আধিপত্য

ফাহমিদা খানমঃ 

“তানিশার মামা ওর জন্য বিয়ের প্রস্তাব এনেছে ”
“এতো ছোট মেয়ে আমি বিয়ে দিবো না “
“তানিশার বড় খালাই ওকে বউ বানাতে চায়, ওর নানীর ইচ্ছাও তাই ”
“মানে! ছেলেতো তানিশার চেয়ে বেশ বড় ”
“স্টাবলিষ্ট ছেলে বয়সী হবেই, এটা কোনই ব্যাপার না ”
“সব কি ঠিক হয়ে গেছে? ”
“না মানে উনারা সবাই ধরলো, আমিও কথা ফেলতে পারিনি। তানিশার খালার ইচ্ছে বোনের মেয়েই বউ হোক ”
“এতদিনেও তানিশার উপর আমার কোন অধিকার হলো না! উনারা না হয় পর ভাবেন কিন্তু তুমিতো একবার জিজ্ঞেস করতে পারতে! ”
“শাহানা উনাদের উপরে কিছুই বলতে পারিনি, তানিশার নানী ও কান্নাকাটি করলো ”
স্তব হয়ে বসে রইলাম। পেটে ধরিনি বলেই হয়তো কেউ আমার মতামত নেবার দরকারই মনে করেনি।
ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে চাচাতো বড়বোনের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছিলাম। বোনের চাচীশ্বাশুড়ি আমাকে ছেলের বউ হিসাবে পছন্দ করে বসলেন। ছেলের বউ দ্বিতীয় বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে এক বৎসর আগে মারা গিয়েছিলো। বয়সের ব্যবধান সত্বেও আমার বিয়েটা হয়েই গেলো। প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক বাবা দেখলেন ছেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকুরী করে, মেয়ের কতোবড় কপাল! মেয়ে কি চায় না চায় কেউ জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেনি। বিয়ের পর চাচাতো বড় বোন সম্পর্ক এ হলো দেবরের বউ। এই বাড়িতে সবাই আমাকে খুব আদর করতো। তবে তানিশার বাবার সাথে কোথাও বের হলেই ভাবতো আমার বাবা বুঝি! খুব লজ্জা পেতাম আমি।
এই বাসায় সবচেয়ে বেশী ভালবাসতো তানিশা। ওর মা ডাক সব অপুর্ণতা ভরিয়ে দিয়েছিলো। নতুন মা পেয়ে ওর জগত বদলে গিয়েছিলো।
“মা তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে নাতো? ”
“নাহ মামনি আমি কোথাও যাবো না ”
আমার বিয়ের আগে তানিশা দাদীর সাথেই ঘুমাতো, মা পেয়ে সে মাকে ছাড়া আর ঘুমাবে না। তানিশার বাবা বিরক্ত হলেও আমি হতাম না। মেয়েতো মায়ের বুকেই ঘুমাবে——এটাই স্বাভাবিক মনে হতো আমার। তানিশাকে স্কুলে দেবার পরেও সে মাকে ছাড়া স্কুল যাবেনা। স্কুলে কেউ বিশ্বাসই করতো না আমি তানিশার মা। এতো অল্প বয়সী মা!
“আমি চাচ্চুর সাথে স্কুলে যাবো না ”
“আম্মুর যে বাসায় কাজ থাকে তানিশা ”
“তাহলে তানিশা একদিন স্কুল থেকে হারিয়ে যাবে, আর ফিরবেই না ”
প্রথম সন্তান তখন পেটে। খুব কষ্ট হতো। তানিশার বাবা আর দাদী বলতো —–“মেয়েকে এতো আস্কারা দেয়া ঠিক না ”
ছেলে হবার পর সবাই ভীষণ খুশী, সবচেয়ে খুশী দেখেছিলাম তানিশার চোখেমুখে। জীবন্ত খেলনাপুতুল পেয়ে পড়ালিখা,খাওয়াদাওয়া সব লাটে উঠলো তানিশার।
“মামনি ভাইয়া আমাকে কবে আপু ডাকবে? ”
“আর কয়দিন পরেই, সারাদিন তোমায় জ্বালাবে ”
“ও স্কুলে ভর্তি হলে আমি হাত ধরে নিয়ে যাবো ”
“বড় হলে তুমিই ওর হাত ধরে নিয়ে যাবে, তুমিতো ওর বড় আপু। ”
তারপর ছোট মেয়ের জন্মের পর তানিশার বাবার বুকে ব্লক ধরা পড়লো। কি যে দু:সহ দিন গেছে আমাদের! তখন কেউ পাশে এসে দাঁড়ায়নি। আজ কোথা থেকে শুভাকাঙ্ক্ষী আসলো!!!!
তিন বাচ্চা নিয়ে আমি হিমশিম খেয়েছি, কেউ খবর নেয়নি আর আজ তানিশার অভিভাবক সবাই!!! এই কি আমার পুরস্কার!!!!
সংসার আসলেই আজিব জায়গা। ১৭ বছরের মেয়েটি পেটে না ধরেই মা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন জিনিস। আজকে মেয়ে বড় হয়েছে ওর ভালেমন্দ দেখার দায়িত্ব সবাই নিজ দায়িত্বে নিয়েছে সেখানে আমার মতো সৎ মায়ের কথার কোন দামই নেই। হয়তো এটাই হয়। ভালবাসার আধিপত্য দেখাতে গেলে অধিকার লাগে —–সেই দাবি সৎ মায়ের থাকেনা।

লেখক ফাহমিদা খানম

১২/২/১৮

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী