মহীয়সীর একান্ত সাক্ষাৎকারে জাপান প্রবাসী লেখক শাহীন আক্তার স্বাতী

বইমেলা ২০১৮ সালে যাদের প্রথম বই প্রকাশ হয় তাদের মধ্যে একজন জাপান প্রবাসী লেখক শাহীন আক্তার স্বাতী । প্রবাসে থেকে বাংলা সাহিত্য চর্চা অনেক কঠিন বিষয় । আবার দূর থেকে নিজ দেশের ভাষা সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত থাকাও এক সুন্দরতম অভিজ্ঞতা। আজকের মহীয়সীর সাক্ষাৎকারে লেখালেখির নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন। তা তুলে ধরা হলো ।

১।মহীয়সীঃ আপনি কেমন আছেন?

লেখকঃ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

২।মহীয়সীঃ এ বছর আপনার প্রথম বই প্রকাশ হল। বইটির বিষয় বস্তু নিয়ে কিছু বলুন।

-লেখকঃ আমার প্রথম উপন্যাস ‘চিলেকোঠা’ মূলত খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনের গল্প যেখানে অর্থবিত্তের প্রাচুর্য্য না থাকলেও আছে পবিত্র ভালোবাসায় পরিপূর্ন এক দম্পতির জীবনগাঁথা। ছোট্ট চিলেকোঠায় থেকেও কেবল আস্থা, বিশ্বাস আর ভালোবাসাকে পুঁজি করে কি করে সুখী থাকা যায়, সেই মূলমন্ত্রই ফুটে উঠেছে ‘চিলেকোঠা’ উপন্যাসে। এছাড়াও এই উপন্যাসে সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশ সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ সহ আরো কিছু শিক্ষনীয় বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

৩।মহীয়সীঃ প্রথম বইয়ে কেমন সাড়া পেলেন?

-লেখকঃ নতুন লেখক হিসেবে আমার প্রথম উপন্যাসে যতটুকু সাড়া পেয়েছি তাতে আমি মুগ্ধ! এত এত বইয়ের ভীরে পাঠক আমার বইটিও গ্রহন করেছেন সেজন্য সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ! পাঠকের অনুপ্রেরনাই আমার আগামী দিনের সাহিত্য জগতকে সমৃদ্ধ করবে।

৪।মহীয়সীঃ কবে থেকে লেখালেখি করছেন?

-লেখকঃ আমার লেখালেখির শুরুটা হয়েছিলো একেবারে শৈশবে। তৃতীয় শ্রেণিতে থাকতে আমার প্রথম কবিতা ‘ মা’ প্রকাশিত হয়েছিলো ‘ দৈনিক জন্মভূমি’ পত্রিকায়।এরপর থেকে নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি করতাম।

৫.মহীয়সীঃ লেখালেখিতে আপনার অনুপ্রেরণা কে?

-লেখকঃ লেখালেখির অনুপ্রেরনা আমার বাবা-মা এবং দাদা। আমার দাদা এম. এ. গফুর সারথী ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচিত্র ‘মুখ ও মুখোশের’ গীতিকার। দাদাকে দেখেই লেখার প্রতি শৈশব থেকে আগ্রহী হয়ে উঠি। দাদা ছিলেন আমার লেখার চালিকাশক্তি।

৬.মহীয়সীঃ প্রবাসে থেকেও বাংলা ভাষায় বই প্রকাশের প্রতিবন্ধকতা গুলো যদি একটু বলতেন।

-লেখকঃ প্রবাসে থেকে বাংলা ভাষায় বই প্রকাশের অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এখানে বাংলা ভাষায় বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনী সংস্থা নেই বললেই চলে। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রকাশনীতে যোগাযোগ করতে হয়। সব সময় প্রকাশকের কাছ থেকে আন্তরিকতাপূর্ন সহযোগীতা পাওয়া যায় না। এছাড়া দূরত্বের কারনে বই প্রকাশের পর বইয়ের ভালো-মন্দ যাচাই বাছাইয়ের সুযোগ থাকেনা।

৭.মহীয়সীঃ কি করলে প্রবাসী লেখকদের জন্য সুবিধা হয় বই প্রকাশ এবং সংগ্রহ করা

-লেখকঃ আমার মতে প্রতিটি প্রকাশনীতে প্রবাসী লেখকদের জন্য বিশেষ কিছু সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা থাকা উচিত। দেশের বাইরে থেকেও আমরা বাংলাদেশকে ভালোবেসে, বাংলা ভাষাকে ভালবেসে সাহিত্যচর্চা করছি। আমাদের চেষ্টাকে অনুপ্রেরনা দেওয়া উচিত। যেহেতু ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয় তাই প্রবাসীদের সহযোগীতায় প্রতিটি প্রকাশনীতে ইন্টারনেটের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা উচিত যেনো আমরা সহজে দেশের বাইরে থেকে প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পারি। সহজে যেনো ই মেইলের মাধ্যমে আমাদের কাঙ্খিত পান্ডুলিপি পৌঁছে দিতে পারি প্রকাশনীতে। এছাড়া ভিডিও কলিংএর মাধ্যমে সরাসরি বই নিয়ে আলোচনাও করতে পারি।

বই প্রকাশের পর আমরা প্রবাসে বসে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় বসে থাকি ছাপা অক্ষরের বইটি হাতে পাবার জন্য। প্রবাসী লেখকের প্রকাশিত বইটি লেখকের হাতে তুলে দেবার প্রয়াশ কোন প্রকাশনীতে দেখা যায়না। বইমেলা হয়, মেলার স্টলে বই রাখা হয় অথচ দূর প্রবাসে বসে সেই বইয়ের স্পর্শ, ঘ্রাণ কোনটাই আমরা পাইনা। প্রকাশনী থেকে প্রবাসে লেখকদের যদি বই পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহন করা হয় তবে আমরা অনেক উপকৃত হতাম।

৮.মহীয়সীঃ লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

-লেখকঃ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আমার অন্যতম প্রিয় লেখক এবং ব্যক্তিত্ব। তিনি নারী জাগরণের অগ্রদূত। আমি তাঁর আদর্শকে পুঁজি করেই আমার আগামীর লেখনিকে চালিয়ে যেতে চাই। আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা আমি নারীদের নিয়ে লিখবো। সমাজে নারীকে নিয়ে যে বৈষম্য ,আমি সেই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে কাজ করতে চাই আমার লেখার মাধ্যমে। আমার বিশ্বাস, আমরা নারীরা যদি জাগ্রত হই তাহলে একদিন আলো আসবেই।

৯.মহীয়সীঃ প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কিভাবে লিখেন?

লেখকঃ প্রবাস জীবন ভীষণ কঠিন। আমরা যারা প্রবাসে থাকি তারা জানি কতটা কষ্ট আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। আমার প্রথম উপন্যাস ‘চিলেকোঠা’ লিখা শুরু করি গতবছরের শুরুর দিকে। তখন আমার ছেলের বয়স তিন আর মেয়ের দেড় বছর। আমি আমার ছোট্ট দুটি সন্তান নিয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে লেখার কাজটি চালিয়ে গিয়েছি। প্রবাসে সংসার, সন্তান সামলিয়ে লেখালেখি ছিলো আমার জন্য যুদ্ধ স্বরুপ। এখানে সহযোগীতা করার কেউ নেই। তবুও আমি চেষ্টা করেছি। আমার ‘ চিলেকোঠা’ উপন্যাসের প্রতিটি অক্ষর আমি লিখেছি সন্তান কোলে নিয়ে। তাই আমার প্রথম উপন্যাস আমার কাছে সন্তানের মত। আমি আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাসের মাধ্যমে নারীদের একটা ম্যাসেজ দিতে চেয়েছি আর তা হলো, আত্মবিশ্বাস আর প্রবল ইচ্ছাশক্তি যেকোন বাঁধাকে অতিক্রম করে আলোর মুখ দেখায়। আমরা নারীরা সমাজ, সংসার, সন্তানের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে নিজেদের সত্ত্বাকেই একসময় বিসর্জন দিয়ে ফেলি। হারিয়ে ফেলি নিজেদের অস্তিত্ব। নিজেদের ভেতরের প্রতীভাগুলোকে বিকশিত করিনা। কিন্তু একটু যদি সচেতন হই তবে আমাদের ভেতর থেকেই কত মূল্যবান রত্ন বের হয়ে আসবে। আমি যদি প্রবাসে বসে সকল ঝড় মোকাবেলা করে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ছোট একটা স্থান করে নিতে পারি তাহলে যারা দেশে আছেন তারাও পারবে। দরকার শুধু আগ্রহ আর অধ্যবসায় ।

১০।মহীয়সীঃ পাঠকদের জন্য কিছু বলুন।

-লেখকঃ পাঠকদের উদ্দেশ্যে আমি শুধু এটুকুই বলবো, আমাদের ভাষা অনেক সাধনার ফল। রক্তের বিনিময়ে যে ভাষা উপহার স্বরুপ আমরা পেয়েছি সে ভাষাকে আমরা যেনো অবমাননা না করি। বড় বড় নামকরা লেখকের বই পড়তে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কিন্তু তাঁদের পাশাপাশি নতুন লেখকদের বই পড়ার অভ্যাসও করতে হবে । নতুন লেখকদের উৎসাহিত করতে হবে । পাঠকের একটু অনুপ্রেরনা লেখকদের যে কত দূর এগিয়ে নিয়ে যায় সেটা কেবল যারা লিখেন তাঁরাই বলতে পারবেন। পাঠকের আন্তরিকতায় লেখকের সাহিত্যের চলার পথ যেনো সর্বদা মসৃন থাকে সেই কামনা করি।
আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন, আমি যেনো আমৃত্যু বাংলা সাহিত্য জগতে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারি।

১১।মহীয়সীঃ মহীয়সী আড্ডার পক্ষ থেকে আপনার জন্য শুভ কামনা এবং ধন্যবাদ ।

লেখকঃ আপনাদের ও অনেক ধন্যবাদ আমাকে মতামত প্রকাশের এমন সুন্দর সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্য ।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী