উপন্যাস ” মারিজুয়ানা ” পর্ব ১৪ – নুরুন নাহার লিলিয়ান

উপন্যাস ” মারিজুয়ানা ” পর্ব ১৪
লেখকঃ নুরুন নাহার লিলিয়ান
একাগ্র মনে গুঞ্জন সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ আকাশের খেলা দেখে ।এমন সব সন্ধ্যা এলে গুঞ্জন ভীষণ রকম একা হয়ে যায় । মনের ভেতরের কোন এক জায়গায় সূচিভেদ্য আঘাত অনুভব হয় । চিন চিন ব্যথা করে । গুঞ্জন বুঝতে পারে না ।খুঁজে পায় না কোথায় সেই ব্যথার জায়গাটা । নেশাম কে নিয়ে জীবনটা তো বেশ ভালই কেটে যাচ্ছে । একমুখী ট্রেনের মতো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে । কি হবে আর বিচ্ছিন্ন বায়বীয় দুঃখকে প্রশ্রয় দেওয়ার । কেন এমন সব সন্ধ্যারা গুঞ্জন কে আবার অতীতে ডেকে নিয়ে যায় ।কেন এমন করে সন্ধ্যার নিঃসঙ্গ মেঘের ভেলায় হৃদয় হারায় । গুঞ্জনের মতো এতো গভীর করে কেউ কি কখন ও এমন সব সন্ধ্যা দেখেছে ।নাহ ! বুকের এক কোনের জমানো কষ্ট গুলো কেমন করে এলোমেলো করে দেয় ।সহস্র দুঃখ দিয়ে সাজানো এক মুঠো সুখ স্মৃতি । থাক না হয় অভিমানী মনের অজানা কোনে । মনের অজান্তেই এমন সুন্দর করে মন খারাপ করা সন্ধ্যায় গুঞ্জন আগের মতো গলা ছেড়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে থাকে …

তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা,
মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগনবিহারী॥
মম হৃদয়রক্তরাগে তব চরণ দিয়েছি রাঙিয়া,
অয়ি সন্ধ্যাস্বপনবিহারী।
তব অধর এঁকেছি সুধাবিষে মিশে মম সুখদুখ ভাঙিয়া–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম বিজনজীবনবিহারী॥
মম মোহের স্বপন-অঞ্জন তব নয়নে দিয়েছি পরায়ে,
অয়ি মুগ্ধনয়নবিহারী
মম সঙ্গীত তব অঙ্গে অঙ্গে দিয়েছি জড়ায়ে জড়ায়ে–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম জীবনমরণবিহারী॥

হঠাৎ করেই রুমের কলিংবেল বেজে উঠে । গুঞ্জনের কল্পনায় অতীত দুঃখের আকাশে যখন সুখের সূর্যটা জেগে উঠেছে ঠিক তখনই কেউ এসে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটাল । মনেহয় নেশামই ফিরে এসেছে । নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে দরজা খুলে দিল । মিষ্টি হাসিতে বিরক্তি মুখে নিয়ে মারিজুয়ানা দরজার সামনে ।
গুঞ্জন আন্তরিকতা নিয়ে বলল,” আরে ভাবি ভেতরে আসুন।”
মারিজুয়ানা বলল “না । ভাইয়া কি ভেতরে ?
গুঞ্জন উত্তর দিল “ও একটু বাইরে গেল । খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর আসবে ।”
একটা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে মারিজুয়ানা বলল ,” আমাদের রুমে ও একজন গেস্ট আসছে। তাই ভাবলাম আপনার খোঁজ নেই । ”
গুঞ্জন উৎফুল্ল হয়ে মারিজুয়ানার হাত ধরে টেনে রুমে নিতে নিতে বলল ,” আরে রুমে আসেন তো । নেশাম আসতে দেরি হবে । এই দিকটায় গল্প করার মতো সুন্দর জায়গা আছে ।”
মারিজুয়ানা ও লাজুক হাসি মুখে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে বলল ,” আমাদের রুমের সাথে ও একটা বারান্দা আছে । কিন্তু সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো না ”
গুঞ্জন একটু থেমে জিজ্ঞেস করল ,” কেন ?আপনাদের বারান্দায় কোন সমস্যা ?”
মারিজুয়ানা চেয়ারে বসতে বসতে বলল ,” না । আপনাদের মতোই এক রকম । আপনার ভাই এই সব সৌন্দর্য উপভোগ বুঝে না । তার মধ্যে একজন উনার এক ফালতু বন্ধু আসছে ।”
গুঞ্জন কৌতূহল হয়ে জিজ্ঞেস করল ,” বাজে বন্ধু ? কে উনি ?”
মারিজুয়ানা মন খারাপ করে বলল ,” উনার নাম বাদল । বয়স্ক একটা বাজে লোক ।এক সময় নাকি রাজনৈতিক নেতা ছিল ।জাপান এম্বাসিতে ও নাকি চাকরি করতো। ”
গুঞ্জন আবার জিজ্ঞেস করল ,” এখানে আসছে কেন ? এখানে ভাইয়ার সাথে উনার কি কাজ ?”
মারিজুয়ানা বলল ,” উনি পূর্ব পরিচিত । খুলনাতেই উনার বাড়ি । এখানে ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত কাজে নাকি আসছে । তবে উনি নিয়মিতই আমার হাজবেন্ডের সাথে যোগাযোগ রাখে । ”
গুঞ্জন একটু দ্বিধান্বিত চোখে মারিজুয়ানার দিকে তাকাল । তারপর আবার জিজ্ঞেস করল ,” তাহলে সমস্যা কোথায় ?”
মারিজুয়ানা সহজ ভাবে শীতল কন্ঠে উত্তর দেয় ,” উনারা দুজনেই মাদকাসক্ত । আজ রাতে আমার রুমের বারান্দায় দুজনে মদ ,বিয়ার সহ যা যা খাওয়া যায় সব খাবে । ”
গুঞ্জনের চোখ কপালে উঠল ,” কি ? আপনার রুমে? আপনার সমস্যা হবে না ?”
মারিজুয়ানা ক্লান্ত চোখে গুঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল ,”ওই লোকটা আমার হাজবেন্ড কে খারাপ বানিয়ে ফেলছে । টাকা পয়সা থেকে সব কিছু চুষে নিচ্ছে । আমার কিছুই করার নেই ।”
একদম নতুন পরিচিত মানুষের মুখে এমন সব অধ্যায়ের গল্প গুঞ্জনের কাছে কেমন অদ্ভুত লাগছিল । ভাবতে পারছিলনা কি বলা উচিত । এতো অল্প বয়সী একটা মেয়ে । শ্যামা চেহারায় কি দীপ্তিময় আভা ।গুঞ্জন একটু সিরিয়াস হয়ে উঠে । খুব ভাল করে মারিজুয়ানার দিকে তাকায়।মারিজুয়ানার গায়ে সাদা শার্ট আর খয়েরি জিন্স । চুল গুলো এক পেশে করে বাধা । চোখ দুটোর নিচে নির্ঘুম রাতের কালচে দাগ ।ঠোঁট দুটো শুকিয়ে শুকনো পাতার মতো মচমচে হয়ে আছে । ম্লান চেহারায় শুধুই আতঙ্ক আর দু;শ্চিন্তা ।
গুঞ্জন কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে জিজ্ঞেস করে ,” আচ্ছা আপনি উনার স্ত্রী । আপনার নিরাপত্তার বিষয়টা উনি ভাববে না ?”
মারিজুয়ানা তাচ্ছিল্যের ম্লান হাসি দিয়ে বলল,” একজন মাতালের কাছে ন্যায় -অন্যায় ,সত্য-মিথ্যা সব এক । মাতালের সাথে ঘর করা যে কতো কঠিন! ”
গুঞ্জন জিজ্ঞেস করল ,” এমন লোককে বিয়ে করলেন কেন ?”
মারিজুয়ানা দীর্ঘশ্বাস দিয়ে বলল ,’ কপালের লিখন যদি সবাই আগে জানতো ! নিজের মতো করেই সব সাজিয়ে নিতো । সে অনেক বড় কাহিনি ।”
গুঞ্জন আন্তরিকতার সাথে বলল ,” আপনার সমস্যা না থাকলে শেয়ার করতে পারেন । ”
মারিজুয়ানা উত্তর দিল ,” না । কোন সমস্যা নেই ।তবে অনেক প্যাঁচের জীবন কাহিনি। ”
গুঞ্জন খুব মনোযোগ দিয়ে মারিজুয়ানার গল্প শোনার প্রস্তুতি নিল । এমন সময়ে নেশামের মোবাইল কল এল । খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর কে নিয়ে নেশাম রুমে ফিরছে । কিছু সময়ের জন্য সামনের বারান্দা কিংবা মারিজুয়ানার রুমে গিয়ে সময় কাটাতে বলল । গুঞ্জন জানিয়ে দিল কোন সমস্যা নেই । কারন সে এখনই মারিজুয়ানার সাথে তাঁর রুমে যাচ্ছে । তারপর রুমের টুকটাক বিষয় গুলো গুছিয়ে রেখে মারিজুয়ানার সাথে তাদের রুমে গেল ।
একদম গুঞ্জনদের রুমের মতোই ছিমছাম সুন্দর গুছানো রুম । সাথে রূপসা নদীর সৌন্দর্য দেখার জন্য ছোট বারান্দা আছে । কিন্তু বারান্দার একটা জায়গায় গিয়ে গুঞ্জনের চোখ আটকালো । অনেক গুলো বিয়ারের বোতল আর অর্ধেক খাওয়া সিগারেট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে । গুঞ্জনের কেমন ঝিম ধরা বিরক্তি এল মনে ।কেমন জানি অদ্ভুত লাগল । আসলে পৃথিবীতে সব মানুষের মনের গভীরে একটা ডাস্টবিন লুকানো থাকে । পরিস্থিতিতে কারওটা প্রকাশ পায় । আর কারওটা খুব সূক্ষ্মভাবে লুকানো থাকে ।
শফিক লোকটার মনের ভেতরের ডাস্টবিনটা এমনভাবে প্রকাশ পাবে গুঞ্জন ভাবতেই পারেনি । অথচ বাইরের ব্যবহারে লোকটা বেশ ভদ্র বিনয়ী আর সামাজিক ।মানুষকে কোনদিন বাইরের চেহারা দেখে কোনভাবেই বিচার করতে নেই । এই দুনিয়ায় মানুষ বুঝা দায় । মারিজুয়ানা বিছানা ঠিকঠাক করে বলল ,” ভাবি এখানে আরাম করে বসুন । ”
গুঞ্জন ঘাড় ঘুরিয়ে রুমের দিকে তাকালো । মারিজুয়ানাকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে । বিছানায় বসতে গিয়ে গুঞ্জন বলল ,” কোন সমস্যা নেই । আপনাকে অস্থির দেখাচ্ছে ।”
মারিজুয়ানা খুব শান্ত কণ্ঠে বলল ,” সব সময়ে এই বাদল লোকটা যখনই আসে আমাদের মাঝে তখনই ঝগড়া হয় ।”
গুঞ্জন জিজ্ঞেস করল ,” আপনি ভাইয়া কে কিছু বলেন না ?”
মারিজুয়ানা বলল ,” উনাকে অনেক বুঝাই । নেশা কেটে গেলে পা ধরে মাফ চাইতেও দ্বিধা করেনা । এই লোকটা এলে নেশা পেলে সব ভুলে যায় ।”
গুঞ্জন একটু আহত হল । একটু সময় নিয়ে বলল ,” তারপর আপনার বিয়ের গল্প বলেন । ”
মারিজুয়ানা বলতে শুরু করল ,” আসলে গ্রামের কোন এক দুর্ঘটনার কারনে আমাকে গাজিপুর ভাইয়ের বাসায় পাঠানো হয় । বিয়ে অথবা পড়াশুনা কিছু একটা করে জীবন চালাতে ।কিছুদিন যাওয়ার পর ভাবি আমার খরচের কথা ভেবে এই বিয়েটা ঠিক করে ”
গুঞ্জন আবার জিজ্ঞেস করে ,” আপনি বিয়ের আগে উনাকে দেখেননি?”
মারিজুয়ানা খুব স্বাভাবিকভাবে বলল ,” হুম ।দেখেছি । উনার বড় বোনের বাসায় আমার ভাই ভাবি ভাড়া থাকতো । ”
গুঞ্জন বলল ,”ওহ! সেখান থেকেই পরিচয় তাই না ?”
মারিজুয়ানা বলল ,” আমার সাথে কোন কথা হয়নি । ভাবিই সবকিছু ঠিক করেছে । এটা একটা পারিবারিক রাজনীতি ছিল । তখন উনি আমাকে জাপান নিয়ে যাবে এই কথা বলেই বিয়ে করেছে । ”
গুঞ্জন জিজ্ঞেস করল ,” আপনি জাপান যাওয়ার জন্য এই বয়স্ক লোকটাকে বিয়ে করলেন ?”
মারিজুয়ানার মুখটা ফ্যাঁকাশে হয়ে গেল । তারপর বলল ,” আমি তখন ভাই ভাবির কাছে একটা অতিরিক্ত বোঝার মতো ছিলাম । অনেক হতাশা আর কষ্টে ছিলাম । কোন কিছুতেই মাথা কাজ করতো না । ভাই ভাবিরা যা বলতো তাই করতাম ।”
গুঞ্জন জিজ্ঞেস করল ,” আপনার মতামতের কোন মূল্য ছিল না ?”
মারিজুয়ানা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল ,” না । আমার মতামতের কোন মূল্য ছিল না । আমার পটুয়াখালী মা বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার ও কোন উপায় ছিল না। ভীষণ রকম অসহায় ছিলাম ।”

চলবে …।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী