সৈয়দ আবুল মকসুদের প্রতি শ্রদ্ধা

নুরে আলম মুক্তা

একজন মানুষ একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেন। এটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে বলা মনে হয় আমার অরন্যে রোদন কিনা জানি না। কিন্তু তার পরেও বলে যাবো। বলতে বলতে যত দিন যায় যাক, যত প্রহর কাটে কাটুক। বলা বন্ধ করে দিলে সমস্যা বেড়ে যাবে। সবাই যদি নিশ্চুপ হয়ে যাই তবে কি পরিস্থিতি হতে পারে তা সময় জানে? সৈয়দ আবুল মকসুূদ ছিলেন এরকম একজন মানুষ। বিবেক তাড়িত হয়ে কথা বলতেন। সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতির বিরুদ্ধে বলতেন। আমি টিভির সামনে বসি না।

কেন বসিনা তা অনেকেই জানেন। আমাকে তেমন কোন অনুষ্ঠান টানে না। সৈয়দ আবুল মকসুদ কথা বললে আমি শুনতাম। বাচন ভঙ্গি আর যুক্তিগুলো প্রান ভরে উপভোগ করতাম। আমার নিত্যদিনের অভ্যাস বিভিন্ন দৈনিক উল্টেপাল্টে ভালো কলামগুলো দেখা। বেশ কয়েকজনের কলাম একনিশ্বাসে পড়তাম।

সৈয়দ আবুল মকসুূদের কলাম নিয়মিত আমাকে টানতো। কেন টানতো? আসলে বাঙালী মধ্যবিত্তের যা খোরাক তার বৃত্ত থেকে আমিও বের হতে পারিনি। আমরা রাজনীতি, সাহিত্য, সমসাময়িক বিষয় একসাথে পেতে চাই। সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখায় এগুলো প্রধান উপজীব্য ছিলো। তিনি মনে প্রানে একজন বাংলাদেশি ছিলেন। 

দেশপ্রেম আর ভাষার প্রতি কতটুকু সম্মান থাকলে মানুষ হওয়া যায় তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন। আমি তাঁর কথা বলার ধরণটি বার বার খেয়াল করতাম। তাঁর কলামগুলোর মতোই তাঁর কথা বলা, ঋজু কিন্তু অত্যান্ত শক্তিশালী। একটি কথা একবার বলতেন, সাবলীল ভাবে বলতেন, শ্রদ্ধাভরে শুনতেন। সারাদিন শোনা যায় কথা মালা এরকম শব্দের পর শব্দ সাজাতেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখা বিভিন্ন মনীষীদের জীবনী আর কর্ম বেশ বড় রকমের বাংলা ভাষার সম্পদ। মাওলানা ভাসানী, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, বুদ্ধদেব বসু, জার্মানির ভ্রমণকাহিনী বেশ সুখপাঠ্য আর উঁচুমানের গ্রন্থ। তিনি কবিতাও লিখেছেন বেশকিছু।

২০১৬ সালে দৈনিক প্রথম আলোতে আনিসুক হকের লেখা পড়ে আমি জানতে পারি মকসুদ ভাই কেন সাদা এহরামের পোশাক পরেন। আসলে মানুষ একটি পর্যায়ে চলে গেলে আর পোষাকের আবেদন থাকে না।

২০০৩ সালে আমেরিকা কর্তৃক উপসাগরীয় যুদ্ধে মারাত্মক আগ্রাসনের ফলে সৈয়দ আবুল মকসুদ মারাত্মক আহত হন। আমেরিকা অযথা ইরাকের ওপর জীবানু অস্ত্র থাকার খোড়া অজুহাত দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেলভান্ডারের ওপর কর্তৃত্ব করার জন্য আক্রমন চালায়। সহজ সাদ্দাম ঐ ফাঁদ ভেদ করতে পারেনি। এটির প্রতিবাদ হিসেবে পাশ্চাত্যের সেলাই করা পোষাক তিনি বর্জন করেন। আসলে আমাদের মতো মানুষের তাছাড়া কিইবা করার আছে। সৃষ্টি কর্তার নিকট প্রার্থনা আর নিজের যা কিছু তা দিয়ে প্রতিবাদ। সবখানে মকসুদ ভাই ও পোষাকেই যেতেন।

আমি বিস্মিত হতাম তিনি রাজপথেও ঐ পোশাকে বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতিবাদ জানাতেন। দাঁড়িয়ে থাকতেন হিমালয়ের শ্বেত সফেদ বরফের মতো সাদা দুটুকরো বস্ত্র শরীরে জড়িয়ে। মার্জিত আর ভদ্রতার এক অবিচল প্রতীক হিসেবে। ১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়ে জন্ম গ্রহন করেন মকসুদ ভাই। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিলো পারিবারিক নাপিতের কাছে। পরে পঞ্চম শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষা নেন পারিবারিক ডাক্তারের কাছে। বিদ্যালয়ে একবারে ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে প্রবন্ধকার, কলামিস্ট আর কবি হয়ে ওঠেন এ বিদগ্ধ পন্ডিত। গবেষনা প্রবন্ধ লিখেছেন অনেক। প্রকাশনা রয়েছে চল্লিশটিরও বেশি গ্রন্থের। কাব্য গ্রন্থ ‘দারা শিকোহ ও অন্যান্য কবিতা’। ১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘকাল বাসসে চাকরি করেছেন। দৈনিক প্রথম আলোতে নিয়মিত কলাম লিখতেন। 

বিবাহিত জীবনে এক পুত্র ও কন্যার জনক। নিরহংকারী এ পুরুষ ৭৪ বছর বয়সে ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২১ আমাদের ছেড়ে পরলোকে আচমকা চলে গেলেন। তাঁর সন্তান সৈয়দ নাফিস মকসুদ জানান হঠাৎ শ্বাস কষ্টের জন্য সৈয়দ মকসুদকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আমরা বঞ্চিত হলাম একজন বিবেকবান নিরহংকারী মানুষের সঙ্গ থেকে। আমরা যদি তাঁর নিকট থেকে সামান্য হলেও অনিয়মের প্রতিবাদ ভাষা শিখে থাকি তবে সৈয়দ আবুল মকসুদের আত্মা শান্তি পাবে। মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট আমাদের আকুল আবেদন তাঁর আত্মা যেন শান্তিতে থাকে।

লেখকঃ কবি,সাহিত্যিক,অনুবাদক ও সহ-সম্পাদক।

 

আরও পড়ুন