যুগের সমাপ্তি

(মহান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত)

নুরে আলম মুকতা

আমি প্রায়ই ভেবে ভেবে ক্লান্ত হয়ে পড়ি যে কেমন করে,  একজন মানুষকে সাহিত্য আর সংস্কৃতি চর্চায় আগ্রহী করে তোলা যায়। বই মুখী করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারলে যে অনাবিল লাভ তা বোঝানো সত্যিই আমার জন্য দুঃস্কর হয়ে যায়। মানুষ বৈষয়িক ভাবনাটিকে সামনে নিয়ে চলে আসে। আমি অসহায়ের মতো বলি, মানবিক গুণাবলি বিকশিত না হলে আর যাই হোক মানুষ হওয়া যায় না। অনেক আপ্তবাক্য সামনে কিন্তু  অর্থ যোগ তো সরাসরি নেই। এজন্য জবাব দিতে পারি না। স্বপ্ন সামনে রেখে কেউ এগোতে চায় না। প্রায় সবাই  স্বপ্নের দ্রুত বাস্তবায়ন চায়। সুকুমার বৃত্তির উৎকর্ষতায় অর্থের যোগ নেই। অর্থের সাথে এর যোগ আছে। আমি টাকা দিলে বই কিনতে পারি। বিষয়টি ভিন্ন দিকে চলে যেতে পারে। এজন্য মনে হয় লেখাটির লাগাম টেনে ধরাই ভালো। বাংলা ভাষাভাষীদের নিকট বাংলা চলচিত্রের আবেদন কেমন আর কতটুকু তা আজ এর ক্রান্তিকালে বলতে শুরু করা কষ্টকর। আমি দেখেছি একজন ক্লান্তশ্রান্ত শ্রমিক সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যে বেলা প্রেমিকার হাত ধরে সিনেমার টিকিটের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। একটি টিকিটের জন্য কি যে  প্রানান্তকর চেষ্টা তা না দেখলে বোঝা দায়। মুভি আর সিনেমার ও দিন আর নেই। ভিজ্যুয়াল পর্দা আছে কিন্তু ছোট হয়ে বিভিন্ন মাত্রায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। আমাদের যে সময়ে বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো ঐ সময়ে আমরা নায়ক রাজ রাজ্জাক, ববিতা,সুচিত্রা, সুচান্দা,রোজিনাদের নিয়ে থাকতাম। একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে বন্দি ছিলো আমাদের আনাগোনা। মহানায়ক উত্তম-সুচিত্রাদের মানস সরোবরে অবগাহন করে সৌমিত্র-শর্মিলাদের স্বপনে আনতাম। অরুন কুমার চট্টোপাধ্যায় তথা উত্তম কুমার বাংলা ভাষাভাষীদের নিকট যদি অপরিচিত হন তবে এক বিশাল ক্যানভাস চোখের সামনে থেক সরে যাবে। তাঁর জীবিতকাল ৩ সেপ্টেম্বর ১৯২৬ থেকে ২৪ জুলাই ১৯৮০। এ স্বল্পায়ু মানুষটি বাংলা চলচিত্রের এক মহাপুরুষ। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের পাশাপাশি আমরা যদি চলচিত্রে অস্কার না পেতাম তবে বাংলা ভাষা আর সাহিত্যের অদম্য ধারাটি কোথায় থমকে যেতো তা গবেষনার বিষয়। সত্যজিৎ রায়!  অসীম প্রতিভাধর এক বিস্ময়কর নাম! তিনি নায়ক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়  কে দিয়ে চলচিত্রের যে কাজ করিয়ে নিয়েছেন তা অবিস্মরণীয়। চলচিত্রে উপন্যাস,গল্প,কবিতা, সঙ্গীত এক সাথে যায়। এজন্য একটি ভাষাকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করতে চাইলে চলচিত্র একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আমরা কবিগুরু,বিমল,শরৎ,তারাশঙ্কর, জহীর রায়হান, শওকত ওসমান, আবু ইসহাকদের লেখার চিত্রায়ন দেখেছি। আমাদের মানসিকতার উন্মেষ ঘটেছে। বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর লেখা অশনী সংকেত তো একটি সার্থক উপন্যাস। এটি চিত্রায়ন করে সফল ভাবে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করেছিলেন সত্যজিত রায়। অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র আর আমাদের ববিতা। একটি চলচিত্র কেমন করে নির্মিত হয় তাও আমরা জেনেছিলাম Making a film নিবন্ধ পড়ে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বিশাল প্রতিভাধর অভিনেতারা সার্থক অভিনয় দিয়ে বাংলা ভাষা আর সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। সৌমিত্র আমাদের অহঙ্কারের নাম। তিনি জন্মগ্রহন করেছিলেন ১৯ জানুয়ারী ১৯৩৫ আর দেহত্যাগ করলেন ১৫ নভেম্বর ২০২০। আমাদের বাংলা ভাষায় নির্মিত চলচিত্র “দোসর,হারানো সুর,অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি,পথে হলো দেরি,অশনী সঙ্কেত,অপুর সংসার,চারুলতা,জয় বাবা ফেলুনাথ,হিরক রাজার দেশে,গণদেবতা, জীবন থেকে নেয়া, অবুঝ মন, যে আগুনে পুড়ি ” কত পরিশ্রম লব্ধ সোনালী নাম আমাদের চোখের তারায় নাচে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরা আমাদের পুরোধা। বাংলার লড়াকু সন্তান। ছোট পর্দায় ছোট হয়ে যাচ্ছে কি আমাদের হৃদয় আর মানসিকতা ? বেগবান হয়েছি আমরা কিন্তু মানবিক আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে। সময় হয়েছে মনে হয় সদ্য প্রয়াত স্বর্গীয় সৌমিত্র দের নতুন করে অনুকরণ করার। আমরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

১৭.১১.২০২০

নুরে আলম মুকতা কবি, সাহিত্যিক, অনুবাদক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী।

আরও পড়ুন