মহীয়সীর কলাম

বাংলার এক মহীরুহ

( নাট্যকার মমতাজ উদদীন আহমদ স্মরণে)

        -নুরে আলম মুকতা

যাত্রাপালা আর নাটকের বিষয়ে আলাপ করতে করতে আমার এক বাংলা ভাষা সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম যাত্রাপালা আর নাটকের মধ্যে আসল তফাৎ টি কি ? বন্ধুবরের উত্তরটি আজও আমার হৃদয়কে দোলা দিয়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, নাটক আসলে গল্পের মতো। ধীরে ধীরে জীবনের ছোট ছোট কয়েকটি বাঁকেই শেষ হতে পারে। কিন্তু যাত্রাপালা হলো এক বড় ক্যানভাস। এখানে দারুন অভিনয় আর নেচে গেয়ে লম্বা কাহিনীর অবতারণা করা হয়। সুখ দুঃখের এক রোমাঞ্চর বিষয় মূর্ত হতে পারে এখানে। মানুষের কোমল হৃদয় আকুল হয়। নাটকে জীবনের কিছু জিজ্ঞাসা, আশা,প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠতে পারে। আমি থমকে গিয়েছিলাম আমার বহু দিনের এক পরম প্রশ্নের সাবলীল উত্তর পেয়ে। একবার সৌভাগ্যক্রমে কোলকাতার নট্ট থিয়েটারের যাত্রাপালা উপভোগ করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন আমার মানদণ্ডে মেপে নিয়েছিলাম আমার বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়ে বা পিছিয়ে আছে। আমি নিরপেক্ষভাবে চেষ্টা করছিলাম এ শিল্পে আমরা কতটুকু কাজ করেছি। সেদিন বার বার অবনত মস্তকে স্মরণ করেছিলাম বাংলার একজন নিবেদিত মানুষকে,যাঁর নাম মমতাজ উদদীন আহমদ। স্যার আমার মাটির মানুষ। বিশাল মহীরুহ। যার ছায়া বাংলা ভাষা আর সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। মমতাজ উদদীন আহমদ কে বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের পথিকৃত বলা হয়। বাংলাদেশের ক্রান্তিকালে মাতৃভাষা ব্যবহার করে তিনি একাই গড়ে তুলেছিলেন এক অভেদ্য দেয়াল। যা স্বাধীনতা উত্তরকালে অসম্ভব রকম জনপ্রিয় হয়েছিলো। এখানে আরো অনেক বিখ্যাত মানুষের অবদান অনস্বীকার্য। স্বল্প পরিসরে তো আর সবার কথা বলা সম্ভব না। তাই সকল সংগ্রামী নাট্যব্যক্তিত্বের প্রতি আমাদের অসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। অনেক নক্ষত্রের মধ্যে একটি স্যার মমতাজ উদদীন আহমদ ভাষা আন্দোলন আর আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অমর সৈনিক। তিনি চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনাকালীন স্বাধীনতার পক্ষে নাটক মঞ্চায়নের জন্য তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের রোষানলে পড়েছিলেন। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখেছি বাংলাদেশের অসম্ভব জনপ্রিয় বিটিভি নাটকের এক বিশাল অংশ জুড়ে মমতাজ উদদীন আহমদের নাম সোনালি হরফে লেখা। স্যার বাংলা ভাষা সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। বিদগ্ধ লেখক। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি মূহুর্ত বিমুর্ত করেছেন তাঁর লেখায় অকৃপণ হাতে। এত গুণী পন্ডিতের সাহচর্য পাওয়াটি ভাগ্যের বিষয়। আমি ধন্য স্যারের সংস্পর্শ পেয়ে। তাঁর হাসিমাখা উৎসাহ আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি। চাঁপাই নবাবগঞ্জের ভোলাহাট ধন্য। স্যারের বাড়ির বিশাল বইয়ের সংগ্রহশালার জন্য আমি গর্বিত। মমতাজ উদদীন আহমদ বাংলা নাটকের এক মহান পুরুষের নাম। এ স্বনামধন্য ব্যক্তি নাটক বিষয়ে দেশি বিদেশি অনেক ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন। মমতাজ উদদীন আহমদ ১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারী জন্মগ্রহন করেছিলেন। তিনি ধন্য যে দেখে গিয়েছেন তাঁর লেখা নাটক দেশ বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসুচী ভুক্ত। স্যারের লেখা বিখ্যাত নাটক “কী চাহ শঙ্খচিল” কোলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিবাহ নাটকটি নেতাজী সুভাষ বোস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। তিনি পুরস্কার অর্জন করেছিলেন অনেক। বাংলা ভাষার এ নক্ষত্রের পতন হয় ২০১৯ সালের ০২ জুন।

এ নগন্য লেখক নিজের একটি বই স্যারকে উপহার দেয়ার ইচ্ছে পোষণ করলে স্যার লেখক কে অটোগ্রাফ দিতে নির্দেশ করেন।

আমরা মহীয়সী পরিবারের পক্ষ থেকে মমতাজ উদদিন স্যারকে জানাই অসীম শ্রদ্ধা। সৃষ্টিকর্তার নিকট কামনা করি তাঁর রুহের মাগফিরাত। স্যারের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের গ্রামেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। কী অসীম টান নিজ বাড়ি আর মানুষের প্রতি! “শেক্সপিয়ার আর এ্যান্টন চেকভ তো সবাই হতে পারবে না। আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কিছু করে দেখাই। হলে হতেও পারে একটি ছোট্ট জীবন সংগ্রামের স্মৃতি স্তম্ভ।” পরম ভালোবাসায় বলা আমাকে স্যারের এ উক্তি আমি ভুলি কেমন করে !

নুরে আলম মুকতা,কবি,সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক ,মহীয়সী।

আরও পড়ুন