অটিজম

অটিজম
সুমাইয়া অাক্তার
তোর বাবু তোকে এখনো মা বলে ডাকে নি?আমার বন্ধু রায়া সেদিন আমাকে সবার থেকে লুকিয়ে আলাদা করে বলছিল কথাটি।আমি বললাম এখনই ডাকবে নাকি?ও বলল-তোর বাবুর বয়স কত?আমি বললাম-এই দেড় বছর চলছে।বলিস কি?এখনো তোকে মা বলে ডাকে নি?আমার মনে হয় তোর ওকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
হ্যা,,আমার বাবুটি অন্য সবার থেকে একটু আলাদা।মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষে পড়া অবস্থায় মহা ধুমধাম করে আমারই পছন্দের এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে বিয়ে হয় আমার।ও ওর পরিবারের একমাত্র সন্তান।আমার শ্বশুর-শাশুড়ি গ্রামে থাকেন।তাই ছেলের প্রতি মায়ের আগ্রহও বরাবরের মতই একটু বেশি।বিয়ের পরের এক বছর বেশ সুখেই কেটেছে বলতে গেলে।ওর অফিস আর আমার ডাক্তারি পড়া,এতসব ব্যাস্ততার ভিড়েও আমরা দুজন দুজনকে বুঝেছি,সময় দিয়েছি।সেইবার তো প্যারিস গেলাম ঈদের ছুটি কাটাতে।এভাবেই চেনাচেনির পর্বটা আরো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় আমাদের।
ডাক্তারির শেষ বর্ষটা শেষ করার আগেই আমার সকল অপূর্ণতার মাঝে পূর্ণতার আবির্ভাব ঘটে।নারীত্বের শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়ে আমার সোনাটা আমাকে চমকে দেয়।আর আত্মতৃপ্তির স্বাদ যে কতখানি তা ওকে দেখেই বুঝেছিলাম।সভাবতই প্রেগনেন্সির সময়টাতে মেয়েদের একটু সাবধানে চলাফেরা করতে হয়।তার উপর শাশুড়ি মায়ের দেয়া একগাদা তাবিজ কবজ।কোনমতে ফাইনাল প্রুফটা দিলাম কিন্তু ইন্টার্নি করবার মত সৌভাগ্য হল না।ও আমাকে নিয়ে কোন রিস্ক নিতে চায় না।তবুও কোন আফসোস ছিল না।বোধকরি জীবনের শ্রেষ্ঠ ইন্টার্নি তো করছিই,,এখনই।
বাবু জন্মাবার একবছর অবধিও সব ঠিক ছিল।কিন্তু সবাই বলত বাবুর আচারণ নাকি খানিকটা ভিন্ন।এইতো সেদিন শশুর বাড়ির এক আত্মীয় বলছিল-এক বৎসর হয়ে গেল অথছ মেয়ে এখনো বসতেই পারেনা।আমার নাতনির বয়স নয় মাস।দিব্যি বসতে পারে,হামাগুড়ি দেয় আরো কত কি!কষ্ট হলেও আমি সহ্য করে নিলাম।একটা সময় আমিও খেয়াল করলাম,আমি ডাকলে বাবু সাড়া দেয় না,তাকায় না,কত্ত রকম খেলনা অথচ একটি মাত্র খেলনা নিয়েই পড়ে থাকে।কোন কারনবসত খেলনাটি সরিয়ে রাখলে সে কি চিৎকার চেচামেচি।এভাবে দুটি বছর কেটে যায়।বুঝতে পারলাম আমার সোনাটি সবার মত না একটু বেশিই আলাদা।আমি নিজে মেডিকেলের ছাত্রী হয়েও কত ঝাড় ফুক করিয়েছি,তাবিজ কবজ এমনকি ফকিরের সান্যিধ্য হয়েছি শুধুমাত্র সোনাটার স্বাভাবিকতার জন্য,একটিবার মা ডাকটি শোনার জন্য।আমার শাশুড়িমা বলেন- “আমরাতো বাপু ওত বর সোহাগী ছিলাম না,কই আমাদের ঘরে তো কোনদিন এসব পয়দা হয়নি।”আমি ওনাকে বোঝালাম মেডিকেল সায়েন্সে দেওয়া আছে কেন বাচ্চা প্রতিবন্ধি হয়।কিন্তু কে শোনে কার কথা।উল্টা আমার স্বামিকেই মাঝে মাঝে বলে-“বউয়ের দোষ আছে তাই ওমন রাক্ষস খোক্ষস জন্মাইছে।তুই ফের বিয়ে কর”।
মেডিকেলের তুখোড় ছাত্রী হয়েও একটা সময় আমার ক্যারিয়ার,স্বপ্ন,ইচ্ছা সবকিছুর জলাঞ্জলি দিয়ে কারাগারত্ত্ব বরণ করেছিলাম শুধুমাত্র সোনাটাকে ভাল রাখার জন্য কারন আমি ছাড়া বাবু অন্য কোথাও থাকতেও চায় না,না স্কুলে আর না ওর বাবার কাছে।পাশে সবসময় তার মাকেই চাই।আমার স্বামী বলে-আবার ক্যারিয়ার শুরু করতে,বাবুকে নাকি প্রতিবন্ধি কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেবে।আমি তা অস্বীকার করি।একটা পর্যায়ে ও বলেও ফেলে-“আমি দুইটা লাশ একসাথে টানতে পারবো না”।ওর কথাই আমি এতটুকু বিচলিত হইনি।আমি তো জানি ওর ভিতরে কতখানি ব্যাথা,কতখানি কষ্ট,ধৈর্যের সর্বচ্চ মাত্রায় পৌছেই ও এতটা বলেছে।প্রতিবাদ তো দুরে থাক আমি কোন কথাই বললাম না।শাশুড়ির পীড়াপিড়ি আর আমার ছন্নছাড়া জীবন সবমিলিয়ে ও বাধ্য হল আমাকে ডিভোর্স দিতে।আমিও আর কোন অধিকার ফলাই নি।কেনইবা ফলাবো।আমি তো জীবন্ত লাশ ছাড়া আর কিছুই নই।শেষমেষ সেপারেশনে চলে আসলাম।
অটিজম কোন পাপ না।ওরা প্রত্যেকে একেকটা এঞ্জেল।আল্লাহপাক সবাইকে এই এঞ্জেল দান করেন না কারন সবাই এদের ক্যারি করতে পারে না।শুধুমাত্র তার কিছু প্রিয় বান্দাদেরই দেন যারা তাদের জীবনের সবটা দিয়েও এইসব এঞ্জেলকে ধরে রাখতে পারে।
আজ অনকদিন হল ওর থেকে দুরে আছি।প্রথম প্রথম ও ফোন দিত খোজ নিত,মাসের খরচ পাঠিয়ে দেওয়ার কথাও বলতো।কিন্তু আমি স্ট্রেইট বলে দিয়েছিলাম-তোমার এত আলগা পীরিতের খুব একটা প্রয়োজন নেই।আমি একাই পারব।ফোন না করলেই বেশি খুশি হব”।শুনেছি বেশ আছে,ফের বিয়েও করেছে।আমিও বেশ আছি,,আমার সোনাটাও আজ অন্য সবার মতই হামাগুড়ি দেয়।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী