মহীয়সী মা তোমায় সালাম

-নুরে আলম মুকতা

(কবি বেগম সুফিয়া কামালের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি)

“কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী-
গিয়াছে চলিয়া ধীরে
পুস্প শূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে ।
তাহারেই পড়ে মনে
ভুলিতে পারি না কোনো মতে”

আব্বা যেমন পড়াতেন তেমনি পড়াচ্ছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আমার একজন খালামনি আর একজন ফুপু ছিলেন। আব্বার ঠাট্টা সম্পর্কের, দারুন প্রিয়। কিন্তু আব্বাতো দারুন রাশভারী লোক ছিলেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাবশিষ্য। শিলিগুগুড়ি ইউনিভার্সিটির বাংলা ব্যাকরনের ডিগ্রীধারী। ইংরেজি,আরবী আর উর্দুতেও সমান পান্ডিত্য ছিলো আব্বার। আমার তখন আর কত বয়স হবে? হাইস্কুলে পা দিয়েছি মনে হয়। কবিতা বা ছড়া সম্পর্কে ধারনাগুলো এরকম ছিলো যে, ওটা আনন্দের। ছন্দময় কিছু শব্দমালা বৈ কিছু নয় । আব্বা পড়াতে পড়াতে হঠাৎ পরিবেশটুকু কেমন ভারী হয়ে গেলো। আম্মা কি যেন কাজে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন। আমার খালা আর ফুপু আব্বার সাথে সাথে চোখে জল। স্তব্ধ চারপাশ। শেষ পর্যন্ত আমি শুনে গেলাম। আব্বা বেগম সুফিয়া কামালের “তাহারেই পড়ে মনে পড়াচ্ছিলেন।
আমাদের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে পন্ডিতগন তিনভাগে ভাগ করেছেন। আদি যুগ, মধ্যযুগ আর আধুনিক। ভাষা সব সময়ই বিজ্ঞানময়। এর চলার পথ পরিক্রমায় বিভিন্ন চড়াই উৎরাই আছে। কিন্তু উৎপত্তি আর বিকাশের ধারাটি একটি নিয়ম মেনে চলে আসছে। আমাদের বাংলা ভাষাও তাই। সংমিশ্রিত হয়েছি আমরা কিন্তু স্বকীয়তা বিসর্জন দিইনি। আমাদের বাংলাদেশের বিষয়টি আরো মজবুত। একক জাতিগোষ্ঠী, একক ভাষা, একক সংস্কৃতি। এরকম ভৌগোলিক অবস্থানগত দেশ পৃথিবীতে বিরল। আমাদের দেশ থেকে অনেকে নিয়ে গিয়েছে। আমরা নিয়ে আসিনি। দিয়েছি অনেক, নিইনি কিছুই। বরং যারা এসেছিলো তারা রেখে গিয়েছে। এ ঘটনাটিও কম। আমাদের বাংলা ভাষায় নারী কবিদের যে দৃপ্ত পদচারণা তা উল্লেখ করার মতো। ক্ষুদ্র পরিসরে মহীয়সীদের সম্মান জানানো কতটুকু সম্ভব? আজ আমরা সংক্ষিপ্ত করি, পরে কোন এক অবসরে আলাদা আলাদা করতে পারি। প্রথমে মা চন্দ্রাবতী (জন্ম-১৫৫০-মৃত্যু১৬০০)কে স্মরন না করলেই নয়, মৈমনসিংহ গীতিকার মলুয়া কাব্য তাঁর লেখা আমাদের বিশাল সম্পদ। দস্যু কেনারামের পালা সম্পর্কে না জানলে বাংলার একটি অধ্যায় অসমাপ্ত রয়ে যাবে। মা কামিনী রায় (জন্ম-অক্টোবর১২,১৮৬৪ মৃত্যু-১৭ সেপ্টেম্বর১৯৩৩) সম্পর্কে নতুন করে বলার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না, “আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে,সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।” কত বার চিৎকার করে মা মা বলে ডাকলে কামিনী রায়ের প্রতি সুবিচার হবে তা আমার জানা নেই। কুসুম কুমারী দাস একজন বিস্ময়কর রত্নগর্ভা (জন্ম-২১সেপ্টেম্বর১৮৭৫ মৃত্যু-২৫ ডিসেম্বর১৯৪৮) বাংলা ভাষায় কাব্যের এক মহাপুরুষের জন্ম দিলেন। জীবনানন্দ দাসের গর্বিত মাতা লিখলেন, “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?” মা আমরা আশীর্বাদ চাই। আমরা যেনো মানুষ হতে পারি। মাঝখানে একজনের কথা বললে তো পড়ার আর ধৈর্য থাকবে কি? বেগম রোকেয়া (জন্ম-১৮৮০,মৃত্যু -১৯৩২,জন্ম আর মৃত্যুদিন একই ০৯ ডিসেম্বর) নিজেই এক বিশাল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। তাঁর লেখা আর কর্ম কদিন পরেই আলোচনা করা যাবে। আধুনিক যুগে মা মহীয়সী বেগম সুফিয়া কামাল (জন্ম-জুন২০,১৯১১ মৃত্যু-২০ নভেম্বর১৯৯৯) যে কাব্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তা বাংলা ভাষা সাহিত্য চিরদিন স্মরণ করবে। মজার বিষয় হলো, কুসুম কুমারী,কামিনী রায় আর সুফিয়া কামাল তিন উজ্জল নক্ষত্রের জন্ম ধান নদী খালের বরিশালে। মেঘনা,আঁড়িয়াল খাঁ আর কীর্তনখোলার জল এতো অমৃত! বিস্ময়কর! সুফিয়া কামালের সাহিত্য সাধনার প্রধান পৃষ্ঠপোষক আর উৎসাহদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেন ১৯৩২ খৃষ্টাব্দে আকস্মিক ইহলোক ত্যাগ করেন। মহীয়সীর জীবন ও কাব্য চর্চায় নেমে আসে বিষন্নতা। এ বিষন্নতা জন্ম দেয় বাংলা ভাষার এক মহাকাব্য। আমরা যে কবিতাংশ দিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ করি তাঁকে দিয়েই,”তাহারেই পড়ে মনে,ভুলিতে পারি না কোনোমতে। ” মহীয়সী মা তোমায় সালাম।

আরও পড়ুন