সাজেক ভ্যালী ও পাহাড়ী-বাঙ্গালি সম্পর্ক

আলপনা তালুকদারঃ 

চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ি গিয়ে উঠলাম পর্যটন মোটেলে। উদ্দেশ্য – আগামীকাল সাজেক ভ্যালী যাব। খাগড়াছড়ির শাপলা চত্বর থেকে চাঁদের/চাঁন্দের গাড়ী (পাহাড়ী রাস্তায় চলাচলের উপযোগী বিশেষভাবে তৈরী উঁচু গাড়ী) ঠিক করলাম। নয় জন বসা যায় অনায়াসে। আমরা মোটে চারজন। আরো দু/তিনজন ছেলেমেয়ে আমাদের সাথে যেতে চাইলো। আমি বড় মেয়েকে বললাম, “আসুক। মানুষ বেশী হলে ওজন বেশী হবে। গাড়ীতে ঝাঁকুনি কম হবে।” শুনে মেয়ে বলল, “কোন দরকার নেই। আমরা একাই যাব। আর ওজন লাগবেনা। আমাদেরই ম্যালা ওজন।” কথা সত্যি। আমরা হলাম গিয়ে “ওজনদার পরিবার”। আমাদের তিনজনের শরীরে (ছোটটা বাদে) আরো তিনজন মানুষের বাড়তি ওজন আল্লাহ ফ্রি দিয়েছেন। আমরা চারজনেই রওনা দিলাম। আর্মির গাড়ী পাহারা দিয়ে নিয়ে যায় এবং সাজেক থেকে নিয়ে আসে রোজ দু’বার। সকাল সাড়ে দশটায় ও বিকেল তিনটায়। আর্মির গাড়ীর পিছনে পর পর সাধারণ গাড়ীগুলো যায়। একইভাবে আসে। আর্মির গাড়ীর পাহারা ছাড়াও যাওয়া যায়। তবে তাতে পাহাড়ীদের দ্বারা আক্রান্ত হবার ভয় থাকে। পাহাড়ীরা গাড়ী আটকে যাত্রীদের লুট করে, আহত করে। তাই একা যাবার সাহস লোকে করেনা।

পাহাড়ী খাড়া উঁচুনীচু পথ। গাড়ী চলছে খুব দ্রুত। আমরা পথ এবং পথের দুপাশের মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পাহাড়ী বনভূমি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার বর দোয়া পড়ছিল ভয়ে। যদি পাহাড়ে উঠতে গিয়ে গাড়ীর ব্রেক ফেল করে গাড়ী উল্টে খাদে পড়ে যায়, তাহলে মৃতদেহও খু্ঁজে তুলে আনা প্রায় অসম্ভব। যেতে যেতে রাস্তার পাশে বিকল হয়ে থাকা দুটো চাঁদের গাড়ীও দেখলাম।

রাস্তার দু’পাশে গাছপালায় ঘেরা দূর্গম পাহাড়। অনেকটা দূরে দূরে পাহাড়ীদের বাড়ী। কিছু বাড়ী রাস্তার পাশে, কিছু দূরে পাহাড়ে। পাহাড়ীরা কেউ সবজি, কলা নিয়ে বাজারে যাচ্ছে, কেউ উঠানে হলুদ শুকাচ্ছে, কেউ তাদের তাঁতে কাপড় বুনছে। পথের পাশের বাচ্চারা হাত নেড়ে আমাদেরকে টাটা দিচ্ছে। ওরা জানে, কখন গাড়ীগুলো আসে বা যায়। কিন্তু ওরা কেন টাটা দিচ্ছে, তা বুঝলাম না। কি সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চাগুলো!!! আমরাও টাটা দিলাম। ঠিক করলাম, ফেরার পথে ওদের জন্য চকলেট আনবো। গাড়ী থেকে ওদের দিকে চকলেট ছুঁড়ে দেব।

সাজেকে পৌঁছে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রকৃতি দেখে দু’চোখ ভরে গেল! কী যে অপরূপ দৃশ্য! চারদিক ধোঁয়া ধোঁয়া নীল, সাদা, ফিরোজা, লাল, হলুদ, কমলা মেঘের সারি। দিগন্ত বিস্তৃত বনভূমি আর অবারিত আকাশ। সব মিলে অপার্থিব সৌন্দর্য যা শুধু পাহাড়েই দেখা সম্ভব। অমন মুক্ত প্রাকৃতিক বিশালতায় গেলে মানুষের মনের সংকীর্ণতা উধাও হয়, অন্যরকম এক ভাললাগায় মন ভরে যায়, সব কষ্ট, ব্যস্ততা, অপূর্ণতা, ক্লান্তি ভুলে মন অকারণ আনন্দে মেতে ওঠে। অমন প্রকৃতিতে আপনার পাখি হতে ইচ্ছে করবে! মনে হবে, একবার ছুঁয়ে আসি মেঘেদের বাড়ী বা সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের উপরের গাছেদের কচি পাতা! ছাইরঙা মেঘের মধ্যে সূর্য ডুবে যাবার পর আমরা ফিরে এলাম রিসোর্টে। দেখলাম, রাস্তার পাশে আগুন জ্বালিয়ে আনন্দ করছে ট্যুরিস্টরা। কফি খাচ্ছে, গল্প করছে।

