অভিজাত মৃত্যু

 

মনসুর আলম                                                         ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। কোনো কারণ ছাড়াই অসম্ভব রকমের ধনী এক পরিবারের সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হচ্ছিল যেদিন, সবাই মিলে একসাথে খেতে বসেছি। বরের বড় ভাই, খুবই সুদর্শন এক পুরুষ মানুষ। যে খাবারই দেওয়া হয় উনি ফিরিয়ে দেন। কোরমা, পোলাও, চিকেন রোস্ট, রেজালা সব তিনি একেএকে প্রত্যাখ্যান করলেন এমনকি দইও। শুধু সালাদ খেতে চাইলেন। আমি তখন মনেমনে ভাবি সব খাবার প্রত্যাখ্যান করে শুধু সালাদ খেতে চাওয়া মনেহয় কোনো আভিজাত্যের লক্ষণ। এটি নিশ্চয়ই বড়লোকদের কোনো স্টাইল। হঠাৎ তিনি বললেন, “মিষ্টি দই খেতে পারবোনা তবে, টক দই থাকলে একটু দিতে পারেন; আমার সুগার প্রবলেম আছে।” তখন বুঝলাম ওনার ডায়াবেটিস আছে।

ছোটবেলা মনে করতাম ডায়াবেটিস বোধহয় শুধু বড়লোকদের হয়; এটি একটি অভিজাত শ্রেণীর রোগ, গরীব লোকদের আশেপাশে যায়না অবজ্ঞা করে। পরে বুঝতে পারলাম আসলে ডায়াবেটিস এত শ্রেণীবিভাজন বুঝেনা – সে ধনী, দরিদ্র সবাইকে সমান চোখেই দেখে। গরীব লোকজন যেহেতু প্রচুর শারিরীক পরিশ্রম করেন এবং জীবন যুদ্ধে লড়তে লড়তে রীচ ফুড খাওয়ার কোনো সুযোগই পাননা হতে পারে একারণে ডায়াবেটিস তাদের কাছ থেকে একটু দূরে থাকে। বড়লোকদের নিয়ন্ত্রিত ডায়েটও আসলে খেটে খাওয়া মানুষের উৎসবের খাবারের চেয়ে রীচ, আর জগিং/ মর্নিং ওয়াক্ এগুলো তাদের পদতলে থাকে। সুগার লেভেল হাই হবার সাথে আভিজাত্যের কোনো সমান্তরাল সম্পর্ক নাথাকলেও একবার হয়ে গেলে আভিজাত্যকে জগিং ট্র্যাকে নামিয়ে আনে।

জেলখানায়ও সেই উঁচু জাত, নীচু জাত বন্দোবস্ত আনুষ্ঠানিকভাবে করা হয়। সাধারণ মানুষ; সাধারণ সেল, ভিআইপি মানুষ; ভিআইপি সেল। চোর, বাটপার, দুর্নীতিবাজ, খুনি – সবাই অপরাধ করে জেলে যায়, সেখানেও আভিজাত্যের বাহার। যত বড় দুর্নীতিবাজ তত বড় ডিভিশন!

আমাদের কাছে অবশ্য মৃত্যুরও শ্রেণীবিভাজন রয়েছে। কে, কীভাবে মরলো? এটি আভিজাত্যের এক‌টি প্রতীক। ছোটোবেলায় হার্ট এট্যাককে মনে করতাম সবচেয়ে অভিজাত মৃত্যু, গরীব লোকদের হার্টের এত সময় কোথায় যে এট্যাক করবে। জন্মের পর থেকে এত অসংখ্যবার হার্ট ধুকপুক করেছে যে এট্যাক হবার প্রবণতা সে ভুলে গেছে। হার্ট এট্যাক করে মরার মত বিলাসীতা গরীব মানুষ দেখাতে পারেনা। মরণের পরেও সেই শ্রেণীবিভেদ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়। কারো মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেন – তাদের মৃত্যুর স্ট্যান্ডার্ড একধরনের। কারো মৃত্যুতে কেবল বিরোধী নেত্রীর শোক প্রকাশ – সেখানে স্ট্যান্ডার্ড ভিন্ন। কারো লাশ শহীদ মিনারে যায়, কারোটা যায়না। কারো কবর হয় আজিমপুর কিংবা কারোটা শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। কোন দল ক্ষমতায় সেটিও কারো কারো মৃত্যুর স্ট্যান্ডার্ডের মাত্রা নির্ধারণ করে। অনেকের পরিবারের লোকজন আফসোস করেন নিজের পছন্দের রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকতে মৃত্যু হলনা কেন? তাহলে স্ট্যান্ডার্ড ভিন্ন হতো!

সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে “ধূমপান ক্ষতিকর/ ধূমপান ক্যান্সারের কারণ।” তারপরও মানুষ ধূমপান করে। সেখানেও ভিন্ন ভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। টাকা দিয়ে কিনে বিষ পান করে সেই বিষেরও উঁচু ক্লাস, নীচু ক্লাস রয়েছে। কেউ ফিল্টার ছাড়া, কেউ ফিল্টার সমেত, কেউ নরম তুলতুলে ফিল্টার, কেউ আবার শক্ত খসখসে ফিল্টার। কারো বিষ থেকে সুঘ্রাণ আসে, কারোটা থে‌কে ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ। বিষ পানেরও কী আভিজাত্য! বিষেরও আত্মসম্মানবোধ প্রখর – সোনালী ফিল্টার নিয়ে গরীবের ফুসফুসে সে আক্রমণ করেনা। একই তামাক ভিন্ন ভিন্ন মোড়কে ভিন্ন ভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড রিপ্রেজেন্ট করে। পাইপ ধরিয়ে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখলে নাকি আভিজাত্যের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটে। একই প্রবণতা এলকোহলের ক্ষেত্রেও। প্যাকেটের গায়ে সতর্কবাণী লেখা থাকার পরেও মানুষ দেদারসে পান করে যথারীতি আভিজাত্য বজায় রেখে। এখানেও সেই সামন্তবাদ! বড়লোক পান করবে উঁচু মানের বিষ আর গরীব লোক নিম্নমানের।

আজ এক জায়গায় যাচ্ছিলাম। ড্রাইভ করার সময় একটি দোকানের সাইনবোর্ড দেখে চমকে উঠলাম। দোকানের সামনে উজ্জ্বল নিয়ন সাইনবোর্ড জ্বলছে “HOOKAH LOUNGE”। লাউন্জ শব্দটি আরাম, বিলাসীতার সাথে সম্পর্কিত। ধূমপান করার জন্য হুক্কা বিক্রির দোকানের নামের সাথে লাউন্জ শব্দটি দেখে একটু চমকে ওঠার সাথে সাথেই মনে হল আমার ছোটবেলায় আমি অভিজাত হুক্কা দেখেছি। গরীবের হুক্কা হতো নারকেলের খোলশ দিয়ে আর অভিজাত হুক্কা হতো তামা, কাঁসা দিয়ে। এখানে বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ডের হুক্কা পাওয়া যায়, এক পাইপ থেকে পাঁচ পাইপ পর্যন্ত। অর্থাৎ একসাথে পাঁচজন ধূমপান করতে পারবে একই হুক্কা দিয়ে আলাদা আলাদা পাইপে। কয়েকশত ধরনের ফ্লেভার রয়েছে সেই তামাকের। একই সাথে পাঁচ ফ্লেভারের তামাক জ্বালিয়ে পাঁচটি ভিন্ন স্বাদের ধূমপান করতে পারে। মরতে হলেও যে একটি অভিজাত আয়োজন সম্ভব সেটি মনে হয় মানবজাতি ছাড়া আর কোনো প্রাণীকুলের সাথে যায়না।

হালের মহামারি কোভিড-১৯। পুরো বিশ্বকে থমকে দিয়েছে এই ভাইরাসটি। পৃথিবীর সবদেশেই ফেসিয়াল মাস্ক ব্যবহার করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এই মাস্ক তৈরিতেও আমরা নিয়ে এসেছি বিভিন্ন ধরনের স্ট্যান্ডার্ড। প্রফেশনালদের জন্য বিশেষ ধরনের মাস্ক একটি ভিন্ন আঙ্গিক। এর বাইরে সাধারণ জনগণের মাস্ক তৈরিতেও নিয়ে আসা হয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। গতকাল একটি দোকানে দেখলাম সুন্দর, আকর্ষণীয় মাস্ক ঝুলছে। কৌতুহলবশত কাছে গিয়ে দেখি ওখানে কেবল নারীদের মাস্ক রয়েছে, একটিও পুরুষদের মাস্ক নেই। মাস্কগুলোতো বিশেষ কিছু ডিজাইন এবং রঙ ব্যবহার করা হয়েছে যা শুধু নারীরাই ব্যবহার করে থাকেন। যেমন: এমব্রয়ডারি করে বিশেষ কিছু ডিজাইন করা, চকচকে পাথর, পুতি, বিভিন্ন ধরনের লেইস, চেইন, স্টার লাগিয়ে মাস্ককে একটি ফ্যাশন ওয়্যার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। এতে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ, সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও আছে অভিজাত আয়োজন। আইসিইউগুলোতে রয়েছে ক্যাটাগরি। সাধারণ আইসিইউ, ভিআইপি আইসিইউ, ভিভিআইপি আইসিইউ – মৃত্যুর মুখে দাঁড়ালেই সব আভিজাত্য ভুলে গিয়ে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে এটি কোনো কথা হতে পারেনা।
মরলেও দাপট দেখিয়ে মরতে হবে। এই ভাইরাসকে পুঁজি করে যারা কোটিপতি হচ্ছেন তাদের উত্থানও একটি অভিজাত উত্থান; কোভিড-১৯ কোটিপতি! হোয়াট এ সেলুকাস!

লেখক: সাহিত্যক ও প্রবাসী বংলাদেশী,
সাউথ আফ্রিকা।