Ads

মধ্যাহ্নেই বেলাশেষ

জীবনের এই অসম্ভব ক্ষণে এসে বাণীদেবী কেবল হিসেব মেলানোর চেষ্টা করেন-
কী করলাম, কী পেলাম জীবনে ? কী করতেই বা এসেছিলাম ? কীসের জন্যই এতো ত্যাগ ? এতো পরিশ্রম!
এত্তো এত্তো জিজ্ঞাসা চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন এককালের দাপুটে কর্মী, স্বপ্নচারী বাণীদেবী।
প্রতিটি ক্ষণকে আর কড়িকে হিসেব করে ব্যবহার করেছেন বাণীদেবী । অথচ আজ আর কোন হিসেব মেলে না।
কষ্ট করলে কেষ্ট মলে । এই তত্ত্বে ভর করে উদয়স্ত পরিশ্রম করেছেন বাণীদেবী । ঘরের একটা কাজ বাকি থাকতে কোনো অবসর কোনোদিন নেননি। পাশের বাড়ির বউঝিদের সঙ্গে আলাপ করার কোনো সময় ছিল না তার । একনাগাড়ে দশ বছর পরে যে মানুষ বাবার বাড়ি যায় সে কি আর গল্প করে সময় ব্যয় করে !
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের স্ত্রী হয়ে চৌদ্দ বছর বয়সে শ্বশুর বাড়ি এসেছিলেন । শ্বশুর-শাশুড়ির একমাত্র সন্তানের বউ । শুনতে খুব আদর আদর বোধ হলেও ব্যাপারটা তেমন ছিল না মোটেও । বাণীদেবী যখন বউ হয়ে এলেন তখন শাশুড়িমা শয্যাগত । এককথায় সেবিকা হিসেবে কিশোরী বালিকা পা রেখেছিল স্বামীর ঘরে।
সম্পূর্ণ নতুন জায়গা আর পরিবর্তিত সংস্কৃতিতে এসে পড়লেন তন্বী বালিকা । আশৈশব জেদী একরোখা বালিকা বাণী । এই জেদী বালিকা শ্বশুর বাড়িতে পা দেয়ার প্রথমদিনে রান্না ঘরে ঢুকে গেলেন । মূলত ঢুকতে হলো ।
বিয়ের বছর খানেকের মাথায় বাণীদেবীর শাশুড়িমা পরপারে পাড়ি জমালেন । বৃদ্ধ শ্বশুর আর স্কুল শিক্ষক স্বামীর সংসারে দ্রুতই মা হলেন বাণীদেবী । একদম একা ।
তখনকার দিনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন খুব সামান্য ছিল । শ্বশুরের জমিজমাও তেমন ছিল না । তাছাড়া শাশুড়ি মায়ের দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে সংসার ছিল শ্রীহীন । ঠিকমত লেপ-কাঁথাও ছিল না তাদের । শূণ্য থেকে শুরু করতে হলো বাণীদেবীকে ।
পরপর তিনটি সন্তান এলো তার কোল জুড়ে । আতুড় ঘরে বসেই শুনতে পেলেন
–এবার দেখব কেমন মানুষ করে ? অমরের বড় বড় কথা অনেক শুনছি । একটাই পোলা ছিল তো ! তাই লেখাপড়া শিখায়ে মানুষ করেচে । এখন তো একডাল থাইকে তিন ডাল হলো । মানুষ করুক না । দ্যাখফানি কিরাম মানুষ হয় !
বাণীদেবীর শ্বশুরের ছেলে লেখাপড়া শিখে চাকরি পেয়েছিল । শুধু তাই নয় খুব ভদ্র স্বভাবের মানুষ তিনি । ছেলের এই লেখাপড়া শেখা এবং সৎস্বভাবের জন্য বাণীদেবীর শ্বশুরমশাই অমরবাবু খুব গর্ব বোধ করতেন । বাণীদেবী শুনেছিল তার শ্বশুর না কি বলতেন
–সন্তান জন্ম দিলেই হয় না , তাকে মানুষ করতে হয়।
আতুর ঘরে বসেই পড়শি দাদীশাশুড়ির কথাটা বাণীদেবীর খুব সম্মানে লেগেছিল । তার মনে হয়েছিল , যেমন করে হোক শ্বশুরের কথার মান রাখবেই । সেই জেদ মাথায় নিয়ে শুরু করেন সংগ্রাম । সেই সংগ্রামে দুজন সহযোদ্ধা ।
সন্তান সংখ্যা তিন থেকে বেড়ে পাঁচ হলো । আয় তেমন কিছুই বাড়ে না । বাড়ে কেবল খরচের খাত ।
বাণীদেবী পথ খুঁজলেন বিকল্প উপার্জনের । হাঁস মুরগী আর গোরু পালন । গোয়াল ভরা পাঁচ-ছটা গোরু । খাঁচা ভরা হাঁস মুরগী । দু’তিন বছর আগের অদক্ষ বালিকা পুরোদস্তুর সংসারী । কাজে কর্মে হিরের ধার । কাঁথা শেলাই করলে মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে । গোবর দিয়ে তৈরি জ্বালানী দেখলে না পুড়িয়ে তুলে রাখার সাধ জাগে । নিজের হাতে ঘী মাখন ঘোল তৈরি করেন । কিছুটা সন্তানদের খাইয়ে বাকিটা বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেন । ওদিকে স্বামীও স্কুল থেকে ফিরে আপাদমস্তক কৃষক । দুটো দুধভাত খেয়েই বেরিয়ে যান গোরুর খাবার জোগাড় করতে । নিজের জমিতে নিজের গোরু দিয়ে হাল চাষ করেন । ধান বোনা , নিড়ানি দেয়া সব একাই করেন ।
বাণীদেবী গোরুর দুধ বিক্রি করেন । ঘী তৈরি করে বিক্রি করেন । গোবর থেকে তৈরি জ্বালানী বিক্রি করেন । আবার হাঁস-মুরগীর ডিম সন্তানদের চাহিদা পূরণের পর বাকিটা বিক্রি করেন । সব কিছুতেই চুল চেরা হিসেব । কোথাও একটা পয়সার অপচয় করেন না । নিজের জন্য চরমতম সংযম যেন তার অন্যতম ব্রত । রাতেদিনে খেটে সময়টাকে হারিয়ে দেবার চেষ্টা চলে অবিরত।
সূর্য উঠার আগেই দুই ব্যারেল ধান সেদ্ধ শেষ । নইলে দুদিনের জমানো গোবর দিয়ে বোড়ে তৈরি হয়ে গেছে । ভোরে উঠে ঘোলটানার ছান্দিক সুরে-শব্দে ছেলে-মেয়েদের ঘুমও কখনও ভাঙত । কোনদিন আবার ভোরে উঠেই ঢেকি চালাতে শুরু করতেন । হয় তো ধান ভানা অথবা চিড়ে কোটা । নতুবা মুড়ি ভাজা । দুপুর বেলা খাওয়ার পর কাঁথা সেলাই । অথবা বোড়ের(গোবরের জ্বালানি) জন্য সমান মাপের কাঠি তৈরির জন্য বাঁশ চেরা । বিকল্পে পাঠকাঠি অথবা খেজুরের পাতার ডাটা । রাতে রান্নাঘরের পাঠ চুকিয়ে শুরু হতো অন্য কাজ । কোনদিন হয়তো চাউল ঝাড়া । তুষ আর -কুড়া আলাদা করা । কখনও মুড়িগুলোকে টালনিতে টেলে ষোল আনা সঠিকগুলোকে আলাদা করা । আর ধান চাল কলাই এর সময় তো নানাবিধ কাজ । কতো যে কাজ ! কেবল কাজ আর কাজ । কত কম বিনিয়োগ থেকে কত বেশি প্রোডাকশন তার নিরন্তর প্রয়াস । গ্রামের লোক অবাক হতো । এতো কাজ এতো সূক্ষ্ম ভাবে কী করে করে একজন মানুষ !
সূর্য উঠার আগেই দুই ব্যারেল ধান সেদ্ধ শেষ । নইলে দুদিনের জমানো গোবর দিয়ে বোড়ে তৈরি হয়ে গেছে । ভোরে উঠে ঘোলটানার ছান্দিক সুরে-শব্দে ছেলে-মেয়েদের ঘুমও কখনও ভাঙত । কোনদিন আবার ভোরে উঠেই ঢেকি চালাতে শুরু করতেন । হয় তো ধান ভানা অথবা চিড়ে কোটা । নতুবা মুড়ি ভাজা । দুপুর বেলা খাওয়ার পর কাঁথা সেলাই । অথবা বোড়ের(গোবরের জ্বালানি) জন্য সমান মাপের কাঠি তৈরির জন্য বাঁশ চেরা । বিকল্পে পাঠকাঠি অথবা খেজুরের পাতার ডাটা । রাতে রান্নাঘরের পাঠ চুকিয়ে শুরু হতো অন্য কাজ । কোনদিন হয়তো চাউল ঝাড়া । তুষ আর -কুড়া আলাদা করা । কখনও মুড়িগুলোকে টালনিতে টেলে ষোল আনা সঠিকগুলোকে আলাদা করা । আর ধান চাল কলাই এর সময় তো নানাবিধ কাজ । কতো যে কাজ ! কেবল কাজ আর কাজ । কত কম বিনিয়োগ থেকে কত বেশি প্রোডাকশন তার নিরন্তর প্রয়াস । গ্রামের লোক অবাক হতো । এতো কাজ এতো সূক্ষ্ম ভাবে কী করে করে একজন মানুষ !
ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চলছে একই গতিতে । একাগ্রতা আর উদ্দেশ্য সৎ হলে প্রকৃতি বোধ করি কিছুটা পক্ষে থাকে । মাঝে মাঝে সন্তানদের অসুস্থতা নিয়ে নাজেহাল হয়েছেন এটা ঠিক । তবে সন্তানেরা বিপথে যাচ্ছে-এমন কোন ভাবনা ভাবতে হয়নি তাকে কোনদিন । সন্তানেরা কেমন করে যেন মা-বাবার চাওয়াটাকে বুঝতে পেরেছিল । সেটাকে সফল করতে তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না । অদ্ভুত ভাবে তারা খুব নিরাসক্ত সংযমী সহবতের অধিকারী ।
স্বামীর চাকরির বেতন,বাণীদেবীর নানামুখী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ সন্তানদের স্কলারশিপ আর টিউশনের টাকায় চলচ্ছিল জীবন —
বড় দুই সন্তানের লেখাপড়া শেষের দিকে । অন্যরা মাঝপথে । এমন সময় হঠাৎ বাণীদেবীর শরীর খারাপ হলো । খুব ব্যথা । স্বভাবতই গ্রামিণ চিকিৎসক দেখানো হলো । কোনো ফল হচ্ছে না দেখে সময় ব্যয় না করেই তাকে মেডিসিনের নামকরা চিকিৎসকের কাছে দেখানো হলো । কিন্তু তেমন উন্নতি হয় না । ছেলেমেয়েরা ঢাকায় আনলো । ডাক্তার দেখল । রোগ নির্ণয় হলো। ‘রিউম্যাটিক আর্থ্যারাইটিস’ । এ রোগ কখনও সারে না । কেবল দমিয়ে রাখার চেষ্টা । চিকিৎসা চালাতে হয় নিরন্তর। নইলে হাত পা বাঁকা হয়ে যাবে । সঙ্গে অসহনীয় ব্যথা তো আছেই । সেটাও চাপা দিতে হবে । ব্যবহার হতে থাকলো ব্যথা নাশক, স্টরোয়েড ইত্যাদি সব বাজে বাজে পার্শপ্রতিক্রিয়াশীল দামী ওষুধ ।
একটু ভালো ফলের জন্য সবাই দিশেহারা । ডাক্তার বদল । যে যেখানে কোনো ভালো ডাক্তারের খবর দেয় সেখানেই ছোটে সন্তানেরা । ভারতেও পাঠানো হলো চারবার । সেখানে তার এক ডাক্তার ছেলে থাকে । হ্যাঁ এই রকম আরও সন্তান তার আছে যাদের তিনি পেটে ধরেননি কিন্তু তাদের কাছে মা হয়ে উঠেছেন শুধু ব্যবহারের গুণে।
বাণীদেবীর বাড়ির কাছে যে কলেজটা আছে সেটা বেশ পুরোন এবং নাম করা । সেই কলেজে দূর দুরন্ত থেকে পড়তে আসতো ভালো শিক্ষার্থীরা । তাদের মধ্য থেকে একজন উনাদের বাড়িতে লজিং থাকতো দুবছরে জন্য । তারা বাণীদেবীর সন্তানদের লেখা-পড়া দেখিয়ে দিতেন এবং নিজের পড়া করতেন । এই শিক্ষার্থীদের তিনি নিজের সন্তানের চেয়ে বেশি যত্ন করতেন । তিনি মনে করতেন পরের ছেলে যেন তার বাড়িতে পরের বাড়ি মনে না করে । যেন পরের বাড়ি থাকার কষ্ট বোধ না করে । আর এভাবেই তার সন্তান সংখ্যা দশের অধিক।
সেই ছেলেদের একজন ভারতে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হয়েছেন । তিনি বাণীদেবীকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছেন । মা হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন । যদিও ভারতের চিকিৎসকরা আমাদের দেশের চিকিৎসাতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ।
সেই থেকে কুড়ি বছর যাবত নানান চিকিৎসার মধ্যেই আছেন বাণীদেবী ——–
পুরো যৌবনে লালপাড় নীলপাড় সবুজপাড় সাদা শাড়ি পরেছেন বাণীদেবী । দুটো উদ্দেশ্য। কম দাম আর কাঁথা সেলাই এর কাপড় হবে । সঙ্গে পাড়ের থেকে মিলবে রঙিন সুতো । যা দিয়ে তৈরি করেছেন প্রচুর শৈল্পিক কাঁথা । চোখ জুড়ানো সেই সব কাঁথা সেলাই করতেও যে কত শ্রম আর সময় বেচারা দিয়েছেন !
ছেলেমেয়েদের খাইয়ে বাঙালি মায়েরা আজীবন অধাপেট খেয়ে গেল । তাও সাদা ভাতে একটু ঝোল মেখে অথবা জল ঢেলে । শুধু কী তাই ! পাঁচটা সন্তানের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত লেখা-পড়া শুধু নয় বিসিএস পরীক্ষার তারিখগুলোও উপবাস থেকেছেন । সেই আগের রাতে খেয়ে পরের দিন বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত এই নির্জলা উপবাস চলতো । শুধু সন্তানের মঙ্গল কামনার।
এমন করে সারা যৌবন কম দামি সাদাশাড়ি পরে বৃদ্ধ সেজে জীবন কাটালেন । অন্যদিকে জল ঢালা ভাত আর উপবাস ! নিরালংকরা বাণীদেবী সাদাশাড়ি পরলেও স্বপ্ন ছিল রঙিন ! একদিন সন্তানরা বড় হয়ে বড় বড় চাকরি করবে । সেদিন
পারবেন ভালো শাড়ি । খাবেন কিছু প্রিয় খাবার । সাজবেন হালকা কিছু গয়নায় ।
বিধি বাম ! সন্তানরা ক্রমে চাকরি পেল ঠিক । কিন্তু বাণীদেবীর কেবল ওষুধ খাওয়া হয় মুঠিমুঠি । খাবার খাওয়া হয় না একমুঠো । শরীর খেতে চায় না, সহ্য হয় না । ছেলেমেয়েরা কেনে একাধিক শাড়ি । আলমারির থাকে থাকে জমে সে সব । গায়ে জড়ানো হয় না তার । একাধিক্রমে দশ বছর বাবার বাড়ি না যাওয়া বাণীদেবীর শেষ বেলায় ঘুরে বেড়ানোর শখটা খাঁচা বন্দী । এখন তার খাট সর্বস্ব জীবন । অলংকার তো দূরের কথা খুব হালকা পাতলা শাড়িও ব্যথার উদ্রেক করে আজ ।
সন্তানেরা ডাক্তার টেস্ট ওষুধ হাসপাতাল ডাইলাসিস বিষয়ক দায়িত্ব পালন করছে । কিন্তু কারো সময় হয় না মায়ের কাছে বসে একটু গল্প করার । সময় মেলে না মায়ের গায়ে-মাথায় হাত বোলানোর । কুড়ি বছর ধরে ডাক্তার টেস্ট ওষুধ করতে করতে তারাও কি ক্লান্ত ! সঙ্গে যার যার চাকরি সংসার সন্তান তো আছেই । দোদণ্ড প্রতাপ আর সীমাহীন কর্মঠ সংযমী বাণীদেবী কেবল হিসেব মেলায় নিজের মনে । এ যেন ছুটিগল্পের ফটিকের আত্মপ্রলাপ
“এক বাও মেলে না, দুই বাও মেলে না।”
কেবল প্রশ্ন করেন নিজেকে । হাজারে হাজারে প্রশ্ন ,উত্তর মেলে না একটিরও। জীবনের তল খুঁজতে গিয়ে কেবল দেখেন
মধ্যাহ্নেই ডুবে গেছে সূর্য।
‘ক্লান্তি বিহীন ফুল ফোটানোর খেলায়’ ছুটে চলা বাণীদেবী কি মনে মনে ভাবেন–
ত্যাগই কেবল জীবন,স্বস্তি সুখ শুধুই মায়া!!
নীলিমা শীল
লেখক,সাহিত্যিক ও গল্পকার।
আরও পড়ুন