Ads

অতি কথন

                          “একটি সাহিত্য আড্ডা”
(এই প্রবন্ধ লেখার পেছনে যাঁদের নিরব উৎসাহ আছে তাঁরা হলেন মহীয়সীর জেনি আপা পরিচয় প্রাঙ্গণের সাবের ভাই ও মাতিউর ভাই ৷আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ ৷)
কলমেঃ শেখ তৈমুর আলম ৷
পর্বঃ ১
আড্ডা বলতে বুঝায় মাঠে ঘাটে বাটে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবসর সময়ে কিছু সংখ্যক সমমনা নারী পুরুষের একত্রিত হওয়া এবং আনন্দঘন পরিবেশে বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট বাক্য বিনিময়ের মাধ্যমে শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করা ৷সভ্যতার আদিকাল থেকে মানুষ এভাবে জীবন যাপন করেআসছে ৷কিন্তু
সাহিত্য আড্ডা সবকিছুকে ছাড়িয়ে স্বরুপে একটি ভিন্ন আঙ্গিকে নিজেকে প্রকাশ করে চলেছে ৷ফোটা ফুলের পাঁপড়ির ন্যায় একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে ৷এই সাহিত্য আড্ডায় যাঁরা অংশ গ্রহন করেন তারা কোন সাধারন ব্যক্তি নন ৷তাঁরা সবাই নিজ প্রতিভা গুনে আপন পরিমন্ডলে একেকজন আলোকজ্জ্বল তারা ৷
প্রত্যেকে নতুন নতুন কাব্যরসে সিক্ত হয়ে নিজের জ্ঞানভান্ডারকে পূর্ন করে জীবনী শক্তিতে প্রান সন্ঞ্চার করেন ৷আর এই সন্জীবনী সুধা অবশেষে সকলের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে নিজে হন পরিতৃপ্ত তা যে ধারার সাহিত্যানুরাগী হোননা কেন ৷সৃষ্টিকর্তা এসব সাহিত্যানুরাগীদের মস্তিষ্কে এমন কিছু রোপন করে দিয়েছেন যে তদ্দ্বারা নিজ তাগিদে কলমের আগায় জাতিকে অনবরত কলুষমুক্ত করে চলেছেন ৷
  শত বৎসর আগে রবীন্দ্রযুগে ঠাকুর বাড়ি বা প্রমথ চৌধুরীর বাসভূমে এমন আড্ডার প্রচলন ছিল ৷বড় বড় লেখক কবি সাহিত্যিক সেখানে মনের মাধুরি মিশিয়ে নিজের সৃষ্টিকে কাব্যরসে সিক্ত করে অপরের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে নিজে ধন্য হতেন ৷এরকম আড্ডায় থাকেনা কোন স্বার্থপরতা থাকেনা অন্যকে ডিঙিয়ে নিজের এগিয়ে চলার প্রবণতা ৷এঁরা শুধু সদাসর্বদা সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন৷এসব মনীষীদের সৃষ্টিশীলতার মূলে রয়েছে মানব ও প্রকৃতি প্রেম ৷এসব প্রেম ভালোবাসার মধ্যদিয়ে এঁরা জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা করেছেন  ৷
সাহিত্যের ফল্গুধারায় কেউ কেউ আনন্দ জোয়ারে ভেসে ভোগ বিলাসের মধ্যে জীবনের মানে খোঁজার চেষ্টা করেছেন ৷আবার কেউ নিমগ্ন হয়ে সুন্দরের ইস্ট দেবতাকে দেখতে চেয়েছেন৷একজন কবি সুনীল আকাশের দিকে চেয়ে বলেছেন—ঐযে নীল আকাশের বুকে পাখীর মত ডানা মেলে নানা আকৃতির উড়োজাহাজ শুভ্রমেঘের কোল ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছে তাকি শুধু বৈজ্ঞানিকের