোর্টও দিতে শিখেছে।কিন্তু সবার ক্ষেত্রে এমন হয় না।এরকম সংসারে টিকে থাকতে হলে প্রচন্ড মানুষিক শক্তির প্রয়োজন হয়।সমাজের মানুষের কথা শুনে সেটা হজম করার শক্তি থাকতে হয়।দাপটের সাথে নিজের সংসারে একটা আসন গেড়ে নিতে হয়।নিজেকে ভালো রাখার কৌশল আয়ত্ত করতে হয়।তবেই এরকম অসুস্থ পরিবেশে টিকে থাকা সম্ভব।

২০১৮ সালের জানুয়ারী মাসের আজকে ৩ তারিখ।কত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।সময়ের স্রোতে ভেসে মানুষ পাল্টায়,সমাজ পাল্টায়।তাই তো জানতাম।কিন্তু গতকালকের একটা ঘটনায় মনে হলো সবই হয়তো পাল্টায় শুধু নারীদের জীবনের গল্প পাল্টায় না।চোখের সামনে দেখলাম কি করে একজন কর্মজীবী নারী সংসারের শান্তির কথা চিন্তা করে চুপ করে থাকে।স্বামীর ছন্নছাড়া কথায় ও কোনো প্রতিবাদ করে না।প্রতিবাদ করেই বা কি করবে?কথায় কথা বাড়বে।অশান্তি হবে।তারচেয়ে নিজের উপর চাপ প্রয়োগ করে স্বামীর মনকে শান্ত করাই উত্তম।নইলে আর সংসার করা কেন!বলতে পারিনি কিছু।অবাক হয়ে শুধু ভেবেছি নারী বলেই কি সব কিছু মেনে নিতে হবে!

এই জায়গাটায় বলতে চাই,নারী তুমি চুপ করে থাকো।কোনো কথা বলো না।রান্না করে খাওয়াও।মন্তব্যের ধার ধেরো না।দায়িত্ব পালন করো।পুরস্কার আশা কোর না।শুধু একটা জায়গায় কোনো ছাড় দিও না।তোমার যে একটা জীবন।মূল্যবান জীবন।সেই জীবনটাকে ভালোবাসো।কষ্ট পেও না।যে তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে সে তোমার মূল্য না বুঝেই তোমার সাথে খারাপ আচরণ করছে।চলে যাওয়া না যাওয়া তোমার ব্যাপার।তবে চলে যাওয়াটা কোনো সমাধান না।চলে গেলেই যে ভালো থাকা যাবে সব সময় এটা সত্য নয়।এর চেয়েও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।যদি সয়ে নেয়ার মতো পরিস্থিতি থাকে তবে নিজের ভেতরের ধৈর্য্যের শক্তি আরো বাড়াতে হবে। নিজের চারপাশে একটা সুক্ষ জাল তৈরী করে নিতে হবে।বুদ্ধি খরচ করে,নিজের সম্মান বাঁচিয়ে বাঁচতে শিখতে হবে।এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে স্বামী স্ত্রীর এক সময়ের ভালোবাসার ফসল ছোট ছোট মানব শিশু।ভালোবাসা হয়তো শেষ।কিন্তু ছোট ছোট যে মানুষ গুলো পরিবারে যোগ হলো,তাদের তো কোনো দোষ নেই।লোকে বলে, যে সব পরিবারে বাবা মা এর মধ্যে ঝগড়া হয় সেসব পরিবারের সন্তান কখনো মানুষ হয় না।আমি বলি মানুষ হয়।যদি মমতাময়ী মা সন্তানের হাতটা শক্ত করে ধরেন।

পুরুষ বলে নারী নাকি রহস্যময়ী।আমি বলি নারী শুধু রহস্যময়ী না।নারী করুনাময়ী তবে সময়ে নারী কাল নাগিনী। নারীর অনেক রুপ।যা বোঝা এক জনমে পুরুষের সাধ্যের বাইরে।তাই এত গুনের অধিকারী নারীদের প্রতি আমার অনুরোধ রইলো,নিজেকে ভালো রাখতে হবে।সমস্যা থাকবেই কিন্তু তার মধ্যেই বাঁচতে জানতে হবে।হিংসা,গীবত বাদ দিয়ে বেশি বেশি বই পড়তে হবে।একজন স্বশিক্ষিত নারী কখনো কোনো কিছুতে ভয় পায় না।কারণ সে জানে সবকিছুর পেছনেই সৃষ্টিকর্তার কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিহিত আছে।সুতরাং স্বশিক্ষিত হতে হবে।নিজেকে ভালো করে জানতে হবে।মূল্যহীন জীবনটাকে মূল্যবান করে তুলতে হবে।

৩ জানুয়ারী ২০১৮ইং

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী