সূর্যাস্তে সূর্যোদয়

আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব:

পানসি গাঁয়ের মোল্লাবাড়িতে খুশির পায়রা উড়ে
সুতোর সঙ্গে রঙিন কাগজ দুলছে উঠোন জুড়ে
কিশোর-কিশোরী দল বেঁধে গায় হলুদ বাটার গান
পানসি নদীর দু ধার উপচে পড়েছে খুশির বান
বড় আপা আর চাচীমা সাজান পান সুপারির ডালা
শিশুরা সবার গলায় পরায় জরিন ফিতার মালা
জোড়া কলাগাছ পাশাপাশি গেঁথে তোরণ হয়েছে বেশ
নীল শামিয়ানা আসেনি এখনো, বাকি আয়োজন শেষ
অন্দরে ধুম মেন্দি বাটার, বাহিরে ফুলের সাজ
মোল্লাবাড়ির মেজ কন্যার বিয়ের আসর আজ।

ভোরবেলা আজ দোয়েল গেয়েছে মিষ্টি সুরের গানে
লেজঝোলা এক ফিঙ্গে নেচেছে দোয়েলের সুরতানে
জোড়া শালিকের কিচিরমিচির এখনো সরব আছে
হলুদিয়া পাখি বিয়ের খবর পেয়ে গেল কার কাছে?
শালবনে ডাকে খয়রা পাপিয়া, মায়াবী সুরের লহর
বুঝিবা তারাও স্বাগত জানায় বরযাত্রীর বহর।

নাগকেশরের ঝোপগুলোতেও মৌমাছি এসে বসে
পাঁপড়ি ভিজেছে শিশিরের সাথে মিষ্টি মধুর রসে
যেনবা তারাই মেহমানদারি করার নিয়েছে ভার
মধুর সময়ে মধু দিয়ে তারা প্রাণ করে সঞ্চার
ভোমরার চাক আজকে নীরব, তারাও নিয়েছে বুঝে
এমন খুশির দিনে অযথাই লাভ নেই বিষ খুঁজে
পুবের বাতাসে কনকচাঁপার থোকা অবিরত দোলে
যেন কোনো শিশু সযতনে দোল খাচ্ছে মায়ের কোলে
দোলনচাঁপাও প্রস্তুত আজ অতিথি করতে বরণ
বেলী তো ঝরেছে ছুঁয়ে দিতে শুধু বর ও কনের চরণ!

মীর্জাবাড়ির বড় ছেলে আজ আসবে বরের বেশে
মুখের উপর রুমাল চেপে সে বসবে লাজুক হেসে
কন্যার মুখে কাতরতা ফোটে, বুক কাঁপে দুরু দুরু
আজ থেকে তার নতুন জীবন, নতুন দিনের শুরু
ভবিষ্যতের চিন্তায় তার কপালে পড়েছে ভাঁজ
অদেখা গাঁয়ের অচেনা ঘরের ঘরণী হবে সে আজ
সংসারটা কি মনমতো হবে? বরটা কি হবে ভালো?
ভালোবাসা আর অনুভবে তার ঘরটা কি হবে আলো?
কত মায়া তার ছায়া হয়ে যাবে, কত স্মৃতি হবে ফিকে
কতটা বিরহে কাতর সে আজ, বোঝানো কি যাবে লিখে?

মা এসে বসেন কন্যার পাশে, বলেন আদুরে স্বরে:
আমি কি আমার কন্যাকে দেব যেমন তেমন ঘরে?
অযথা চিন্তা করিস না তো মা! কিসের করিস ভয়?
ভাটির দেশের লোকেরা কিন্তু পত্নীসোহাগা হয়!
বনেদি ঘরের ভদ্র ছেলেকে এনেছি জামাই করে
কত ভালোবাসা দেবে তারা তোকে দেখিস বিয়ের পরে।

ছোট্টবেলার খেলার সাথীরা বিয়ের আসরে এসে
গল্পের ছলে কাটছে ফোঁড়ন, কেউবা যাচ্ছে হেসে
কেউবা হাতের মেহেদী-রাঙ্গা আলপনা দেখে বলে
‘আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিস তবে পরের বাড়িতে চলে?’
ও-পাড়ার মেয়ে মাবিয়া খাতুন, কিশোরীবেলার সাথী
ভাবতে পারেনি বান্ধবী তার পর হবে রাতারাতি
‘এই তো সেদিন তুই আর আমি কানামাছি খেললাম
এত তাড়াতাড়ি সুখস্মৃতিগুলো হারিয়ে কি ফেললাম?’
আয়েশা বানুর ভাল্লাগছে না দুঃখ-বিলাসী কথা
‘খুশির দিনেও তোরা এইসব ক্যান বলিস অযথা?
আজকে সে বধূ হয়েছে, কালকে তুই কিবা আমি হবো
সারা জীবন কি আমরা সবাই এই গাঁয়ে পড়ে রবো?
কাছে থাকা মানে আপন এবং দূরে থাকা মানে পর—
এমন মিথ্যে ধারণা তোদের মনে কেন করে ভর?’
আয়েশা বানুর এ কথা শুনেই জমিলা বেগম কয়
‘বুঝেছি বুঝেছি, তোর মনে খুব বিয়ের বাতাস বয়
সবুর কর্ না! ঘটক লাগাবো আমরা সবাই মিলে
আমরা বুঝি তো কী শখ জেগেছে আয়েশা বানুর দিলে!’
‘ধুর তোরা সব পঁচা কথা ছাড়া আর কি পারিস কিছু?
এদ্দিন ছিলি ওকে নিয়ে আর এখন আমার পিছু।’
ইসমত আরা চুপচাপ ছিলো, এবার খুলেছে মুখ
লাজুক মেয়েটা কী বলে, শুনতে সকলেই উৎসুক
‘তোরা কি সবাই ঝগড়া বাঁধাবি বিয়েবাড়িতেও এসে?
বাপ রে আবার মুখ খুলে যেন আমিই না যাই ফেঁসে!’
বান্ধবীদের খুনসুটি দেখে মনে মনে হাসে কনে
কে জানে কীসব ভাবনা জেগেছে বধূর কোমল মনে।

বজরায় চড়ে বর এসে গেলো রাজপুত্রের বেশে
মসজিদগাহে আকদ হয়েছে যোহর নামায শেষে
ইমাম সাহেব খোতবা পড়িয়ে খোরমা ছিটিয়ে দেন
মুসল্লিগণ ছিটানো খোরমা দুই হাত ভরে নেন
যৌতুকহীন বিয়ের জন্যে ইমামের ঘাম ঝরে
মানুষকে তিনি বুঝিয়ে গেলেন আজ কতদিন ধরে!
তাঁর এই শ্রম সফল হয়েছে, আজকের বিয়ে দেখে
খুশিতে ভীষণ মাতোয়ারা তিনি, তাই সব কাজ রেখে
স্বেচ্ছায় এসে হাজির হলেন আকদ পড়িয়ে দিতে
কন্যার বাপ হাদিয়া যাচেন, গররাজি তিনি নিতে।

নতুন বরের জন্যে খাসীর মাংস, গরুর নলা
কাঁচের প্লেটের উপর উপুড় গ্লাসে ভরা দুধ-কলা
পুকুরের বড় রুই মাছটার মাথাও পেয়েছে বর
‘সব খেয়ে শেষ করতে পারব?’ বাসা বাঁধে মনে ডর
কনের শ্বশুর, লাল মাংসের খাবারে নিবেশ নাই
দেশী মোরগের রান দেয়া হলো তার পাতে তুলে তাই।

আপ্যায়নের পর্ব শেষেই এলো বিদায়ের ক্ষণ
অশ্রুবিহীন ক্রন্দনে ভাসে পিতার দরদী মন
শ্রাবণ ধারার মত ঝরে যায় মায়ের চোখের জল
বৃদ্ধ দাদুর বুকেও রোদন, চোখ দুটো ছলছল
সুখে দুখে তাঁর নাতনিটা ছিলো সারাক্ষণ শুধু পাশে
কেউ কি এখন নাতনির চেয়ে তাঁকে বেশি ভালোবাসে?
অজুর জন্যে কে তাকে এখন মশক এগিয়ে দেবে?
কে এখন থেকে কাঁধে ভর দিয়ে পুকুরের পাড়ে নেবে?
লাঠির উপর ভর দিয়ে শুধু বারবার ফিরে চায়
ছানিপড়া চোখ আরো আন্ধার হয়ে আসে বেদনায়।

ঘাটে ভিড়ে আছে বজরা নৌকা, সেজেছে বিয়ের সাজে
তপ্ত রোদেও মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালি সুর বাজে
একটু পরেই পাল তুলে দেবে ছরন মাঝির তরী
ঢেউ কেটে কেটে দাঁড় টেনে যাবে মীর্জাবাড়ির ছড়ি
বাবাকে জড়িয়ে কন্যা আবারো মূর্ছা গিয়েছে প্রায়
দাদীমা এবং ছোটবোন তার আগপিছে সাথে যায়
কন্যার সাথে শ্বশুরবাড়িতে তারা দুজনও যাবে
হয়তো তাদের পাশে পায়ে মনে কিছুটা সাহস পাবে।

আল্লার নামে পাল তুলে দিলো মাঝি-মাল্লার দল
ময়ূরপঙ্খী বজরা কাটছে শান্ত নদীর জল
বধূর কান্না থামছে না মোটে, থেমে থেমে কেঁদে চলে
পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিতে বরকে সবাই বলে
কিন্তু বেচারা লজ্জায় মরে, কথাই ফোটে না তার
সাধ্য কি আছে কান্না থামার? কী আর করবে আর?
বধূটা হয়েছে ক্রন্দসী খুব, বরটা হয়েছে লাজুক
মোটামুটি এই মিলিয়ে হয়েছে পরিস্থিতিই নাজুক।

দেখতে দেখতে বজরা এসেছে একেবারে মাঝনদী
মাঝি সাবধান, কাটাল স্রোতের পাকে পড়ে যায় যদি!
কাটাল স্রোতের ঝুঁকি কমে এলো, আসলো কাঁঠালপুর
মীর্জাবাড়ির ছড়ি পৌঁছানো এখনো অনেক দূর
কাঁঠালপুরের বাঁক পেরিয়েই পানকৌড়ির ঝাঁক
কোষা নৌকায় শিকারী বালক গুলতি করেছে তাক
ডুবসাঁতারের কসরতে যেই পানকৌড়ির দেখা
অমনি গুলতি ছুঁড়ছে বালক, কিন্তু বেচারা একা
একা একা খুব কঠিন এমন শিকার নাগাল পাওয়া
তার চে’ কঠিন খরস্রোতা নদে ডিঙ্গি নৌকা বাওয়া।

একটু দূরেই একটা শুশুক উঁকি দিয়ে দিলো ডুব
শুশুক দেখেই যাত্রীরা সব এক মুহূর্ত চুপ
তীরঘেঁষা ঘাটে দুরন্ত শিশু দাপাদাপি করে, আর
ছরন মাঝির মনে পড়ে যায় শৈশব-স্মৃতি তার
উজানের স্রোতে সাঁতার শিখেছে কত সংগ্রাম করে!
জোয়ারের টানে চোখের সামনে কতজন গেল মরে
কত গ্রাম গেল নদীর গর্ভে, কত চিৎকার শুনে
মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যেত ভয়ের প্রহর গুণে
তীরে নেই আর বাঁশের শলায় গড়া চৌয়ারি ঘর
দক্ষিণ পাড় ভাঙছে কেবল, উত্তরে জাগে চর।

নতুন বরের পাংশু মুখের দিকে চেয়ে মাঝি হাসে
নদীর ঢেউয়ের মত মনে তার করুণার ঢেউ আসে
‘আচ্ছা সাহেব, শাদী মোবারক হয়েছে যখন সারা
ভাবীসাহেবার মন পেতে আর দরকার নেই তাড়া
শুধু একখান কথা বলি আজ, দিন চলে যাবে যত
একে অন্যের জন্যে হবেন চাঁদ ও নদীর মতো।’

লজ্জায় হলো লাজুক বরের চেহারাটা আরো লাল
দাঁড়িয়ে আড়াল বানালো এবার বজরার সাদা পাল
খানিক বাদেই সংকোচ ঝেড়ে মাঝিকে প্রশ্ন করে
‘চাঁদ আর নদী বাইরে যেমন, তেমন কি হয় ঘরে?
মানুষ কিভাবে চাঁদ হয়ে যায়? কিভাবে সে হয় নদী?
জানার ইচ্ছে, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলতে যদি!’

একটানা মাঝি বৈঠা বেয়েছে, ক্লান্তি এসেছে গায়ে
পেশীতে হঠাৎ টান পড়ে গেছে, ঝিম ধরে গেছে পায়ে
একটু সময় জিরিয়ে এবার দাঁড় টানে ধীরে ধীরে
উত্তর দিতে নতুন বরের দিকে তাকায় সে ফিরে
চাতকের মতো চেয়ে আছে সেও শুনতে মাঝির কথা
ছরন মাঝির গলা খাঁকারিতে ভেঙ্গেছে নীরবতা
‘শোনেন সায়েব, তিন যুগ হলো এ নদীতে দাঁড় টানি
নদীই আমার পৃথিবী, আমার আকাশ নদীর পানি
কিশোরবেলায় বৈঠা যখন বেয়েছি বাপের সাথে
নদী ছাড়ি নাই তুফানের দিন কিংবা ঝড়ের রাতে
জানতে চেয়েছি জোয়ার-ভাটার সময় বাপের কাছে
এই পানি ফুলে, এই নেমে যায়— রহস্য কিছু আছে?
বাপ বলেছেন, চাঁদের টানেই জোয়ারে সাগর ভরে
আবার সেখানে ভাটা এসে যায় চাঁদ গেলে দূরে সরে
চাঁদের সঙ্গে সাগর-নদীর এ মিতালী দেখে ভাবি
সাগরে যখন তালা পড়ে যায়, চাঁদের হাতেই চাবি
সাগর যখন ছুটন্ত ঘোড়া, চাঁদের হাতেই লাগাম
সাগর কখন শান্ত হবে তা চাঁদ জানে শুধু আগাম
সাগর-নদীর পানিকে যেভাবে চাঁদটা নিতুই ডাকে
দাম্পত্যের হাসির সূত্র এখানে লুকিয়ে থাকে
এরপর থেকে মনে হয় শুধু সংসার এক নদী
দুই জন একে অপরের তরে চাঁদ হতে পারে যদি
বোঝাপড়া আর অনুভবে তারা কতো কাছাকাছি হতো!
তাই বললাম, আপনারা হন ‘চাঁদ ও নদীর মতো’।

মীর্জাবাড়ির রাজপুত্রের কাটে না অবাক ঘোর
অক্ষরজ্ঞান-বিহীন মাঝির কেমন বোধের জোর!
কতো সুনিপুণ ভাবনাটা তার, প্রতীতি নিটোল কতো
ছরন মাঝির জীবনবোধ তো গভীর, নদীর মতো!
ভাবতে ভাবতে বিকেল গড়ালো পানসি নদীর বুকে
বধূর কান্না থেমেছে আগেই, কথা নেই কারো মুখে
বিকেল বেলার এই নীরবতা ছুঁয়েছে সবার মন
বিকেলের সাথে করেছে সবাই নীরব থাকার পণ।

কন্যার দাদী পান মুখে দিয়ে পিচকি ফেলছে জলে
বেখেয়ালে তার পুরনো চুড়িটা হাত থেকে গেল গলে
এই নিয়ে তার চিন্তা হলো না, চিন্তা নাতনি নিয়ে
কে জানে পুত্র কোন্‌ ঘরে দিল নাতনিকে তার বিয়ে!

বজরা ছুটছে বাতাসের বেগে, ভাটির স্রোতের সঙ্গে
গোধূলীর রং মায়া ছড়িয়েছে নদীর রূপালী অঙ্গে
দূরে দেখা যায় উদোম গায়ের উদ্যমী সব ছেলে
শান্ত নদীর বুকেতে এখনো যায় জলকেলি খেলে
ঝিকিমিকি করে সূর্য-কিরণ আর নদীস্রোত মিলে
মাঝনদী থেকে ছোট এক মাছ ছোঁ মেরে নিয়েছে চিলে
রাখাল ছেলেটা নদীর কিনারে অগভীর জলে এসে
ধেনু গাভীটার গাও ধুয়ে দেয় কী গভীর ভালোবেসে!
নিরীহ পশুটা চোখ বুজে রাখে, যত্ন কী সে তা বোঝে
মানুষের মতো সেও কি তাহলে মমতার মানে খোঁজে?

নববধূ খুব নীরবে নদীর দৃশ্য গোচর করে
শীতল বাতাস ছুঁয়ে যায় তাকে কান্না থামার পরে
শাশুড়িমা ছিলো চুপচাপ বসে দু প্রহর পাশে তার
নিজের চোখের আর্দ্রতা তিনি লুকান অনেকবার
বউমাকে তার শান্ত দেখেই নিবিড় হলেন আরো
বলেন, ‘বউমা তুমি নাকি খুব ভালোবাসা দিতে পারো?
মা-বাবা এবং দাদু-দাদীকেও আগলে রাখতে তুমি
ছোট শিশুদের জন্যে তুমি তো ছিলে এক ঝুমঝুমি
তোমার আদব-লেহাজের কথা শুনেছি মুগ্ধ হয়ে
তবে কান্নার রুদ্র রূপেতে কিছুটা ছিলাম ভয়ে
পরে একে একে মনে হলো নিজ বিবাহের স্মৃতিগুলো
আজ সে স্মৃতির আতশী কাঁচেও জমেছে অনেক ধূলো
আমিও এমন নাতিশীতোষ্ণ একটা দিনের শেষে
কাঁদতে কাঁদতে পালকির পেটে চড়েছি কনের বেশে
খুব মনে পড়ে বাবা-মা’র কথা, ভুলতে পারি না মোটে
বাবা-মা’র স্নেহ সারাটা জীবন ভাগ্যে কি আর জোটে?
জীবন থেকেই হারিয়ে ফেলেছি দুইটা বটের ছায়া
তবু কেন আজো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের মায়া?
আচ্ছা বউমা, তোমার তো ঘরে বাপ-মা দুজন আছে
আমার বাপ-মা নেই কেন, বলো, আমার বুকের কাছে?

বলতে বলতে বৃদ্ধা ভীষণ আবেগতাড়িত হন
হঠাৎ কিসের ভাবনায় তার চকিতে জেগেছে মন
বউমার চোখে আবার যখন নীরব অশ্রু আসে
একটা মাতৃমূর্তি তখন তার দুই চোখে ভাসে
আরো কাছে টেনে বিনুনি কাটেন বধূর দীঘল চুলে
মুখটা এদিকে ফিরিয়ে বলেন চিবুকটা হাতে তুলে-
বাপ-মা-হারানো এই ‘আমি’টার শূন্যতা কমে গেলো
যেদিন আমার কোলজুড়ে এক ফুটফুটে শিশু এলো
আমার তো আছে একটাই ছেলে, বাপ ডাকতাম তাকে
যতবার তাকে বাপ ডাকতাম, খুঁজে বেড়াতাম মা-কে
মায়ের অভাব ঘুচে গেল আজ বউমা তোমাকে পেয়ে
তোমরা দুজন বাপ-মা আমার, আমি তোমাদের মেয়ে।

এতক্ষণের ক্রন্দসী বধূ এবার না হেসে পারে?
কত সুন্দর করে মানুষটা মায়ায় জড়ায়, আরে!
একটা স্নেহের অনুভূতি তার সারা গায়ে গেল খেলে
মনে মনে বলে, ‘বধূ তুমি ঠিক মানুষের কাছে এলে!’

সংকোচে তবু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না তাকে
তবে কিছু কথা বলার জন্যে হৃদয়ে জমিয়ে রাখে
স্বামীকে বুঝিয়ে দিতে হবে আজই, ‘আমরা বাপ ও মা
আমাদের কোলে আমাদের মেয়ে কখনো কাঁদবে না।’

আর কিছুদূর বজরা এগিয়ে পল্লীর দেখা মেলে
পল্লীবালারা কলস বুরায়, জাল গুটে নেয় জেলে
কোন্দা নৌকা ভর্তি হচ্ছে রিঠা ও জিয়ল মাছে
পাতারা দুলছে আসমানমুখী তাল-তমালের গাছে
ছোট চরটাতে হরেক পদের সবজি হয়েছে চাষ
এই পল্লীর মানুষ সবাই সুখে থাকে বারো মাস
থাকবে না কেন? অল্পতুষ্টি মানুষকে ভালো রাখে
কম চাহিদার মানুষেরাই তো বেশি আনন্দে থাকে
সাদা মেঘেদের উড়াউড়ি দেখে মনে হয় পেঁজাতুলো
উঁকি দিতে শুরু করেছে এখনই আকাশের তারাগুলো
মাগরিব আসে ঘনিয়ে, সূর্য নিস্তেজ হতে থাকে
খুব বেশি পথ আর বাকি নেই, ছড়ি যেন কাছে ডাকে!
বজরার গতি কমে আসে, আর যাত্রীরা উঠে দাঁড়ায়
নতুন অতিথি বরণ করতে ঘাট বুঝি হাত বাড়ায়!

আবিররাঙ্গা সূর্য যখন দিগন্তে ডুবে গেলো
মীর্জাবাড়ির আকাশে একটা নতুন সূর্য এলো।

Comment

Comment

   
ই-মেইলঃ mohioshi@outlook.com
ফেসবুকঃ www.facebook.com/mohioshibd
মোবাইলঃ ০১৭৯৯৩১৩০৭৮, ০১৭৯৯৩১৩০৭৯
ঠিকানাঃ ১০/৮, আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
কপিরাইট ©  মহীয়সী