ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসঃ পোপের যুগ

এম আর রাসেল 

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস দুই বোন পড়ছিলাম। নীরদের একটি সংলাপে এসে থমকে দাঁড়ালাম। দেখ উর্মি, ‘মনটাকে পথে চলতে চলতে কেবলই চলকিয়ে ফেলো না, পথের শেষ প্রান্তে যখন পৌঁছাবে তখন ঘড়াটাতে বাকি থাকবে কি। তুমি প্রজাপতির মতো চঞ্চল হয়ে ঘুরে বেড়াও, কিছুই সংগ্রহ করে আন না। হতে হবে মৌমাছির মতো। প্রত্যেক মুহূর্তের হিসেব আছে। জীবনটা তো বিলাসিতা নয়।’  

নীরদের সংলাপ পড়ে আমার অগাস্টান যুগের লেখক আলেকজান্ডার পোপের কথা মনে পড়ল। তাঁর কবিতার দুটি লাইন স্মৃতিতে মজুদ আছে।  

“In the nice bee, what sense so subtly true

From pois’nous herbs extracts the healing dew”

মৌমাছির মতো হলে লাভ বৈ ক্ষতি নেই। চারপাশে বিরাজমান সবকিছুর মাঝ থেকে উত্তমটাকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরির প্রয়োজন রয়েছে। এমন মানসিকতার চাষাবাদ সবাই করতে পারে না। এর জন্য সাধনার পথে অবিরাম চলতে হয়। ভেবে দেখতে বলি আমরা সেই সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি কি? 

আলেকজান্ডার পোপের কথা যখন চলেই আসল, তখন তাঁর সম্পর্কে কিছু বিষয় বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তাঁর নামে ইংরেজি সাহিত্যের একটা যুগের নামকরণ করা হয়েছে। 

বুদ্ধির সাথে ভাববাদের সমন্বয়ে নীতিবোধকে জাগ্রত করার পদ্ধতি এই যুগের আকর্ষণীয় সৃষ্টি। বিষয়টি বুঝতে এডিসন-এর একটি আপ্তবাক্যের দ্বারস্থ হওয়া যাক। তিনি লিখেছেন, “To enliven morality with wit and temper wit with morality.” কৌতুকরসের মাধ্যমে নীতিবোধ, নীতিবোধের মাধ্যমে কৌতুকরস বিষয়টি কিন্তু চমৎকার। 

এ যুগেই প্রথম ইংরেজ উপন্যাস পামেলা প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্য লেখার নতুন একটি ধরণের আবির্ভাব ঘটে যাকে বলা হয় Epistolary Novel বা পত্রপোন্যাস। বাংলা সাহিত্যের প্রথম পত্রপোন্যাস হিসেবে কাজী নজরুলের ‘বাঁধনহারা’ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। 

এ যুগেই ড্যানিয়েল ডিফোর বিখ্যাত রবিনসন ক্রুসো রচিত হয়েছিল। ইংরেজি সাহিত্যের অগাস্টান যুগকে Age of pope ও বলা হয়। এ যুগের লেখকরা ইতালির সম্রাট অগাস্টাস-এর আমলের লেখকদের অনুসরণ করেছিলেন। এই জন্যই এই নামকরণ। এর ব্যপ্তিকাল ছিল ১৭০০ সাল থেকে ১৭৪৫ সাল পর্যন্ত। রোমান সভ্যতার সেরা কবি ভার্জিল ও হেরেসের অনুকরণে এই সময় ইংরেজ সাহিত্য সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে পোপ এই ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি অনুবাদ করেছেন। 

পোপ যখন সাহিত্য চর্চা শুরু করেন তখন ইংরেজদের স্মৃতিতে ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব, মিল্টনের অমর কাব্য, লকের দর্শন, নিউটনের আবিষ্কার প্রভৃতি দীপ্তি ছড়াচ্ছে। ১৬৮৯ সালে Bill of Rights স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র সংকুচিত হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে নতুন সাজে সেজে উঠতে থাকে। এক সময়ের জীর্ণ – শীর্ণ লণ্ডন শহর প্রাণ- প্রাচুর্যে সজীব হয়ে উঠে। 

লন্ডনের জৌলুসহীন অবস্থার কিছু তথ্যও জানা থাকা দরকার। অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বের লন্ডন শহরের রাস্তাগুলো খুবই সংকীর্ণ ছিল। গাড়ি চলাচলের জায়গা পাওয়া যেত না। বাড়ির খোলা জানালা দিয়ে ময়লা রাস্তার উপর ছুঁড়ে ফেলা হতো। বর্ষাকালে সারারাস্তা কালো জলের স্রোতে ভরে যেত। জলের সাথে ময়লা আবর্জনা হু হু করে টেমস নদীতে গিয়ে পড়ত। রাতে লন্ডন শহরে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল না। 

ভদ্র বাড়ির সন্তানেরা মেয়েদের প্রতি অশোভন আচরণ, অঙ্গভঙ্গি করে কটূক্তি করতো। ছিনতাই এড়ানোর জন্য লন্ডন বাসীরা পথ ছেড়ে জলপথেই বেশি যাতায়াত করতো। লন্ডনের বাড়ির দরজায় নম্বর দেয়া থাকত না। কারণ অধিকাংশ মানু্ষই অশিক্ষিত ছিল। প্রকাশ্যে পথের উপরই বেচাকেনা হতো। কিন্তু দ্রুতই এই অবস্থার পরিবর্তন হয়। লন্ডন জৌলুসময় হয়ে উঠে। পরে একটি কথার প্রচলন হয়, “He who is tried of London is tried of life”.  

অস্টাদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইংল্যান্ড ইউরোপের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্ররূপে গড়ে উঠতে শুরু করে। ব্যবসা বাণিজ্য সূদূর প্রাচ্যদেশেও বিস্তৃত হয়েছিল। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে রকমারি পণ্যে বাজার ছেয়ে যেতে লাগল। কৃষিতে উন্নতি ঘটল। রকমারি আসবাব পত্রে গৃহ সজ্জিত হতে লাগল। লন্ডন শহরে অসংখ্য কফি হাউজ গড়ে উঠল। রানি অ্যানির রাজত্বকালে লন্ডন শহরে প্রায় ৫০০ কফি হাউজ গড়ে উঠেছিল। 

১৭০২ সালে প্রথম ইংরেজি পত্রিকার আত্নপ্রকাশ ঘটে। কফি হাউজগুলোতে  জ্ঞানের বিতরণ চলে। যুক্তি তর্কের মধ্য দিয়ে ইংরেজ মানসে বিজ্ঞানের আলোকে আলোকিত হয়ে উঠে। 

কফি হাউজগুলোতে জমজমাট আড্ডার আসর জমতো। নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক হতো। যুক্তির কঠোর কষাঘাতে যে কোন বিষয়কে চূর্ণবিচূর্ণ করা হতো। এ জন্য অষ্টাদশ শতাব্দীর কালকে Age of Reason বা যুক্তির যুগও বলা হয়। 

এখানে বলে রাখি, পোপের যুগেই রানি অ্যানি ১৭০২ সালে স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ড একত্র করে গ্রেট ব্রিটেন গঠন করেব। এ যুগে আলেকজান্ডার পোপের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাহিত্যিক ছিলেন জোনাথন সুইফট, ড্যানিয়েল ডিফো, স্যামুয়েল রিচার্ডসন, জোসেফ এডিসন, রিচার্ড স্টিল। 

এই সময়ে সাহিত্য চর্চায় কিছু সাময়িক পত্রিকার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। পোপ ‘মার্টিন স্ক্রিবলার্স ক্লাব’ নামে  সাহিত্য চক্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ক্লাবের বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন জোনাথন সুইফট।

এই ক্লাবের সদস্যদের অনুপ্রেরণাতেই জোনাথন সুইফট ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’ রচনা করেছিলেন। বাংলায় ‘গালিভারের সফরনামা’ নামে বইটির অনুবাদ করেছেন আবুল মনসুর আহমদ।  

১৭০৯ সালে দি ট্যাটলার নামে একটি পত্রিকার আত্নপ্রকাশ ঘটে৷ বেশ কিছুদিন চলার পর এই পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। এর পর The Spectator নামে নতুন একটি পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। 

দুটি পত্রিকার সাথেই জোসেফ এডিসন ও রিচার্ড স্টীল জড়িত ছিলেন। পত্রিকা দুটি সে যুগের মধ্যবিত্ত মানুষের মনোরঞ্জন, রসপিপাসা এবং চাহিদা মেটাতে সক্ষম হয়েছিল। সব কিছু ছাপিয়ে এই সময়ে পোপই ছিলেন প্রধান। এজন্যই তার নামে একটু যুগের নামকরণ সম্ভব হয়েছে। 

প্রতিভাবান এই কবির সাহিত্যকর্ম নিয়ে সংক্ষিপত কিছু তথ্য জানিয়ে এই লেখার সমাপ্তি টানবো। পোপের রচনাকে শীতল ঘোষ তার ‘ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস’ বই-এ মোটামুটি তিন অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। 

এক. ১৭০৩ থেকে ১৭১২. এই সময়কাল ছিল রানি অ্যানির রাজত্বকাল। এই সময়ের মধ্যে পোপ রচনা করেছেন,  Pastoral, Windsor Forest, Eassay on Criticism, The Rape of the Lock. 

দুই. ১৭১৫ – ১৭২৫. এই সময়কাল রাজা প্রথম জর্জ এর রাজত্বকাল। এই সময়ে তিনি হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি অনুবাদ করেছেন।

তিন. ১৭২৬- ১৭৪৩. এই সময়কালে তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও নীতিমূলক কাব্য লিখেছেন। এ সময়ের রচনা করেছেন The Dunciad, Moral Eassays, Eassay on man, prologue to staires.

পোপ Mock herioc রীতি অনুসরণ করে কাব্য রচনা করেছেন। আবার কবিতায় Heroic couplet ও ব্যবহার করেছেন। শেষ করার আগে পোপের কবিতার কয়েকটি লাইন স্মরণ করিয়ে দিতে চাই৷ 

“A little learning is dangerous Thing;

Drink deep, or taste not the Pierian Spring:

There shallow Draughts intoxicate the Brain,

And drinking largely sobers us again” 

গ্রিক পুরাণে প্রাচীন মেসিডোনিয়ার পাইয়েরিয়া নগরে একটি ঝরণা ছিল। কবিতায় একে পাইয়েরিয়ান স্প্রিং বলা হয়েছে। এই ঝরণা থেকে কেউ যদি অল্প পান করে, নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আবার যে কিনা ঝরণাটি থেকে যথেষ্ট পান করে সে বেশ তৃপ্ত প্রশান্ত থাকে।

আমাদের সবার জানাটাও যেন গভীর হয়। লোক দেখানো বিদ্যা অর্জন আর যাই হোক মানসিক মুক্তি দিতে পারে না। আপ্তবাক্যটি মাথায় রেখেই জানার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ আমি তৃপ্ত ও প্রশান্ত হতে চাই। 

লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন