ফুল মানুষ-ভুল মানুষ

ফুল মানুষ-ভুল মানুষ
– রাবেয়া সুলতানা মুনা


মাঝে মাঝে ভীষণ অবাক হই, এতটা বছর পরও স্মৃতির দরজায় নাড়া দিতে কি করে পারে মানুষ!
রেল স্টেশনে একা বসে আছি, কত বছর আগে এই প্ল্যাটফর্মে তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো, কত ভীড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেইদিন পরিবারের সবার সাথে ঢাকায় গিয়েছিলাম আমি। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ওর চোখে চোখ রেখেছিলাম, হাত ধরে হেঁটে ছিলাম কয়েক মিনিট।
তার সাথে আমার পরিচয় ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে , কোন একটা গ্রুফে গল্প পড়েছিলাম একটা, যদিও গল্প কিন্তু বাস্তব কাহিনী ছিলো ।
গল্পটা ছিলো এই-
‘’ বাবা-মা দুজনের স্বপ্ন ছিল, মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন। জেরিন নামের সেই মেয়েটা মেধাবী ছিল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়ার সময়েই একই ব্যাচের একটা ছেলেকে ভালোবেসেছিলো জেরিন, ছেলেটার নাম মুনতাহিদ। দুজনে কত স্বপ্ন দেখেছিল, ছোট্ট একটা ঘরের স্বপ্ন, সুখী একটা পরিবারের স্বপ্ন। নামের পাশে ডাক্তার পদবী যোগ হয়েছিল দুজনের, ৩৩তম বিসিএসে দুজনেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, নিয়োগ পেয়েছিলেন সরকারী চিকিৎসক হিসেবে। সংগ্রাম আর কষ্টের প্রহরগুলো শেষ হতে চলেছে বুঝি, এমনটাই ভেবেছিলেন তারা, মালাবদল করে দুজনে পেতেছিলেন সুখের সংসার। কিন্ত আচমকাই সেই সংসারে হানা দিলো কালবৈশাখী ঝড়, যে ঝড়ে টালমাটাল হয়ে গেছে এই মানুষগুলোর জীবন।
২০১৪ সালের ২৪শে আগস্ট ছিল সানজানা জেরিনের কর্মস্থলে যোগদানের দিন। ফেনী জেলার পরশুরামে পোস্টিং হয়েছিল তার। মুনতাহিদের পোস্টিং ছিল কুমিল্লার মেঘনায়। সেদিন ভোর ছ’টার দিকে জেরিনকে পৌঁছে দিতে বাসস্ট্যান্ডে যাচ্ছিলেন দুজনে, রিক্সায় চড়ে। কমলাপুর স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তাটা ছিল বেশ নিরিবিলি। আচমকাই পাশ দিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যাওয়া একটা গাড়ি থেকে এক ছিনতাইকারী জেরিনের হাতে থাকা হ্যান্ডব্যাগটা ধরে প্রচণ্ড জোরে টান দেন। ব্যাগের বেল্ট ছিল জেরিনের হাতের সাথে শক্ত করে পেঁচানো, টাল সামলাতে না পেরে রিক্সা থেকে পড়ে যান জেরিন। গাড়িটার গতিবেগ বেশী থাকায় প্রায় ১০-১৫ ফুট দূরে গিয়ে পড়েন, মাথাটা গিয়ে জোরে ধাক্কা খায় পিচ ঢালা রাস্তায়। গাড়িটা ততক্ষণে হাওয়া হয়ে গেছে, জেরিনের হাতের সাথে লেগে আছে ব্যাগের ছেড়া অংশ, ব্যগটা চলে গেছে গাড়ির সাথে। ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়েছিলেন জেরিন, অজ্ঞান হওয়ার আগে স্বামীকে শুধু এটাই বলতে পেরেছিলেন- “আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যাথা, সিটিস্ক্যান করাও!” সেটাই এখনও পর্যন্ত জেরিনের শেষ কথা হয়ে আছে।
না, জেরিন মারা যাননি। বেঁচে আছেন তিনি, কিন্ত সেটাকে বেঁচে থাকা বলা চলে কিনা আমার জানা নেই। গুরুতর আহত জেরিনকে সঙ্গে সঙ্গে মুনতাহিদ নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে। যমে মানুষে টানাটানি হয়েছে সেখানে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজের আইসিইইউতে জেরিন ভর্তি ছিলেন প্রায় দুই মাস। তারপর মুনতাহিদ জেরিনকে নিয়ে ছুটেছেন ভারতে। কলকাতা আর চেন্নাইতে চিকিৎসা করানো হয়েছে, কিন্ত ফল মেলেনি। যেখানেই আশার সামান্য আলো দেখতে পেয়েছেন মুনতাহিদ, সেদিকেই হাত বাড়িয়েছেন। কিন্ত ভাগ্য সহায় হয়নি তার। মস্তিস্কে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় স্মৃতি হারিয়েছেন তিনি, হারিয়েছেন চলাফেরা বা কথা বলার ক্ষমতাও।
সানজানা জেরিন, মোনতাহিদ, অদ্ভুত ভালোবাসা
জেরিন এখনও কথা বলতে পারেন না। কারো কথা বোঝেন না, কাউকে চেনেনও না। নির্জীব একটা অবস্থা এই উচ্ছ্বল তরুণীর। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার দিন কাটে, হাঁটাচলা করার সামর্থ্য তো নেই। বাচ্চাদের মতো ডায়পার পরিয়ে রাখতে হয় তাকে, চোখেমুখে কোন অভিব্যক্তি নেই, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন শুধু। স্বামী মুনতাহিদের কর্মস্থল এখন কুমিল্লায়, ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা করেই অফিস করেন তিনি। যাত্রাবাড়ীতে ভাড়া বাসায় একটা রুমকে নার্সিংহোমের মতো বানিয়ে সেখানে রাখা হয়েছে জেরিনকে, চারপাশে চিকিৎসার যন্ত্রপাতিতে ভরা রুমটা। রাতে জেরিনের রুমেই মেঝেতে ঘুমান মুনতাহিদ, কিছুক্ষণ পরপর জেরিনের বুকে কফ জমে, তখন সেটা বের করে দিতে হয়। মুনতাহিদের বাবা-মা’ও পুত্রবধুর যথেষ্ট সেবা করেন, সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্যে রাখা হয়েছে একজন সাহায্যকারীও।
কিছুক্ষণ পরপরই শিশুদের মতো কান্নাকাটি করেন জেরিন, সেই কান্নার কোন ভাষা নেই, বোবাকান্নার মতো। কখনও গোঙানী শোনা যায়, কখনও শুধু চোখের কোনে জল জমে থাকে। পরিবারের সদস্যেরা তখন গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দেন, মেয়েটা কিছুক্ষণ শান্ত থাকেন সেই আদরের ছোঁয়া পেয়ে। জেরিনের বাবা মারা গেছেন কিছুদিন আগে, সেটা তিনি বুঝতেই পারেননি। ঘরের দেয়ালে দুজনের বিয়ের ছবি টানানো, সেগুলো এখন শুধু স্মৃতি হয়েই আছে। কাহিনীটা পড়ে আমি কান্না করছিলাম অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারি না ।‘’

এই গল্পের কমেন্ট বক্সের একটা মন্তব্য ভীষণ ভালো লেগেছিলো আমার, কমেন্টেষ রিপ্লাই দিতে গিয়ে তার সাথে আমার হাই হ্যালো, শুরু হয় মেসেজ আদান প্রদান, কিভাবে কখন ভালো লেগে যায় বুঝতে পারিনি, এইভাবে চলতে থাকে, হঠাৎ মনে হচ্ছিলো আমাকে অনেক ভালোবাসে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল টাইম পাস করছে যাই হোক বুঝতে পারছিলাম তখন তার কথা শুনলে সব দুঃখ ভুলে যেতাম, একদিন বললো -তোমার সাথে যোগাযোগ রাখা সম্ভব না,কখনো যোগাযোগ রাখার চেষ্টা ও না করি ।
আমার পৃথিবী তখন ঝাপসা, ভীষণ হাহাকারে যার ছায়া নিয়ে জীবন কাটাতে চাইলাম তার আচরন মেনে নিতে পারছিলাম না, তবুও আমি মরিচীকার পিছনে ছুটছিলাম, তারপর ভূয়া পরিচয় তৈরি করি আর একটা ফেসবুক আইডি খুলি , তার ফ্রেন্ডলিস্ট ধরে ধরে ফ্রেন্ডের ফ্রেন্ডকে রিকোয়েস্ট পাঠাই। কেউ গ্রহণ করে, কেউ করেনা। এক সময় ফ্রেন্ডলিস্টের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফ্রেন্ড হয়ে যায়,এবার বোধহয় তাকে পাঠানো যায়! অতপর: রিকোয়েস্ট। সন্দেহের অবকাশ নেই অ্যাপ্রুভ হয়। .নকল পরিচয়ের নকল বন্ধুত্ব চলে। নেটে ঢুকলেই লগইন করে খবর নেয়া,কী খাচ্ছে, নতুন করে কার সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সব ঠিক ঠিক খবর পাই। স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে, নোটে, অ্যালবামে তথ্য হালনাগাদ হয়। কষ্টগুলোও হালনাগাদ হয়। বুঝতে পারি ও মুখোশ মানব, আজ এক জন তো কাল অন্যের সাথে সময় কাটানো ওর স্বভাব ।
অন্যদিকে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি, এভাবে আর কত ।একদিন মনে হলো সেই তো ভালো আছে, শুধু শুধু আমি কষ্ট পাচ্ছি, নেমে গেলাম নিজকে সামলে নেওয়ার সংগ্রামে, টের পাই ভুল মোহে জীবনটা বিষাক্ত করে রেখেছিলাম নিজেই।
এ সংগ্রাম খুব কঠিন, বার বার হোঁচট খেয়েছি, এই পথ চলতে যারা সাহস যুগিয়েছে তারাই আমার প্রকৃত স্বজন । জীবনটা অনেক সুন্দর, এই সুন্দর খুঁজে নিতে সঠিক পন্হায় ।
লেখিকা : রাবেয়া সুলতানা মুনা

আরও পড়ুন