কবি আল মাহমুদঃ ‘আমাকে তোমার পাঠ করতেই হবে’

-এম আর রাসেল

আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের একজন কালজয়ী প্রতিভা। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ থাকলেও কবি হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। তিনি একবার বলেছিলেন,

‘আর কেউ কি আরেকটি সোনালী কাবিন লিখতে পেরেছে?’ 

আল মাহমুদ

কবির এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সকলেরই জানা। বাংলা সাহিত্যে সোনালী কাবিন একটিই। এর সমতুল্য কোন কাব্যগ্রন্থ এখনও সৃষ্টি হয়নি। কবি আসাদ চৌধুরী বলেছেন,

‘আমি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে দেখেছি সোনালি কাবিন তাদের মুখস্থ’। – আসাদ চৌধুরী

কবি নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। কবির কাছে কবিতাই ছিল অন্য সকল কিছুর উপরে। তিনি লিখেছেন,

‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার’।- আল মাহমুদ

প্রথম জীবনে তিনি বামপন্থী চিন্তাধারা লালন করতেন। তাই প্রথম দিকের রচনাগুলোতে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীতে কবির লেখনীতে ইসলামী ভাবধারা সজীবতর হয়ে উঠে। কবির বাণী –

‘অথচ ঘুমের মধ্যে কারা যেনো, মানুষ না জ্বীন
আমার কবিতা পড়ে বলে ওঠে আমিন, আমিন।’

আল মাহমুদ

সত্যিই তো আজ কবির অনেক কবিতা পড়েই মুসলিম তরুণ আমিন আমিন বলে। এর জন্য কবিকে অনেক কটূ কথাও শুনতে হয়েছে,মৌলবাদী তকমাও পেতে হয়েছে। তিনি এর প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন,

‘দাড়ি রাখলে আর ধর্মভীরু হলে যদি কেউ মৌলবাদী হয়, তবে অবশ্যই আমি মৌলবাদী’।

আল মাহমুদ

একজন কবিকে মৌলবাদী ট্যাগ লাগিয়ে দেয়ায় কি কারণ থাকতে পারে? এ নিয়েও একটু আলাপ হওয়া দরকার। ধর্মীয় বিষয়কে ভিত্তি করে কাব্য রচনার রেওয়াজ অনেক পুরনো। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস তো পুরোটাই ধর্মীয় বিষয়কে প্রাধান্য করেই বিকাশ লাভ করেছিল। প্রাচীন যুগের চর্যাপদ, মধ্য যুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল প্রভতি প্রায় সকল সৃষ্টিকর্মেই ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে। রামায়ণ,মহাভারত ও মধ্য যুগেই বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগের সাহিত্যকর্মেও ধর্মের প্রভাব ছিল। বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবদ কাব্য’। এই সাহিত্যের মূল উপকরণ তো রামায়ণ থেকেই নেয়া হয়েছে। আধুনিক উপন্যাসের পথিকৃৎ বঙ্কিমচন্দ্র তো সাহিত্যের মধ্য দিয়ে একটা ধর্মীয় মতাদর্শই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। যার সার্থক রূপায়নে আত্ননিয়োগ করেছে ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

রাজা রামমোহনের ‘ব্রাক্ষসভা’, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ এসবের মূল উদ্দেশ্যও ছিল ধর্মীয় মতবাদ প্রচার। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের মাঝেও ধর্মীয় দর্শন পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যের বাইরে দৃষ্টি দিলেও একই বিষয়ের অবতারণা দেখতে পাওয়া যায়। গ্রীক সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্যেও ধর্মের আবেদন হারিয়ে যায়নি। ইতালীয় সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’। বিশ্বখ্যাত এই জাত মহাকাব্যের বিষয়বস্তুও ধর্মীয় বিষয়কে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। দান্তে এই কাব্যের মূল রসদ সংগ্রহ করেছেন ইসলাম ধর্মের হাদীস ও ‘কিতাব আল মিরাজ’ নামক গ্রন্থ থেকে।

ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত মহাকাব্য মিল্টনের ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ এর বিষয়বস্তুর মাঝেও ধর্মের প্রভাব রয়েছে। উদাহরণ খুঁজলে এমন অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যাবে। জগতখ্যাত এই সব সাহিত্যকর্মের রচয়িতাকে নিয়ে স্তুতিগান হয়। সাহিত্যের সমৃদ্ধিতে তাদের ভূমিকাকে  নিশ্চয় আমরা মৌলবাদের তকমা দিয়ে ভূষিত করি না। তবে ইসলাম ধর্মের ঐতিহ্য পুরাণ নিয়ে সাহিত্য রচিত হলেই তাকে কেন মৌলবাদের লেবাস লাগিয়ে দেয়া হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের সকলেরই অনুসন্ধান করা উচিত।

আল মাহমুদের প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, ‘সোনালী কাবিন’ নিয়ে যত মাতামাতি হয় অন্য কাব্য নিয়ে ততটা হয় না। এই তিন কাব্যের স্রষ্টা আল মাহমুদ সকলের কাছে প্রশংসার পাত্র। অন্য সব কাব্যের স্রষ্টা আল মাহমুদ কেন সকলের কবি নয়? এই প্রশ্নের উত্তরও জানা প্রয়োজন।

প্রথম তিনটি কাব্য রচনার সময় আল মাহমুদ প্রগতিশীল ছিলেন। আর যখনই ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’ লিখলেন তখনই হয়ে গেলেন প্রতিক্রিয়াশীল। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় ‘প্রগতিশীল থেকে মৌলবাদী’। এই কারণে ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’ নামক বই এ ৪৪ জন কবির স্থান হলেও আল মাহমুদের স্থান হয় নি।

এসব দেখে মনে হয়, ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধাচারণই যেন প্রগতিশীলতার  মূল মন্ত্র। কেননা এইসব প্রগতিশীল শ্রেণী অন্য ধর্ম নিয়ে ঠিকই কথা বলছেন। ইসলাম নিয়ে আলোচনা করলেই কেন প্রতিক্রিয়াশীল বা মৌলবাদী হতে হবে? এসব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বলি। কবি কেন ইসলামী ভাবধারার দিকে ধাবিত হয়েছিলেন? এর একটি জবাব তিনি ২০০৫ সালে বিবিসি বাংলাকে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন,

‘আমি যে পরিবারে জন্মেছি তারা সবাই ছিল খুবই ধর্মপ্রবণ লোক। কিভাবে যেন তাদের মধ্যেই যে রয়েছে সত্যিকারের পথের ঠিকানা এটা আমাকে দূর থেকে ইশারায় ডাকতো’।

আল মাহমুদ

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখক, সমালোচক শিবনারায়ণ রায় বলেছিলেন,

‘বাংলা কবিতায় নতুন সম্ভাবনা এনেছেন আল মাহমুদ, পশ্চিম বাংলার কবিরা যা পারেনি তিনি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন।’ – শিবনারায়ণ রায়

এর পরও কবিকে অবহেলিত হতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে। জীবিত অবস্থায় তিনি তার মর্যাদা অনুযায়ী প্রাপ্য সম্মান পাননি। এসব নিয়ে কবির মনে কোন প্রকার অভিযোগ ছিল না, তবে দুঃখবোধ ছিল। কবি কৃত্তজ্ঞ চিত্তে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেছেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন,

‘বঙ্গবন্ধু আমাকে সাধারণ ক্ষমায় জেল থেকে মুক্তি দিলেন। বের হয়ে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। কেউ আমাকে চাকরি দিতে চায় না। তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে আমাকে চাকরি দিলেন। নইলে এতগুলো সন্তান নিয়ে কোথায় যেতাম আমি’?

আল মাহমুদ

বঙ্গবন্ধু গুণী লোকের কদর করেছিলেন, কিন্ত পরবর্তীতে তিনি সেই প্রাপ্য সম্মান পাননি। অনেক অখ্যাত-কুখ্যাত লোক স্বাধীনতা পদক পেলেও কবির কপালে এই পুরষ্কার জুটেনি। অবশ্য খ্যাতিমান লেখকরা পুরষ্কারের আশায় রচনা লেখায় প্রবৃত্ত হন না। তবে একটা আক্ষেপ কবির কন্ঠে প্রায়শই  সুর পেয়েছে। প্রবন্ধ সংকলন ‘সাহসের সমাচার’ গ্রন্থে তিনি বলেছেন,

‘তোমরা আমাকে বোঝোনি। আমি বলি না বুঝবে না, বুঝবে। তবে তখন আমি আর থাকবো না। তবে এটা মনে রেখো, বাংলা সাহিত্যে যারা কিছু করতে চাও, আমাকে তোমার পাঠ করতেই হবে। এটা আমার আত্মবিশ্বাস।’

আল মাহমুদ

কবির এই আত্নবিশ্বাসের প্রাচীর যে ঠুনকো নয়, তা সাহিত্য বোদ্ধারা গভীরভাবেই অনুধাবন করতে পারেন। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে ততদিন কবির নাম হারিয়ে যাবে না এটা সুনিশ্চিত।

আরও পড়ুন