অনুভব

আরণ্যকে শবনমঃ

মাথার উপর সিলিং ফ্যান ঘুরছে বেশ স্পিডে,সলাতে দাড়িয়ে আতিকা তবুও প্রচন্ড ঘামছে। সারা শরীরে তাপমাত্রা এতো বেড়ে গিয়েছে মাথা ঘুরছে ভীষণ,সালাম ফিরিয়ে জায়নামাজের পাটিতেই বসে থাকে কিছুক্ষণ। মনে মনে ভাবে বিকেলে চা খেলে হয়তো মাথা ব্যথা একটু কমবে,কিন্তু সারাশরীরে বিবশ হয়ে থাকে।পা টলটল করে বাথরুমে যায় সে,কলের নিচে মাথা নামিয়ে দেয় চুল ধুয়ে নেমে আসে উত্তাপ।গামছায় চুল মুড়িয়ে ক্লান্ত শরীরে গা এলিয়ে দেয় সে।এতোক্ষণে কিছুটা আরাম বোধ হতে শুরু করেছে আতিকার।পাশের রুমে আহমদ পড়াশোনা করছে,খুউব গ্রীনটি খেতে ইচ্ছে করছে বলবে কী না সেটাই ভাবছে যদি ফোকাস নষ্ট হয়।দিনরাত কিসব প্রজেক্টের কাজ করছে,এটা শেষ করতে পারলেই নাকি পিএইচডি প্রোগামের জন্য আপ্লাই করতে সহজ হবে।সাত-পাঁচ ভেবে আতিকা চা খাবার চিন্তাটা বাদ দেয়,শুয়ে শুয়ে একটা গল্পের বই পড়বে ভেবে,বালিশের পাশে গোজা বইটা হাতে নেয়।নাআ, একদম পড়তে ইচ্ছে করছে না,শরীর মন কেমন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে আসছে।

অবসন্ন শরীরে কেমন সবকিছু গুছিয়ে করবার তাড়া,মন ভরে লিখতে ইচ্ছে করছে ওর।টেবিলে রাখা শখের ডায়েরী,নোটবুক আর কোনদিন কি পাতা ভরে লেখা হবে নাআআ,অনেক লিখতে চেয়ে কি সব খালিই রয়ে যাবে।প্রিয় লেখাগুলোয় চোখ বোলায় আতিকা,অনাগত সন্তানের কথা ভেবে কতো প্ল্যান,চিন্তা,প্যারেন্টিং টিপস,পড়াশোনা, নোটস লিখেছে বিগত ছয় মাস ধরে।সেসব দেখে কেমন অজান্তেই চোখ ছলছল করে উঠছে।

আহমদকে শত জোর করে বলার পরও, আতিকাকে হসপিটালে ভর্তি করাতে রাজি হয়নি।এমন নিদারুণ সময়ে সে সর্বোচ্চ পাশে থাকতে চায়,জীবনের সঞ্জীবনী সুধাই যদি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয় অনবরত। বেঁচে থাকা নিয়ে এতো আক্ষেপ,অস্হিরতা কেন!সারাদিন জায়নামাজে পরে থেকে দুহাত তুলে দু’আয় ডুবে থাকে দিনমান।কখনো ঔষুধ পথ্য আনতে বের হয়,রান্না করে।আতিকার হাত ধরে বারান্দায় বসিয়ে দিয়ে,বিকেলের অস্তমিত সূর্যের রাঙায় আলোয় এক কাপ গ্রিনটি’ খায় দু’জন।

এক সপ্তাহ পর। একদিন বিকেলে আতিকা শুয়ে আছে দূর্বল শরীরে, আহমদ জরুরী কাজে বাইরে গিয়েছে।আতিকা’র ভীষণ অস্হির লাগছিলো।কতো এলোমেলো ভাবনা’রা মাথায় আসে,
মুহূর্তে চেতনা শূন্য হয়ে যাবে নিথর হয়ে যাবে শরীর, প্রিয়জনকে চোখের সামনে পাওয়া যাবে না,শেষ নিশ্বাসের সময়ে কি এমন আয়োজন করে সব গুছায়ে যাওয়া যায়?আলমারীতে তুলে রাখা শখের ভাঁজ করা হিজাবগুলো পড়া হবে না,কলমদানীতে শখের কলম,আর্টের পেন,ক্যালিওগ্রাফির পেনগুলো দিয়ে এলোমেলো রং কাব্য আঁকা হবে না।সত্যিই কি সব ছেড়েছুড়ে হুট করে চলে যেতে হবে,আতিকা ভাবে,সকালে আহমদ তিলওয়াত করছিলো সেই আয়াতগুলো সূরা আত-তাকাসুরের,
أَلْهَىٰكُمُ ٱلتَّكَاثُرُ
حَتَّىٰ زُرْتُمُ ٱلْمَقَابِرَ
” প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে,যতোক্ষণ না কবরসমূহে তোমরা উপস্হিত হও…”
চারপাশে এতো দূর্যোগ,হাহাকার,মৃত্যুরা কেন ছুঁয়ে যায় না, হৃদয়কে….।অসুস্হতা আর অখন্ড অবসরে আতিকা সেটা ভেবে চলে। অনুক্ষণ ভাবে কখন না জানি সব মায়া, প্রীতি বন্ধন ছেড়ে তাকে সূদূরের পানে চলে যেতে হয়…!

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন