মহীয়সী শীত

হামেদা

       –নুরে আলম মুকতা

ছোট ছোট বিষয়গুলো মাঝে মাঝে এত বড় হয়ে যায় যে ঘুমানোর সময় নয়তো একাগ্রে নিরিবিলি নির্জন মুহূর্তের চিন্তার খোরাক হয়ে যায়। আমরা সবাই কোন না কোনোভাবে নিভৃতচারী। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় খেয়াল করিনি। হতে পারে অফিসের তাড়া নয়তো বিচ্ছিন্ন কোন চিন্তা মাথায় ছিলো। কাজ সেরে আমার মনে হয়েছিলো। গিন্নির কাছে একজন বেশ বয়সী নারী বসে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো। আমার হৃদয় আর মনে ওর তাকানো,মুখাবয়ব আর চোখদুটো বার বার সিনেমার মতো ঘুরে ঘুরে আসছিলো। সরাতে পারছিলাম না কেন ? এ রহস্যের ভেদ আমি করতে পারছিলাম না। কেমন এক অস্থিরতা তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিলো আমাকে। ভিন্ন আরেকটি চিন্তা মাথায় এলে এটি সরে যাবে বলে অপেক্ষা করছিলাম। কখন সরে গিয়েছিলো ভুলে গিয়েছিলাম। বেশ কয়েকদিন পর দরজায় করাঘাত হলে আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই। একাজটি আমি সাধারনত করি না। আমাকে করতে হয় না। লাফিয়ে লাফিয়ে চলা মা আমার সবার আগেই দরজা খুলে কুশল বিনিময় করে। অলিখিত ভাবে কখন এ দায়িত্বটি ও নিয়েছে কেউ জানে না। বাড়ির সবার উপস্থিতিতেও এটি আমার প্রিয়তম কন্যার কাজ বলে ধরেই নিয়েছে সকলে। ওর সফেদ কচি আঙ্গুলের সাথে দরজার খিড়কীর দারুন সখ্যতা। সেদিন মায়ের অনুপস্থিতিতে আমি দরজা খুলে তাকিয়ে রইলাম মুখটির দিকে। একজন অশীতিপর বৃদ্ধা যাকে আমি আমার দৃষ্টি থেকে সরাতে পারছিলাম না। আজও অসহায় অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে। প্রচন্ড  কুয়াশা চারিদিকে। সামান্য দূরেও কিছু দেখা যায় না। লেপের ওম ত্যাগ করেনি তখনও অনেকে। কাক ডাকা ভোর সে কখন শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শীতে ভেজা কাক ডানা ঝাপটাতেও পারছেনা। উত্তরের হিমেল কনকনে হাওয়া বিস্তৃত হয়েছে। সূর্য কয়েকদিন থেকে কুয়াশার চাঁদরে ঢেকে গিয়েছে। বুড়িকে দেখে বিস্ময়ের ঘোরে ওর যুবতি চেহারার আঁকিবুকি আঁকতে থাকি আমি। বহু পুরুষের হৃদয় জ্বালানো ওর ছবি আমাকে মায়ার জালে আটকে দেয়। মাসের শেষ। গামছাও কেনা যাবে না এরকম পকেটের দূরাবস্থা। কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে কিছু অগ্রসর হয়ে একটি বস্ত্রালয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনি আমি। বুড়ি আসে না। কুয়াশা ভেদ করে আমার দৃষ্টি এগিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু হৃদয়ের বেগ অতিক্রম করে ওর শনের ছাউনী দেয়া প্রায় উলঙ্গ ঘরে গিয়ে থর থর করে কাঁপতে থাকে। গিন্নির কথা মালা কানের ভেতরে তীব্র বেগে আঘাত করে আমার শ্রবণশক্তি  ধীর করে দেয়। ওর একটিই মেয়ে। জগতে আর কেউ নেই। স্বামী কখন মরেছে মনে করতে পারে না। শীতের জন্য দুটি কাঁথা তোলা ছিলো। মেয়েকে দিয়ে দিয়েছে। ওর পরনের সুতি ফিনফিনে সাদা শাড়িটি আমার স্যুট জুতাকে এমন করে ব্যঙ্গ করে যেন আমি বিবস্ত্র হয়ে কুয়াশার চাঁদরে মুড়ে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে লাঠি হাতে বাঁকা শরীর টেনে এগিয়ে আসে হামেদা বুড়ি আমার দিকে। ও এগিয়ে এলে একটি দীর্ঘশ্বাস আমার বুক ভেদ করে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। একটি কম্বল নিয়ে আমি সামনে হাঁটতে থাকি। মুখোমুখি হয়ে প্রথম প্রনয়ের আবেদনের মতো বুড়ির সামনে আমি বস্ত্রটি উঁচু করে ধরে থাকি। হামেদা ওটা পরম আদরে বুকের আঁচল দিয়ে ঢেকে নেয়। চোখ বেয়ে দুজনের অশ্রু পরম ভালোবাসায় মুক্তো দানার মতো দুলতে থাকে। কুয়াশায় কেউ দেখেনি। ঠক ঠক শব্দ করে লাঠি হাতে একটি জীবন্ত ভালোবাসা প্রান্তরে মিলিয়ে যায়। আমি উদাস দৃষ্টিতে অযথাই তাকিয়ে থাকি। কিছুই দেখতে পাই না।

নুরে আলম মুকতা,কবি,সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক,মহীয়সী।

আরও পড়ুন