আমাদের রিসোর্টে ১০/১২ টা ছেলেমেয়ে এসেছে। ওরা একসাথে পড়ে। মেয়েরা একটা রুমে সবাই থাকছে, ছেলেরা আলাদা আলাদা রুমে। অনেক রাত পর্যান্ত ওরা আড্ডা দিল, একসাথে ছবি তুললো। মেয়েরা ছেলে বন্ধুদের সাথেও নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পেরেছে বলেই এভাবে এতদূর আসতে পেরেছে। দেখে আমার ভাল লাগলো।

রাতে হোটেলে প্রথমবার খেলাম বাঁশ মুরগী বা ব্যাম্বো চিকেন। মশলা মাখানো মুরগীর মাংস বাঁশের চোঙ্গায় ভরে আগুনে পুড়িয়ে রান্না করা পাহাড়ীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার। দারুণ স্বাদ!! যারা খাননি, খেয়ে দেখতে পারেন। কচি বাঁশ সব্জির মত মাংসে দিয়েও রান্না করে ওরা।

হোটেলে মালিকের সাথে কথা বলে খুব ভাল লাগলো। সে আমাদেরকে খুব যত্ন করলো। কারণ আমাদের কারণেই তাদের জীবিকা চলে। ব্যবসায়ী, দোকানদার, গাড়ীচালক, হোটেলমালিক সবার আয়ের উৎস টুরিস্টরা।

ফেরার আগে আর্মিদের দোকান থেকে চকলেট নিতে চাইলাম। ওরা মানা করলো। কারণ বাচ্চারা চকলেট কুড়াতে রাস্তার উপরে দৌড়ে এসে দূর্ঘটনায় পড়ে আহত হয়। আমি চকলেট নিলাম না। তবে নিতে না পেরে আমার মন খারাপ হলো।

আসার সময় খেয়াল করেছি, কিছু বাচ্চা আমাদেরকে টাটা দিলেও কিছু ছেলে শিশু আমাদের গাড়ীর দিকে ছোট ছোট ঢিল ছুঁড়েছিল। গালি দিচ্ছিল। সেটা বুঝেছি ওদের মুখচোখের অভিব্যক্তি দেখে, যেহেতু ওদের ভাষা বুঝিনা। ওরা আমাদেরকে ভালো চোখে দেখেনা, অপছন্দ করে। তার কারণও আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আর দশটি এলাকার চেয়ে আলাদা। এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক কাঠামো, ভৌগোলিক পরিবেশ, এতদঞ্চলের মানুষের জীবনাচার, ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সবকিছুই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাই পাহাড়ীদের দাবী, এ বাস্তবতা স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্ব দিয়ে তাদেরকে আঞ্চলিক শায়ত্বশাসন দেয়া হোক। তিন পার্বত্য জেলার শাসনভার পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হোক।

পাহাড়ীরা চায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে সম্মানজনকভাবে সেটেলার বাঙালিদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যথাযথভাবে পুনর্বাসন করা হোক। কারণ তারা মনে করে, পাহাড়ের গাছপালা, ভূমি, সম্পদ সবকিছু পাহাড়ীদের। তাতে বাঙালিদের কোন অধিকার নেই। পাহাড়ীরা চায়, পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভূমি, বন ও পরিবেশ, পর্যটন প্রভৃতি হস্তান্তর করা হোক। এগুলো করা হয়নি বলেই বাঙ্গালীদেরকে তারা দেখতে পারেনা। আমার শ্বশুরবাড়ি এলাকার দুতিনটা পরিবার গেছিল পাহাড়ে থাকতে। পাহাড়ীরা দলবেঁধে এসে জোর করে তাদের ফসল কেটে নিয়ে যেত। ফলে তারা চলে আসতে বাধ্য হয়।

পাহাড়ে অতিরিক্ত মিলিটারির উপস্থিতি পাহাড়ের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থায় নিঃসন্দেহে একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাহাড়িরা চায় একটি স্বাধীন, শংকাহীন এবং ভয়হীন জীবন-যাপনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো (পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও প্রায় ৪ শত ছোট-বড় অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প আছে) প্রত্যাহার করা হোক, যা করা হয়নি।

পাহাড়ীদের মধ্যে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তির পর অসংখ্যবার ভূমি কমিশন গঠন করা হলেও কোনো ভূমি কমিশনই এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই পাহাড়ীরা চায় ভূমি সমস্যার একটা দ্রুত এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান।

পাহাড়ের বিস্তৃত এলাকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে পারলে প্রচুর লোকের বসবাসের, চাষাবাদের, কাজের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে পাহাড়ের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার করা যাবে, গরীব মানুষদের জীবনমান বাড়ানো যাবে, দেশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে জনগণ সরালে পরিবেশ দূষণ, অপরাধ কমানো যাবে। ওসব এলাকার সৌন্দর্য বাড়ানো যাবে। পাহাড়ের পাদদেশে ভূমি সংস্কার ও সেচের ব্যবস্থা করতে পারলে সবার লাভ। এতে পাহাড়ীরাও চাষাবাদের সুবিধা পাবে। কর্মসংস্থান বাড়ানো যাবে, পাহাড়ীদের তৈরী নানা জিনিসের (ব্যাগ, জুতা, পোশাক, ঝুড়ি, শোপিচ ইত্যাদি) বাজারজাতকরণ ও ভাল দাম পাওয়া সম্ভব হবে।

পাহাড়ে প্রচুর সম্পদ। কিন্তু পাহাড়ীদের ঘরবাড়ি, জীবনযাপনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না। তারা দরিদ্র। পাহাড়ে জনবসতি বাড়লে তাদের কাছে পাহাড়ীরা তাদের ফসল, তৈরী পণ্য, এমন কি শুধু কাঠ বেচেই কোটিপতি হতে পারে। তখন তাদের জীবনমান ভালো হবে। জনসংখ্যা বাড়লে পাহাড়ে আরো রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত, বাজারসহ নানা অবকাঠামো বাড়বে। তখন জনসমাগম বাড়বে। ফলে পাহাড়ের লোকজন নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন কোন জনপদের অতি সংখ্যালঘু বাসিন্দা মনে করবেনা। কিন্তু তাতে পাহাড়ীরা আপত্তি করবে। কারণ তারা পাহাড়ের সম্পদ বাঙ্গালীদের দিতে চায়না এবং মনে করে, বাঙ্গালীরা এলে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য বিলুপ্ত হবে। একে অন্যের প্রতি বৈরী মনোভাবের কারণেই মাঝে মাঝে পাহাড়ী-বাঙ্গালি সংঘর্ষ বাধে (সবশেষ লংগদুর ঘটনা)। উভয়ের মধ্যে মেলামেশা বাড়ানোর মাধ্যমে পাহাড়ী-বাঙ্গালিদের মধ্যে বিদ্যমান এই বৈরী মনোভাব দূর হতে পারে। এরফলে একে অন্যের প্রতি সহনশীল মনোভাব, শ্রদ্ধা, স্বীকৃতি, বাড়ানো সম্ভব। পাহাড়ীদেরকে আলাদা করে দিলে হয়তো অন্য কোন দেশ তাদের বিচ্ছিন্ন এলাকা দখল করে নিতে পারে। তাতে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশী।

আমি হোটেলে, গাড়ীতে, দোকানে, রাস্তার ধারে যেখানে যেখানেই পাহাড়ীদের সাথে কথা বলেছি, আমার মনে হয়েছে, আমাদের প্রতি ওদের ঘৃণা ও অবিশ্বাস অনেক কমেছে। পাহাড়ে পাহাড়ীদের অধিকার বেশী। তারাও আমাদের সম্পদ। তাই তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রেখে বাঙ্গালীদের তুলনায় নানা সুবিধা (জমি, সেচ, বাজার, বিদ্যালয়, কলেজসহ ওদের প্রয়োজনীয় নানা সুবিধা) ওদেরকে বেশী দিলেই তারা নিজেদের বঞ্চিত বা প্রতারিত মনে করবেনা। আরো আশার কথা হলো, যেসব পাহাড়ী ছেলেমেয়েরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পড়তে আসে, মেলামেশার কারণে বাঙ্গালীদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ ধীরে ধীরে কমছে। ফলে একসময় হয়তো পাহাড়ী-বাঙ্গালী সহাবস্থান আরো বাড়বে। আমরা আশাবাদী হই।

লেখকঃ অধ্যাপক, আই ই আর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী