বাংলা হোক হৃদয় স্পন্দন

বাংলা হোক হৃদয় স্পন্দন
ইব্রাহীম খলিল

একদিনে বর্ষপূর্তি উদযাপন করে, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, নাচে-গানে মাতিয়ে, পান্তা-ইলিশ খেয়ে বাঙালি সেজে বাংলার জমিনে বছরের বাকীদিনগুলো ভিনদেশীয় ভাষার প্রয়োগে অতিবাহিত করার নাম বাঙালি নয়। আমরা বাঙালি, বিশ্ব দরবারে এ পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি সবসময়। এদেশে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে- “মাতৃ ভাষা বাংলা চাই” এই শ্লোগানে মূখরিত ছিল রমনার বটমূল সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো। তখন বাংলা ভাষার জোর দাবী জানিয়ে বায়ান্নের ১১ই ফেব্রুয়ারি জীবন বলি দিয়েছিল- রফিক, সফিক, বরকত সহ নাম না জানা অনেকেই। রক্তে রঙিন হয়েছিল বাংলার বুক। এরপর একাত্তুরে ৭ই মার্চে পল্টন ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্বালাময়ী ভাষণে জাগ্রত হওয়া বাঙালিদের, ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলার স্বাধীনতা।
কিন্তু এ কেমন স্বাধীনতা? যদি স্কুল, কলেজ সহ সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা মাস অনুযায়ী দিন-তারিখ ব্যবহার না করে ইংরেজি মাসের হিসাব করা হয়। ব্যাংক সহ সরকারী-বেসরকারি সংগঠনগুলোর যে কোন রিপোর্ট কেন বাংলা না হয়ে ইংরেজিতে তৈরি করা হয়। যদি বাঙালি বলেই আমরা নিজের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি, তবে বাংলার প্রতি এ কেমন বিচার আমাদের। এ কেমন ভালোবাসার প্রকাশ পায় বাংলার জমিনে।
পহেলা বৈশাখে দেখি বাঙালির মুখে ফোটে হাসি, মুখে মুখে শুনি বাংলা ভালোবাসি, অথচ বিনা যুদ্ধে ইংরেজির ব্যবহার হচ্ছে রাশিরাশি। এর কারণ কি? আজও ভেবে যাচ্ছি, যে মাতৃপ্রেমে রক্তে রঙিন হয়েছিল বাংলার সবুজ প্রান্তর, সেখানে কেমন করে ইংরেজি ভাষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। হতে পারে ইংরেজি ভাষা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা, তাই বলে আমরা কেন আমাদের মায়ের ভাষাকে অবহেলা করে তার স্থানে ইংরেজি ভাষার প্রয়োগ করবো। তাহলে কি আমরা মুখের বুলিকেই বাংলা ভক্তি বলে অন্তরে ইংরেজ প্রেম জাগিয়ে রাখবো। নাকি কণ্ঠবুলির পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও বাংলার ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, এই প্রশ্ন আজ বিবেকের কাছে রেখে গেলাম। যদি বিশ্ব দরবারে ইংরেজি রিপোর্ট দাড় করাতে হয়, তবে সময় মত বাংলার বিপরিতে যে কোন রিপোর্ট তৈরি করা যায়, যা ভিনদেশীদের বুঝানো সম্ভব। কিন্তু বাঙালি হয়ে বাংলা ভাষা যারা চোখ থাকতেও কিছুটা কম দেখে বা কম বুঝে তারা-তো ইংরেজি বুঝা সম্ভব নয়। তাই দেশ প্রধানের প্রতি আমার আর্জি, বিষয়টা একটু গভীর ভাবে ভেবে দেখবেন। বাংলা হোক আমাদের মাথার মুকুট, বাংলা হোক আমাদের হৃদয় স্পন্দন, বাংলার ব্যবহার হোক আমাদের সকল কর্ম ক্ষেত্রে। আমি বাংলা ভালোবাসি, তাই বাংলার ব্যাপক প্রসার হোক এটাই কামনা করি।

প্রকৃতির সাজে বাংলার শ্যামল প্রান্তর যতটা সুসজ্জিত, ঠিক তেমনি ভাবে বাংলার জমিনে বাংলা ব্যবহার হোক ব্যাপক ভাবে। সুশিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত সহ এদেশের নিম্নশ্রেণীর পেশাজীবী মানুষগুলোর মাধ্যমে বাংলার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ুক স্বাধীন এ বাংলার আনাচে-কানাচে। লাল সবুজের বুকে বাংলার স্বাধীনতা উজ্জীবিত হোক পৃথিবীর অন্তিম দিন পর্যন্ত। যদি তা না হয়, তবে শহীদদের জীবন বলিদান ও মা-বোনের ইজ্জত হারানো স্বাধীন এ বাংলা পরাধীনতার শিকলে বন্দি থাকবে অনন্তকাল। যা একজন বাঙালি হিসাবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাতে কখনই মেনে নেওয়া যায় না।
যে বাংলা শাসন করেছিল ইংরেজ দলপতি, কালের বিবর্তনে পাক হায়েনার কবলে ছিল বন্দি। একজন বীর সেনাপতি না থাকায় তখন ভিনদেশীদের সকল কার্যক্রম বাঙালিরা মেনে নিয়েছিল নিরবে। আজ-তো সেই কালোদিনের চাপ আমাদের মাঝে নেই, একজন মহানবীরের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করে অর্জিত হয়েছে আপন অধিকার, আজ আমরা মুক্ত, মুক্ত সমগ্র বাঙালি জাতি। কিন্তু জাত স্বাধীনতা কেবল নামে নয়, এর প্রভাব পড়ুক সকল বাঙালি জাতির কাজে কর্মে সুশৃঙ্খল ভাবে। স্কুল-কলেজগুলোর প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায়, বাংলার চেয়ে ইংরেজি শিক্ষাটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। আর এর প্রমাণ মিলে এ দেশে গড়ে উঠা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর প্রতি লক্ষ করলে। যদি বহি বিশ্বে বাংলার তেমন প্রসার না হয়, তবে আমরা কেন অন্য ভাষার প্রতি এতোটা দুর্বল হয়ে নিজের সত্ত্বাকে অস্বীকার করবো। তাই বলছি, একজন খাঁটি বাঙালি ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক হতে হলে- জাগ্রত হোক বাঙালির বিবেক, বাধ্যতামূলক করা হোক বাংলার ব্যবহার, তবেই জাতির জনক সহ সকল শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে বলে আমার বিশ্বাস।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী