আদিমতম অস্বীকৃত পেশায় যারা!

যূথিকা জাকারিয়াঃ

সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীদেহ নিয়ে ব্যবসায় চলে আসছে, তাই একে বলাই হয় আদিম পেশা।এক শ্রেণীর পুরুষের চোখে নারী মাত্রেই ভোগের বস্তু, লালসার সামগ্রী।একই মাটিতে তৈরী নারী তাই সেকেন্ড সেক্স আর পুরুষ নিজেকে ভাবে একমেবাদ্বিতীয়ম!তাই নারী শরীরে জন্ম নিয়ে নারীকেই বানায় দাসী। সনাতন ধর্মে দুর্গাদেবীর পুজায় তাঁর মুর্তি গড়তে বেশ্যাবাড়ির মাটি লাগে।মার্কন্ডেয় পুরাণ মতে দেবীর প্রতীমা গড়তে যে নবকন্যার দ্বারের মৃত্তিকা লাগে, গণিকালয় তার একটি। সূর্যপুরান মতে যে ব্যাক্তি সূর্যদেবের নামে গুটিকয় বেশ্যা উৎসর্গ করবে সে তাঁর সংগে অক্ষয়লোকে বিরাজ করবে। এতো কথার পরেও বেশ্যাবৃত্তি সমাজের চোখে তথা ধর্মের চোখে পাপই।সমাজে বাস করেও পতিতা নামক নারী সমাজচ্যুত।আমরা জানি যে কোন মেয়ে সাধ করে এই জঘন্য পেশায় আসেনা। নেহাত দায়ে পড়ে আসে,আসে বিভিন্নরকমের ফাঁদে পড়ে।

Peace in Islam নামক পোর্টালে প্রকাশিত আর্টিকেলে লেখক লিখেছেন-“’পতিতা’ পাওয়া যায় বলেই কি পুরুষরা “পতিত” হয়, নাকি পুরুষের “পতিত” হবার চাহিদা থেকে “পতিতা”র জোগান দেয়া হয়? স্বাভাবিক যেকোন মানুষই দ্বিতীয় কারণের সাথে একমত হবেন। জ্বী হ্যাঁ, আমাদের দেশসহ বেশীরভাগ দেশেই “পতিত” পুরুষদের চাহিদা মেটানোর জন্যই “পতিতা”র আমদানী বা জোগান দেয়া হয়। এর জন্য দালাল হয় “পতিতা”র। বিভিন্ন অসহায় নারীদের মিথ্যা লোভ দেখিয়ে, শহরে বা বিদেশে নানারকমের চাকরীর প্রলোভন দেখিয়ে অভাবী নারীদের পাচার করা হয়। বর্তমান বিশ্বে মনে হয় অস্ত্র ব্যবসার পরেই শিশু ও নারীব্যবসা সবচেয়ে জমজমাট ব্যবসা ।”

সকল ধর্মমতে দেহব্যবসা পাপ, এতোটাই পাপ যে কোন পতিতা মারা গেলে সে ধর্মমতে দাফন কাফনের হকদার হয়না। একটা সময়ে এদের কপালে মাটিও জুটতোনা।কোনমতে বস্তাবন্দী করে জলে ভাসানই ছিল এদের নসিবে। হিন্দু ধর্মমতে এরা অগ্নিসৎকার পায়না বা দাহ করা হয়না। ধর্মের কোন বীধিই মানা হয়না।আমরা যতোই বলি পাপকে ঘৃনা করো পাপীকে নয়,তবুও পতিতাদের বেলায় আমরা অন্ধ হয়ে যাই।তাই তাদের দেহসৎকারে, স্রেফ মাটি খুঁড়ে পুতে ফেলা হয় লাশ। বর্তমান সময়ে কিছু উন্নয়ন সংস্হা পতিতা পল্লিতে তাদের স্বাস্হ্য সেবা, পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটেশন, এইডস প্রতিরোধী প্রজেক্ট চালান।কোন কোন সংস্হা পতিতা পল্লিতে জন্ম নেয়া শিশুদের শিক্ষার বিষয়টা দেখেন।কিন্তু এতো কিছুর পরেও বাংলাদেশে যৌনকর্মীরা স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়েই জীবন কাটান।

প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সীমানা থাকায় ও অবাধ অনুপ্রবেশকারীদদের কারণে বাংলাদেশে এইডস সহহ বিবিধ যৌনরোগ বাড়ছেই।আর এসব রোগের প্রধানতম শিকার দেহব্যবসায় লিপ্ত গণিকারা।যৌনরোগ ছাড়াও আর নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় বিনাচিকিৎসায় মারা যায় এরা।কারণ স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস। আমার জানামতে দেশের কোন কবরস্হান বা শ্মশান কমিটি তাদের নিয়মের বাইরে গিয়ে কোন যৌনকর্মী কে এসব স্হানে দাফন করতে দেয়না। উন্নয়ন কর্মীরা তাদের আন্তরিক চেস্টায় হয়তো মৃতদেহ সতকার করবার জায়গা পান সেই পল্লীতেই।আমি জানিনা ধর্মে এদের জন্য কী বিধান? সত্যই কি এসব হতভাগিনী মৃত্যুর পরে সাড়ে তিনহাত জায়গা না পাওয়াটাই নিয়ম? এরা কি নিজের নিজের ধর্ম মতে দাহ বা অগ্নিসতকার কি সমাধি পাবেনা? ধর্ম যাই বলুক, সমাজ এদের সুবিধা নেয়। এদের কাছে গিয়ে সেইসব নরপিশাচ তাদের লালসার সুধা মেটায় । যাদের কারও কারও হাতে  রাস্তাঘাটে নিজের সম্ভ্রম হারাতে হয় অনেক জানা-অজানা নারীকে । এরা নীলকন্ঠের মতোই সমাজের বিষ নিজেরা পান করে থাকে।

সমাজের কিছু লোক যেন তাদের পাপের কবর দেয়ার জন্য এদের  আটকে রেখে  পল্লী তৈরি করেছে । অথচ এদের অনেকে সমাজে সুস্থ ভাবে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে চায় । রাতের বেলা গা ঢাকা দিয়ে যারা তাদের কাছে যায় তারাও  ঐসব অস্পৃশ্য, অচ্ছুৎতের মতই পাপের অংশীদার ।

 

 

লেখক যূথিকা জাকারিয়া

লেখকঃ কথা সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী