উপন্যাস “মারিজুয়ানা” পর্ব ১২- নুরুন নাহার লিলিয়ান

উপন্যাস “মারিজুয়ানা” পর্ব ১২
নুরুন নাহার লিলিয়ান
শফিক তাঁর জটিল জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে ম্লান একটা হাসি দিয়ে সহজ করার চেষ্টা করল । বিষয়টা কিছুইনা কিংবা তেমন কিছু ঘটেনি এমন ভাব নিয়ে বন কর্মকর্তাদের বাংলোর বারান্দা থেকে নেমে এলো । নাতালি কে বলল ,” এটা কিছু না । ওরা প্রবেশ মূল্য বেশি নিতেই এমনি জিজ্ঞেস করল । ”
ডঃ নেশাম কাছে এসে জিজ্ঞেস করল ,” কি হয়েছে ? ওরা কি জিজ্ঞেস করল ?”
শফিক সাহেব ভাবান্তর না করে সাধারন ভাবেই উত্তর দিল ,” ফরেনার দেখেছে ! কিছু পয়সা বেশি নেওয়ার ধান্দা করেছিল ।আরে ওই মাঝি গিয়ে কান ভারী করেছে যে আমরা সাথে ফরেনার নিয়ে আসছি । প্রবেশ মূল্য বেশি চায় ”
ডঃ নেশাম ,”এখন আপনি কি বেশি দিয়েছেন ?”
শফিক বলল ,” আরে না । উনাদের জানালাম ও তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিখছে । নিয়মিত বাংলাদেশে থাকছে। কেন বেশি প্রবেশ মূল্য হবে ?”
নেশাম আবার জিজ্ঞেস করল ,” ঝামেলা মিটেছে এখন?”
শফিক বলল ,” হুম । এই তো টুকটাক জিজ্ঞেস করল । তেমন কিছু না । চলুন আমাদের ফিরতে হবে । ”
নেশাম বলল ,” আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে ।একটু একটু ক্ষুধা লাগছে ।”
শফিক সাহেব বলল ,” চলুন । দেখা যাক কি করা যায় ।”

এইদিকে মারিজুয়ানা বাংলোর কাছের এক গাছ থেকে পেয়েরা খেতে খেতে কয়েকটা পেয়ারা ব্যাগে চুপচাপ ঢুকিয়ে নিল । ব্যাপারটা গুঞ্জন দেখল এবং মুচকি হাসি দিল ।মারিজুয়ানা একটু লজ্জা পেল ।
গুঞ্জনের দিকে এগিয়ে এসে কানে কানে বলল ,” এতো ক্ষুধা লেগেছে না! কিছু মনে করবেন না ।”
গুঞ্জন উত্তর দিল ,” আরে না । আমার ও ক্ষুধা লেগেছে । দুপুর হয়ে আসছে ।”
নেশাম কাছে এসে বলল ,” আমরা এখনই রওয়ানা করব । ফ্রেস হতে চাইলে যেতে পারো । পাশেই লেডিস ফ্রেশ রুম আছে । ”
নাতালি এবং গুঞ্জন গেল ফ্রেশ হতে । ফ্রেশ রুমের সাথে একটা টিউবওয়েল আছে । টিউবওয়েলের পানিতে চোখে মুখে পানি দিল ।
অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই সবাই হাড়বাড়িয়া ইকোট্যুরিজম পর্যটন কেন্দ্র ত্যাগ করল ।মাঝি কাশেমের চেহারায় মিচকা শয়তানির হাসি । সবাই ধিরে ধিরে নৌকায় উঠল । এবার করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে যাওয়ার পালা ।এপ্রিলের মধ্য দুপুরে মাথার উপরে আকাশটা বেশ তীব্র । প্রচণ্ড তাপমত্রার ভেতরেও একটা সুন্দর শীতল বাতাস বইছে ।রৌদ্রের তাপে পুড়ে বাতাস আর ঢেউয়ের অনাবিল আনন্দ দেখতে দেখতে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছিল । কিছু দূর এগিয়ে যেতেই দেখা গেল অনেক ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় করে মাঝিরা গলদা চিংড়ি ধরছে ।
ডঃ নেশাম বলল , ” মাঝিদের কাছ থেকে কিছু গলদা চিংড়ি নিয়ে নেই ।”
গুঞ্জন বলল ,” ওরা কি বিক্রি করবে ?”
মাঝি কাশেম বলল ,” স্যার কিন্না নেন । ডাক দিমু নাকি ?”
নেশাম বলল ,” ডাক দাও । আর কিছু এখন রান্না করতে পারবে ?”
