মহীয়সীর কলাম

অনন্য সৃষ্টি মানুষ
( বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে
আমাদের ভাবনা )
— নুরে আলম মুকতা
আমার আপন চাচাতো ভাই একজন মহান মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ করার অবকাশ নেই । কোন শিক্ষকের মৃত্যুর পরে যদি একজন ছাত্রও কাঁদে তারপরও কি আমি বলতে পারি না শিক্ষক সফল ছিলেন? এ মহান শিক্ষক, একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা পরবর্তিতে শিক্ষক পেশা বদলে প্রেষণে যুক্ত হন শিক্ষা অফিসে। তাঁর স্ত্রী পরম প্রেমিকা, মহান শিক্ষক , পরমা সুন্দরী, অনেক বড় মাপের জবরদস্ত আলেম আমার বড় বোন। তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়ালো যে নিজের চাচাতো ভাই-বোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরম সুখে দিন যাপন করেছিলেন। এখন ইতিহাস। আমার কাছে হা-হুতাশ। তাঁদের দুজন সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত আর একজন দেশের গোল্ডেন সিটিজেন বা সূবর্ণ নাগরিক। আমার বায়োলজির যৎসামান্য জ্ঞান দিয়ে নিজে এক ভীতির মধ্যে ছিলাম। কখন সৃষ্টি কর্তার বিস্ময়কর সৃষ্টি ক্রোমোজোম বিদ্রোহ করে!  কিন্তু এত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার মানুষকে কি কিছু বলা যায়? দুজনই আমার পিতৃ মাতৃতুল্য।  আমি বয়সেও অনেক ছোট। এজন্য পারিনি। কিন্তু চ্যালেঞ্জটি আমাকেই নিতে হয়েছিলো। দুটি সন্তানের পরে আপা একটি মেয়ের জন্য পাগল ছিলেন।সৃষ্টিকর্তা অনুমোদন দিয়ে দিয়েছিলেন আপার প্রার্থনার। কিন্তু পরীক্ষা জুড়ে দিয়েছিলেন। কন্যা শিশুটি ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত। ক্রোমোজোমাল বিষয় গুলো একই বংশধারায় সমস্যা তৈরি করে। এখানে একটি বিষয়ে বিতর্ক অনন্তকাল চলবে, তা হলো প্রাক যুগে নিজের আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে, বিশেষ করে আমাদের জানা ইসলামি প্রারম্ভ কালে এ ঘটনা ঘটেছে বেশি। তখন এগুলো প্রকট হয়নি কেন? সব প্রশ্নের উত্তর এ স্বল্প পরিসরে সম্ভব নয়। কোন অবসরে বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে। আমি আপার তৃতীয় কন্যা শিশুটি নিয়ে চ্যালেঞ্জ নিলাম। ভাই-বোন পরম সুন্দরী ফুটফুটে শিশুটি নিয়ে রাত-দিন পরিশ্রম আর সেবা দিয়ে চললাম। যে সময় বুঝতে পারলাম শিশুটির মানসিক বিকাশ বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে, কালবিলম্ব না করে রাজশাহী মেডিকাল কলেজের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান প্রফেসর হামিদ শেখকে দেখালাম। তিনি ডাউন সিন্ড্রোম ঘোষনা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করলেন। বিশেষ কিছু যত্ন আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর কিছু ওষুধ দিয়ে চললেন। উন্নতিও হলো চোখে পড়ার মতো। বেশিদিন আমাদের আনন্দ দীর্ঘায়িত হলো না। বিধাতার অমোঘ আহ্বানে সাড়া দিয়ে চলে গেলো স্বর্গের পুষ্প আমাদের ত্যাগ করে। আপা কিছুদিন পর অন্তস্বত্তা হলেন। আবার পুত্রসন্তান। শিশুটির অটিজমাল আচরন স্পষ্ট হলো প্রাথমিকের গন্ডি পেরোনোর পরে। এবারও মায়ের সাথে আমি সহযোদ্ধা। লড়াই চালিয়েই যাচ্ছি। বিজ্ঞানীরা কি বলছেন অটিজম সম্পর্কে তা একটু জেনে নিই   “Autism is a development disorder characterized difficulties with social interaction and communication, and by restricted and repetative behaviour. Parents often notice sign during the first three years of their childs life “. এবার মাতৃভাষায় একটু জেনে নেয়ার চেষ্টা করি, অটিজম কোন রোগ বা এমন কোন সমস্যা নয়। এটি জন্মগত মানসিক স্নায়ুগত সমস্যা। অটিজমকে শিশু বা কিশোরের মনোজগতের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইংরেজিতে এটিকে নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার বলা হয়। মস্তিস্কের অস্বাভাবিক জৈব রসায়নের কারনেও এটি হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা কেউ কেউ বলছেন। আবার কেউ বলছেন ক্রোমোজোমের ৭ম ধারা বা জোড়াটি এ ঘটনার জন্য দায়ী। কেউ কেউ এমনও বলেন ,  গর্ভকালীন মায়ের মানসিক অস্থিরতাও এটির কারন হতে পারে। এ রোগের প্রাথমিক লক্ষ্মণগুলো জেনে আসি চলুন,
*এ রোগে আক্রান্ত একই কাজ বার বার করবে। নিষেধ করলে বেশি করবে।
* নিজের কাজে একদম নিমগ্ন থাকবে। ডাকলে সাড়া দেবে না।
* কারো ডাকে সাড়া না দিয়ে ভেংচি কাটবে।
* একা থাকতে পছন্দ করবে।
* দূরের পানে অদৃশ্যে তাকিয়ে থাকবে।
* জিনিস-পত্র ছুড়ে মারবে।
*  নিজের অবস্থান পরিবর্তন না করা বা একই স্থানে অবস্থান পছন্দ করবে।
*  কাঙ্খিত বস্তু না পেলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাবে বা খিঁচুনি শুরু হতে পারে।
*  একটি বিষয় নিয়ে লেগে থাকবে বা না পারা পর্যন্ত করতেই থাকবে।
গ্রামের চেয়ে শহরে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। গ্রামে প্রতি ১০ হাজারে ১৪ আর শহরে ২৫ শিশু অটিস্টিক। মেয়ের চাইতে ছেলে শিশু আক্রান্তের সংখ্যা আড়াইগুন বেশি। দেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়সি শিশুদের ভেতরে অটিজম বিস্তারের হার প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন। সম্প্রতি এ তথ্যগুলো জানিয়েছে ইনস্টিটিউট অব পেড্রিয়াটিক নিউরো ডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)। যুক্তরাষ্ট্রের অটিজম সোসাইটির পরিসংখ্যান  বলছে বিশ্বে মোট জনসংখ্যার প্রায় ০১ শতাংশ অটিজম আক্রান্ত। আমাদের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ২.৮৭ শতাংশ অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন,  অটিজম কোন প্রকারেই ছোঁয়াচে রোগ নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেড্রিয়াটিক অনুষদের ডিন ও ইপনা পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ শাহীন আখতার বলেছেন,শিশুদের অটিজম সনাক্তকরণ থেকে সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট থেরাপি এবং ম্যানেজমেন্ট সহ সকল সেবা দেয়া হয় ইপনাতে। গত শুক্রবার  ০২ এপ্রিল ছিলো বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো,”আলোকিত হউক উদারতায়। ” দুলাভাই আচমকা চলে যাবার পর থেকেই ছেলেটি আমাকে আব্বা ডাকে। একদম অন্তর থেকে ডাকে। আমিও আমার বিয়ের আগে থেকেই সন্তান হিসেবে মেনে নিয়েছি। একবার মনের আবেগ সংবরন করতে না পেরে আমার ছেলেমেয়ে আর ওকে সহ ডিভি করতে চেয়েছিলাম। এখন আর ওপথ মাড়াই না। দেশেই লড়াই চালাবো ওকে নিয়ে স্থির করেছি। আমি জানি ও আমার আশীর্বাদ। প্রিয় বন্ধু আপনাদের কারো অটিস্টিক বেবি থাকলে দয়া করে একটুও বিরক্ত হবেন না। সমাজ আর চারপাশ চ্যালেঞ্জ করে আল্লাহর এ শ্রেষ্ঠ নেয়ামতের হেফাজত করুন। আমি নিশ্চিত আপনি ভাগ্যবান।
তথ্য ও ছবিঃদৈনিক ইত্তেফাক ০২.০৪.২০২১
লেখকঃ নুরে আলম মুকতা

কলামিষ্ট,কবি-সাহিত্যিক ও সহসম্পাদক, মহীয়সী
আরও পড়ুন