সবুজ শাড়ি

ডঃ উম্মে বুশরা সুমনা

সবুজ রঙের উপর লাল লাল ফুলের ছোপ,কী সুন্দর শাড়ি, আম্মাকে খুব মানাবে,আর হালকা নীল শাড়িটা ওটা দাদিকে,আর ওই যে কচু পাতা রঙের শাড়িটা ওটা ফর্সাপাগলি বুবুটাকে মানাবে, কী সুন্দর নতুন শাড়ির গন্ধ, বুবুটা যে কীখুশি হবে আর দাদিটা ফোকলা দাঁত সব বের করে হাসবে।শাড়িগুলোরউপর হাত বুলাচ্ছে নাসরিন, কবে বাড়ি যাবে, কবে যে মা,বুবু,দাদি,এক পা খোঁড়া আব্বা আর ছোট বোনটাকে দেখতে পাবে। বাড়ির মালিক খালাম্মার ডাকে নাসরিন ফিরে তাকায়।

‘কী রে, নাসরিন, শাড়িগুলো পছন্দ হয়েছে? তোর খালু এবার তিন হাজার শাড়িযাকাত  হিসেবেগ্রামের মানুষদের দিবে,আমি তোর জন্য এই তিনটা আলাদা করে রেখেছি।’

‘খালাম্মাখুব ভালো হইব,এবার গ্রামের সব মহিলারা নতুন কাপড়া পইরা ঈদ করবার পারব।’

‘হুম, এবার তো আমরাও গ্রামে ঈদ করব। যেদিন যাকাত  দেবে সেইদিন রাতেই রওনা দেবো। ভোরে যেয়ে পৌঁছব। তোর খালু আগেই যাবেন। নিজ হাতে জাকাতের কাপড় বিলাবেন। স্থানীয় খবরের কাগজেও ছাপানো হবে। বুঝলি, এবার তিনগুণ শাড়ি দেওয়া হবে। গতবার তো একহাজার  শাড়ি দিয়েছিল। এবার মাইকিং করা হয়েছে। বিশাল ব্যাপার।’

নাসরিনের মুখটা খুশিতে ঝলমল করে উঠল। গ্রামের সব বৌ-ঝিয়েরা নতুন শাড়ি পরে আয়েশ করে পান চিবাতে চিবাতে বিকেলের মরা রোদে টং এর উপর বসে গল্প করবে। হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়বে। অলস সময়টাতে নতুন বউয়েরা হয়ত শাশুড়ির জটা চুলে তেল দিয়ে পরম যত্নে বিলি কেটে দেবে। মায়েদের আনন্দে বাচ্চারাও খেলতে খেলতে হেসে উঠবে। মায়ের গায়ের নতুন শাড়ির গন্ধ নিতে হয়ত কোনো কোনো বাচ্চা মাকে জড়িয়ে ধরে আদর নেবার ছলে শাড়ির মাড়ের অদ্ভুত সুন্দর ঘ্রাণ নেবে। আহঃ এবারের ঈদটা কত আনন্দের হবে।

পাশের রুম থেকে সেলিম সাহেব ডাকছেন।সেলিম সাহেব স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘এই শুনছ,মত পাল্টালাম,তিন হাজার না,পাঁচ হাজার শাড়ি দেবো ঠিককরলাম। সামনে ইলেকশন, এখন থেকেই ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করে রাখতে হবে।  মাইকিং এখন থেকেই করতে বলেছি। আমাদের পাঁটের গুদামের মাঠটাতেডিস্ট্রিবিউট করা হবে। আমি তোমাদের আগেই আগামীকাল বাড়ি যাব। তোমরা তার পরেরদিন এসো।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম।’

‘কি কথা? বলো’

‘তোমার তো যাকাতের অনেকটাকা, একজন কে ত্রিশ হাজার টাকা দিতে পারবে? লোকটার এক পা ভাঙা।কাজ করতেপারে না। একটা মুদির দোকান দিলে বসে বসে কাজ করতে পারত আর পরিবারটা তাহলেস্বাবলম্বী হতো।’

‘কার কথা বলছ?নাসরিনেরবাবা? স্ত্রী লোকের যে আসলেই বুদ্ধি নাই তা আবার প্রমাণকরলে। নাসরিনের টাকায় ওদের সংসারটা চলে।ওর বাবা যদি ইনকাম করে তাহলে কিতার মেয়েকে তোমার কাজের লোকহিসেবে রাখবে? লস টা তো তোমারই হবে। সারভেন্ট ছাড়া এভাবে পটের বিবি হয়ে থাকতে পারবে?’

‘আমার কি হবে সেটা পরে ভাবা যাবে।তোমার মতো এত প্যাঁচানোবুদ্ধি আমার নাই।আমি তো শুধু মানুষের ভালোই চেয়েছি। যে যাকাত মানুষেরকাজে লাগে না,সেটা কেমন যাকাত?আমার মাথায় ঢোকে না।’

আজকে শেষ রোজা।সাহরি খেয়ে নাসরিনের মা, বুবু আর দাদি ঘুমায় না। আজকে সেলিম সাহেবকাপড় দিবে।সকাল ৭টায় পাঁটের গুদামের দরজা খুলবে। লাইন ধরে দাঁড়াতে হবে। আগে আগেযেতে হবে।

নাসরিনের বড় বোন নসিমন দাদির দিকে তাকাল। এরকম অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি যেতে চাচ্ছেন।একটা সাদা থানে আলুথালু বেশে লাঠিতে থুতনিটা ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে বসে আছে। প্রায়ই অসুস্থ থাকে, হাত পা কাঁপে, শরীরে বল পায় না।এইরকম বয়সে সে নতুন শাড়ি দিয়ে কী করবে নসিমন ভেবে পায় না। রোজা থেকে এরকম চড়া রোদে দাদি আবার অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। দাদিকে আটকাতে হবে। নসিমন দাদির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দাদি,তুমি থাক।বুড়া মানুষ। রোজা আছ,তার মধ্যে আবারচড়া দিন। মানষের পাড়াপাড়িত তুমি চ্যাপ্টা হইয়া যাইবে। তোমার যাওনের কামনাই। তুমি নয়া কাপড় দিয়া কী করবা? পরার শখ হইলে আমারটা পরিও।’

দাদি খেঁকিয়ে উঠে বললেন, ‘ঐ ছেমড়ি! তুই খালি আমারে বুইড়া কস।মুই তোর চ্যায়া জোয়ান আছম, বুঝলু? মোর নয়া কাপড়া পরার শখ নাই। খায়েরের পোয়াতি বউ এর কাছে কাপড়াটাবেচিম।সেই ট্যাকা দিয়া পোলাটাক ডাক্তার দেখামু।’

নাসরিনের মা দাদি-নাতনীর ঝগড়া বন্ধ করতে আসেন, ‘ঐ নসিমন, তোর দাদির সাথে ঝগড়া বন্ধ কর।চল হাঁটা দেই।দেরি হইয়া যাইব।আজক্যা আবার নাসরিন ঢাকাত থাইক্যা আইব। শাড়ি নিয়া আবার বাড়িত আইস্যা রাঁন্ধন লাগব। মাইয়াটা কতদিন মোর হাতের রাঁন্ধা খায় না।’

নসিমন, নাসরিনের মা আর দাদি, তিনজন ভোরের আলোয় ঘর থেকে বের হলো। ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে। ওরা গ্রাম ছেড়ে মফস্বল শহরের মেইন রাস্তায় চলে আসল। মানুষের স্রোতের সাথে হাঁটতে হাঁটতে পাঁটের গুদামের কাছে এসে হা হয়ে গেল। এত মানুষের ভিড়। এরা কখন এসেছে কে জানে। এরা মনে হয় এখানেই সাহরি খেয়ে বসে আছে। বিশাল টিনের গেট। সকাল সাতটায় খুলবে। এতক্ষণ তারা এখানে বসে থাকবে। সকাল সাতটা বাজতে মানুষের জটলা ভারী হয়ে এল। পুরো এলাকার মানুষ বোধ হয় এসেছে। মানুষের খালি মাথা দেখা যাচ্ছে। ওরা তিনজন জটলার মধ্যে মিশে গেল। সারাবছর ধরে অপেক্ষার ফল একটা নতুন শাড়ি পেতেই হবে। শত তালি দেওয়া, জীর্ণ শাড়িটা দিয়ে যে শরীর ঢাকে না। যে করেই হোক একটা শাড়ি পেতেই হবে।

গতরাতের প্রাইভেট কারে খালাম্মা আর তাদের দুই সন্তানের সাথে নাসরিনবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।গাড়ি সকাল ১০টার দিকে মফস্বল শহরটাতে ঢুকে পড়ল। নাসরিন ঘুমঘুম ভাবটা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। জানালা দিয়ে উসখুস মনে তাকিয়ে থাকে। একটু পর পর সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স সাঁই করে চলে যাচ্ছে।অ্যাম্বুলেন্সের শব্দটা বুকের ভিতর তোলপাড় করে দিয়ে গেল। কোনো খারাপ কিছু ঘটে নি তো? গাড়ি পাটের গুদামটার কাছে আসার আগেই বন্ধ হয়ে গেল।মানুষ আর মানুষ,তার মধ্যে শুধু কান্না আর চিৎকারের আওয়াজ।নাসরিন ওর স্ক্র্যাচে ভর দেওয়া বাবাকে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখতে পেল।নাসরিন গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গেল।সারি সারি লাশের সাথে ওর মা,দাদি আর বুবুর লাশ পড়ে আছে গুদামের বারান্দায়। নাসরিন চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠে বলল, ‘মাগো,আমি তোমাগো লাইগা তো শাড়ি আনছি,ক্যান তোমরা এইখানে আইছিলা? ক্যাডায় তোমাগো মাইরা ফ্যালাইল,আল্লাগো, এইডা কি হলো গো।’

নাসরিনের বাবা বুক চাপড়ে কেঁদে উঠে বলল,‘মুই ওগো মারছম,মুই যদি কাম করবার পারতাম তাইলে কি ওরা ফকিরনীর মতো একটাকাপড়ার লাইগ্যা আইত।মানষের পায়ের তলে পইরা মরতো।সব দুষ আমার, মোরএই ভাঙা পাও টার। আল্লাহ্‌ ঠিক কামই করছে। মুই কাম করবার পামনা, কাকো খিলাবার পাম না,তাই সবগুলারে উঠায় নিছে। কান্দ,আরো জোরে কাঁন্দরে মা,চিৎকার দিয়া কাঁন্দ তোর কাঁন্দন জানি বড়লোকের ঠসা কানত যাইয়া পৌঁছায়। বড়লোকেরা আমাক কামত নেয় না। কেউ আমাক একটা কামের ব্যবস্থা কইর‍্যা দেয় না। ও বড়লোকেরা, হামার কাঁন্দন কি তোমরা শুনবার পাও?’

টিকাঃ আমাদের সমাজে প্রতি বছরেই যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে মানুষ পদ দলিত হয়ে মারা যায়। তবুও এরকম সিস্টেমের যাকাত বন্ধ হয় না।কিছুবিত্তবানমানুষেরা দরিদ্র মানুষদের  লাইনে দাঁড় করিয়ে নিম্নমানের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করে।লোক দেখানো খ্যাতির মোহেনি জেদের মনগড়া যাকাতের সিস্টেমে যাকাত আদায় করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে।

এদের উদ্দেশ্য ধর্ম পালন নয়, ধর্মকে বিকৃত করে দাতা হিসেবে সুনাম কুড়ানো, এরকম মনগড়া সিস্টেম ইসলাম ধর্মে নাই। আমাদের দেশেই শুধু এরকম শাড়ি-লুঙ্গি দিয়ে মানুষ যাকাত আদায় করে যা রসূল (সাঃ)এবং তাঁর সাহাবাদের আমলের বিপরীত। এভাবে যাকাত আদায় করলে যাকাতের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন করা এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করা। ধনী-গরীবের বৈষম্য দূর করা, সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু লোককে আয়ের উৎস তৈরি করে দেয়া, দরিদ্রতা বিমোচন করা, অর্থনৈতিক কল্যাণের পথ প্রশস্ত করা, নিজের কষ্টে উপার্জিত সম্পদকে পবিত্র করা,আত্মশক্তি অর্জন করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা।

সুতরাং, অবশ্যই সম্পদের যাকাত দিতে হবে নগদ অর্থ দিয়ে। নবির সুন্নত বিরোধী, রিয়া মিশ্রিত নিম্ন মানের যাকাতের কাপড় বিতরণের মাধ্যমে যাকাত আদায় আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।এর দ্বারা যাকাতের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সহীহ হাদীস দিয়ে প্রমাণিত রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশ ও সাহাবীদের আমল হলো ফসলের যাকাত ফসল, গবাদি পশুর যাকাত গবাদি পশু ও সম্পদের যাকাত নগদ অর্থ দিয়ে আদায় করতে হবে। যাকাতভিক্ষা নয় বরং যাকাত হলো ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার, খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে মানুষ পরিপূর্ণ ভাবে যাকাতের নীতিমালা মেনে চলায় আরবে যাকাত গ্রহণ করার কোনো লোক ছিলনা। আমরা কি পারি না, আবার সেই স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে যেখানে যথাতযথ ভাবে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষগুলোর আয়ের উৎস তৈরি হবে আর তারাই একদিন যাকাত গ্রহীতা নয় যাকাত দাতা হিসেবে পরিচিত হবেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টর সহকারী অধ্যাপক

আরও পড়ুন