মাঝি কাশেম লাজুক হাসি দিয়ে বলে,” আশাকরি আমার রান্না আপনাগো ভাল লাগবো ।”
দৃশ্যটা খুব সুন্দর । কিছুদূর যেতেই অনেক ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা কাগজের নৌকার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে । আর গলদা চিংড়ি ধরছে ।ঢেউয়ের গতি বেশ ছন্দময় । সবার ভেতরেই মাছ ধরার আনন্দ । কিছুক্ষনের মধ্যেই অনেক গুলো গলদা চিংড়ি সহ হাড়ি আর ঝুড়ি বড় নৌকায় তুলে আনা হল । কিছু চিংড়ি বেশ জীবন্ত । নাতালি , গুঞ্জন আর মারিজুয়ানা সবাই মিলে চিংড়ি নিয়ে ছবি তোলা শুরু করল । যে গলদা চিংড়ির খবর পত্রিকায় পাওয়া যায় তা নিজের চোখে দেখা সত্যি ভীষণ আনন্দের ।খুব কাছ থেকে গলদা চিংড়ি হাতে ধরে দেখার অন্যরকম সুখ । নৌকার মাঝি কাশেম চিংড়ি নিয়ে রান্নার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল ।
এইদিকে শফিক এবং ডঃ নেশাম নৌকার নিয়ন্ত্রন হাতে নিল । মনে হল স্রোতের টান বেশ ভাল হওয়ায় নৌকা বেশ দ্রুত চলছিল । দূর থেকে নৌবাহিনীর বড় বড় জাহাজ গুলো যখন যায় তখন ভাঁজে ভাঁজে স্রোত গুলো এসে হালকা দোল দিয়ে যায় ।দোল খেয়ে টালমাটাল হয়ে গুঞ্জন চিৎকার দেয় ।আর অন্যদিকে ভিন্ন শিহরণে নাতালি এবং মারিজুয়ানা দুজনে খিল খিল করে হেসে উঠে ।
শফিক খুব আগ্রহ নিয়ে মাঝিকে জিজ্ঞেস করল ,”কেমন মাছ বিক্রি হয়?”
মাঝি কাশেম বেশ ফুরফুরে কন্ঠে বলল ,” স্যার দিনে কয়েক হাজার ট্যাকার তো বিক্রি বাট্টা হয়ই ”
শফিক আর ও একটু প্রফেশনাল আগ্রহ দেখিয়ে বলল ,” মাসে কেমন হয় ?”
কাশেম উত্তর দিল ,” স্যার এইডা কাস্টমারের উপ্রে যায় ।তয় পঞ্চাশ ষাইট হাজারের নিচে যায়না । ”
নেশাম বলল ,” ভাল তো । তাহলে তো চিংড়ি বিজনেস বেশ রমরমা । ”
মাঝি কাশেম এবার সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল ,” না স্যার । এইডা সিজনাল ব্যবসা । ঝড় বাদলের দিনে জানের ও রিস্ক থাহে । ”
শফিক বলল ,” হুম । অনেকে সুন্দর বনের খুব ভেতরে যায়না । ঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাস এলে অনেকে ফিরতে পারে না ।সিজনালি যা ইনকাম করতে পারে । ”
কথা বলতে বলতে নৌকা করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন ও ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রের কাছে এসে ভিড়ে । এই কেন্দ্রটি মংলা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ।এখানে অনেক দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিড় দেখা গেল ।দলে দলে যেমন মানুষ আসছে তেমনি অনেকে সুন্দরবন দেখার পর আনন্দের সাথে ফিরে যাচ্ছে ।মাঝি পাড়েই একটা মোটা গাছের সাথে নৌকা বাঁধলো ।
তারপর বলল ,” স্যার আপনেরা ঘুইরা আইতে আইতে রান্ধন হইয়া যাইবো ।”
নেশাম বলল ,” ঠিক আছে তুমি তাহলে থাকো । কোন অসুবিধা হলে জানিও । ”
সবাই ধীরে ধীরে নৌকা থেকে ডাঙ্গায় নামল । এই দিকে শফিক একটু ফিসফিস করে নাতালি কে বলল ,” এখানে যতক্ষণ থাকবে বাংলায় কথা বলো । কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে তুমি বাংলাদেশি ।”
নাতালি লাজুক হাসি দিয়ে উত্তর দিল ,” ঠিক আছে পাপা । ”
সবাই করমজল ইকোট্যুরিজমের ভেতরের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল । ঢুকতেই দলে দলে বানর দেখা গেল । বেশ কিছু ছোট বানরের দল কারও হাতে খাবার দেখলেই তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে । বিষয়টা অনেক বিপদজনক । অথচ সেখানে তেমন কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই । যদি কোন পশু যেকোন ভাবেই পর্যটকদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে কিংবা বিপদজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সাথে সাথে নিরাপত্তাকর্মীর সাহায্য পাওয়া কঠিন ।
সবাই প্রজনন কেন্দ্রের বেশ কয়েকটা জায়গায় হরিণ , ভাল্লুক আর বাঘ দেখার পর কুমির দেখতে গেল ।অনেকক্ষন অপেক্ষার পর তিন চারটা কুমিরের দেখা পাওয়া গেল ।
হঠাৎ করেই কুমিরের খামারের কাছে এসে মারিজুয়ানা চুপ হয়ে গেল ।খামারের একটা জায়গায় কিছুটা উদাস হয়ে বসে রইল ।
জলে কুমির ,মধ্য দুপুরের কাঠফাটা রোদ ,সমুদ্রে জাহাজের জলকাটা ঢেউ দেখলে রাহাতের কথা খুব মনে পড়ে । রাহাতের সাথে সম্পর্কের দিন গুলোর স্মৃতি গুলো মারিজুয়ানা কে কুঁড়ে কুঁড়ে খায় । স্থান কাল সময় কোন কিছু মানে না । স্মৃতি গুলো হঠাৎ করে বাকরুদ্ধ করে দেয় । প্রথম
জীবনের সেই দুর্বিষহ সময়ের কষ্ট গুলো আর সে মনে করতে চায় না ।রাহাত ছিল মারিজুয়ানার জীবনে গোপন ভালোবাসার জলোচ্ছ্বাস । পাগলের মতো প্রচন্ড ভালোবাসতো আবার অনেক স্বেচ্ছাচারিতা ও করতো । রাহাতের জটিল ভালোবাসা গুলো মাঝে মাঝে ভীষণ দুর্বোধ্য ছিল ।মারিজুয়ানা ওর ভালোবাসাটা ঠিক বুঝতে পারতো না ।
একদিকে ওর সীমাহীন ভালোবাসা যেমন ভালোলাগায় সিক্ত করতো । ঠিক তেমনি মাঝে মাঝে ওর মনের অর্থহীন অবহেলা কে মারিজুয়ানা বুঝতো না ।
পৃথিবীতে স্বীকৃত খারাপ মানুষদের যেমন কিছু মহৎ দিক থাকে ।তেমনি অনেক জনপ্রিয় ভাল মানুষদের ও কিছু গোপন ভয়ঙ্কর খারাপ দিক থাকে ।
রাহাত ওর সব টুকু দিয়ে উজার করে মারিজুয়ানা কে ভালবাসলে ওর চরিত্রে স্বেচ্ছাচারিতা ছিল প্রকট । একদিন রাহাতের চাপে গোপনে তাঁরা দুই গ্রাম দূরে গিয়ে বিয়ে ও করে ফেলে । আর তারপর থেকে শুরু হয় নতুন অন্ধকার । ভালোবাসার আকাশে গভীর অমাবস্যা ।
রাহাতের বাবা মা মারিজুয়ানা কে মেনে নেয় না । কারন মারজানের বাবা এক সময় ডাকাত ছিল । গাজা আর কোকেনের ব্যবসা সহ চোরাকারবারি ও করতো । বেশ কয়েকবার জেল ও খাটে । একদিন তওবা করে ভাল মানুষ হওয়ার দিক্ষা নেয় মসজিদের মাওলানার কাছে । একদিন অনেক সময়ের পর সে নিজেই মাওলানার দায়িত্ব পায় ।
সবার জীবনেই নব অধ্যায়ের সূচনা হয় । কলংকিত অতীত যতোই লুকানো থাকুক । সময়ে বাতাস তাকে স্পষ্ট করে তুলে ।মারজানের বাবা মাওলানা হলেও তাঁর সময়ের অনেকেই তার কাহিনী জানে ।

রাহাতের বাবা মা একমাত্র সন্তান কে স্নেহে অন্ধ হয়ে কিছু না বললে ও মারজানের পরিবার কে কৌশলে ভয়ংকর সব নির্যাতনে রেখেছিল ।তাদের গোপন বিয়ের কথা জানাজানি হওয়ার আগে মারজান কে দূরে কোথাও পাঠানোর ব্যবস্থা করতে চাপ দেয় । নয়তো মারজানের বাবার মাওলানার চাকরি থাকবে না ।জীবননাশের হুমকি ও আছে ।মারজানের বড় বোনেরা আর মা বাবা মিলে গোপনে গাজীপুর বড় ভাইয়ের বাসায় পাঠিয়ে দিল ।
ভাই ভাবির সংসারে ও ছিল আরেক যন্ত্রণা । নাহ! এক সময়ে জাপান প্রবাসী ব্যবসায়ী শফিকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় । শফিকের কাছে এসে মারজান হয়ে যায় মারিজুয়ানা । এসব মনে হলে বুকটা হু হু করে উঠে । মাথার উপরে গগন ফাটা রোদ । এদিকে অতীত অভিজ্ঞতার কাল অধ্যায় ভেবে মারিজুয়ানার বুকের ভেতরটা ফেটে চৌচির হয় । চোখের পাতা উপচে বন্যা বয় ।
হঠাৎ শফিক এসে সবাইকে ডাকে ।কাশেম মাঝির গলদা চিংড়ি রান্না হয়ে গেছে । সবাইকে ফিরে যেতে হবে ।
চলবে …।।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী