মহীয়সীর কলাম

 

আশৈশব স্মৃতির ঝুড়ি

– নুরে আলম মুকতা

ছোট বেলায় আব্বার রক্তচক্ষু আর অভুতপূর্ব এক ভালোবাসার মিশেলে আমরা বড় হয়ে উঠেছি।   শিক্ষা ছাড়াও বেশ কেছু পেশা আর এগুলোর সাথে যুক্ত মানুষ আমাদের মনোজগতে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করে দিয়ে যায়! এর প্রভাব আমরা বয়ে নিয়ে বেড়াই সারাজীবন। ইংরেজি Caliph বা বাংলা খলিফা ইসলামের মহান প্রতিনিধি হলে দরজি আবার খলিফা হলো কেমন করে? এ জটিল প্রশ্নটি আমি আব্বাকে করে অভিধান ঘেটেছিলাম বেশ সময় ধরে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় থেকে বাংলা একাডেমি।  শব্দটির বিবর্তন কেমন করে বাংলায় এলো তা জানা না গেলেও খলিফা যে দরজি বা কারিগর এটি আমাকে মেনে নিয়ে আজো চলতে হচ্ছে। ঈদ পার্বনের সময় আমরা দরজি বাড়ি আর দোকানে কত যে ঢু মেরেছি তা বলাই বাহুল্য। নওগাঁ টেইলার্সের ভাঙ্গা একটি সাইনবোর্ডের ছোট্ট ঘরে বসে থেকেছি প্রহরের পর প্রহর। মা বাবার বকুনি খেয়েছি বিস্তর। কিন্তু পালু ভাইয়ের স্মৃতি আমি মন থেকে মুছে ফেলতে পারিনি। অনেক কারিগরের মধ্যে তিনি ছিলেন অনন্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন তাঁর নিপুন হাতের সেবা নেয়ার জন্য অপেক্ষা করতেন। এমনও হয়েছে আমার এক উঠতি বয়সী ভায়ের পাজামা নির্দিষ্ট ঈদে ডেলিভারি দিতে না পেরে পরের ঈদে দিয়েছেন। কিন্তু ততদিনে বাড়ন্ত শরীরে তিন ইঞ্চি ছোট হয়ে গিয়েছে। হাসির রোল পড়ে গিয়েছে বাড়ির উঠোন জুড়ে। আমাদের এলাকার একজন বিশিষ্ট  সাবেক কর্মকর্তা এলাকায় এলে আর পালু ভাই কে পায় কে ? বেশ কয়েক জোড়া পোশাক হবে তো এজন্য আমরা তখন গৌন। এ বিষয়ে আমরা মশকরা করতাম বেশ। মৌসুমি পাখি চলে গেলে আমরাই তখন আছি। তিনি বলতেন, থাক না। তোরা তো বাড়িতেই আছিস রে। আমি তোদের কাজ হাতে রেখেছি। উনি জানতেন আমরা কোথাও যাবো না। পালু ভায়ের এক শিষ্য এক গ্রাহকের পাঞ্জাবী ফিট করতে না পেরে বহু চেষ্টা করেছে। শেষে বলেছে আপনার বডি ডিফেক্ট। আমরা হেসে খুন। পালু ভাই বলেছিলেন, আমরা তো ডিফেক্ট বডিরও কারিগর রে। আক্ষেপ করে বলেছিলেন তোদের আমি ডিফেক্ট কারিগর বানালাম এতদিন ধরে! সময়ের বিবর্তনে অনেক পেশাজীবি হারিয়ে যাবেন। আমরা তাঁদের মনে রাখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করি না। রোজার মাসে রাতভর পালু ভায়ের মুখে মুকেশের গান আর সুললিত কন্ঠে মর্শিয়া আর আমরা শুনতে পাবো না কোনদিন। আমি যে শিক্ষাটি পালু ভায়ের কাছ থেকে নিলাম তা কি শোধ দেয়া যাবে কোনদিন। “দুনিয়া বানানে ওয়ালে কা তেরে মন মে সামায়ী? কাহে তু দুনিয়া বানায়ী?” কিংবা বিখ্যাত মর্শিয়া,”এই কি জাহেদা কেমনে বিষ দিলি স্বামীরও পানির পেয়ালায়,বিছানায় গড়াগড়ি যায়।” সারা রাত জেগে জেগে মহান কারীগর মানুষকে সুন্দর বানানোর জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। কাজ করতেন একাগ্র চিত্তে। পালু ভাই সব শেষে গিন্নির ব্লাউজের সাইজ আর মাপ নিয়ে মশকরা করে পেশার ইতি টেনেছিলেন। এত হাল্কা বডির ব্লাউজ বউদের হয় রে? তুই মনে হয় মাপ ভুল করছিস?  আমি বলেছিলাম না উস্তাদ, এরা ভেজাল খাওয়া বডির মানুষ তো এজন্যে আপনাকে নিজে মাপ না নিলে ঠিক হবে না। তিনি রাজি হননি। কিন্তু উৎরে গিয়েছিলেন। কথা বলতেন দারুন বাংলায়। বলতেন আমার নওগাঁর ওস্তাদ মিষ্টি ভাষা আর কাজ আমাকে শিখিয়েছেন। হেভি লেন্সের চশমা দিয়ে অশীতিপর বয়সেও আমাদের সেবা দিয়েছেন পালু ভাই। বাংলাদেশের এ কারিগরেরা আজ বিলুপ্তির পথে। কাঁশারি,ঠাটারি,কামার আর কুমারদের মতো এরাও হারিয়ে যাবেন কালের মহাপরিক্রমায়। আমরা শুধু নষ্টালজিক হবো। অভিধানে থাকতে পারে এ শব্দগুলো। মহান কারিগর তামিজুদ্দিন পালু ভাই আমাদের ছেড়ে গত ১১.১০.২০২০ চলে গিয়েছেন বিধাতার সান্নিধ্যে। ওস্তাদ আপনাকে সালাম।

নুরে আলম মুকতা, কবি, সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক , মহীয়সী

আরও পড়ুন