বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ

-ওমর ফারুক

সাহিত্যের কোনো দেশ, কাল নেই।সাহিত্যের নিদিষ্ট সীমানাও নেই।সাহিত্যের সুর একটাই।বাংলাসাহিত্য দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়েছে মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কারণে। তিনি জন্মেছিলেন জমিদার – জোতদার পরিবারে। আবার সে পরিবারের লোকজন গোঁড়া ছিলেন না।ঠাকুর পরিবারের প্রজা পীড়নের ইতিহাস নেই।তৎকালে পরিবারটি ছিলো শিল্প, সাহিত্য আর দর্শনের তীর্থভূমি। পরিবারের সকলেই সাহিত্য, দর্শন চর্চা করতেন।নেহায়েত আনন্দ আর ভোগবিলাসের জন্য তাঁরা সমাজ হিতৈষী কাজে আত্মনিয়োগ করেননি। পরিবারের মহিলারাও সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে কলম ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলাসাহিত্যে অপরিহার্য এ সত্য প্রতিষ্ঠিত। তাঁকে নিয়ে বা তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কম-বেশি আলোচনা -সমালোচনা হয়েছে। তবে সে সমালোচনা ধোপে টিকেনি।রবীন্দ্রনাথের বিশাল ব্যক্তিত্বের কাছে সব ম্লান হয়ে গেছে।

ঠাকুর পরিবারের চতুর্দশতম সন্তান রবীন্দ্রনাথ।পারিবারিক বলয়ে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ ছিলো।রবীন্দ্রনাথ ছোট থাকতেই তাঁর মা মারা যায়।মায়ের স্নেহ বঞ্চিত বলে তাঁর উপর পড়াশোনার চাপ ছিলো কম।সে সুযোগে তিনি পাঠশালার পাঠ সমাপ্ত করতে পারেননি। পরিবারে কঠিন নিয়মের মধ্যে তাঁর মনের ব্যাপ্তি বাধাগ্রস্থ হতে থাকে।সে কারণেই তিনি শৈশবে মায়ের স্মৃতি ভুলতে বড়দাদার স্ত্রী কাদম্বিনী দেবীর সান্নিধ্যে থাকেন।আন্না তড়খড়(নলিনী) রবির জীবন জুড়ে ছিলেন। তিনিই যৌবনে রবিকে আলোকিত করেছেন।ররবীন্দ্রনাথ পরিবারের উজ্জ্বলতম সদস্য হিসেবে পরিগণিত হতেন না।মহর্ষি দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাম উজ্জ্বল করার জন্য অন্যসব সদস্য বর্তমান ছিলো। রবীন্দ্রনাথের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবী উপন্যাস লিখে আলোচনায় ছিলেন।তাঁর বড় দাদারা শিল্প, সাহিত্য এবং ধর্ম নিয়ে নানামুখী গবেষণা করেছিলেন।পরিবারে সমাজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সমাজ সংস্কারকদের নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। কেউ কেউ রাজা রামমোহন রায়ের ব্রাক্ষ্ম সমাজ নিয়ে পড়ে ছিলেন।রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না।তিনি ছিলেন পিরালি ব্রাক্ষ্মণ।আর বিয়েও করেছিলেন পিরালি পরিবারে।ঠাকুর পরিবারে বাউল দর্শনের প্রবেশ ঘটে রবীন্দ্রনাথের অনেক আগে।

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য চর্চা করতে যখন আসেন তখন ব্রিটিশ যুগ।চারদিকে তখন ভারতচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন,দ্বীনবন্ধু মিত্র এদের প্রভাব।বঙ্কিমের ‘ বন্দেমাতরম জাতীয়ভাবে উচ্চকিত। সুবাস,চিত্তরঞ্জন, মহাত্মা গান্ধী স্বরাজের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।চারদিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা। সে ঢেউ ঠাকুর পরিবার স্পর্শ করেনি।তাঁরা মজে ছিলেন শিল্প-সাহিত্য নিয়ে।রবীন্দ্রনাথ তখনও চিত্রপটে নেই।রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৬ পর্যন্ত সমাজে অপরিচিত ছিলেন লেখক হিসেবে।তাঁর প্রথম দিকের রচনা কোনো প্রকাশক প্রকাশ করতে চাইতেন না। তাঁর রচনা সেলফেই সাজানো থাকতো।শখের বশেই তখন লিখতেন। তিনি সমাজে তখনো শিক্ষিত বলে পরিগণিত হতেননা। এ সম্পর্কে জাস্টিস আব্দুল মওদুদ তাঁর “মধ্যবিত্ত সমাজের বিকাশ; সংস্কৃতি রূপান্তর গ্রন্থের ৪০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

” ঠাকুর নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তির পূর্বে প্রায় অশিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হতেন।আমার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার বাংলা প্রশ্নপত্রে ঠাকুরের একটি রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সেটাকে বিশুদ্ধ ও সাধু বাংলায় লেখার নির্দেশ ছিল।”

রবীন্দ্রনাথের পথ সহজ ছিলো, তিনি ঠাকুর পরিবারের পরিচয়ে দ্রুতই গন্তব্যে পৌঁছে যান।তিনি ঠাকুর পরিবারের সন্তান, ব্যারিস্টারি সমাপ্ত না করে বিলাত থেকে ফিরে আসেন।তবে জমিদার বলে হাতে অনেক সময় এ অজুহাতে তিনি লিখতে বসেননি।বিলাতে তিনি কিটস, মিল্টন,শেকসপিয়ার, গ্যাটে,দান্তে,গোর্কি, তলস্তয়, শেলি প্রভৃতি কবি-সাহিত্যিকের রচনার প্রভাব-বলয়ের সাথে পরিচিত হন এবং নিজেকে উর্বর করেন।আর সেসবের প্রভাব পাওয়া যায় তাঁর গান, কবিতা, উপন্যাসে।রবীন্দ্রনাথ মহান লেখকদের বলয় থেকে মুক্ত হতে পারেননি।তিনি সে সব লেখদের ভাষা, চিন্তা,দর্শনে পরিবর্তন এনে নতুন রূপে বাঙালির কাছে উপস্থাপন করেছেন।এটা করতে পেরেছেন তাঁর ভাষা দক্ষতার জন্য।রবীন্দ্রনাথের ভাষা উন্নত, তিনি সাধারণ জিনিসকেও অতুলনীয়ভাবে উপস্থাপন করেছেন ভাষা দক্ষতা গুণে।তিনি বলেছেন,

“দেবে আর নেবে
মিলিবে, মিলাবে।

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে বলয়,যুগ সৃষ্টি করতে পেরেছেন।বাংলা সাহিত্যকে মোটা দাগে ভাগ করলে রবীন্দ্র যুগ বিরাট জায়গা দখল করে রেখেছে।রবীন্দ্রনাথ ১৮৬১ সালে জন্মেছেন।তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অনুসরণ করার চেষ্টা করলেও সেখান থেকে দ্রুতই প্রস্থান করেন।তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের মতো ইতিহাসের দিকে যাননি।সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প উসকে দেননি।তাঁর রচনা জুড়েই মানুষের কথা।মানুষের নানামুখী সমস্যা,জীবনের গভীরতা এবং রহস্যকে চিত্রপটে এঁকেছেন। দেশপ্রেম, মানবপ্রকৃতি, সমাজ-সংসারের বিচিত্র গতিপ্রকৃতি নিয়ে লিখেছেন।উনিশ শতকে যারা লিখেছেন এক কাজী নজরুল ইসলাম ছাড়া সবাই কম-বেশি রবীন্দ্র বলয়ের মধ্য থেকেই লিখেছেন।এর একটা কারণ হলো কেউ রবীন্দ্রনাথের বাইরে গিয়ে লিখতে চাননি।আবার রবীন্দ্র বলয়ে লেখার সুবিধাও ছিলো, সহজেই খ্যাতি পাওয়া। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব বাংলা সাহিত্যে এতোটাই প্রকট যে শরৎচন্দ্রের ” মেজ দিদি “প্রকাশ হলে লোকে ভাবতো এটা রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস।রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা কিংবা তাঁর সাহিত্যের সমালোচনা সেভাবে কেউ করেনি।রবীন্দ্রনাথের বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে সমালোচনা টিকেনি।নবীন চন্দ্র সেন,মোহিতলাল মজুমদার, বিহারীলাল চক্রবর্তী কিছু কিছু সমালোচনা করেছেন।হালে নীরদচন্দ্র চৌধুরী ” আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ ” লিখে রবীন্দ্রনাথের স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন।কিন্তু এর সবই বিচ্ছিন্ন এবং ক্ষুদ্র প্রয়াস।রবীন্দ্রনাথ বড় লেখক এনিয়ে সন্দেহ নেই।তবে তিনি বড় মানুষ কিনা এ নিয়ে লেখক সমাজে আপত্তি আছে।রবীন্দ্রনাথ মোটাদাগে ব্রিটিশদের সমালোচনা করেননি কিংবা নোবেল প্রাপ্তির পূর্বে তিনি তাঁর রচনার মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের অবসান চাননি।

রবীন্দ্রনাথের নানা পরিচয়। সাহিত্যের সব শাখায় তাঁর বিচরণ। তিনি কবিতা,গান,উপন্যাস, ছোট গল্প, নাটক,গীতিনাট্য, পত্রনাট্য,প্রবন্ধ লিখেছেন। এক জীবনে এতো কিছু কীভাবে সৃষ্টি করলেন সে এক মহা বিষ্ময়।এতো কিছুর পরেও রবীন্দ্রনাথ মানুষ এবং প্রকৃত মানুষ। তিনি দার্শনিকও বটে।মানব মনের গভীর বোধ, মনস্তাত্ত্বিক দিক নিয়ে রচনা করেছেন “চোখের বালি” ,”গোরা”, “নৌকাডুবি”, ” হৈমন্তী “,” ছুটি”। তাঁর সৃষ্টিকর্মের স্থায়িত্ব এখানেই।বাংলাসাহিত্যের খুব কম লেখক আছে যাদের লেখা কাল,যুগ অতিক্রম করতে পেরেছে। রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে বিরল প্রজাতির একজন।দীর্ঘজীবী এই মানুষটি পৃথিবীর নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন, নানা জনের সাথে মিশেছেন।বয়সের গণ্ডি তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি।তিনি ইতালির মুসোলীনির প্রশংসা করেছেন।প্রশংসা করে গান রচনা করেছিলেন পঞ্চম জর্জকে নিয়ে।আইনস্টাইনের সাথে ভাব বিনিময় করেছেন।ছুটে গিয়েছেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পের কাছে।আর এতে করে সাহিত্যে ভাবের আদান-প্রদান হয়েছে, জানা-শোনা হয়েছে।রবীন্দ্রনাথ অশিক্ষিত ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ পরাধীন দেশের নাগরিক ছিলেন এ নিয়ে দীর্ঘ বির্তক আছে।১৯১৩ সালে নোবেল প্রাপ্তির মধ্যদিয়ে এ বিতর্কের অবসান হয়।

রবীন্দ্রনাথ মানুষ ছিলেন।তিনি মানবতার কথা বলতেন।বিশ্বকর্মার কথা বলতেন।তাঁর বিশ্বকর্মা মানুষ। তিনি জীবনের কঠিন সত্যকে উপেক্ষা করতে পারেননি।সমাজ-সংসারে যে সত্য চিরজাগরুক সে সত্য তিনি অনুভব করেছেন।দীর্ঘ জীবনে তিনি যে দর্শনের চর্চা করেছেন, যে ভাবের উন্মেষ করেছেন সেটা বাংলা সাহিত্যে নতুন এবং অভিনব।তিনি মনেপ্রাণে বাঙালির মিলন কামনা করেছেন।তাঁর সমগ্র রচনার সুর একটাই।তিনি মানব ধর্মের কথা বলেছেন, মানবিকতার বাণী অর্চনা করেছেন।তিনি জমিদার ছিলেন ঠিকই, কিন্তু জমিদারী করেননি।তিনি জানতেন প্রজা পীড়ন করেই জমিদার টিকে থাকে।জমিদার-জোতদারের স্বরূপ তাঁর কাছে অপ্রকাশিত নয়।আর এ কারণেই জমিদারি পাট চুকিয়ে দেন।

দেশপ্রেম বাঙালির সম্পদ বটে।দেশপ্রেম নিয়ে এদেশে অনেক গীত রচিত হয়েছে।রাধারমণ, গোবিন্দ্র দাস,দ্বিজেন্দ্রলাল রায়,আব্দুল হাকিম,নিধিবাবু প্রভৃতি পদাকার দেশপ্রেমমূলক পদ রচনা করেছেন।তাদেরও আগে ভূসুকি পাদ,লুইপাদ,কুক্কুরি পাদ দেশপ্রেমমূলক পদ রচনা করেছেন।তবে রবীন্দ্রনাথ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনিই দেশপ্রেমে উচ্চভাবের প্রবেশ ঘটান।এনিয়ে অবশ্য অনেকে সমালোচনাও করেছেন।তাঁর ভাব,ভাষা,শব্দ চয়ন ছিলো উচ্চমার্গীয়। বিষয়টি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মনপুত হয়নি।রবীন্দ্র সাহিত্যে হেঁয়ালি ছিলো বলে তিনি মনে করতেন।এ নিয়ে তাঁর অনুযোগ ছিলো। তিনি বলতেন,” আমাদের দেশে এই অস্পষ্ট কবিদের অগ্রণী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।” তিনি আরও বলতেন, “হেঁয়ালিতে কবিতা লিখলেই তা উত্তম হয় না।রবীন্দ্রনাথের কাছে এ সবই ” অঘটন “মাত্র।সুর নাই, তাল নাই অথচ অন্ধ ভক্তগণ মোহিত।”

আধুনিক সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য কিনা কিংবা রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রাসঙ্গিক এ নিয়ে হাল আমলে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে।আরও একটি বিষয় নিয়ে হাল আমলে আলোচনা হচ্ছে,রবীন্দ্রনাথ কেন বাঙালির হতে পারেননি আজও। এ নিয়ে নানা আলোচনা ডাল -পালা বিস্তার করেছে।বিশাল রবীন্দ্র সাহিত্য।৫২ টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮ টি নাটক, ১৩ টি উপন্যাস, ৩৬ টি প্রবন্ধগ্রন্থ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন, ৯৫ টি ছোটগল্প, ১৯১৫ টি গান।ইতোমধ্যে ৩২ খন্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী প্রকাশিত হয়েছে।এপার-ওপার বাংলায় জাতীয়ভাবে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হচ্ছে ঘটা করে।এতোকিছুর পরেও রবীন্দ্রনাথকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।এর কারণ অনুসন্ধান নিয়ে নানা আলোচনা -সমালোচনা পাওয়া যায়।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে মাতামাতি কম নয়।এদেশে কেউ রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে অবস্থানের কথা চিন্তাও করতে পারেনা।এখানে যারা রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে সাহিত্য রচনার চেষ্টা করে তারা অনায়াসেই মৌলবাদী কিংবা সাম্প্রদায়িক তকমা পেয়ে যান।

রবীন্দ্রনাথের বিশাল কর্ম দিয়েও তিনি বাঙালি মুসলমানের কাছে আদর্শ কিংবা সর্বজনীন হতে পারেননি।এ দায় কার? এ নিয়ে আলোচনা করার আগে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে।তবে এ কাজ এ বঙ্গদেশে বেশিদূর আগায়নি। আবু সয়ীদ আইয়ুব কিছু কাজ করেছেন তাঁর “আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ ” গ্রন্থে।তাঁরও আগে কিছু কাজ করেছিলেন সুখরঞ্জন রায়।তারপর আর কিছুই এগুয়নি।আহমদ ছফা, সৈয়দ আব্দুল মান্নান কিংবা কাজী আব্দু ওদুদ বেশিদূর অগ্রসর হননি।এর একটি কারণ এদেশে সমালোচনা এখনো সাহিত্যের শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি।সমালোচনা সহ্য করার জন্য রবীন্দ্রনাথের মতো বড় লেখক হতে হয়।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তলিয়ে দেখার আগে সময় এবং কাল নির্ণয় জরুরি।বঙ্কিমচন্দ্র এখনো সাম্প্রদায়িক তকমা থেকে নিষ্কৃতি পাননি।তাঁকে এখনো গালি খেতে হয়।শতাব্দীর ফেরারি বঙ্কিমচন্দ্র। উচ্চশিক্ষিতরা তাঁকে “শালা” বলে গালি দিয়েছে তাঁর “আনন্দমঠ, “দেবী চৌধুরানী “এবং” দুর্গেশনন্দিনী” র জন্য।সেপথ ধরে রবীন্দ্রনাথ হাটেননি।তাঁকে গালিও খেতে হয়নি।তিনি বাঙালির পরিচয় নির্দেশ করেছেন।বাঙালিকে মানুষ হবার জন্য বলেছেন।কিন্তু রবীন্দ্র সমালোচনা থেমে নেই।একদল মনে করে তিনি বঙ্গভঙ্গ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে ছিলেন, তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন, তিনি ব্রিটিশ ঘেঁষা ছিলেন, তিনি প্রজা পীড়ন করেছেন, তাঁর সমগ্র সাহিত্যই নকল।তাঁর সম্পর্কে এ অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।তিনি মনে প্রাণে বাঙালি ছিলেন।
তিনি বলতেন,

বাংলার মাটি, বাংলার জল
বাংলার বায়ু, বসংলার ফল।
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।

রবীন্দ্রনাথ সমগ্র বাঙালির হতে পারেননি।এ নিয়ে নানা মত থাকলেও পথ খোঁজার চেষ্টা দেখা যায় না।রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এতো বেশি মাতামাতি করার ফলে রবীন্দ্রনাথ আজ বিভক্ত।নানা সুরে রবীন্দ্রনাথ বেজে চলেছেন।যার কারণে বাজনার নানা সুর উঠছে।রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির করতে হলে রবীন্দ্র চর্চার পথ সৃষ্টি করতে হবে উন্মুক্ত। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে গবেষণার পথ সৃষ্টি করতে হবে।বিশাল রবীন্দ্র সমগ্রকে শিক্ষায় কাজে লাগাতে হবে।রবীন্দ্রনাথ কেন বিশ্বনাগরিকের কথা বলেছেন, কেন তিনি বিশ্বের সাথে যোগসূত্রের কথা বলেছেন সেটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে।রবীন্দ্র সমালোচনা মানে হেয়প্রতিপন্ন করা নয়।রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা, চর্চার মাধ্যমে তাঁকে সত্যিকার প্রতিষ্ঠিত করা হবে।

রবীন্দ্রনাথের কাছে আমাদের আশা একটু বেশিই।আমাদের সকল কাজে তিনি।রবীন্দ্রনাথ তাঁর এ সীমাবদ্ধতা এভাবেই প্রকাশ করেছেন,

সকলে আমার কাছে যতকিছু চায়
সকলেরে আমি তাহা পেরেছি কি দিতে!
আমি কি দিইনি ফাঁকি কত জনে হায়!
রেখেছি কত ঋণ এই পৃথিবীতে।
(কড়ি ও কোমল)

ওমর ফারুক – সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন