ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল অব ঢাকা -ডাঃ জোহরা কাজী

মাহজেবিন মম

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোনো নারী রোগাক্রান্ত হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে লজ্জা পেতেন। সেই আমলে কোনো মুসলিম নারীর চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যয়ন চমকপ্রদ ঘটনাই বটে। বলছিলাম ১৯১২ সালে ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেওয়া ডাঃ জোহরা বেগম কাজীর কথা৷ তিনিই ছিলেন প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক ।

তিনি ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের মধ্য প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন । পিতা ডাঃ কাজী আব্দুস সাত্তার ছিলেন রাজনীতিবিদ এবং মাতা আঞ্জুমান নেছা ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের খালাতো বোন। জোহরা বেগমের পৈতৃক নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায়।

ডাঃ জোহরা বেগম কাজী আলীগড় মুসলিম মহিলা স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে ভর্তি হন”লেডি হার্ডিং মহিলা মেডিকেল কলেজে”। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে এমবিবিএস পাশ করেন এবং অর্জন করেন ভাইসরয় পদক।

মানবসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করে তিনি মহাত্মা গান্ধীর ” সেবাশ্রম” এ যোগ দেন। এখানে তিনি অবৈতনিক সেবা প্রদান করতেন। তবে তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিলো ” ইয়োথমেল উইমেন্স হসপিটাল”। দেশ ভাগের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

দেশ ভাগের পর সপরিবারে তাঁরা পূর্ববঙ্গে( বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন।

তখনকার সমাজে প্রসূতি সেবার মান অত্যন্ত খারাপ ছিলো। হাজারো কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিলো সমাজব্যবস্থা। ফলে প্রসূতি মায়েদের সহ্য করতে হতো সীমাহীন যন্ত্রণা। এ সকল কিছু ডাঃ জোহরা
কাজীর মনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তিনি ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রথম ঢাকা মেডিকেলে এবং পরে মিটফোর্ড হাসপাতালে “স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ” চালু করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ উপমহাদেশের নারীদের কুসংস্কারের পুরোনো খোলস থেকে বের করে নিয়ে আসে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন দুয়ার খুলে যায়।

পরবর্তীতে তিনি লন্ডন থেকে চিকিৎসা শাস্ত্রের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডন থেকে ফিরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের “স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ” এর প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালেও কিছুদিন কর্মরত ছিলেন।

ডাঃ জোহরা কাজী সর্ব প্রথম এই দেশে ধাত্রীবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি চিকিৎসা বঞ্চিত এবং অবহেলিত নারীদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেন। সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভ্রান্তপ্রথার বিরোধিতাকারী এবং নারীশিক্ষার অগ্রদূত এই নারী আজো শত শত মুসলিম নারীদের অনুপ্রেরণা। বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতে অবদান রাখার জন্য তাঁকে “ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল অব ঢাকা ” বলা হয়ে থাকে।

মহীয়সী এই নারী চিকিৎসক জীবনের বিভিন্ন সময় নানা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পাকিস্তান আমলে তিনি “তখমা -ই পাকিস্তান ” নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে “একুশে পদক”, ” রোকেয়া পদক” এবং “বিএমএ স্বর্ণপদক” প্রদান করে।

ডাঃ জোহরা বেগম কাজী এক বর্ণাঢ্য কিন্তু অনাড়ম্বর জীবন যাপন করেছেন। হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন নারীদের বেদনা, ভোগান্তি। তাই জীবনের পুরোটা সময় নারীদের নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন। আজ নারী দিবসে এই মহীয়সী নারীর জন্য রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

তথ্যসূত্রঃ বাংলাপিডিয়া, রোর বাংলা, প্রথম আলো পত্রিকা।

লেখক- শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন