মাংস

আবু জিয়াদঃ

: কত দিবো বলো !

আমার সামনে যে ছেলেটি দাঁড়িয়ে আছে তার নাম ওশান। আজ সকালে তার সাথে পরিচয়। কোয়ারিন্টিনের দিন গুলো এখন আর সুখে যাচ্ছে না। কেমন যেন ‌অসহ্য হয়ে উঠছে। এক হাজার বর্গ ফুটের পাখির বাসা সদৃশ ফ্ল্যাট বাড়িতে গাদাগাদি করে সবাই থাকতে থাকতে কেমন যেন একে অপরের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। আমি চাপি বাচ্চাদের উপর , কেনো তারা পড়ছে না। বউ চাপে আমার উপর , কেনো কাজ করছি না। বউয়ের উপরও কি আর চাপ কম ? কাজের মহিলা নাই-একা একা যাই রাঁধে স্বাদ আর লাগে না। সবাই মিলে কম্প্লিন করি আজ ঝাল বেশি তো কাল লবন বেশি, তেল বেশি তো গরম মসলা কম ইত্যাদি।

: বলো ,কত দিবো ? বলো ?

এবারও ওশান চুপ। ওশান আমার বড় ছেলের বয়সী। ক্লাস সেভেনে পড়ে। সকালে আমার ছেলে জিমাদের পড়া নিয়ে মেজাজ গরম করেছিলাম ।একেবারে পড়া বিমুখ একটি ছেলে। যতই বুঝাই আর চাপ প্রয়োগ করি তার মাঝে কোনো ভাবান্তর হয় না। মেজাজ কি আর ঠিক থাকে ?

আমার একতরফা গলা চড়ানোর মাঝে তার মা এসে চড়াও হলো। কোয়ারিন্টেনে থেকে নাকি আমি খিটমিটে মেজাজের হয়ে গিয়েছি। কোনো কাজ কাম করি না কেবল বাচ্চাদের পড়া নিয়ে বাসার শান্তি নষ্ট করি। বারান্দা, সিড়ি আর গ্যারেজে অনেক ময়লা। কাজের লোক না থাকলে নিজ থেকে কি পরিষ্কার করা যায় না ? অগত্যা আমার উপর দায়িত্ব পড়ে এগুলো যেনো আজ পরিষ্কার করি।

বাসার শান্তি রক্ষার্থে হাতা, বালতি আর ঝাড়ু নিয়ে নিচে নেমে আসি। রোজার দিন সকাল দশটায় গ্যারেজ পরিষ্কার করতে যেয়ে বুঝতে পারলাম সকাল সকাল পেটে ক্ষুধা মুচড় দিয়ে উঠছে । বাড়িতে কাজের লোকের যে কত প্রয়োজন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

একটু জিরিয়ে নেয়ার লক্ষে যখন মেইন গেইট খুলে রাস্তায় দাঁড়াই তখন ওশানকে নজরে পড়ে। সে রাস্তার ওপারে বন্ধ চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আমার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে ছিল।বিষয়টি আমার কাছে রহস্যময় মনে হল।

ওশানকে ডেকে কাছে এনে জিজ্ঞেস করেছিলাম , ” আমাকে কিছু বলবে ?

: জ্বি , কাজ চাচ্ছিলাম।

: মানে ?

: আমাকে কোনো কাজে লাগাতে পারেন ? আমার টাকার প্রয়োজন।

এরকম ভাবে যারা কাজ চায় তারা আসলে ধান্দাবাজ হয়। কারণ এই দুনিয়ায় সব কিছু সংঘঠিত হওয়ার মাঝে একটি চেইন থাকে। ওশানের যদি কাজের প্রয়োজন হয় তবে  সেই চেইন মেইন্টেইন করে কাজের সন্ধানে আসার কথা। আমি ছেলেটির আপাদমস্তক ভালো করে লক্ষ করলাম। খুব সাধারণ মনে হলো। মুখে একাধিকবার ব্যবহৃত সার্জিক্যাল মাস্ক , গায়ের টি শার্ট, প্যান্ট আর চামড়ার সেন্ডেল জোড়া দেখে মনে হয়না কামলা শ্রেণীর কেউ। আমার সন্দেহ বেড়ে গেলো।

: কত টাকার প্রয়াজন তোমার ?

: জ্বি আংকেল আমার কাজের প্রয়োজন।

: দেখে তো মনে হয় না তুমি কাজের লোক ?

: যে কাজই করাতে চান, পারবো। কাজ ছাড়া টাকা নিবো না।

একটু ধাঁধাঁয় পড়ে গেলাম । এমন কাজের লোক তো জীবনেও দেখিনি। সুযোগ পেলে যেখানে কাজের লোকেরা কাজ না করেই ফাঁকি দিয়ে আলগা টাকা নিয়ে যেতে চায় সেখানে এই ছেলে বলে কি ! সে কাজ চায় । এমন কি বিনা কাজে টাকা দিলেও সে নিবে না। বিষয়টি বেশ ইন্টারেস্টিং ! মনে হলো কাজ করতে দিয়ে দেখিই না কি হয় ! আমি তো সাথেই থাকবো। চুরি-চামারী করা এতো সহজ হবে না।

: ঠিক আছে , আসো।

সকাল থেকে ওশানকে নিয়ে সব গুলো কাজ সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করেছি। সিড়ি ঝাট দেয়া , গ্যারেজ পরিষ্কার করা , ছাদের বাগানে গাছের যত্ন নেয়া,  সব। এর মাঝে ওশানের সাথে টুকটাক গল্পও করেছি।

ওশান ময়মনসিংহ শহরের জেলা স্কুলের ছাত্র। তাদের বাড়ি জামালপুরে । তারা ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে শম্ভূগন্জ মেইল গেইট এলাকায় ভাড়া থাকে। সে খুব দায়িত্বশীল ও ভদ্র। কিছুক্ষন কাজ করানোর পর তার প্রতি আমার ‌অহেতুক সন্দেহ কেটে যায়। কাজ খুব বেশি ছিলো না। জোহরের নামাজের আগে আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেলে আমরা এক সাথে সালাত আদায় করি। ওশানকে তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ,আমার কাজ শেষ । তুমি এখন যেতে পারো।
সে বলেছিলো আরও কাজ থাকলে আসর পর্যন্ত করতে রাজি । তার মানে সে আরও কাজ করে তার পারিশ্রমিকের অঙ্ক বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে।

: ঠিক আছে ওশান , তাহলে চলো বাজার করে আসি।

: আচ্ছা।

মেছুয়া বাজার ঘুরে ঘুরে সব বাজার শেষ করেও বেলা রয়ে গেছে ঢেড়। এবার ওশানকে বিদায় দেবার পালা।

: বলো ওশান, কত দিবো তোমাকে ?

ওশান এবারও চুপ। আসলে ছেলেটি অন্তর্মুখী। সকাল থেকে যতটুকু জানতে চেয়েছি সে উত্তর দিয়েছে মেপে মেপে। প্রয়োজনের তুলনায় কম। এই যেমন তার বাবা কি করে , তারা কয় ভাইবোন ইচ্ছা থাকার পরও এসব ডিটেইল জানা হলো না। জিজ্ঞেস করলে সে চুপ থেকেছে ।

: আচ্চা ওশান, তোমাকে কত দিতে হবে ? তুমি যদি না বলো তবে আমি দিবো কি করে ?

: স্যার , আপনি কাজের অনুপাতে যাই দিন ।

: কাজের অনুপাতে দিতে গেলে তো অনেক কম দিতে হবে ?

: তাহলে কমই দিন ।

: এই নাও, তিন শত টাকা।

: ধন্যবাদ স্যার।

: ওশান , তুমি কিন্তু বললে না তোমাকে কাজ করতে হলো কেনো ? বাসায় রাগারাগি করেছো ?

এবারও ওশান চুপ। আমি বিরক্ত হলাম। ধমকের সুরে বললাম যাও । বাসায় যাও । তোমাকে কিচ্ছু বলতে হবে না।

ওশান আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে । আমি দাঁড়িয়ে আছি রিক্সার জন্য , আর ভাবছি রাগ করে হউক বা প্রায়োজনে হউক টাকার জন্য সে যদি ঘর থেকে বের না হতো তাহলে এমন জেদি আর দায়িত্ববান ছেলে আমার জীবনেও দেখা হতো না। বারবার মনে পড়ছিল আমার জিমাদের কথা। ভালো করে পড়া লেখা করার জন্য কত যত্ন করি ! কত ব্যয় করি !খাবার-দাবার,পোষাক-পরিচ্ছদ, কোচিং-টিউটর  কত্ত কি! অথচ এতো সুযোগ সুবিধা পেয়েও সে উন্নতি করতে পারছে না। দায়িত্ববান হচ্ছে না। মোবাইলের নেশায় জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছে। ‌আর একই ক্লাসে পড়ে একটি মেধাবী ছেলে আমাকে আজ কত কিছু শিখিয়ে গেলো।

রিক্সা পাচ্ছিলাম না। দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষন যাবৎ। হঠাত দেখি ওশান আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

: কিছু বলেবে ওশান ?

: আংকেল এই টাকা থেকে আমাকে একটু গরুর মাংস আর বাকি টাকা দিয়ে যে পরিমানই হয় চাউল কিনে দিতে পারবেন ?

ওশান হঠাৎ করে স্যার থেকে আংকেলে নেমে আসে।

: না পারবো না। তুমি কিনে নাও।

: আমি গোস্ত চিনি না । আংকেল প্লিজ, একটু হেল্প করুন। কৃতজ্ঞ থাকবো। আমি কিনতে গেলে কসাই মন্দ গোস্ত দিয়ে দিবে। খেতে স্বাদ  হবে না।

: বাজার করে দিতে পারি এক শর্তে ।তোমাকে সব খুলে বলতে হবে কেনো তুমি কাজে আসলে ? তোমার বাবা কি করেন তোমরা কয় ভাই বোন ,সব ।

: আংকেল , আমার বাবা মারা গিয়েছেন পয়ত্রিশ দিন হলো। তিনি চরপাড়ার দিকে একটি দোকানের ম্যানেজার  ছিলেন। গলা ব্যাথা,  সর্দি,জ্বর নিয়ে তিনি মার যান। এলাকার লোক জন করোনা সন্দেহ করে এতোদিন আমাদেরকে এক ঘরে করে রেখেছিল। গত কয়দিন হলো আমরা ঘর থেকে বের হয়েছি। আমরা দুই ভাই।

: বলো কি ওশান !

: জ্বী আংকেল , আমরা এখানকার স্থানীয় না। বাবার চাকরির কারনে আমরা ময়মনসিংহে থাকি। দাদুর বাড়িতে আমাদের কোনো সহায়-সম্পত্তি নাই। বাবার জমানো টাকা বলতে কিছু ছিলো না। এই কয়দিন আশপাশের লোকজন যা দিয়েছে তা দিয়ে কোনো রকম চলে গিয়েছে।

: তারপর  ? তোমার ভাই আর মায়ের কি অবস্থা ?

: মা খুব কান্নাকাটি করেন। ভাইটা ছোট । ছয় বছর বয়স । সে তেমন কিছু বুঝে না। তার বিশ্বাস, বাবার করোনা হয়েছে। করোনা হলে চিকিৎসার জন্য মানুষকে কিছু দিন মাটির নিচে রাখতে হয়। সুস্থ্য হলে সে আবার ফিরে আসে। বাবাও ফিরে আসবেন। তাকে হয়ত এমনটি বুঝানো হয়েছে ।

আমার ভাবনার জগত এলোমেলো হয়ে গেলো। ওশানকে জিজ্ঞাসা করার মতো কোন ভাষা অবশিষ্ট রইলো না। অথচ মনের ভিতর কত প্রশ্নের তোলপাড়। তারপরও খুব সাহস করে ওশানকে শেষ প্রশ্নটি করেছিলাম।

: তাহলে আর তোমার পড়ালেখা হচ্ছে না ?

: আংকেল দোয়া করবেন । পড়া লেখা ত্যাগ করবো না। স্কুলের ফাঁকে যেখানে সুযোগ পাই, সেখানে কাজ করবো। মা কি আর বসে থাকবেন ! তিনিও কোনো না কোনো কাজ জোগাড় করে নিবেন।

: কাজ আর পড়া দুটো কেমনে সম্ভব হবে?

: আংকেল, ‌অসুস্থ থাকার সময় বাবা অনেক কথা বলে গিয়েছেন। সবগুলো দামী কথা । হয়ত তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার হায়াত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তার অনেক কথা আমার মনে আছে। তিনি বেশি বেশি যে কথাটি বলতেন তাহলো , মানুষ যত বেশি ‌অসহায় হয়ে প্রভুকে ডাকবে তিনি ততবেশি সহায় হয়ে তার ডাকে সাড়া দিবেন। আংকেল আমরা বড় অসহায়। এই কথাটি প্রভুকে বেশি বেশি করে বলবো। তাছাড়া আমাকে বেশিক্ষন পড়তে হয় না। কম পড়েই শিখতে পারি ।

আমি আর পারছিনা। মনে হচ্ছে এই ছোট্ট বালকের সামনে থেকে দ্রুত পালিয়ে যেতে না পারলে মানুষের সামনে লজ্জা পেতে হবে। কোনো অবস্থায় চোখে বাঁধ নির্মাণ করতে সক্ষম হচ্ছিনা।

: ঠিক আছে , চলো তোমাকে বাজার করে দিয়ে আসি। ও আচ্ছা তোমার যেহেতু টাকা কম, তাহলে এতো দামী মাংস কেনো কিনবে ?
মুরগির মাংস কিনলেই পারো।

: ছোট ভাইটার জন্য। বাবা সবসময় ভালো বাজার করতেন । খাবারের প্রতি তার বেশ ঝোঁক ছিল। বিশেষ করে গরুর মাংসের প্রতি। কাল থেকে ছোট ভাইটা গরুর মাংসের জন্য কান্না করছে। মা সকাল বেলা সহ্য করতে না পেরে তার গায়ে হাত উঠিয়েছেন। অথচ মা আমাদেরকে কখনও মারেন না। ছোট ভাইটা  তো আর বুঝে না যে, সংসার থেকে বাবা হারিয়ে গেলে সাথে সাথে আরও কত কিছু হারিয়ে যায়।
হয়ত বড় হলে বুঝতে পারবে। ততদিন আমাকে আর মাকে তার আবদার মিটাতে কষ্ট সহ্য করে যেতে হবে।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন