অপেক্ষা (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

-মুরশিদা সাথী

শ্রাবণ মাসের শেষ সপ্তাহ চলছে এখন। আকাশ এসময় পূর্ব সংকেত না দিয়ে হুটহাট তার রং বদল করে। কখনো মেঘাচ্ছন্ন আবার কখনো রোদ্রৌজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চারো দিকের গুমোট অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে আজ প্রকৃতির খুব বেশি মন খারাপ। সকাল থেকে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সাথে যদি মানুষের কষ্টগুলো ধুয়ে-মুছে যেতো কতই না ভালো হতো। কিন্তু তা কখনোই হয়ে উঠে না। শ্রাবণের প্রচন্ড বারিধারার সাথে রাবেয়া বেগমের চোখের পানি বরং তাল মিলিয়ে ঝরে। গত বারো বছর যাবত এমনিভাবে চলছে। বৃষ্টি তাঁর অসহ্য লাগে এখন। কারণ ঠিক বারো বছর আগে এমনই এক বৃষ্টির দিনে রাবেয়া বেগম হারিয়েছেন তাঁর নাড়ি ছেঁড়া একমাত্র মেয়ে নুহাকে। নুহা আদৌ বেঁচে আছে কিনা তিনি জানেন না। তবুও বারো বছর ধরে মেয়ের অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন রাবেয়া বেগম।

রাবেয়া ও রায়হান দম্পতির তিন সন্তান। দুই ছেলে, এক মেয়ে। দুই ছেলের পর একমাত্র মেয়ে নুহার জন্ম। নুহার জন্মের সময়  রাবেয়া বেগমের অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিলো যে সবাই তার বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলো। দীর্ঘ চিকিৎসার পর রাবেয়া বেগম সুস্থ হন। হয়ত ছোট্ট নুহার জন্যই রাবেয়া বেগমকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন তখন। সকলে এমনটাই বিশ্বাস করে। নুহার জন্মের পর রায়হান সাহেব ব্যবসা থেকে শুরু করে সব কাজেই সফল হতে থাকেন। তাই  নুহাকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে হতো সবার কাছে। ছোট্ট মেয়েটি ছিলো পরিবারের সকলের মধ্যমণি। তার ডাগরডাগর চোখের চাহনি, আদৌ আদৌ মুখের কথা আর পিক পিক হাসি রাবেয়া বেগমের সকল কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছিলো। হুড়োহুড়ি, ছোটাছুটিতে পুরো ঘর মুখোর করে রাখতো ছোট্ট নুহা। রাবেয়া বেগমের এখনো স্পষ্ট মনে আছে, ছোটবেলা নুহা যখন  তার ছোট ছোট কোমল হাত দুটি দিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে নানা বায়না করত। রাবেয়া বেগমের তখন কি যে ভালো লাগতো। তা পূরণ না করা পর্যন্ত শান্তি পেতেন না। নুহার প্রতিটি স্মৃতি এখনো জীবন্ত তাঁর কাছে।

সে বছর মাত্র দশম শ্রেণিতে  উঠেছিলো নুহা।বাড়ির পাশেরই এক মাদ্রাসায় পড়তো। পড়াশোনায়  ভালোই ছিলো। দেখতেও ছিল বেশ সুন্দরী। ওর সৌন্দর্য্য, আর বাবা রায়হান সাহেবের সম্পদের প্রতি লোভ এবং হিংসা ছিলো কাছের কিছু আত্মীয়-স্বজনের। তাই তারা নুহার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিতে থাকে তখন থেকেই ।কিন্তু নুহার বাবা-মা তাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। এই নিয়ে প্রায়ই নুহাকে নানাভাবে বিরক্ত করা হতো, রাজি না হলে তুলে নেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হতো। নুহা বেশ চাপা স্বভাবের হওয়ায়  বাবা-মা, ভাইদের কাছে বলতে গিয়েও পারেনি এসব।

সেদিন ছিলো শুক্রবার। সকাল থেকেই আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছিলো। বাড়িতে মা-মেয়ে দুইজন ছাড়া আর কেউ নেই। নুহা সিদ্ধান্ত নেয় তার মাকে আজ সব জানাবে। কিন্তু রাবেয়া বেগম অসুস্থ মাকে দেখতে এবং ভাইয়ের জরুরী কথা শোনার জন্য কাছেই বাবার বাড়ি চলে যান দুপুরের দিকে। নুহাকে যেতে বলেছিলো, শরীর ভালো না বলে যায়নি। রাবেয়া বেগম বাবার বাড়ি গিয়ে নুহার সহপাঠী ভাতিজির কাছে জানতে পারে গত কয়েকদিন ধরে নুহাকে কেউ ডিস্টার্ব করছে আর হুমকিও দিচ্ছে। ভাতিজির কথা শুনে রাবেয়া বেগমের বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে।এমনি গত দু’রাতের দেখা স্বপ্ন তাকে বেশ বিচলিত করে রেখেছে।ভেবেছিলো এখান থেকে যাওয়ার পথে ইমাম সাহেবের স্ত্রীর কাছে জানতে চাইবে এমন স্বপ্ন দেখার কারণ কী হতে পারে। তা আর হয়ে ওঠেনা। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি দ্রুত বাড়ির পথ ধরেন। বাড়ি এসে দেখেন ঘরের দরজা খোলা! নুহা ঘরে নেই। ভাবলেন আশে পাশে কারো ঘরে গিয়েছে হয়ত।  কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখলেন কারো ঘরেই নেই! ঘরে ঢুকে রাবেয়া বেগমের বুকের ভিতর কামড় দিয়ে উঠে। দেখতে পান মেঝেতে বেশ কিছু চুল পড়ে আছে এবং সেখানকার মাটি কেমন অসংলগ্ন! তখন থেকে পরিচিত, সম্ভাব্য প্রায় সব জায়গায় পাগলের মতো খোঁজা হয় নুহাকে। এমনকি পুকুরেও তন্নতন্ন করে খোঁজ করা হয় । কিন্তু কোথায়ও তার হদীস পাওয়া যায়নি।থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পুলিশ ধারণা করে তাকে কেউ জোর জবরদস্তি করে তুলে নিয়ে গেছে। সন্দেহ ভাজন কয়েকজনকে হেফাজতে নেয় পুলিশ কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ না পাওয়ার কারণে তাদের ছেড়ে দেয়। 

রাবেয়া বেগমের সেই যে কান্নার শুরু। আজ বারো বছর যাবত এতোটুকুও থামেনি। মেয়ে বেঁচে আছে না তাকে মেরে ফেলেছে সেই খবরটাও পরিবারের কেউ জানেনা। শুনে নুহার বাবা ও বড় ভাই বিদেশ থেকে চলে আসে। বাবা-মা, ভাইরা আদরের নুহাকে হারিয়ে প্রায় দিশেহারা। যেখানেই কোন লাশ পাওয়ার খবর শুনে সেখানেই তারা পাগলের মত ছুটে যায়। যদি অন্তত লাশটা পাওয়া যায়, সেই আশায়। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও নুহার সন্ধান দিতে পারেনি। দিনের আলোয় একটা জলজ্যান্ত মানুষ এভাবে উধাও হয়ে যাবে। এটা কী মেনে নেওয়া যায়?  কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, নুহার পরিবারকে এই সত্যটাই মেনে নিতে হচ্ছে! নুহা হারিয়ে যাওয়ার দু’দিন পর রহস্যজনক ভাবে বাড়ির পাশের মসজিদের ইমাম স্ট্রোক করে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে ইমাম সাহেব নুহার বিষয়ে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন স্ত্রীকে। কিন্তু বলতে পারেন নি। পুলিশ ও সাধারণ মানুষের ধারণা, নুহাকে যারা গুম করেছে ইমাম সাহেব হয়ত তাদের দেখে ফেলেছিলো। এ বিষয় জানাজানি হলে ক্ষতি কিংবা খুন করার হুমকি হয়ত দিয়েছিলো তারা। অতিরিক্ত মানসিক চিন্তা ও ভয়ে তাঁর স্ট্রোক হয়। ইমামের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একমাত্র এবং শেষ ক্লুটাও হাতছাড়া হয়ে যায়। অতঃপর নুহার ভাইয়ের করা অপহরণ মামলায় পুলিশ চারজনকে আটক করে। কিন্তু এতো বছর পরও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি! ফলে আইনের ফাক গলিয়ে আসামীরা জামিনে মুক্ত হয়ে যায়।

বারো বছরের মেয়েহীন সফরে রায়হান সাহেব ও রাবেয়া বেগমের চোখের আলো এখন ধূসর। তাদের জীবনে একমাত্র মেয়েটা ছিলো আঁধারে এক টুকরো নক্ষত্র। মেয়েকে হারিয়ে পুরো পরিবার কেমন অন্ধকারে আছন্ন হয়ে গেছে। স্ত্রী রাবেয়া যখন প্রায় রাতেই নুহা.. নুহা.. বলে চিৎকার দিয়ে উঠে  তখন নিজেকে খুব বেশি অসহায় মনে হয় রায়হান সাহেবের কাছে। স্ত্রীকে কি বলে সান্ত্বনা দিবে? যদি মেয়ের লাশটাও অন্তত পাওয়া যেতো। তবু না হয় কবর তো আছে এই বলে সান্ত্বনা দিতো! রায়হান সাহেবের এখন একটাই চাওয়া, মেয়ের এক টুকরো হাড় হলেও যেনো সন্ধান পায়….. অন্তত তা মাটি চাপা দিয়ে যদি বুকের কষ্ট  কিছুটা লাঘব হয়! কিন্তু রাবেয়া বেগম তো মা। মায়েরা কখনো সন্তানের অমঙ্গলের চিন্তা মাথায় আনতে পারে না। দীর্ঘ এক যুগ পেরিয়ে গেলোও তিনি আশায় বুক বেঁধে আছেন হয়ত কোন একদিন তাঁর মেয়ের খোঁজ মিলবে এই আশায়। রাবেয়া বেগমের অপেক্ষার অবসান আদৌ হবে কিনা কারো জানা নেই…..

(গল্পটি একুশে বইমেলা ২০২০ এ প্রকাশিত  “বৃত্ত-৩” গল্প সংকলনে প্রকাশিত) 

  • মুরশিদা সাথী সহ-সম্পাদক মহীয়সী।
আরও পড়ুন