কীর্তি,তাতে কি সাহিত্যের কোন ছুঁয়া নেই ? হয়ত নেই হয়ত আছে ৷আর আছে বলেই যতদূর দৃষ্টি যায় সাহিত্যসেবীরা ভাল লাগার নেশায় উন্মাতাল হয়ে চেয়ে থাকে ৷তারা শুধু পাখি প্রকৃতি আর আকাশযানই নয়, বিশ্বচরাচরের সবকিছুতে সুন্দরের ইস্টদেবীকে দেখতে পান ৷সমুদ্রের সর্বগ্রাসী ঢেউ যতই ভয়াল থাবা নিয়ে এগিয়ে আসুক, ঢেউয়ের শুভ্র ফেনা হৃদয়কে গোধূলির আবিরে রাঙিয়ে তুলবেই
৷ এঁরা এমন এক সম্প্রদায় যাঁদের হিংসা বিদ্বেষ পরশ্রীকাতরতা স্পর্শ করতে পারেনা ৷এঁরা গোত্র বোঝেনা বর্ন বোঝেনা, দেশ কাল পাত্র বোঝেনা,দেশের সীমানা বোঝেনা ৷তারা তাদের সৃষ্টিকে আনন্দরসে আবৃত করে কাল থেকে কালান্তরে দেশ থেকে দেশান্তরে পুরো বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডে ছড়িয়ে দিতে চায় ৷আনন্দের এই উর্মিমালা শুধু যে বাঙ্গালীর বুকে সীমাবদ্ধ তা নয় সীমানা পেরিয়ে দেশে দেশে সকল কবি সাহিত্যিকের হৃদয়ে আন্দোলিত হয়৷
প্রশ্ন জাগতে পারে সাহিত্য কি ? কি এর ব্যপ্তি আর এর রূপ লাবন্যই বা কেমন ? উত্তরটা আমাদের সবারই জানা ৷ পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতির শোভার অন্ত নেই ৷সাগর তর্জন গর্জন করে ছুটে চলেছে দিক থেকে দিগন্তে ৷নদী কুল কুল ধ্বনি তুলে ধেয়ে চলেছে সাগর পানে৷ বনের বুক চিরে মর্মর ধ্বনি তুলে দক্ষিনের সমীরণ ৷ গ্রীষ্মের চম্পা থেকে শীতের গোলাপ পর্যন্ত যে বিচিত্র রংয়ের শোভা ছড়ায় তা প্রকৃতির রূপ লাবন্যকে মোহনীয় করে তোলে ৷ বিধাতা চেয়েছিলেন
পৃথিবী নামক সুন্দর একটি বাগান গড়তে ৷কিন্তু কোথায় যেন একটা শুন্যতা রয়ে গেছে ৷ অবশেষে সৃষ্টি করলেন মানব নামের এক মায়াময় জীব ৷ভিতরে  ঢুকিয়ে দিলেন চমৎকার একটি মন ৷
ভিতরে ঢুকিয়ে দিলেন চমৎকার একটি মন ৷সেই মনে দিলেন ভাল লাগা না লাগার এক যাদুকরী বৈশিষ্ট ৷ সেই থেকে সাহিত্যের সৃষ্টি ৷আসলে সাহিত্য কি, কি এর রূপ রস একথার উত্তর যেন গুটি কয়েক শব্দের মধ্যে বেঁধে রাখা সম্ভব নয় ৷ স্নেহ মায়া মমতা সুখ দূ:খ ব্যথা বেদনা আর হাসি কান্না থেকে সাহিত্যের আবির্ভাব ৷
বিধাতা মানুষের জন্য ভোগের অফুরন্ত সম্ভার এই মায়াময় পৃথিবীতে দান করেছেন ৷বিধাতার এই দান অকৃপণ হলেও মানুষের বেঁচে থাকার সময়টা মোটেও দীর্ঘ নয় ৷স্বল্প আয়ুর মানুষ তাই সব কিছু পেয়েও যেন কিছুই পায়নি ৷কবি সাহিত্যিকগন এর থেকে একটু ভিন্নধারায় প্রবাহিত ৷ তারা প্রত্যেকে নিজস্ব নিয়মে নিজের মত করে এই অল্প সময়ের মধ্যে জীবন ও যৌবনকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছেন ৷
মধ্যযুগের পারস্য কবি ওমর খৈয়ামকে আমরা কমবেশী অনেকেই জানি ৷তাঁর রহস্যাবৃত বিচিত্র জীবন কাহিনী সাহিত্যের এক বিরাট অংশ জুড়ে ব্যপ্ত
আছে ৷ নৈরাশ্যবাদ তাঁর জীবনকে বিচিত্র করে তুলেছে ৷তিনি জীবনকে খুব কাছ থেকে গভীরভাবে উপলব্দি করতে যেয়ে বার বার মনে হয়েছে কেন এই জীবন, মৃত্যুই বা কেন, আমরা মরে কোথায় যাই ?এই প্রশ্নের উত্তর কেউ তাঁকে দিতে পারেনি ৷তাই ওমর খৈয়াম বললেন, সব মিথ্যা, পৃথিবী মিথ্যা,সূর্য্য মিথ্যা পাপ পূন্য মিথ্যা তুমি মিথ্যা আমি মিথ্যা সত্য মিথ্যা মিথ্যা মিথ্যা ৷একমাত্র সত্য যে মূহুর্ত্যটি তোমার হাতের মুঠোয় এল তাকে চুটিয়ে ভোগ করে নাও ৷এই উপলব্দি থেকে তিনি তাঁর কাব্যে বার বার সরাইখানা সুরা ও সাকীর উল্লেখ করেছেন ৷
তিনি তাঁর রুবাইয়াতে বলেন——
বিদায় নিয়ে আগে যারা গেছে চলে হে সাকী
চির ঘুমে ঘুমায় তারা মাটির ঘরে হে সাকী
শরাব আনো,আসল সত্য আমার কাছে যাও শুনে
তাদের যত তথ্য গেল হাওয়ায় গলে হে সাকী ৷
তিনি আবার বলেছেন—–
কোথায় ছিলাম কেনই আসা- এই কথাটা জানতে চাই
জন্মকালে ইচ্ছাটা মোর কেউতো তেমন শুধায় নাই ৷
যাত্রা পূন: কোন লোকেতে ?প্রশ্নটা মোর মাথায় থাক
ভাগ্যদেবীর ক্রুর পরিহাস পেয়ালা ভরে ভোলাই যাক ৷
ভোগ বিলাসের মধ্যে এই ক্ষণকালীন জীবনকে বিলিয়ে দেয়ার মাঝে তিনি বেঁচে থাকার যথার্থতা খুঁজে পান ৷তার মতে এই ক্ষণকালীন জীবনে নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাঁকীর খাতায় শুন্য থাক ৷
আমাদের গ্রাম বাংলার পথে প্রন্তরে এমন অনেক ঘটনার জন্ম হয় যা সাহিত্যভান্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করে ৷সেই পথভুলা যুবকের মত ৷চৈত্রের দাবদাহে ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় শরীর জুড়িয়ে নিতে কখন যে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়েছে তা সে নিজেই জানেনা ৷তারই পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঠ পথ ধরে চলা মলিন বসনা গ্রাম্য কিশোরীর চকিত চাহনী যেন তার চলার ছন্দকে স্তব্দ করে দেয় ৷
দেহবল্লরির মনের কোনায় বিদ্যুৎপৃষ্টের মত কি যেন খেলে যায় ৷একি শিহরণ নাকি অন্য কিছু !সুখের না দু:খের সে বুঝতে পারেনা ৷কিশোরীমন বার বার ব্যকুল হয়ে উঠে ৷উদাসী দৃষ্টি ক্ষণে ক্ষণে ঐ যুবককে ছুঁয়ে যায় ৷কিন্তু কেন ? সে জানেনা বুঝতে পারেনা কি সে ব্যথা ৷সে তো লেখাপড়া জানেনা ৷সে শুধু জানে প্রকৃতিকে যার আঁচল ধরে বড় হয়েছে ভালোবাসতে শিখেছে ৷
অনেক পৌরাণিক কাহিনী থেকেও সাহিত্যের স্বাদ আস্বাদন করা যেতে পারে ৷মোট কথা মনের কোণে যে অব্যক্ত অনুভুতি লুকিয়ে আছে বিভিন্ন ঘটনাচক্রে তাই সাহিত্য হয়ে আমাদের সামনে ধরা দেয় ৷
পরিশেষে বলা যায় সাহিত্য জীবন জীবনই সাহিত্য ৷ আর এটি সৃষ্টি করেছেন একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহ ৷
ঃ শেষ ঃ

লেখকঃ শেখ তৈমুর আলম, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন