মানুষিকতা 

ফাহমিদা খানমঃ
বলিষ্ঠ শব্দের কোন স্ত্রীবাচক শব্দ নেই তাই কিছু পুরুষ এটা খুব তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে। বলিষ্ঠ হবার সাধ বেশীরভাগ পুরুষের। স্ত্রীর মন বোঝা আজো কিছু পুরুষের জন্য হাস্যকর।
আমি জেসমিন আরা পছন্দ করেই জাহিদ চৌধুরী কে বিয়ে করে এক ছাদের নিচে জীবন কাটানোর পণ করলেও এটা এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের আগের চেনা জাহিদ আর এই জাহিদের মাঝে অনেক পার্থক্য । আগে সে আমার প্রতি যত্নশীল হলেও বিয়ের পর দেখছি পুরো উল্টো।
সমস্যা কি ওর একার নাকি আমারো —-সেটাও বুঝতে পারছিনা। বিয়ের অল্প কিছুদিনের মাঝেই আমি আবিষ্কার করলাম স্ত্রীর সাথে কোনকিছু শেয়ার করা জাহিদের পছন্দ নাহ। সে হুটহাট করে একটা কাজ করে বসে, বিব্রত হই আমি। যেমন —–শুক্রবার দুজনের অফিস ছুটি থাকে, আমি ভাবি সারা সপ্তাহের কাজ গুছিয়ে রাখবো, জাহিদ মানুষ কে দাওয়াত দিয়ে এসে আমাকে জানায়।
“”জাহিদ তোমার হুটহাট উদ্ভট কাজে আমি যে বিব্রত হই সেটা কি তুমি বুঝতে পারো না নাকি বোঝার চেষ্টা করতে চাওনা “?
“”আরে বন্ধুরা জোর করে ধরলো তাই না করতে পারিনি বুঝলে, আচ্ছা আমি তোমায় হেল্প করবো “”
এটা যে একটা কথার কথা গত কয়েকমাসে আমি বুঝে গেছি। প্রায় অফিস থেকে ফেরার সময় মাছ কিনে এনে রাতে ই ফ্রেশ রান্নাবান্না করতে বলে। হ্যাঁ সে চাইতেই পারে কিন্তু সমস্যা হলো অফিস করে এসে সে যেমন ক্লান্ত থাকে আমিও থাকি। সে এসেই টিভি নিয়ে বসে পড়ে, চা নাস্তা দিতে হয়। নতুন করে রান্নাবান্না করতে ইচ্ছা করেনা। ছুটির দিনে রান্না করে বক্সে ভরে ফ্রিজে রেখে দেই, তারপর গরম করে খাই। আমি বুঝি ওর ফ্রেশ খাবারের প্রতি আগ্রহ কিন্তু আমিতো উপায়হীন। আমার বড় আপুর বাসার কাছেই আমাদের বাসা। ভালো মন্দ কিছু হলে ও সন্ধায় পাঠিয়ে দেয়, অনেক সময় আপু, দুলাভাই দুজনেই এসে ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে চলে যায়। জাহিদ অজ্ঞাতকারনবশত দুলাভাইকে পছন্দ না করলেও আপুর গুণমুগ্ধা প্রায়ই বলে তোমার বোনের রান্নার স্বাদ অসাধারণ, এমন রান্না পেলে জীবনে আর কি চাই!
আচ্ছা জাহিদ কি চায় চাকুরী ছেড়ে আমি ঘরকন্না আর রান্নাবান্না নিয়েই পড়ে থাকি????? কিন্তু জাহিদ জানে এই চাকুরী আমার জন্য কতোটা জরুরী। সব জেনে বিয়ে করে এখন এই কথা কেন?
অগ্রণী ব্যাংকের এই চাকুরীতেই জাহিদের সাথে পরিচয়, অফিসের কাজ নিয়ে এসে পরিচয় হয়েছিল। তারপর ফোন বিনিময়, কাজের ফাঁকেফাঁকে এসএমএস চালাচালি। জাহিদ বিয়ের জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। বাবা নেই, এক ভাই ভাগ্য বদলাতে প্রবাসী আরেক ভাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। সংসার আমি দেখি। দুলাইকে সবাই গার্জিয়ান মানতো। দুলাভাই খোঁজখবর নিয়ে মতামত দিলেন। আপুর বাসায় ছোট পরিসরে বিয়ে হয়ে গেলো দুজনের। ঘটা করবার মতন সামর্থ্য আমার মায়ের নেই। বিয়ের এক সপ্তাহ পরেই আগেই দুজনের পছন্দ করা বাসায় নতুন জীবন শুরু করলাম আমরা।
“জেসমিন মায়ের শরীর খারাপ আমি কালই ঢাকা নিয়ে আসতে বলেছি “”
“আচ্ছা তোমার ছোট বোনকে সাথে নিয়ে আসতে বলো, আমি গত সপ্তাহে ৭দিন জ্বরে সিক লিভ নিয়েছিলাম এখন ছুটি পাওয়া মুস্কিল হয়ে যাবে জাহিদ “”
“”ওর সংসার আছে, স্কুল এর চাকুরী আছে, ও আসতে পারবেনা, আমি কথা বলেছি “”
“”তাহলে তুমি ছুটি নাও জাহিদ”
“মায়ের মেয়েলী রোগ, আমি ছুটি নিয়ে কি করবো? মা এসব কথা আমার সামনে ডাক্তারকে জীবনেও বলবেন না ” শোনো জেসমিন এতো সমস্যা নিয়ে চাকুরী করার কি দরকার? তোমার নিজের মা হলে কি করতে তুমি? মেয়েদের জীবনের আসল কাজ কিন্তু শ্বশুরশ্বাশুড়ি আর স্বামীর খেদমতগারি করা। “”
স্তব্ধ হয়ে গেলাম আমি। এই যুগের ছেলে হয়ে এসব কি বকছে জাহিদ। গড়ন আর লেবাস আধুনিক হলেও ভেতরবাড়ি যে আদি অকৃত্রিম পুরাতন!
অকারণ কথা বাড়াবাড়িতে আমি গেলাম না। আমি জাহিদ কে আগেই জানিয়েছি চাকুরী আমার জন্য কতো দরকারি। ভাগ্য বদলাতে গেলেও বড় ভাই নিজেই প্রবাসে যুদ্ধরত, মায়ের ডায়াবেটিস, উচ্চচ্চ রক্তচাপ —-প্রতিমাসে মেডিসিন লাগে ৫ হাজার টাকার মতন, ছোট ভাই টিউশানি করলেও হয়না,ওকেও মাসে দেই তিন হাজার টাকা। আপু, দুলাভাইয়ের তিন বাচ্চা নিজেরাই হিমশিম খায়, সাহায্য করবে কি?
বিয়ের আগেই জাহিদকে আমি জানিয়েছি চাকুরী আমি জীবনের তাগিদেই করি আজ তাহলে এই কথা কেন? নাকি চাকুরীর বড় অংশ বাড়ি তে দিয়ে দেই বলে, ওর আক্ষেপ???
শ্বাশুড়িমা কে ডাক্তার দেখানোর পর ডাক্তার জানালেন জরায়ু তে ইনফেকশন, অপারেশন করতে হবে। এক মাস দশদিন পর সুস্থ্য হয়ে মা বাড়ি ফিরে গেলেন। জাহিদের দুই বোন মাকে দেখতে এসে আমাকে অনেক গালভরা উপদেশ দিয়ে গেলো , মায়ের যত্নের যেন কমতি না হয়। শ্বাশুড়ি মা বাড়ী যাবার পর আবার দুজনে একা। সব আগের মতো মনে হলেও আমার ভিতরে ভাঙন ধরেছিল।
“”জেসমিন শোনো একটা সমস্যা হয়ে গেছে, বোনের শ্বাশুড়ি স্ট্রোক করেছে , ডাক্তার ঢাকা রেফার করেছে, কেউ নেই বলে আমি এখানেই আনতে বলেছি ”
“এই ডিসিশন নেবার আগে একবার কি আমার সাথে পরামর্শ করা যেতো না? ”
“”আরে এখানে পরামর্শ এর কি আছে? বিপদআপদ কি বলেকয়ে আসে নাকি? আত্মীয়স্বজন থাকলে এসব মেনে নিতেই হবে “”
“আচ্ছা তোমার বোনকে সাথে আসতে বলো “”
“ও কি করে আসবে? আজ অক্টোবর মাসের ১৫তারিখ,নভেম্বর মাসের ১ তারিখে ওর ছেলের জেএসসি পরিক্ষা , যা করার তোমাকেই করতে হবে।
“”অফিস থেকে এখন আমি আর কোন ছুটি পাবো না, আসতে হলে কাউকে সাথে আনতেই হবে ”
“”কি হয় ছাতার এই চাকুরী না করলে! কয় টাকা ঘরে আসে শুনি? “”
নির্লজ্জ, বেহায়ার মতো সত্য বাহিরে বেরিয়ে এলো। ওর মনের ভিতরের পোকাটা দাঁত মেলে বেরিয়েই এলো। আমি এই সত্য র অপেক্ষায় ছিলাম। চাকুরীর টাকার বিরাট অংশ আমার পরিবারে চলে যাওয়া জাহিদের পছন্দ হচ্ছিল না বিয়ের পর বুঝেছিলাম কিন্তু সত্যি টা ওর মুখ থেকেই শুনতে চেয়েছিলাম আমি।
সকালে দুজনেই অফিসের জন্য বের হলাম, আমি স্বাভাবিক জেনো কিছুই হয়নি। দুই ঘণ্টা অফিস করে বাসায় এসে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। তারপর একটা চিরকুট লিখলাম ———-
“”যদি কখনো মানুষিকতা বদলাতে পারো কেবল তখন আমায় নিতে এসো, না হলে কখনওই না “”
যুগ বদলালেও কিছু মানুষ আজো নিজেকে ধরে রেখেছে সেই পুরাতন মানুষিকতায়। শিক্ষিতের লেবাস নিলেই কিন্তু মানুষিকতা বদলায় না।

৬/২/১৮

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী