উপন্যাসঃ মারিজুয়ানা পর্ব ১১- নুরুন নাহার লিলিয়ান

উপন্যাসঃ মারিজুয়ানা পর্ব ১১
নুরুন নাহার লিলিয়ান

গুঞ্জন প্রবাহিত নদী কিংবা সমুদ্রের পানি প্রচণ্ড ভয় পায় ।খুব ছোট বেলা থেকেই তাঁর পানির প্রতি একটা একান্ত আতংক আছে। কেমন করে যেন গুঞ্জন পুকরের পানিতে দুই বার ডুবে গিয়েছিল । দুই বারই তাকে অর্ধ জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় । সেই থেকেই তার ভেতরে কিছু মানসিক পরিবর্তন দেখা যায় । ঘুমের মধ্যে কান্না করে উঠত । কোন উচু স্থানে যেতো না ।নদী কিংবা সমুদ্রের কাছে যেতে ভয় পেতো । বাইরের পৃথিবীর সাথে তার যেন অনেক দূরত্ব । চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই রোগটাকে বলে একুয়াফোবিয়া । জল বা জল জাতীয় যেকোন কিছুতে আতঙ্কিত হয়ে উঠে ।জলের কাছেই গুঞ্জনের জীবনের যতো ভয় ।কিন্তু ভয় কে তো জয় করতে হবে । সব মানুষকেই প্রকৃতির খুব কাছে গিয়ে কান পেতে হৃদয় ছুঁয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় । সময়ের সাথে সাথে মানুষ অনেক কিছুই জয় করে নেয় । কিন্তু একটা অজানা ব্যাখ্যাহীন অনুভূতি তো থেকেই যায় ।

তাই গুঞ্জন নিজের মতো করেই থাকতে ভালোবাসে । খুব সুন্দর অনাবিল নদীর ঢেউয়ের নাচনে তাল মিলিয়ে নৌকা সামনে ছুটে চলছিল । ভোরের স্নিগ্ধ আলো একটু একটু করে সূর্যের আড়াল থেকে নদীতে নেমে আসছে । নদীর পানিতে ধীরে ধীরে সূর্যের চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ।কিছুক্ষন পর পর ঢেউ খেলা করে যায় পানিতে লুকানো সূর্যের সাথে । সেখানে মারিজুয়ানা যেন হঠাৎ উচ্ছল হয়ে উঠে ।সে বাম দিকে বসে পা পানিতে ভেজাতে লাগল । গুঞ্জন অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে মারিজুয়ানার সেই ম্লান ভাবটা নেই । পশুর নদীর পানির ঢেউ তাকে অনেকটা ছন্দময় করে তুলেছে । মারিজুয়ানার পায়ে রূপার নূপুর । পানির ভেতরে ও সূর্যের আলোতে ঝিলিক দিয়ে উঠছে কিছুক্ষন পর পর । গুঞ্জন জিজ্ঞেস করে ,” আচ্ছা আপনার ভয় করছে না ?”
মারিজুয়ানা হাসতে হাসতে উত্তর ,” মুই পানির দ্যাশের মাইয়া ।ডরামু ক্যান ?আরে আপনে পা ভেজান দেহি !”
গুঞ্জন একটু ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে ,” ঠিক আছে । আপনি আনন্দ করুন । ”
নাতালির হয়তো ঘুম পাচ্ছে । বার বার ঢুলু ঢুলু চোখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে ।হাই তুলতে তুলতে কিছুক্ষন পর পর ঘুমিয়ে পড়ছে । যখন নৌকায় ঢেউয়ের ধাক্কা লাগে তখনই লাফ দিয়ে জেগে উঠে । এদিকে নেশাম আর শফিক সাহেব নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে । যেন সূর্যের পাঠানো রোদের কোলে শুয়ে হীম হীম বাতাসের ভেলায় ভেসে যাচ্ছে স্বপ্নের দেশে । ওই দুজনের দিকে তাকালে মায়া লাগে । কি সুন্দর প্রশান্তির ঘুম!

কিছুক্ষন পর পর নৌকা দোল খেয়ে উঠে । আর গুঞ্জন চিৎকার করে উঠে । আর সবাই ঘুম থেকে জেগে যায় । এবার ও তাই হল । নেশাম চোখ খুলে দেখে চারিদিকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ক্রমশ জেগে উঠছে । চোখের সামনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে নয়নাভিরাম সুবিশাল বনভূমি সুন্দরবন।মংলা বন্দর থেকে ১৪ কিঃমিঃ দূরে হাড়বাড়িয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র । খুব কাছেই চলে এসেছে সবাই । অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই সবাই নামবে ।
নৌকা প্রথমে হাড়বাড়িয়া ইকোট্যুরিজমের কেন্দ্রের কাছে থামে । এখানে প্রবেশের অনুমতি নিতে হয় ।
ডঃ নেশাম প্রথমে নেমে গেল । তারপর গুঞ্জনকে হাত ধরে নামাল ।কারও সাহায্য ছাড়াই মারিজুয়ানা লাফ দিয়ে নিচে নেমে গেল । নেমেই প্রানখোলা হাসি দিল । গুঞ্জন একটু বিস্মিত হয়ে মারিজুয়ানার দিকে তাকালো । পানির সাথে মারিজুয়ানার কি সুন্দর বন্ধুত্ব! পুরোটা পথ সে পানির সাথে খেলতে খেলতে এসেছে । কিন্তু গুঞ্জন পানি ভয় পায় । একটা মানুষের মধ্যে কতো বিস্ময় লুকানো থাকে । খুব ছোট ছোট বিষয়ে মানুষের ব্যর্থতা থাকে । আর এই ব্যর্থতাটুকু কখন ও অনেক বড় দুঃখ ও দেয় । মানুষ সে দুঃখ গুলো গভীর করে আগলে রাখতে ও ভালোবাসে ।
শফিক সাহেব নাতালিকে হাত ধরে খুব যত্ন করে নামাল ।
নৌকা থেকে নেমেই নাতালি অভিভূত হয়ে বলল ,”ওয়াও!দিস ইজ সুন্দরবন! রিয়েলি বিউটিফুল ! ”
শফিক সাহেব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল ,” ইয়েস! দিস ইজ বিউটিফুল বাংলাদেশ !
দীর্ঘ নৌকা যাত্রায় ক্লান্ত হলেও এখন সবাই আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠেছে । সবার প্রান চাঞ্চল্যতা ফিরে এসেছে ।
নাতালি খুব কৌতূহলী হয়ে বাংলায় জিজ্ঞেস করল ,” আচ্ছার এই ফরেস্টের নাম সুন্দরবন কেন ?”
মাঝি কাশেম পেছন থেকে উত্তর দিল ,” বাকেরগঞ্জের ইতিহাসের কাহিনী আছে যে সুন্দা নদীর নাম থাইক্কা পয়লা সুন্দারবন পরে তা সুন্দরবন ।”
নাতালি পেছনে তাকিয়ে হেসে দিল । তারপর বলল ,” আপনি ভাল ইতিহাস জানেন।”
কাশেম মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল ,” এই বনের নাম লইয়া অনেক কাহিনী আছে । স্যারেরা ভাল কইতে পারব ।”
ডঃ নেশাম আর শফিক সাহেব একটু সামনের দিকে ছিল । কিছুটা হাটার পর সবাই একটু থামল ।
তারপর ডঃ নেশাম বলল ,” আসলে এই বনের প্রধান বৃক্ষ হল সুন্দরী । আর ধারনা করা হয় সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবনের নামকরন হয় । তবে এটা ও প্রচলিত আছে সমুদ্রের নিকটে হওয়াতে প্রথমে “সমুন্দর ” শব্দ হতে প্রথমে ” সুমন্দরবন ” হয় । এরপরে তা “সুন্দরবন” নামের উৎপত্তি হয় ।

কাছেই একটা সাইন বোর্ডে লেখা ” বাঘ হতে সাবধান” তারপাশেই ছোট দীঘি । থরে থরে শাপলা ফুল ফুটে আছে । এর সাথেই পর্যটকদের জন্য বসার জায়গা আছে ।
গুঞ্জন হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে গাছের নিচে পাকা চেয়ারে বসল । তারপর বলল ,” সুন্দরি গাছ আর বাঘদের দেশে এলাম। তাদের কাউকেই দেখছি না । ”
মারিজুয়ানা হঠাৎ ,” ওই যে ওখানে বাঘ দেখা যাচ্ছে । বলেই হাসতে লাগল । ”
নাতালি ও হেসে দিল । বাঘ দেখা না গেলেও অনেক অনেক বানরের ছুটাছুটি দেখা গেল । এর মধ্যে দুই একটা হরিণ ও মাঝে মাঝে পাতার ফাঁকে তাদের কান ঝাড়া দিল । নাতালি, গুঞ্জন আর মারিজুয়ানা ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠল । এই সময় দুজন বন কর্মকর্তা রাইফেল সহ এগিয়ে এল । সবার সম্পর্কে জানতে চাইল । তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে জানাল ,” বাঘ নিয়ে ভয় পাবার কিছু নেই । দুই এক সময় ওরা বের হয় । এখন এই সময়ে আসবে না । তবে সাপ হতে সাবধান । ”
শফিক সাহেব জিজ্ঞেস করল ,” দীঘিতে সাপ আছে নাকি? ”
বনকর্মকর্তা জানাল ,” জঙ্গলেই অনেক ধরনের বিষাক্ত সাপ আছে । আপনারা কি জজ্ঞলের ভেতরে যেতে আগ্রহী ?”
ডঃ নেশাম বলল,” আপনি আমাদের সাথে গেলে ভাল হয় । ”
সামনেই বনের দিকে অনেক লম্বা একটা কাঠের তৈরি সেতু নান্দনিক ভাবে সুন্দরবন কে আর ও সুন্দর করেছে। পর্যটকদের জন্য এই সেতু খুব গুরুত্বপূর্ণ । রাইফেলসহ বন কর্মকর্তা দুজন সবার সাথে এগিয়ে যেতে লাগল । এই গভীরে অরন্যে বসবাসের নানা অভিজ্ঞতা ও শেয়ার করল । সেতুর নিচে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে জায়গায় জায়গায় । সেই সাথে ম্যানগ্রোভ সহ নানা প্রজাতির গাছ । অনেকটা পথ কাঠের সেতুতে হাটতে হল । শফিক সাহেব কয়েকবার নাতালির ছবি তুলে দিল । একবার ও মারিজুয়ানাকে কিছু বলল না । কিন্তু অনেকবার মারিজুয়ানা চাইল এমন সুন্দর জায়গায় শফিকের সাথে একটা সুন্দর স্মৃতি রাখতে । শফিক বার বার মারিজুয়ানার অনুরোধ ফিরিয়ে দিল । গা ছম ছম করা নিস্তব্ধ গভীর অরন্য পথ হাটতে হাটতে সবার ক্ষুধা লেগে গেল । এপ্রিল -মে মাসে সুন্দর বনের তাপমাত্রা বেশি থাকে । গরমে সবাই ঘেমে গেল । কাঠের সেতুর শেষে একটা বন পর্যবেক্ষণ টাউয়ার আছে । কিছুটা ভাঙ্গা আর পুরনো মনেহল । বনের ভেতর থেকে বের হয়ে গুঞ্জন টিউবওয়েলের পানিতে মুখ চোখ ভেজাল ।বাকিরা ছোট ছোট পেয়ারা গাছের পেয়ারা ছিঁড়ে খেতে লাগল ।

এমন সময় আচমকা মাঝি কাশেম সহ একজন বন কর্মকর্তা তাদের বাংলোর বারান্দায় ডেকে পাঠাল শফিক সাহেব কে । মাঝি কাশেমের চেহারায় দুষ্ট হাসি । এইদিকে সবাই কিছুটা হকচকিত হয়ে গেল । কারনটা হল নাতালি একজন বিদেশী । শফিকের সাথে নাতালির সম্পর্কটা কি । তাছাড়া বিদেশীদের জন্য প্রবেশ মূল্য আলাদা ।
শফিক সাহেব কে একজন কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করল ,” আপনার কেমন মেয়ে ?”
শফিক সরাসরি তাকে উত্তর না দিয়ে নাতালিকে বলল ,” উনারা জিজ্ঞেস করেছে তুমি আমার কি হও?”
নাতালি লাজুক হাসি দিয়ে বলল ,” আমার বাবা হয় । আমার মা জাপানি ।কিন্তু ওই যে উনি বাবার বাংলাদেশী স্ত্রী । ”
নাতালির সরল স্বীকারোক্তিতে সবাই সহজ হয়ে গেল । শফিক এবার জানাল যে নাতালি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিখছে । নিয়মিতই বাংলাদেশে আসে ।
তারপর একজন কর্মকর্তা বলল ,” যাইহোক আপনাদের সাথে একজন বিদেশি আছে সেটা জানানো দরকার ছিল । দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক বিবেচনায় আমাদের সচেতন থাকতে হয় । ”
বন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে নাতালি কিছুটা ভয় পেয়ে গেল ।

চলবে …।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী