চাচা vs ইফতার

তারিক হক ঃ 

রোজার সময়ে জার্মানি থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম । যেতে না যেতেই ফোন এলো আমার চাচার । -কি রে , রোজা রাখিস তো ? নাকি বিদেশে থেকে থেকে কাফির হয়ে গেছিস ?

আমি সবিনয়ে বললাম , রাখি তো ।

কালকে বিকেলে আমার বাসায় ইফতার করবি । আর শোন , রাতে আমার এখানে সেহরি করে সকালে রওনা হবি ।বুঝলি ? আমি চাচার কথা অমান্য করি কিভাবে বলুন? টুথব্রাশ সাথে নিয়ে চাচার বাসায় হাজির হলাম ইফতারের সময় ।

ঢুকেই আমার চোখ চড়কগাছ ।

সারা টেবিল জুড়ে শুধু ইফতার আর ইফতার । চাচা পুরানো ঢাকায় থাকেন কিন্তু তাই বলে ইফতারটিও কি নবাব সিরাজউদ্দৌলার মতো হতে হবে ? ১৮ টি পদ । খেজুর , বেগুনি , ছোলা , শাহী জিলাপি থেকে শুরু করে পরোটা, খাসির রান আর বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়, কোনো কিছুই বাদ যায় নি ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম , আর কে কে আসবে ? কে আবার আসবে ? শুধু তুই ।

এগুলো সব আমরা খাবো ? আরে, এটা তো কিছুই নয় , আমগুলি তো এখনো দেখাই নি ।

চল পাশের রুমে, চল । পাশের রুমে গিয়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো ।

এটা ইফতার নাকি আমের মহোৎসব ? একটি রেকাবিতে গোবিন্দভোগ , গুলাবখাশ , গোপালভোগ আর হিমসাগরের ছড়াছড়ি । পাশেই রাজরানীর মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে রানীপছন্দ , বৃন্দাবনি, লক্ষণভোগ আর ক্ষীরশাপাত ।

বৃন্দাবনি আর হিমসাগর আমি যতদূর জানি জুন মাসে পাকে ।

আমি চাচাকে বললাম , চাচা , এখন তো মাত্র মে মাস । এগুলো পাকলো কিভাবে ?
চাচা বললেন : তুই তো বিদেশে গিয়ে বেশ পেকে গেছিস দেখছি । পাকাতে চাইলে পাকানো যায় । যাহোক ইফতার শুরু হলো ।

আমি চাচার মুখব্যদান করে খাসির ঠ্যাং কামড়ানো দেখছি । চাচী এসে বললেন , তুই তো কিছুই খাচ্ছিস না , জার্মানিতে কি না খেয়ে থাকিস ?

আমি সবিনয়ে বললাম , আমি প্রতিদিন জিমে গিয়ে ব্যায়াম করি, আর পরিমিত খাবার খাই ।
চাচা অট্টহাস্য দিয়ে বললেন , বোকা কোথাকার । আরে ভোজনেই তো নিহিত আছে মানুষের সুখ ।

তার এই সক্রেটিসের মতো বাণী শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম ।

তারাবীর নামাজের পর চাচা বললেন , খিদে পেয়েছে , চল , খাওয়া দাওয়া করি । আমি বললাম, কিছুক্ষণ আগেই তো খেলাম ।

-আরে, ওটা তো ইফতার ছিল । খাসির আরেকটি ঠ্যাং আর পরোটা উনি সাবাড় করতে লাগলেন । বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়, আনাম খাসি , সুতা কাবাব, বটি কাবাব, লতা কাবাব, কোয়েল পাখি রোস্ট, আস্ত মুরগী রোস্ট সবই আছে।

হরেক রকম খাবারের নাম শুনলে বাংলা একাডেমী অবাক হয়ে যাবে।

আমি মনে মনে বললাম , রমজানের মাস , সংযমের মাস ।

যাহোক খাওয়ার পর উনি বললেন , যা ওই রুমে গিয়ে ঘুম দে একটা। সেহরি আমরা বাসায় করবো না , রেস্তোরাঁতে হবে । ওখানে অর্ডার দেয়া আছে ।

আমি অনেকদিন দেশের বাইরে । রেস্তোরাঁয় যে সেহরি হয় , আমি জানতাম না ।

চাচা বললেন , বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল। ফেইসবুক , স্মার্টফোন , রেঁস্তোরায় সেহরি , সব মডার্ন ।

আমি বললাম , কিছু মনে করবেনা না চাচা, রেঁস্তোরায় যাবো না , বাসায় সেহরি করবো । খুব সকালে উঠে বাসার দিকে রওনা হলাম ।

দুপুরে চাচাকে ফোন করি কিন্তু তাকে আর ফোনে পাই না । চাচী বললেন , উনি নাকি সারাদিন টয়লেট থেকে বের হচ্ছেন না ।

আমি একটু হেসে কবিগুরুর লিখা তার জীবনের প্রথম কবিতা আওড়ালাম :

আমসত্ত্ব দুধে ফেলি , তাহাতে কদলী দলি , সন্দেশ মাখিয়ে দিয়া তাতে , হাপুস হুপুস শব্দ , চারিদিক নিস্তব্ধ ,পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে ।

২১/০৫/ ২০১৮

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী