ভালোবাসা” (নারী দিবস উপলক্ষে)

অধ্যাপিকা মৌলুদা খাতুন মলি

একটা গল্প বলি।একজন নারীর জীবনের গল্প।

এক

মুখ ফুটে যদিও বলা হয়নি কথাটা- ‘ভালোবাসি তোমাকে’। কিন্তু তবুও আমি ওকেই ভালোবাসি, প্রচণ্ড ভালোবাসি। লজ্জায় আজও বলতে পারিনি যে- “তপু, আমি তোমাকে ভালোবাসি”!!

তপু আমার সমবয়সী। একই ক্লাসে পড়তাম। বোকাসোকা মুখচোরা ছেলেটা বসতো একদম ক্লাসের পেছন বেঞ্চে। বরাবরই তাই। মাস্টার পড়া ধরলে- উত্তর দিত না। চুপ করে- না বোঝার ভান করে, মাথা হেট করে বসে থাকতো। মিলিটারি মার্কা ইংরেজি স্যারের বেতের বারি- কতদিন যে তপুর কোমল পিঠে পড়েছে- তার হিসেব নেই। ধর্ম স্যার তো ক্লাসে ঢুকেই তপুকে কি’রাত ধরতো। বলতো-
— “সূরা ‘ত্বীন’ গুন্নাহ, মাখরাজ সব ঠিক রেখে- সুর করে বলতো তপু। দেখি, এবার তোকে প্রতিযোগিতায় পাঠানো যায় কিনা”।
মুখে মুচকি হাসি এনে তপু মাথা দুপাশ দুলিয়ে বলতো-
— “পারবো না স্যার”।
স্যার মহা আশ্চর্য হয়ে বলতো-
— “সে কিরে, শুনলাম তুই নাকি মসজিদে সূরাতুল ত্বীন দিয়েই নামায পড়াস? ভারী সুন্দর নাকি তোর গলার সুর! আর এখন বলছিস ‘পারবো না স্যার’! এ-তো হিসেবে মিলছে না তপু? আসল ব্যাপারটা কি খুলে বলতো”?
আবারো তপুর সেই হাসিহাসি মুখ, বোকা বোকা চেহারা, লজ্জায় মাথা হেট করা…তবুও আমি তপুকেই ভালবাসি, প্রচণ্ডভাবে ভালবাসি। যদিও বলা হয়নি কখনো কথাটা। কিন্তু ভালবাসিই…। ওকে ভাল না বেসে থাকতে পারিনি। ওর এই চুপচাপ সৌম্য চেহারার মাঝে- কোথায় যেন একটা গভীর কষ্ট, ভালোবাসা লুকিয়ে আছে…যার হদিস পাইনি কখনো ।

রেজাল্টের দিন তপু যথারীতি স্কুলে আসেনা। কখনওই না। ওর রোল নং- বরাবরই ০১। আমার-০২। ক্লাসের ফার্স্ট বয় সে। হেড স্যার বাহবা দিয়ে পিঠ চাপড়ে গুণগান গায় তপুর। নির্ভেজাল প্রশংসায় আমার হিংসে হয়নি কখনো। বরং ভাল লেগেছে। তপুকে কেউ ভাল বললে- আমি খুশি হই। খুব খুশি হই। কারণ, ওকে ভালোবাসি যে! প্রাণাধিক ভালোবাসি। তপু ছাড়া এত ভালোবাসা আমি কাউকে বাসিনি কখনো । যেদিন তপু ক্লাসে ইংরেজি স্যারের সপাং সপাং বেতের বারি খায়- আমি তখন কানে আঙুল চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি। তপু ভরা ক্লাসে খুব লজ্জা পায়। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে। বাড়ি ফিরে আমিও কাঁদি। রাতে ভাত খাইনা। রাতভর কাঁদি। ইংরেজি স্যারের দুহাত লুলা হওয়ার অভিশাপ দেই।

সেই তপু আজ অনেক বড় ডাক্তার। সার্জন। অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলে। মাথা উঁচু করে সবার সাথেই কথা বলে, লেকচার দেয়। কথা বলাটাই যেন তার প্রধান কাজ। কি আশ্চর্য রকমের পরিবর্তন!! তপুর এ পরিবর্তনে খুব অবাক হয়েছি আমি, কিন্তু হিংসে হয়নি। আমি তপুকে ভীষণ ভালোবাসি যে! সত্যিকারের ভালোবাসায় কোনো হিংসা-প্রতিহিংসা থাকেনা। থাকে শুধুই ভালোবাসা।।

ম্যাট্রিক ফার্স্ট ডিভিশনে- চার বিষয়ে লেটার নিয়ে পাস করার পর- তপু শহরে চলে যায়। ভাল কলেজে ভর্তি হয়। আর বাড়ি থেকে আমার পড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমিও তপুর মতই ভাল রেজাল্ট করেছিলাম।
কিন্তু তপুকে বলার সুযোগ  হয়নি যে-
— “তপু, আমি তোমাকে ভালোবাসি, খুব বেশি ভালবাসি”।

বাবার লাল চোখকে ভয় করতাম ভীষণ। মা হারা দুই বোনের আমিই বড়। বাবা আর বিয়ে করেনি হয়ত আমাদের কথা ভেবে। দাদা-দাদি বেঁচে ছিল তখন। ছোট চাচির কাছেই আমরা দুইবোন বড় হয়েছি। চাচী নিঃসন্তান। আমরা দু’বোন মেয়ের মতনই ছিলাম। ঘরের কোনো কাজে হাত লাগাতে দেয়নি চাচি। কিন্তু দাদা-দাদির দুচোখের বিষ ছিলাম আমরা। আমাদের জন্যেই জোয়ান বাবার জীবনটা নাকি মাটি হয়ে যাচ্ছে..। দাদা-দাদির ক্ষোভটা সেখানেই। আমি ভয়ে দাদা-দাদির কাছ ঘেঁষতাম না। পাছে গালমন্দ করে। কিন্তু ছোটবোন ‘তিশা’ ছিল- দাদা- দাদির ন্যাওটা।

সেদিন ছিল সোমবার।
বাবা হাসতে হাসতে অত্যন্ত খোশ মেজাজে দাদিকে বললো-
— “মা, তিন্নি’র খুব ভাল একটা প্রস্তাব পাওয়া গ্যাছে। ছেলে “বিলাতফেরত”।
দাদি ‘বিলাতফেরত’ মানে কি বুঝলো জানিনা।তবে প্রচণ্ড খুশি হয়ে আমাকে এই প্রথমবার কাছে টেনে নিল। মাথায় হাত বুলে কাঁদোকাঁদো হয়ে বললো-
— “দেখলি হতভাগী, তোর কপালে যে এতবড় সুখ লেখা ছিল, কে জানতো আগে?
তোর পরই তিশারটা সেরে ফেলবো । যা, দু’রাকাত নফল নামায পড়ে আল্লাহ্‌র দরবারে শুকরিয়া কর গিয়ে”।
সেদিন দাদির কথার আগামাথা খুব ভাল না বুঝলেও- এটুকু বুঝেছিলাম যে, আমার আর লেখাপড়া হলো না।

বাবা আমার মুখের দিকে সরাসরি তাকায়নি। হয়ত তার মাঝে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল।

তিশা আমার থেকে মাত্র দেড় বছরের ছোট। কিন্তু হলে হবে কি, বিয়ে সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে সে। আমাকে টেনে ঘরে নিয়ে বললো-
— “আপু, এ বিয়েতে তুমি রাজি হয়ো না। নিশ্চয়ই বরের কোনো খুত আছে। নইলে তোমার মত পাত্রী– মাত্র ম্যাট্রিক পাস, তার সাথে ‘বিলাতফেরত’ পাত্রের প্রস্তাব আসে কি করে? খোঁজখবর নিয়ে দ্যাখো গিয়ে- পাত্রের মধ্যে কোনো গলদ আছে”।

তিশার কথায় যদিও যথেষ্ট যুক্তি ছিল।
কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার পরিসমাপ্তি টেনে- সাতদিনের মাথায় আমার বিয়ে হয়ে যায়, ঐ বিলাতফেরত ছেলের সাথেই।

দুই

তপুকে খুব মনে পড়লো। ডুকরে কাঁদলাম অনেকক্ষণ, সারারাত । কিন্তু প্রকাশ করতে পারলাম না কিছুই। বলতে পারলাম না কাউকেই যে-
— তপু নামের একটা ছেলেকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।

বিলাতফেরত পাত্রের নামে সবাই বাহবা দিল, আমার ভাগ্যের তারিফ করলো। মা-মরা মেয়ের কপালে এমন সুপাত্র জোটা অনেক পুণ্যের ফসল। দশ ভরি স্বর্ণ আর পাঁচ লাখ টাকা, এ আর এমন কি! অমন বিলাতফেরত ছেলে!!

কিন্তু যখন এক মাসের মাথায় আমার ডিভোর্স হয়ে গ্যালো- তখন দাদা-দাদি, বাড়িশুদ্ধ লোক কেউই বকলো না আমাকে। বরং আমার প্রতি তাদের দয়ার সাগর য্যানো উথলে উঠলো । আমার দাগেভরা রক্তাক্ত শরীর দেখে- তারা একদম চুপ হয়ে গ্যালো। তিশার বিয়ের আলাপও বন্ধ করলো।

লজ্জা ঢাকতে আমাকে পাঠানো হলো শহরে বড় মামার বাসায়। কলেজে ভর্তি করানো হলো ঠিকই, কিন্তু ঐ পর্যন্তই…।
তারপর-
মাঝে কয়েকটা বছর পার হয়ে গ্যালো…।

ছেলেমেয়ে নিয়ে তিশা শ্বশুর বাড়িতে নাকি শান্তিতেই আছে।
আর আমি ডিভোর্সি নামের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে মামার সংসারে বাঁদীর মতো খেটে মরছি। মামী প্যারালাইজড। মামার একমাত্র ছেলে বিয়ের আগেই পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে। আর দেশমুখো হয়নি সে। কাজের লোক থাকা সত্ত্বেও মামীর দেখাশোনা, সংসারের অন্যান্য কাজ আমাকেই করতে হতো বেশি। মাঝে মাঝে মামী হাই তুলে বলতো-
— বুঝলি তিন্নি, মেয়ে সন্তানই ভাল রে। মানুষ না বুঝে শুধু ‘ছেলে-ছেলে’ করে।
মামীর আফসোস দেখে কাঁদবো না হাসবো- সহসা বুঝতে পারিনা।

মামা অনেক বড় চাকরি করে। একদিন সাহসে ভর করে বললাম-
— মামা, তোমার অফিসে একটা চাকরি দাওনা আমায়। বাসায় খুব ফাঁপর লাগে।
শুনে মামাতো হেসেই আকুল। বললো-
— চাকরি! তুই করবি চাকরি?
‘হাতি ঘোড়া হলো তল, পিঁপড়ে বলে কত জল’। এ বাজারে ম্যাট্রিক পাশের কোনো চাকরি আছে নাকি রে? আজকাল পিয়নের চাকরি পেতে গেলেও তো ইংরেজি আর কম্পিউটার ভাল করে জানা দরকার। তুই এসব পারিস?

সেদিনই থেমে গেছি। আর চাকরির কথা মুখেও আনিনি কখনো।মনে পড়লো স্কুল জীবনের কথা। তপুর কথা। তপু’র পরের রোলটাই আমার ছিল। ০২।
তপু আজ ডাক্তার। মস্ত বড় ডাক্তার। বাড়ি, গাড়ি, নিজস্ব ক্লিনিক কি নেই তার। আমিতো অন্তত একটা নার্স হতে পারতাম। কাউকেই দোষ দেব না। সবই আমার কপালের লিখন।

দুদিন আগে মামীর পিত্তথলির পাথর অপারেশন করা হয়েছে। হসপিটালের কেবিনে মামীর শিয়রে বসে আছি আমি। মামা অফিস থেকে তখনো ফেরেনি। হঠাৎ সিস্টার হন্তদন্ত হয়ে কেবিনে ঢুকে মামীর কাছথেকে আমাকে উঠিয়ে দিল। সবগুলো লাইট জ্বালিয়ে দিল, ফাইল রেডি করলো, এসি ছাড়লো, বেড টানটান করে গোছালো, ইয়ার ফ্রেশনার ছড়িয়ে দিল-। বড় ডাক্তার আসছেন বলে কথা!আমি গুটিসুটি মেরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মুহূর্তের জন্য ভাবলাম, ইস- আমি যদি এদের মতো নার্স হতে পারতাম!

বড় ডাক্তার পুরো একটা টিম নিয়ে কথা বলতে বলতে কেবিনে ঢুকলেন। সবাই-ই ডাক্তার। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁরা আলোচনা করছেন।
আমি পাথরের মূর্তির মতো মুখে ওড়নার একটা অংশ দিয়ে নিজেকে আড়াল করলাম। ডাক্তার ঢুকেই জানতে চাইলেন-
— রুগীর সাথে কে আছেন?
আমি একটু ইতস্ততভাবে, কাঁচুমাচু করে বললাম-
— জ্বি, আমি আছি স্যার। উনার ভাগ্নি।
বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হলে যেমন হয়। তিনি দ্রুততার সাথে আমার দিকে তাকালেন। অপলকভাবে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। হাতে মামীর ফাইলটা ধরা। সবাই ডাঃ তপুকে দেখছে বিস্ময় নিয়ে।
বললাম-
— স্যার খারাপ কিছু নয়তো?
তপু মাথা নিচু করে ফাইলে রাখা রিপোর্ট দেখছে। সেই লজ্জানত হাসি হাসি মুখ, সেই মাথা হেট করা…সেই তপু।
আবারো বললাম-
— মামীর সব রিপোর্ট ভালতো স্যার?

তপু এবার দু’পা এগিয়ে এসে এক্কেবারে মুখোমুখি হলো আমার। সকল ভীরুতাকে কাটিয়ে তপু আজ যখন সাহসী হয়ে উঠেছে– আমি তখন লজ্জায় অপ্রস্তুত হয়ে পেছনে সরতে চাইলাম। কিন্তু পিঠ দেয়ালে ঠেকে গ্যাছে আমার।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে– এমন কি আমাকেও অবাক করে তপু বললো-
— তুমি আমাকে চিনতে পারছো না তিন্নি? ক্যামন আছো তুমি?
আমি কিছুক্ষণের জন্য কথা বলতে পারলাম না। লজ্জায় তপুর দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারলাম না। সবকিছু ছাপিয়ে- শুধু বারবার মনে হতে লাগলো- আমি তো একজন ডিভোর্সি। সমাজে আমার কোনো মূল্যই নেই।

এরপর, তপুর সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছে। তপুই করেছে। আমার জীবনের সবকথা শোনার পর তপু অনুশোচনা করেছে, সমবেদনা জানিয়েছে, সাহস যুগিয়েছে। আমাকে সমাজে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে। আমার সুখের জন্য ওর ক্লিনিকে নার্সের চাকরি পর্যন্ত দিয়েছে। আর কি চাই?

তপু হসপিটালে যখন রাউন্ড দেয়, আমি তখন ওর পিছুপিছু রুগীর ফাইল নিয়ে ঘুরি। সেই মুখচোরা তপু কখনো-সখনো রসিকতা করে বলে-
— ফাইলটা ভালকরে ধরো তিন্নি। খুব শক্ত করে ধরে রেখো। হাত ফসকে নিচে পড়ে না য্যানো। এ যেমন-তেমন ফাইল নয় কিন্তু, এ আমাদের ভালোবাসার ফাইল।তপুর এমন কথায় আমি শুধু মিটিমিটি হাসি।আর একান্তে ভাবি,ভালোবাসা তো এমনই হওয়া উচিত।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন