বুক রিভিউঃ নাফ নদীর তীরে

সাদিকা সুলতানা লিনা

উপন্যাস-নাফ নদীর তীরে
লেখক-আলী আহসান
মুদ্রিত মূল্য-৩০০টাকা
প্রকাশনা–অন্বেষা প্রকাশন
প্রচ্ছদ-ধ্রুব এষ

ইতিহাসকে আশ্রয় করে লিখা এক অনন্যসাধারণ উপন্যাস। লিখেছেন আলী আহসান।ব্যতিক্রমী প্লট নিয়ে লেখা এই উপন্যাস শুধু এক গল্পই নয়;ইতিহাসকে আশ্রয় করে এগিয়ে গেছে যার কাহিনী। ইতিহাস বিষয়ে যাদের আগ্রহ আছে, নি:সন্দেহে তাদের মনের খোরাক জোগাবে এই উপন্যাস।চেনা জগতের বাইরে গিয়ে পাঠক পাবেন এক ভিন্ন জগতের দর্শন।
এই উপন্যাসের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে সম্রাট শাহজাহানের পুত্র যুবরাজ শাহ সুজাকে নিয়ে। শাহ সুজা আপন ভাইদের কাছ থেকে পালিয়ে ঢাকা হয়ে চচট্টগ্রামে আসেন, তারপর আশ্রয় নেন জঙ্গলঘেরা রহস্যময় আরাকানের ম্রাউক–উ রাজ্যে, সাথে নিয়ে আসেন হাজার পালঙ্ক ভর্তি মূল্যবান ধনসম্পদ।হীরা, চুন্নি, পান্না, সোনা আরও অনেক ধনসম্পদ। যুবরাজের সম্পদ নাকি তার সুন্দরী কন্যার প্রতি লোভ করল আরাকানের রাজা থুডাম্বা? এইরকম নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে উপন্যাসের কাহিনী।
উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমার কাছে ড. সরোজের ভূমিকা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে।অক্সফোর্ডের পড়াশুনা শেষ করে তিনি লিখেছেন এক পান্ডুলিপি যার পুরোটাই রহস্যেয় ঠাসা।ড. সরোজের সেই পান্ডুলিপির সূত্র ধরেই এগিয়ে গেছে মূল কাহিনি।ড. সরোজ যিনি জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করে গেছেন এই পান্ডুলিপির পিছনে।
এই উপন্যাসের পড়তে পড়তে ছড়িয়ে আছে রহস্য আর ধাঁধা।পড়তে গিয়ে বারবার বিভ্রম হতে হয়েছে। জটিল রহস্যের অন্তর্ধানে আটকে গেছি বারবার। লেখক এখানে পাঠকের মনোজগতের সাথে এক চমৎকার খেলা খেলেছেন।উপন্যাস পড়ে নিজে নিজে একটা ধারণা করি যে পরবর্তীতে কি ফলাফল হতে পারে কিন্তু যতোই পৃষ্ঠা এগিয়ে সামনে যাই নিজের ধারণার সাথে লেখকের ধারণার মিল পাইনি।লেখক বেশ যুক্তিসঙ্গতভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন উপন্যাসের কাহিনি। সেদিক থেকে আমাকে এই উপন্যাসটিকে কখনো মনে হয়েছে রহস্য উপন্যাস, কখনোবা থ্রিলার।
উপন্যাসের “রাফিন” চরিত্রটি আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।প্রাণচাঞ্চল্য ভরা দেবদূতের মতো সুন্দর এক ছেলে।ইতিহাস নিয়ে যার আগ্রহের শেষ নেই। উপন্যাসে আছেন হুসেইন আলী নামের এক ভদ্রলোক। বয়সে প্রবীণ হলেও মনের দিক দিয়ে একদম তরুণ। হুসেইন আলী এবং রাফিনও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে ড. সরোজের হারিয়ে যাওয়া পান্ডুলিপির রহস্যের সন্ধান জানতে। তারা শেষ পর্যন্ত শাহ সুজার ফেলে যাওয়া ধনরত্নের সন্ধান পান কিনা তা পাঠক উপন্যাস শেষে জানতে পারবে।
উপন্যাসটিকে আরও ভালো লেগেছে লেখকের সুন্দর বর্ণনাশৈলী দেখে। খুব চমৎকার ভাষায় নানাবিধ অলংকার আর উপমায় সজ্জিত করেছেন প্রতিটি পরিচ্ছেদ।দারুণ ও প্রাণবন্ত বর্ণনার মাধ্যমে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে হৃদয়গ্রাহী।
ভালো লাগে নাফ নদীর তীরে ড. সরোজের সেই বাড়িটি। সেই বাড়িতে, হতকুচ্ছিত সেইসব রাস্তায়, সেখানকার অপরিচিত জীবনে,কাছ থেকে শোনা সমুদ্রের গাড় গর্জনের ভাষায় –সবকিছুর মধ্যেই গূঢ় রহস্যের সন্ধান পাই।মাথা থেকে অনেক উঁচু অবধি ফোলাফাঁপা ঢেউ। কাচা দুধের মতো ফেনিয়ে ওঠা চুড়ো। কিন্তু তারও বেশি এক বিশাল হৃৎপিন্ড যেন ধুকপুকিয়ে ওঠে সমুদ্রের ভীষণ গভীরে। মনে হয় ব্রক্ষ্মাণ্ডের স্পন্দমান বুকই সমুদ্র, তার গান।
সাহিত্যসমৃদ্ধ হলেও এটি মূলত ইতিহাসকে আশ্রয় করে লিখা এক উপন্যাস।ইতিহাসকে জানতে পারবেন পাঠক সাথে সাহিত্যের স্বাদও পাবেন। বেশ তথ্যমূলক ও দারুণ বিশ্লেষণধর্মী এক উপন্যাস।সাহিত্যের সাথে সাথে পাঠক জানতে পারবে ইতিহাসের নানা অজানা অধ্যায়।
উপন্যাস পড়া শেষে নেরুদার কবিতার বিশেষ লাইনগুলো বারবার মনে পড়ছিলো—
খুব বেশি হলে আমি ধরতে পেরেছিলাম একগুচ্ছ মুখ,
হঠকারী মুখোশ, যেন সোনার শূন্য আংটি
যেন ইতস্তত বিক্ষিপ্ত জামাকাপড়, এক দুর্দান্ত শরতের বালখিল্যর দল
যারা ভয়ার্ত জাতিগুলোর শোচনীয় গাছটা ধরে নাড়াচ্ছে।
এই উপন্যাস পড়ে জানা যাবে আরাকানে বাস করা মুসলিমদের উপর কি অবর্ণনীয় নির্যাতন চালায় নাসাকা বাহিনী আর মায়ানমার সরকার।গৃহহীন হয়ে পালিয়ে বেড়ায় মায়ানমারের মুসলিম অধিবাসীরা।কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে মায়ানমার থেকে পালিয়ে এসে নতুনভাবে বাঁচার;যেন নির্যাতিত একটি বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে এই জনপদের মানুষেরা।
এভাবেই কাহিনি সামনে এগিয়ে যাবে। রাফিন নামের দেবদূতের মতো ছেলেটা কি পাবে সেই পান্ডুলিপি? বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কাহের সাহেব কিভাবে জড়িত এদের সাথে? কানা রাজার গুহায় কি আছে? সমস্ত ঘটনা ধীরে ধীরে জমে উঠেছে নাফ নদীর তীরে। কি ঘটছে সেখানে? শাহ সুজার ফেলে যাওয়া ধন-রত্নের সন্ধান নাকি এটাকে ঘিরে অন্য কোনও ইতিহাস ঘটছে নাফ নদীর তীরে?
দারুণ সুখপাঠ্য এক বই। ২০২০সালের বই পড়ার তালিকায় রাখতে পারেন এই বইটি। সবাইকে পড়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

আরও পড়ুন