শেষ দান সব সময়ই ঈশ্বরের

 ডাঃ নাসিমুন নাহারঃ
______________________________

স্বামী নামক লোকটাকে খুন করার প্ল্যান মাথায় এসেছিল বিয়ের রাতেই লোবার।কারন লোকটা যখন বাসর ঘর নামক সার্কাস ঘরে ঢুকে রজনী গন্ধা দিয়ে সাজানো শ্বেত শুভ্র বিছানাতে বসে বরফ শীতল কন্ঠে দেয়ালের দিকে মুখ করে বলল– দেখো শুধুমাত্র সামাজিকতা আর ফ্যামিলি প্রেসারের জন্য আমি বিয়েটা করেছি।আমার কাছে কোন কিছু আশা করবে না তুমি।তোমার financial ব্যাপারটা আমি সাপোর্ট দিব।প্রতি মাসের সাত তারিখের মধ্যে হাত খরচ পেয়ে যাবে।সব কিছুতে তোমার স্বাধীনতা থাকল।শুধু আমার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখাবে না।

কথা শেষ করে লোকটা বিছানার মাঝখানে কোলবালিশ রেখে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো।লোবা আস্তে ধীরে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে শাড়ি ছেড়ে কাফতান পরে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।
নভেম্বরের হিম শীতল কুয়াশার চাদর মাখা প্রকৃতি যেন লোবার শরীর মনে পরশ বুলিয়ে দিল।সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই উধাও।এক কাপ কফি হলে মন্দ হতো না এখন।কিন্তু আজ প্রথম এই বাড়িতে বৌ হিসেবে পা রেখেছে সে।কিচেন কোথায় এখনো জানে না।সুতরাং কফি পান করার প্ল্যান ক্যান্সেল আপাততঃ।
বারান্দার দরজা টেনে সাইড টেবিলে রাখা ব্যাগটা হাতে নিয়ে চুইংগাম বের করে মুখে পুরে বিছানায় এসে পা তুলে বসল সে।
চুইংগাম চাবাতে চাবাতে বলল — এই যে শুনছেন রাশেদ ?
ও হ্যালো।ঘুমাননি বুঝতে পারছি।আমি বাঘ ভাল্লুক না।মানুষ।কথা বলতে চাচ্ছি।

রাশেদ – বল।

লোবা – যেহেতু আপনার সাথে সহজ সম্পর্ক হবে না তাই আমাকে তুমি করে বলবেন না।

রাশেদ – মানে কি ?

লোবা – সবাইকে অনুমতি দেইনা তুমি বলার।
আচ্ছা আপনার কি gf আছে ?

রাশেদ – এই মেয়ে কি বল এসব ?

লোবা – উহু তুমি না।আপনি করে বলুন।

রাশেদ – আমি ভদ্র ছেলে।ভদ্র পরিবার, চাকরি বিলং করি।প্রেম করা আমার কাজ না।এত সময়ও নেই আমার।

লোবা একটু শব্দ করে হেসে বলল– তারমানে অভদ্র ছেলেরা প্রেম করে আপনি বলতে চাচ্ছেন ? আর ভদ্র ছেলেরা সমাজ আর পরিবারের চাপে বিয়ে করে ফেলে ? বাহ

রাশেদ – ঘুমাও।

লোবা- আপনি করে বলুন।
কিছুক্ষণ থেমে বলল আচ্ছা আপনি কি গে ?

What !! ছোটখাটো চিৎকার দিয়ে উঠে বসল রাশেদ।এই মেয়ে তোমার কি মাথা খারাপ ?

লোবা চুইংগাম ফোলানোর চেষ্টা করে বলল– হুমম কিঞ্চিৎ সমস্যা আছে মাথায়।কথা সত্য।নাহলে কি আর দ্বিগুণ বয়সী মাথায় টাক পরা একজন প্রায় বৃদ্ধ লোককে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যাই ড্যাং ড্যাং।বলুন ?

রাশেদ ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলো আর ভাবতে লাগলো এই লোবা মেয়েটাকে দেখে যত গোবেচারা মনে হয়েছিল আসলে তো সে তা না।যথেষ্ট বুদ্ধিমতী বলে মনে হচ্ছে।
চল্লিশ বছরের এই জীবনে কম মানুষ তো আর দেখেনি সে।এই মেয়ে তো জ্বালাবে মনে হচ্ছে।মনে মনে একটু হেসে নিল রাশেদ।

লোবা — এত রাতে এত হাঁটাহাঁটি করছেন কেন ? ডায়াবেটিস আছে নিশ্চয়ই ?

রাশেদ — এই মেয়ে চুপ।একদম চুপ।

লোবা — একদম সাউট করবেন না।ভদ্রলোক ভদ্র ভাবে কথা বলুন।

রাশেদ — আমার যা বলার বলে ফেলেছি।আর কিছু বলার নেই আমার।তুমি চাইলে সোফায় বসে সারা রাত তোমার bf এর সাথে কথা বলতে পার।আমার আপত্তি নেই।

লোবা তাচ্ছিল্যের সাথে তাকিয়ে বলল তাই নাকি ? এক কাজ করি বরং আমার bf কে এই রুমেই নিয়ে আসি।কি বলেন ?

রাশেদ — bfও আছে তাহলে ?

লোবা — না থাকার কি আছে ? আমি তো দেখতে কুৎসিত না।চোখ কান মুখ আর বাদ বাকী সবকিছু মিলিয়ে ঠিকঠাক একটা মেয়ে।
Bf থাকতেই পারে।
আচ্ছা আমার কথা থাক।আপনি সমাজ আর পরিবারের ভয়ে বিয়ে করেছেন এটা কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।সত্যিটা বলুন তো।

রাশেদ গম্ভীর হয়ে বলল – এটাই সত্যি।তবে ভয়ে না চাপে।
আমাকে বিরক্ত না করে ঘুমাও।সকালে উঠতে হবে আমাকে।

পায়ের কাছে রাখা চাদরটা টেনে গায়ে টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লো লোবা।দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বাজে রাত একটা দশ।লাইটটা কি অন থাকবে সারা রাত !

কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে আবার উঠে বসল লোবা।কোলবালিশের ওপাশে রাশেদের শ্বাস প্রশ্বাস তখন ধীর হয়ে এসেছে।ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে সে।

হাত দিয়ে রাশেদ কে আস্তে আস্তে ধাক্কা দিয়ে বলল লোবা– এই যে শুনুন আমার ঘুম পাচ্ছে না।

ধড়মড় করে কাচা ঘুম ভেঙে উঠে বসে বিরক্ত নিয়ে রাশেদ বলল — কি ব্যাপার ? ঘুমোতে দিচ্ছ না কেন ? আমাকে ঘুমের আর প্রেসারের ওষুধ খেয়ে ঘুমাতে হয়।কেন বিরক্ত করছ ?

রাশেদের বিরক্তি নিয়ে করা প্রতিউত্তরে চুপসে গেল লোবা।আস্তে করে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো আবার।একটু তন্দ্রার মতো এসেছি কি আসেনি ঘুমটা চটে গেল।আবার এসে বসলো বারান্দায় লোবা।

আচ্ছা ওর জীবনটা এমন হলো কেন ? ওর বয়স যখন তিন বাবা মা আলাদা হয়ে যায়।নানীর কাছে মানুষ ও।আদরেই ছিল।মামাদের বিয়ে হতেই জীবনটা এলোমেলো হতে শুরু হলো।দুই মামী কেন যেন পছন্দ করত না ওকে।তারপরও নানী যতদিন বেঁচে ছিল তেমন ঝামেলা করতে পারেনি।গত বছর নানী মারা যাবার পর থেকেই তাদের অত্যাচার বেড়ে গেছে।ক্লাসে গেলে সন্দেহ, কলেজ থেকে ফিরতে দেরী হলে কটু বাক্য।যাকে দেখে তার সাথেই বিয়ে দিয়ে দেবার হুমকি চলছেই।গত সপ্তাহে ছোট মামীর এক আত্মীয় এই রাশেদ নামক অবস্থাপন্ন লোকের সন্ধান দেন।আত্মীয় স্বজন সবাই বলতে থাকে কি ভাগ্য রে লোবার।এত বড় লোকের সাথে বিয়ে হচ্ছে।রানীর মত থাকবে। সব দুঃখ কষ্ট এবার শেষ। আরো কত কি।

কিন্তু লোকটা কত কি বলল।কি জানি কি সমস্যা ? যদিও যতখানি কষ্ট পাবার কথা ততখানি পায়নি লোবা।জীবন সব সময়ই খেলল ওকে নিয়ে।কিন্তু কেন ? জন্ম মৃত্যু বিয়ে এই তিনটা নাকি হয় বিধাতার নিয়মে।তাহলে? বিধাতা এত বিমুখ কেন তার সাথে ? হঠাৎই না কেমন যেন গা কাঁপানো রাগ উঠে গেলো লোবার।সে কেন সব সময় গিনিপিগ হবে জীবন নামক রেসে ? আর কত ?
ঝট করে ঘুরে বারান্দা থেকে বের হয়ে রুমে এলো।বিছানায় ঘুমানো রাশেদকে দেখে রাগ আরো বেড়ে গেল।এক ছুটে আলমারি ঘেঁষে দাড় করানো ওর লাগেজ খুলে এন্ডিকাটারটা বের করল ভেতর থেকে।ক্লাস ফাইভ থেকে এন্ডিকাটার সাথে রাখে লোবা।বালিকা থেকে মেয়ে হয়ে ওঠার আগেই লোবাকে জানতে হয়েছিলো এই ছোট্ট শরীরটা তার শত্তুর !

এন্ডিকাটার হাতে নিয়ে রাগের মাথায় ছুটেই এল রাশেদের মাথার কাছে লোবা।জন্ম নিয়ে কষ্ট দিয়েছে বিধাতা।সে মেনে নিয়েছে।এই বাইশ বছরের জীবনটা মরতে মরতে বেঁচেছে।আজ বিয়ে নিয়েও হঠকারিতা !
না বিয়ে আর মৃত্যু নিয়ে সে প্রকৃতির খামখেয়ালী মানবে না।এই লোকটা তার জীবন নিয়ে খেলতে চায়।সে তা হতে দিবে না। জন্মের দায়ভার মেনে নিলেও তার বিয়ে আর মৃত্যুর এলোমেলো হিসেব সে মানবে না।এই ঘুমন্ত লোকটাকে খুন করে নিজেও নিজ হাতে জীবনের সমস্ত দায় মিটিয়ে নিবে আজ।টলমল পায়ে হাতে এন্ডিকাটার নিয়ে ভারী হয়ে আসা মাথা নিয়ে আগায় লোবা।

ধুপধাপ দরজা ধাক্কানোর শব্দে ঘুম ভেঙে নিজেকে মেঝেতে আবিষ্কার করলো লোবা পাশে এন্ডিকাটার পরে আছে।চোখ কচলে উঠে দাঁড়াতে দেখে রাশেদ তখনো বিছানায়।চট জলদি দরজা খুলল।রাশেদের বোন দাঁড়িয়ে।বলল– বেলা বারোটা বাজে।দাদা তো কখনো এত বেলা পর্যন্ত ঘুমোয় না।আর আজ সকাল এগারোটার ফ্লাইটে তোমাদের না কক্সবাজার যাবার কথা।হানিমুন ট্রিপ ।
দাদা তোমার জন্য সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছিল।আমি রাতে আমার ফ্লাটে ফিরে গিয়েছিলাম উপরে।দাদা বরাবর কাজ পাগল মানুষ।আর একা থাকতে পছন্দ করে।তাই আত্মীয় স্বজন সবাই উপরে আমার আর ছোট ভাইয়ের ফ্লাটে ছিল।একটু আগে তোমাদের বুয়া জানালো তোমাদের ঘুম ভাঙেনি।তাই ছুটে এলাম ।ডাকো দাদাকে।

লোবার হাত পা কাঁপছে।কি শুনলো সে।সারপ্রাইজ হানিমুন ট্রিপ !!
এই লোক কি তবে মজা করেছিল কাল তার সাথে? এখনও সে ঘুমাচ্ছে কেন ? এত জোরে দরজার শব্দেও ঘুম ভাঙল না কেন ? কি হলো তার ?

রাশেদের বোন চিৎকার করছে।কাকে যেন বলছে এম্বুলেন্স ডাক।দাদার সেন্স নেই।শরীর ঠান্ডা হয়ে আছে।হাসপাতাল , ডাক্তার শব্দে বাসর ঘর লোকে ভরে যাচ্ছে।

এম্বুলেন্সে রাশেদের ঠান্ডা বরফের মতো হাত নিজের উষ্ণ দু হাতের ভেতরে নিয়ে পাথর হয়ে বসে আছে লোবা।যেন উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে হাত থেকে হাতে।
ছুটে চলছে এম্বুলেন্স তীব্র গতিতে।

ঈশ্বর আবারো কি লোবাকে বুঝিয়ে দিল জীবন নামক নাট্যমঞ্চে সেটাই ঘটবে যেটা তিনি চাইবেন।আমরা মানুষ তো শুধু নিমিত্ত মাত্র।

লেখকঃ চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবী

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী