আমার স্বামী

শিবানী মণ্ডলঃ

আমার স্বামী হওয়ার কোন যোগ্যতাই পার্থর নেই।ওকে আমার একদমই ভালো লাগেনা। আমার পছন্দ ছিলো আমার স্বামী হবে স্মার্ট, প্রতিরাতে আমায় কবিতা শোনাবে।
ও ভালো গিটার ও ভায়োলিন বাজাতে পারবে।তা আর হলো কই??মোট কথা আমার পছন্দের সকল উপাদানের একটি উপাদানও ওর মধ্যে নেই।তবুও ওকে আমি বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি।না বাবা মায়ের চাপে নয়।বরং সবার অবহেলা থেকে বাঁচতেই পার্থকে বিয়ে করতে আমি বাধ্য হয়েছি।জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করার পর আমার অসুস্থতা বাড়তে থাকে।একটা পর্যায়ে আমার ওভারিতে অস্ত্রপাচার করা হয়। যদিও আমি ফিট ছিলাম তবু কেউ মানতে চাইতনাযে আমি মা হতে সক্ষম।চাইবেইবা কেন আমারযে এপেন্ডিসাইডস এর জন্য আগেও অপারেশন করতে হয়।সেই অপারেশানটা ছিলো অনার্স পাশ করার পরে। একবার অপারেশান করার পর মিনিমাম তিনবছর লাগে ফিট হতে।সেখানে আমার এক বছর অন্তর দুইটা অপারেশান।সবার অবহেলার কারন হওয়াটা তাই অস্বাভাবিক কিছুই নয়। সকল অবহেলা সহ্য করেও বিধবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মাটি কামড়ে বাড়ি পড়েছিলাম।ভোর বেলায় রান্না করে ছেলে পড়াতে যেতাম।সাধ্যমত সংসারের সকল কাজ করে অসুস্থ শরীরে রাতে আর পড়া হয়ে উঠতোনা।এর মধ্যেই আমার সরকারি চাকরির বয়স চলে যায়। ভাল ছাত্রী হিসেবে খ্যাতি থাকার পরও আমি একটা জব পাইনি।দিবারাত্রি পড়ালেখা করে যেখানে মানুষ চাকরি পায়না সেখানে আমি না পড়ে কি করে চাকরি পাবো?? অথোরিটি কি আর এটা দেখবেযে কে অসুস্থ ছিলো?? সেটা দেখতে গেলেতো অনেকের অসুবিধাই দেখতে হয়।
নিজের পায়ে দাড়ানো অদম্য বাসনা তাই আমার পুরোন হলোনা।
ওভারিয়ান সিস্ট অপারেশানটা হওয়ার ছয় মাস পরেই আমার বাবা মারা যান মূলত সেখান থেকেই আমার দুর্ভোগ শুরু।দেখতেও অসুন্দরদের মধ্যে সেরা অসুন্দর ছিলাম।
দুই ভাইয়ের বউয়ের মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ বিধবা মাকে ফেলে শহরে পাড়ি জমাই ভাগ্য গড়তে।
সেখানেও কেউ আমায় সাহায্য করেনি।সবাই বলতো বিয়ে করে ফ্যাল।লজ্জা করেনা তোর তিনবছর মাস্টার্স পাশ করে বসে আছিস??
আমি মন খারাপ করে কাঁদতাম।শুধু প্রিয়া নামে একটা বোন আমায় একটা টিউশনি জোগাড় করে দেয়।তা দিয়েই আমার দিন চলত।এর মধ্যেই আমার পার্থর সাথে এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয়।প্রথমে ফোনে কথা তারপরে আমরা দেখা করি।ওকে আমার জীবনের সকল কথা খুলে বলি।সবটা মেনে নিয়ে ও আমার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। আমার সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমার সাথে ওর পূর্ব পরিচয়ের বিষয়টিও গোপন রাখে।সবাই আনন্দের সাথেই রাজি হয়।কারন সবাই ধরেই নিয়েছিলো ললিতার মানে আমার কখনই বিয়ে হবেনা।সবাই এটাতে খুশিযে ললিতার বিয়ে হয়েছে।বিয়ের আগেও অনেকে এই বলে পার্থর পরিবারের কান ভাঙাতে চেয়েছেযে আমার নাকি কোনদিন বাচ্চা হবেনা।
ওদের পরিবারের কেউ কান দেয়নি।কারন এমন উচ্চশিক্ষিতা বেশী বয়সী মেয়েদের নামে নানা বদনাম হয়।
আমাদের বিয়ের পর শশুরবাড়ি যখন প্রথম যাই তখন আমার বড় জা এবং আমার শাশুড়ি আমায় বলেন আমি যেন পরিবারকে ভালোবাসি।শাশুড়িমা বড় জায়ের পরামর্শমত চলার নির্দেশ দেন।ভাসুর আমায় বোন বলেই মেনে নেন।আমার বড় ননদ আমার হাতে তার মেয়েকে দিয়ে বলেন,
– এ সবদিন মামার বাড়ি থাকে।তুই এর মামী হিসেবে যত্ন করিস।ওর বড় মামী ওকে খুব ভালোবাসে।
এভাবে আমার ভাসুরের মেয়েও আমার ভক্ত হয়ে ওঠে।আমার শশুর বাবা আমায় ডেকে বলেন,
– আমার গোয়ালের বড় গরুটা দেখে রাখে আমার বড় মা (বড় বউমা)
আর আজ থেকে ছোট গরুটা দেখবে তুমি।
আমার স্বামীর দিকে তাকিয়ে খুব হাসি পেয়েছিলোযে আমার শশুর ওকে গরু বলেছে।
বাসর রাতে আমার স্বামী আমায় বলেন,

-যতদিন তুমি মানসিকভাবে রেডি না হবে ততদিন আমি তোমায় স্পর্শ করবনা।আমি বিশ্বাস করি স্ত্রী শুধু শয্যাসঙ্গিনী নয় অর্ধাঙ্গিনীও হয়।তুমি আমার সারাজীবনের সাথী হলে।তোমায় সুখে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলাম।আর সন্তান হওয়াটা সৃষ্টিকর্তার হাতে।কোন নরনারী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেনাযে সে সন্তান ধারনের ক্ষমতা রাখে।তাই সে যতই সুস্হ্য ও স্বাভাবিক হোকনা কেন।তাই এসব ভেবে একদমই মন খারাপ করতে পারবেনা।

এই শুরু হলো আমাদের পথচলা।আমি ওকে বলতে পারিনিযে আমি ভালোবেসে নয় আশ্রয় খুঁজে নিতে ওকে বিয়ে করেছি। ঐ রাতেই নিজের হৃদয়কে,নিজের জীবনকে ওর চরণে সমার্পন করি।
আমায় ও প্রতিটা ভুল সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতো।
পরিবারে কে কেমন মানুষ,কার সাথে কেমনভাবে চলতে হবে সবটা ও আমায় শিখিয়ে দিতো।আমার কখন কি লাগবে কিছুই বলতে হতনা।সব না চাইতেই দিত।
জিনিসগুলো অনেক কমদামী ছিলো কিন্তু অনেক ভালোবাসামাখা ছিলো তাতে।আমার বড় জা এবং আমার শাশুড়ি আমায় গোবরের ঘুটে দেয়া ও ঘর নিকানো শিখিয়েছিলেন পরম যত্নে।
আমার বাবার বাড়ি পাকা ঘর ছিলো ও গরু ছিলোনা বলে ওসব কিছুই পারতামনা আমি।তবে খুব ভালো রান্না ও সেলাই জানতাম আমি।
আমার ভাবতেই বুক ভরে যায়,এত সুখ ছিলো আমার জীবনে??এত সুখের ভার সইতে পারবতো।পারবতো সবাইকে এই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে??
কান্না পাচ্ছে খুব।
আমার ননদ? তিনিও মাটির মানুষ।অসম্ভব ভালোবাসেন আমায়।
আমি ভেবে কুল পাইনা মানুষ এত ভালো কেমন করে হয়??আমার স্বামী যিনি আমায় একটি সম্মানের জীবন দিয়েছেন তার কাছে আমার আগামী সাত জনমের ঋণ রইল।
সে আজ চারদিন হলো ঢাকায় গিয়েছে।
আজকাল মানুষটাকে বড্ড মিস করছি। সামান্য দুরে গেলেই মনে হয় সে বুঝি আর ফিরলোনা
কেনজানি অদ্ভুত একটা টান তৈরী হয়ে গেছে। তবেকি ওকে আমি ভালবেসে ফেলেছি??
এমন মানুষকে ভাল না বেসে কে পারে??
হয়ত আমার পছন্দের কোন গুন তার মধ্যে নেই কিন্তু তার বুকে আছে অফুরন্ত ভালোবাসা।
মাঝ রাতে কবিতা না শুনিয়েও কেউ যদি কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় তবে আমি হলফ করে বলব, রবি ঠাকুরের সকল কবিতার চেয়েও সেই প্রেম অনেক ছন্দময়।আজ আমার ভিতর কোন অপূর্ণতা নেই।সমান তালে আমরা দুটিতে দুষ্টমিমাখা খুশিতে বাড়ি মাতিয়ে রাখি।আমি আমার ভাসুরের মেয়ে আর ননদের মেয়ে সারাটাদিন মজা করি।আমার বড় জা না উনি আমার জা নন উনি আমার বড়দিদি আর আমার শাশুড়ি না উনি আমার মা, আমার পাগলামী দেখে হাসেন।
আমার রাসভারী শশুর না উনি আমার বাবা, আজকাল আমার সাথে তাল মিলিয়ে নাতনীদের সাথে খুঁনসুটিতে ব্যস্ত। এখন সবার ভালোবাসার মিষ্টি উপদ্রব আরোে বেড়েছে।এইতো কিছু সময় আগে আমার মা (শাশুড়ি) আমার পিঠে দুটো কিল দিয়ে বলে গেলেন,

-হতচ্ছাড়ি ধাড়ি মেয়ে! এই সময়টাতে অন্তত একটু আস্তে চলাফেরা কর।তিনমাস ধরেযে বমি করে শরীর কাহিল হয়ে গেছে সেটা বুঝিস?? বড় হয়েছিস কি ঘাস খেয়ে??

আমার বড়দিদি কাঁদো কাঁদো সুরে বলেন,

-ললিতা,আমারতো মেয়ে। তুই আমায় একটা ছেলে দিস। তবে আমাদের দুবোনের আর কোন সাধ অপূর্ণ রবেনা।

আমি সত্যিই অবাক হলাম।এত ভালমানুষও দুনিয়ায় আছে।এখন আর আমার বাবার বাড়ির কথা একফোঁটাও মনে পড়েনা।শুধু আমার বিধবা মা ও ভাইপো ভাইঝির জন্য যাই।
আজ রাতে আমার স্বামী ফিরে এসেছে।দুজনে মিলে আকাশের তাঁরা দেখছি জানালা দিয়ে।এমনসময় আমার পেটে থাকা গুন্ডাটা সজোরে লাথি মারে।আমি ব্যথা পাই।আর আমার স্বামী পেটে মাথা দিয়ে সেই লাথির জোর টের পেয়ে বলে ওরে আমার ছেলে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোল দিয়েছে। বলেই হাতে তালি।
কি বেক্কল বর আমার।রাতের শব্দ দুরে যায়।লোকে শুনলে বলবে কি???

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী