অভিনয় করতে শিখুন এবং প্রতিবাদ করুন

আলপনা তালুকদারঃ 

১। ধরুন, কারো কোন অপরাধের বা অপকর্মের কারণে তাকে বা তাদেরকে আপনার ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করতে ইচ্ছে করছে। তার বা তাদের অপকর্মের জন্য এতটাই রাগ হচ্ছে যে, তাকে বা তাদেরকে খুন করলেও তা তাদের অপরাধের তুলনায় নগণ্য। কিন্তু আপনি জানেন, আপনার সে ক্ষমতা নেই। (আমি যখন কারো ভালো মানুষের মুখোশটা খুলে পড়ে তার কুৎসিত চেহারাটা বেরিয়ে পড়তে দেখি, অসহায় কোন মানুষ, বিশেষ করে নারী বা শিশুকে, তার অতি আপনজন বা কারো দ্বারা নির্যাতিত হতে দেখি, তখন আমার ইচ্ছা করে হারামীগুলার মুখে সজোরে লাথি মারি)। তখন কি করা উচিত?

২। মনে করুন, কোন পরিস্থিতির কারণে আপনি এতটাই কষ্ট পাচ্ছেন যে, সহ্য করতে না পেরে আপনার মরে যেতে ইচ্ছে করছে (যেমন -বিচ্ছেদ)। নির্যাতন, শারীরিক বা আর্থিক দৈন্য, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদি নানা কারণে আপনি ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। তখন কি করবেন?

জীবনে এমন কিছু সমস্যা আসবে, যার সমাধান সহজ নয়। কখনও কখনও সম্ভবও নয়। কিছু কিছু পরিস্থিতি বদলানো যায়না। মেনে নিতে হয়। আবার কখনও কখনও তা মেনে নেয়াও ভয়াবহ রকমের কষ্টের। এমন হলে কি করা উচিত?

১। সমস্যাটা আপনার ব্যক্তিগত হলে এবং তার সমাধান সম্ভব না হলে যত কষ্টেই থাকুন, সেটা শুধু আপনি জানবেন। অন্যদের জানতে দেবেন না। তাতে অন্যরাও আপনার মত শুধু কষ্টই পাবে। আর কোন লাভ হবেনা। কাউকে কষ্টের কথা বলার মানে হলো, আপনি নিজের কষ্ট অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে অন্যদেরকেও কষ্ট দিলেন। তাতে কোন লাভ হয়না। কারণ তাতে আপনার কষ্ট দূর হয় না। (একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার সমস্যা আপনাকেই সমাধান করতে হবে। আর কেউ করে দেবেনা)। তাই ভাল থাকার অভিনয় করুন। আর খুব বিশ্বস্ত, প্রিয় কেউ থাকলে শুধু তাকে আপনার কষ্টের কথা বলুন। তাতে আপনার মনের কষ্ট কিছুটা হলেও হালকা হবে, মনে শান্তি পাবেন। মনে রাখবেন –

ক) কোন সমস্যাই চিরদিন থাকে না। আপনারটাও থাকবেনা। তবে সমস্যার সমাধানে আপনি কতটা তৎপর সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

খ) যেকোন সমস্যা যত তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারবেন, ততই ভালো। কারণ সমস্যার কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপ আপনার দেহ-মনের জন্য ক্ষতিকর।

গ) আপনিই পৃথিবীতে প্রথম বা একমাত্র ব্যক্তি নন, যার এমন সমস্যা হয়েছে। আপনার চেয়ে শতগুণ বেশী সমস্যা নিয়েও মানুষ বেঁচে থাকে।

ঘ) যেকোন সমস্যা মস্তিষ্কে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘন্টা তীব্র চাপ ফেলতে পারে। তারপর এর তীব্রতা কমতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ঘটনা ঘটার পর থেকে যত সময় যায়, ততই এর তীব্রতা কমতে থাকে। কারণ প্রতিটা ঘটনা মস্তিষ্কে স্মৃতি হিসেবে জমতে থাকে, ছাপ ফেলতে থাকে। ফলে যে ঘটনাটি আপনার কষ্টের কারণ, সেটি ঘটার পর যত সময় যায়, তত তার উপরে অন্যান্য ঘটনাগুলোর স্মৃতি মস্তিষ্কে ছাপ ফেলতে থাকে। ফলে আপনার কষ্টের স্মৃতিটা চাপা পড়তে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে আপনি কষ্ট ভুলে যান।

ঙ) আপনার আবেগের তীব্রতা কমে গেলে মস্তিষ্ক যুক্তি দিয়ে ঘটনাটি আপনার কাছে ব্যাখ্যা করে। ফলে আপনি বিষয়টি মেনে নিতে রাজী হন বা মেনে নেন।

চ) কারো জন্যই, কোন কিছুর জন্যই জীবন থেমে থাকেনা। সব সমস্যা, প্রতিকূলতা কাটিয়ে বেঁচে থাকার নামই জীবন। তাই সমস্যাকে ভয় পাবেননা। দুঃখ, কষ্ট, হতাশা এগুলো জীবনেরই অংশ। তাই এগুলোকেও মেনে নিয়েই বাঁচতে পারার জন্য আপনাকে বুদ্ধি-বিবেক দেয়া হয়েছে।

ছ) আপনি একা নন। আপনার জীবনের সাথে আরো অনেকের জীবন জড়িত। তাই নিজের সাথে সাথে অন্যদের কথাও ভাবুন। তাতে কষ্ট সহ্য করার শক্তি পাবেন।

২। সমস্যাটা আপনার বা আপনার কোন প্রিয়জনের প্রতি কোন নির্যাতন বিষয়ক হলে যথার্থ জায়গায় অভিযোগ জানান, প্রতিকার করুন। কোনভাবেই অপরাধ গোপন বা সহ্য করবেন না। অপরাধের প্রতিকার না হলে কি কি ক্ষতি হয়, তা আমার একটি লেখায় আমি লিখেছি। লেখাটির লিংক দিলাম। কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন।

লিংক : https:m.facebook.com story.php?story_fbid=1836960076557817&id=100007315272396

৩। সমস্যা ব্যক্তিগত না হয়ে পারিবারিক হলে এবং সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলে পরিবারের সবাই একে অন্যের সমব্যথী হোন। কষ্ট হলেও সবাই মিলে সহনীয় কোন একটা সমাধান বেছে নিন।

৪। সমস্যা সামষ্টিক হলে তথা সমাজ (নৈতিক অবক্ষয়, অপরাধ, সম্প্রীতি নষ্ট হতে পারে এমন কিছু, মাদক ইত্যাদি) ও দেশের সব মানুষের স্বার্থ সম্পর্কিত (দূর্ণীতি, কুশাসন, অপরাধ, স্বার্থহানিকর ইত্যাদি) হলে এবং তার সমাধান কঠিণ হলে আপনার সাধ্যমত প্রতিবাদ করুন। চুপ করে থাকবেন না। তাতে সমস্যা বাড়বে। সবাইকে বিষয়গুলো জানান, জনমত তৈরী করুন, অব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করুন। সবাই অন্তত বিষয়টা জানুক। একসময় এর প্রতিবাদ কেউ না কেউ নিশ্চয় করবে।

আমি মাঝে মাঝে হতাশ হয়ে লেখা ছেড়ে দিতে চাই। কিন্তু যখন দেখি, কোন একজন মানুষ আমার কাছে তার কষ্টের কথা বলে তার প্রতিকার পেতে চায়, প্রতিবাদ করতে চায়, তখন মনে হয়, মানুষের নির্ভরতার একটা জায়গা অন্ততঃ আমি হতে পেরেছি। এক জীবনে মানুষ এরচেয়ে বেশী আর কি পেতে পারে?

বল্টুকে তার মা বলল, “আইসক্রিম খেয়োনা। ঠাণ্ডা লাগবে।” বল্টু বলল, “লাগবে না। আমি সোয়েটার পরে আইসক্রিম খাবো।”

তাই বলছিলাম, সমস্যা থাকবেই। কিন্তু আপনি বল্টুর মত কোন না কোন একটা সমাধান ঠিক বের করে ফেলবেন। আর একান্তই যদি না পারেন, তবে আমি তো আছি!!!

সবাইকে ভালোবাসা দিবসের অনেক অনেক ভালোবাসা!!!!!!

লেখক আলপনা তালুকদার

আলপনা তালুকদারঃ  অধ্যাপক, আই ই আর , রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

 

 

 

 

 

 

 

 

লেখকের অন্যান্য লেখা-

শিশুর বহূমুখী বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে জানুন

শুধু বুদ্ধি নয়, শিশুদের সব গুণের বিকাশ চাই

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী