উপন্যাস ” মারিজুয়ানা” পর্ব ১৩ – নুরুন নাহার লিলিয়ান

শফিকের ডাকে মারিজুয়ানার ভাবনায় ছেদ পড়ল । প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে । গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । রাহাত কে নিয়ে দুঃখের স্মৃতির পাখাদের গুটিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল ।চিৎকার করে কাঁদলেই পৃথিবী সব অশ্রুর স্রোত স্পর্শ করতে পারে না। কখনও গভীর নীরব অশ্রুতেও পৃথিবী মেঘাবৃত হয়। নিঃসঙ্গ হয় একান্ত অসহায় হৃদয়ে। রাহাত ও মারজানের একান্ত কষ্ট । রাহাতের ভালোবাসার বিষয়টা অন্য কেউ বুঝবে না । পৃথিবীর সবাই কি মারজানের অনুভূতি কি অনুভব করতে পারবে ! মস্তিস্কের ভেতরের কষ্টের স্রোতে বহমান অনুভূতির জলকাটা গুলো বুকে ভীষণ বিঁধে । নিস্তেজ করে দেয় মনের শক্তি । তাই ফেলে আসা কষ্টের অতীত স্মৃতি কে কিছুতেই মনে করতে চায়না ।

মারজান কিছুদূর হেটে সামনে এগিয়ে এসে দেখে পাশেই দেখল নাতালি মনোযোগ দিয়ে খাঁচায় বন্দি পশুদের দেখছে । আর নিজের মতো মোবাইলে পশুদের ছবি তুলছে ।
ধিরে ধিরে সবাই নৌকায় ফিরে এলো ।
মাঝি কাশেম শুরু থেকেই মারিজুয়ানা আর শফিকের দিকে খুব মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করছিল । মারিজুয়ানা মুখে শফিক কে আপনি সম্বোধন করলেও খুব কাছাকাছি থেকে তার প্রতি শফিকের মনোযোগের একটা গোপন চেষ্টা আছে । বিষয়টা লক্ষ্য করার মতো । প্রায়ই নৌকার মধ্যে শফিকের কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছিল । আবার এদিকে নাতালি শফিক কে পাপা বলে সম্বোধন করছে । এই বিষয়টায় অন্য সবার মতো কাশেমের কৌতূহলী চোখ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল ।সে হয়তো তার ভেতরের কৌতূহল কে দমাতে ও পারছিল না । সে প্রায়ই পলকহীন তাকিয়ে থাকে শফিক এবং মারিজুয়ানার দিকে ।

নৌকায় বিশুদ্ধ পানির ভীষণ অভাব । তবে নেশাম করমজল ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে যাওয়ার আগে ঘাট থেকে কিছু কচি ডাব কিনে রেখেছিল নৌকায়।কাশেম মাঝি কিছু ডাব কেটে পানি সবাই কে দিল । মারিজুয়ানা গ্লাসে ডাবের পানি খেতে খেতে শফিকের গায়ে হেলান দিয়ে বসল । শফিকের কাঁধে মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস দিয়ে বলল ,” এতো পানির তৃষ্ণা লাগছিল!”
গুঞ্জন ও সাথে সাথে বলল ,” ডাবটার পানি মিষ্টি ।ভাল লাগল । আমার ও খুব পানির পিপাসা পেয়েছিল । ”
এর মধ্যে কাশেম মাঝি কৌতূহলী হাসি মুখে নিয়ে শফিক আর মারিজুয়ানার দিকে তাকালো । তারপর কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল ,” আইচ্ছা আপনাগো দুই জনের মধ্যে সম্পর্কডা কি ?”
মারজান ঘাড় ঘুরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দেয়,” হ্যায় আমার স্বামী লাগে। ক্যান কি অইছে। ”
মাঝি কাশেম একটু সংকুচিত হয়ে নাতালির দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল ,” না । হ্যায় তো আপনের স্বামীরে বাপ ডাকাতাছে । হের লেইগা মনে প্রশ্ন আইলো ।”
শফিক মনে হয় এই বিষয়টা এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছিল । মুচকি হাসি মুখে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল ।
এই দিকে গুঞ্জন মাঝি কে বলল ,” কেন ভাই আপনি কি নিজে বুঝেন না । এটা জিজ্ঞেস করে কেন অপ্রস্তুত করছেন । ”
মাঝি কাশেম মনে হয় একটু ভয় পেল ,” না মানে ! না মানে ! আফা কিচ্ছু মনে লইয়েন না ।আপনেরা খাইয়া লন ”
কথাটা বলেই মাঝি প্লাস্টিকের প্লেটে সবার জন্ ঝাল মশলায় সাজানো গলদা চিংড়ি ভুনা আর মোটা ভাত এগিয়ে দিল । বেলা অনেকটা গড়িয়ে সূর্য মাথার উপরে কেমন রৌদ্রের আভিজাত্য দেখাচ্ছিল । আর সুন্দরবনের ভেতরে নৌকার যাত্রীরা যথেষ্ট খাদ্যাভাবে ক্ষুধায় অস্থির হয়ে উঠছিল । মাঝি কাশেমের গলদা চিংড়ি ভুনা আসলেই অসাধারন হয়েছে । যেকোন রান্না প্রতিযোগিতায় মাঝি কাশেম কে নিলে সে কোন একটা পুরুস্কার পাবেই । এদিকে গলদা চিংড়ি ভাত খেয়ে মাঝি কাশেমের উপর মারজানের রাগ ও অনেকটা বিনয়ের সাথে নিচে নেমে এলো ।

মারজান মনে মনে ভাবল হয়তো এটাই স্বাভাবিক । মানুষের চোখ ,মুখ আর কৌতূহল কি আর বন্ধ করে রাখা যাবে ? তাছাড়া শফিক কোন জায়গায় গেলে মারজানের সাথে তার সম্পর্কটা রহস্যময় করে রাখে । কোথাও কোথাও স্ত্রী হিসেবে তাকে সমাজের সাথে পরিচয় ও করিয়ে দেয় না । যেখানে কবুল পড়া স্বামীই নিছক প্রতারনা করে যায় । সেখানে অন্য মানুষকে দোষারোপ করে লাভ নেই । ভাত খাওয়া শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস দিল ।

বাকিদের দেখে বুঝা গেল যে সবার চিংড়ি ঝাল লেগেছে এবং খেয়ে মজা ও পেয়েছে । এইদিকে হঠাৎ করে শফিকের একটা মোবাইল কল এলো । প্রোজেক্টের এক স্টাফ টনি বাগেরহাটে ফিল্ড দেখতে গিয়ে মোবাইল এক রেস্তোরাঁয় ফেলে এসেছে । এখন সেই রেস্তোরাঁর লোকেরাই লাস্ট কল লিস্ট ধরে শফিক কে কল দিয়েছে ।তারা মোবাইল ফেরত দেওয়ার জন্য প্রকৃত মালিক কে খুঁজছে । বিষয়টা নিয়ে সবাই হাসাহাসি শুরু করল।আজকাল কেউ মোবাইল হারিয়ে গেলে ফেরত পাওয়ার আশা করে না । তারমধ্যে অচেনা জায়গায় অচেনা কেউ এমন করে হারানো মোবাইল পেয়ে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করে তা সাধারন ভাবে দেখা যায় না ।পৃথিবী যখন অনাস্থা আর অবিশ্বাসের অন্ধকারে ডুবতে থাকে তখন দুই একটা সততার ঘটনা পৃথিবীকে নতুন করে আলোকিত করে । মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের জায়গাটা বিস্তৃত করে ।

কিন্তু এদিকে টনি কে অন্য মোবাইলে ও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না । টনির বাবাকে শফিক মোবাইল করল ।তিনিও টনিকে মোবাইল করে খুঁজে পাচ্ছেন না । বেশ অনেকটা সময় ধরে শফিক মোবাইলে টনিকে খোঁজার চেষ্টা করল ।কোন সাড়া পাওয়া গেল না । টনির সাথে দেখা হওয়ার কথা খুলনায় ।সেখানে সে হোটেল এম্বাসেডরে সে অপেক্ষা করবে । কোথায় গেল ! এর মধ্যে সে তেমন কোন যোগাযোগ করেনি । শফিক পুরো পরিস্থিতে ভীষণ রকম বিরক্ত হল । কারন সবাইকে মংলা পশুর হোটেলে ফিরে সব কিছু গুছিয়ে খুলনা যেতে হবে । টনির সাথে যোগাযোগ হওয়াটা খুব জরুরী ।ওদিকে হারানো মোবাইল নিয়ে টনিকে ফেরত দিতে অপেক্ষা করছে । সবাইকে অনেকটা সময় ধরে টনির মোবাইলের জন্য অপেক্ষা করতে হল । তারপর হঠাৎ করে টনির মোবাইল ফোন আসে । এর মধ্যে সে হারানো মোবাইল ও ফিরে পেয়েছে ।সেটা জানানোর জন্যই সে শফিক কে ফোন করেছে ।
শফিক যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল ।শফিক ভীষণ রেগে গিয়েছি্ল টনির উপর । তাকে ফিল্ড থেকে খুলনায় অপেক্ষা করতে বলা হল ।
নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা আর সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই সবাই মংলা বন্দরে ফিরে এল । মংলার পশুর হোটেলে ফিরে খুব অল্প সময় থেকেই আবার তাদের গাড়িতে উঠতে হল ।
কারন সবাইকে খুলনা ফিরতে হবে । সেখানে এক রাত থেকে পরের দিন সাতক্ষীরা ,বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ আর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজার দেখতে যাবে ।

বিকেলের মধ্যেই সবাই খুলনার হোটেল এম্বাসেডরে পৌঁছে গেল ।
ড্রাইভার সিদ্দিক আর টনির হোটেলের দোতলায় এক রুমের ব্যবস্থা করা হল এক সাথে থাকার জন্য । অন্যদিকে পঞ্চম তলায় তিনটি রুম পাশাপাশি পাওয়া গিয়েছে ।শফিক তিনটি রুম ঘুরে ঘুরে নাতালিকে দেখাল । নাতালি সবচেয়ে সুন্দর আর সুবিধাজনক রুমটি পছন্দ করার পর বাকি দুটি অন্যদের জন্য বরাদ্দ হল । শফিক মারিজুয়ানার জন্য একটি রুম এবং অন্যটি ডঃ নেশাম গুঞ্জনের জন্য । নাতালির রুমের সাথে বারান্দা নেই কিন্তু এসির সুবিধা আছে । অন্য রুম গুলোতে এসির সমস্যা থাকায় নাতালি এই রুমটা পছন্দ করল ।
ছিমছাম সুন্দর বিভাগ খুলনা । হোটেল এম্বাসেডরের পাশেই রূপসা নদীর বয়ে চলা । রুমে ফিরে গুঞ্জন ফ্রেস হয়ে এসে রুমের সাথের বারান্দায় গিয়ে বসল । খুব সুন্দর করে সাজানো গাছ গাছালি দিয়ে । চা খাওয়া বা কিছুটা সুন্দর সময় কাটানোর জন্য চেয়ার টেবিল ও আছে । সেখান থেকে খুলনা শহরের জীবন যাপন আর রূপসা নদীর সৌন্দর্য সত্যি মনে স্নিগ্ধতা স্পর্শ করে যায় । কিছু সময় পর টনি কে দেখা গেল । তাকে দিয়ে সুন্দরবন থেকে আনা গলদা চিংড়ি হোটেলের ফ্রিজে রাখার ব্যবস্থা করা হল । নেশাম ও কিছুক্ষন পর গুঞ্জনের সাথে বারান্দায় গিয়ে খুলনা শহরটা দেখতে লাগল । এর মধ্যে হোটেল থেকে চা দিয়ে গেল । নেশাম আর গুঞ্জন রূপসা নদীর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চায়ের কাপে মুখ দিল । আর কিছুক্ষন পরই সন্ধ্যা নামবে আঁধার হয়ে আসবে পৃথিবী । কি এক অপূর্ব নৈসর্গিকতা !
নেশাম বলল ,” এসিতে সমস্যা থাকলে ও সিলিং ফ্যান আছে । আর এক রাতের ব্যাপার ! বারান্দাটা বেশ । তাই না ?”
গুঞ্জন চায়ের কাপ টেবিলে রেখে বলল ,” হুম । ভাল হয়েছে ।বারান্দাটা খুলনা শহরটাকে দেখাচ্ছে । রুমে এসি ঠিক থাকলে এই রুমটার সৌন্দর্য হারাতে হতো । ”
কথাটা বলেই হেসে দিল ।
নেশাম হাসি হাসি মুখে বলল ,” হুম । মন্দের ভাল ।”
গুঞ্জন বলল ,” যাই বল নাতালি মেয়েটাকে একটু স্বার্থপর মনেহল । সে পছন্দ করার পর আমাদের রুম নিতে হল । অদ্ভুত তো !”
নেশাম বলল ,” বাদ দাও । ভিন্ন সংস্কৃতির আর শীতের দেশের মেয়ে তো । তাই এসি ছাড়া থাকতে কষ্ট । আর শফিক সাহেব মেয়েটাকে কেয়ার করছে কারন সে যেন বাংলাদেশ থেকে কোন কষ্ট না নিয়ে যায় । ”
গুঞ্জন বলল ,” ঠিক আছে । ভাবিকে কি এখানে ডাকবো ?”
নেশাম বলল ,” একটু পর ডাকো । শফিক সাহেবের কোন এক বন্ধু হয়তো উনার সাথে দেখা করতে আসবে । আর সন্ধ্যার পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর আসবে আমার সাথে মিটিং করতে । রুমটা গুছিয়ে রেখো ।আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। ”
নেশাম বাইরে যাওয়ার পর গুঞ্জন একা গুন গুনিয়ে গান গাইতে গাইতে সন্ধ্যা উপভোগ করতে লাগল ।
চলবে …।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী