পরিবার যেভাবে শিক্ষালয়

ফাহমিদা খানমঃ 
যুগ যুগ ধরে রাখা মানুসিকতা থেকে অনেক মানুষই আজো বের হতে পারেনি। একজন মেয়ে যে মানুষ –এটা ভাবতে আজো কিছু মানুষের ভীষণ আপত্তি। যুগ পালটেছে কেবল টিভির নাটকে আর সিনেমায় দেখি। বাস্তবতা ভিন্ন ব্যাপার। আজো মেয়েদের ক্যারিয়ার গড়ার কথা সম্মানীয় অভিভাবক বৃন্দ সেভাবে ভাবেননা, বিয়ে দিয়েই দায়মুক্তি পেতে চান। আবার যুগ যুগ ধরে চলা সংস্কার মুক্ত হতে পারছেনা অনেক মেয়েরাও। অনেকেই বলে আজকালকার মেয়েরা আধুনিকা হয়েছে। অল্প সংখ্যক মেয়েদের পরিবর্তন কি পুরো দেশের চিত্র!!! নাহ কখনওই নাহ।

আগের যুগে আমাদের নানী -দাদীরা ধান সেদ্ধ করতো, মসল্লা পিষে খেতো —-এই যুগের মেয়েদের নাকি আরাম, আয়েশের কোন শেষ নাই, অনেক উচ্চ শিক্ষিত ছেলেদের মুখেও আমি এসব কথা শুনেছি।
খুব ভোরে রাস্তায় বের হলে একটা দৃশ্য সবার চোখেই পড়ে। মায়েরা সন্তানদের নিয়ে কেউ স্কুলে আবার কেউ কোচিং ছুটছে। আমাদের মায়েদের এই উটকো ঝামেলা ছিলোনা তাই করেনি, করার দরকার হয়নি। এখন বাচ্চাকে একা ছাড়ার মতো পরিবেশ আর নেই। সময়, পরিস্থিতি বদলেছে। কাউকে বিশ্বাস করা যায়না তাই মায়েদের দায়িত্ববহন বেড়েছে। অনেক মহিলারা বাজার পর্যন্ত নিজ হাতে করেন কারণ অনেকের স্বামীরা সময় পায়না আবার অনেক স্বামীরাই প্রবাসী। বাচ্চাকাচ্চা স্কুলে দিয়ে লম্বা সময় হাতে থাকে বলে মেয়েরাই সানন্দে সংসারের এই দায়িত্বটুকুও নিয়েছে। এই পরিবর্তন চোখে পড়লেও চেপে রাখাই ভালো।

সেদিন একজন বয়স্ক মানুষ খুব আক্ষেপ করেই বললেন আজকালকার কোন মেয়েই নাকি পারফেক্ট স্ত্রী হতে চায়না, নিজেদের নিয়েই ব্যস্ততা তাদের। জিজ্ঞেস করলাম পারফেক্ট বলতে আসলে আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন? উনি উত্তর দিলেন বিয়ের পর থেকে উনার সকল কাজ উনার স্ত্রী নিজের হাতেই করেন। উনার নাস্তা, পছন্দের রান্নাবান্না —সবকিছু একাই খেয়াল রাখেন এমনকি উনি যখন কাজে বের হন তখন গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেন। শুনেই মন জুড়িয়ে গেলো আমার। আমি বললাম আপনার স্ত্রী আপনার এতো খেয়াল রাখেন, উনি কখনো সিক হলে আপনি কি উনার সেবা করেন? বয়স্ক মানুষটা রেগে উত্তর দিলেন—“এসব মেয়েলী কাজ আমি কেন করবো? ” একজন মেয়ের দায়িত্ব পুরো সংসার দেখা কিন্তু সে সিক হলে স্বামীর দায়িত্ব নাই। স্যালুট মুরুব্বী আপনার অসাধারণ ভাবনাকে।

উনি এরপর প্রবাসে থাকা ছেলের বউয়ের অকুণ্ঠ প্রশংসা করলেন, আমি এতেও অবাক হইনি। ভোরে উঠে বৃদ্ধ শ্বশুরবাড়ির সকলের নাস্তা টেবিলে দিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে স্কুলে যায়, ফেরার পথে বাজারটা সেরে আসে। বাসায় এসে রান্নাবান্না সেরে আবারো বাচ্চা আনতে স্কুলে যায়। সন্ধার পর একটু টিভিতে সিরিয়াল বা নেটে বসে।ছেলে বিদেশ থাকে বউ নেটে না জানি কি করে বেড়াচ্ছে! সত্যি ইতো বউটা এমন কেন করবে? বউ কি মেয়ে? ভালো লাগুক আর নাই লাগুক খুঁজে খুঁজে ঘরের কাজ বের করবে। আচ্ছা মেয়েটা হয়ত স্বামী বা শৈশবসঙ্গী কারো সাথে কিছুক্ষণ সময় কাটায় তাও কারো পছন্দনীয় নাহ। ভালো লাগুক আর নাই লাগুক তাকে সংসারের সব দিকে কঠিন মনোযোগ দিতেই হবে। বউদের আবার কোন হাউস কেন থাকবে? বউরা কি মানুষ! আমি যখন বউয়ের কাজের ফিরিস্তি দিলাম উনি উত্তর দিলেন—“সংসার সামলানো এমন কোন বড় কাজ নাকি? আমাদের মায়েরা ৬/৭ জন বাচ্চাও পেলেছে আবার সব কাজ নিয়ে করেছেন। গৃহিণীপনা খুব তুচ্ছ কাজ উনার কথায় টের পেলাম। আচ্ছা যদি এই গৃহিণীরা রান্নাবান্না আর বাচ্চার দায়িত্ব বন্ধ করে দেয়! হাড়েহাড়ে টের পাবেন কতো তুচ্ছ কাজ সেটা! হ্যাঁ আপনি বলতেই পারেন হোটেলে খাবো। কিন্তু সেটা কয়বেলা! কয়দিন!
আসলে পরিবারের চেয়ে বড় শিক্ষালয় আর কোথাও নেই। আপনাকে যখন সন্তান দেখবে নিজের স্ত্রী কে সম্মান করতে, তার সমব্যথী হতে সেও নিজের স্ত্রীর সাথে সেই আচরণ করবে। ছেলে সন্তানকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যদি মেয়েকে অবহেলা করেন তাহলে আপনার সেই শিক্ষাও অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। সন্তানের মাঝে ভেদাভেদ পরিবার থেকেই হয়। চাকুরীরত অনেক মেয়েকে দেখেছি সারাদিন অফিস করে এসে ঘরের কাজেকর্মে লেগেছে, এটাই বউ হিসাবে আসল কর্তব্য মনে হয় সবার। কে এই দায়িত্ব দিয়েছে নারীকে? সমাজ, সংসার!! কেন সবার মন যুগিয়ে চলার দায়িত্ব একার নারীর?

আজকাল কিছু ছেলে বদলাচ্ছে, যে ছেলে স্ত্রীকে বুঝে সমব্যথী হয়ে পাশে দাঁড়ায় তাকে আবার অপদার্থ বিশেষণ পেতে হয়।
কথার পিঠে কথা বাড়ে তাই সেদিন উনার কথা শুনে অনুভব করলাম এই যুগের মেয়েরা কেউই পারফেক্ট স্ত্রী হতে পারবেনা, সম্ভবপর না। নিজের কথাই বলি —স্টুডেন্ট অবস্থায় বিয়ে হয়েছিল। পড়ালিখা শেষ করে সংসার করতে এসে দেখি বাচ্চার স্কুলের বয়স হয়ে গেছে।তাকে নিয়ে দৌড়েছি, এরমাঝেই আরেকজন। বড়জন বোঝার পর এবার ছোট জনকে নিয়ে দৌড়াচ্ছি। হায় পারফেক্ট হওয়া হলোনা। এটা বেশিরভাগ নারীদের চিত্র। সপ্তাহে ৭দিন ডিউটি, ছুটি নাই।
বহিদৃশ্য দেখে কতো সহজেই আমরা কতো কি বলে ফেলি! ভিতরের যুদ্ধের চেহারাটা অজানাই থেকে যায়। একটু ভাবুন ছেলেমেয়ে আর সংসারের বন্ধনে নারীদের শিকড় কিন্তু দিনদিন বেড়েই চলে। পুরাতন তাকে আর খুঁজেই পাওয়া যায়না। নারীদের মানুষ ভাবুন, তাদের জন্যই সংসারজীবন টিকে আছে, সম্মান করুন তাদের।
সেকাল আর একালের মাঝে পার্থক্য শুধুমাত্র গড়ন আর লেবাসে। অনেক মানুষ উপরে আধুনিক হলেও ভেতরবাড়ি এখনো স্যাঁতস্যাঁতে, ঘুণধরা ।

৫/৩/১৮

লেখক ফাহমিদা খানম

ফাহমিদা খানমঃ কথা সাহিত্যিক

 

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী