সম্বোধন

স্যার#

স্যার ডাকার ইতিহাস কম বেশী আমরা সবাই জানি। আমাদের জীবনের চতুর্দিকে স্যারময় পরিবেশ। সেই যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন স্যারের সামনে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে স্যার ডেকেছিলাম এরপর আর কার সাধ্য আছে এই স্যারের চক্র থেকে বের হয়ে আসে। আমরা শিক্ষকদেরকে স্যার ডাকি শ্রদ্ধাবোধ থেকে তথাপি আমি মাঝেমধ্যে আরবি পড়তে যেয়ে মক্তবের হুজুরকেও স্যার ডেকে ফেলতাম।

স্যার ডাকতে ভালোই লাগে। শুরুর দিকে বেশ উদ্যমের সাথে স্যার ডাকতাম। স্যার ডাকার মধ্যেই মনে হতো সব স্মার্টনেস। ধীরে ধীরে এটি গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। সরকারি কোনো অফিসে গেলে কেরানি থেকে শুরু করে সবাইকে স্যার ডাকতে হবে। না ডাকলে কাজ হওয়া তো দূরের কথা গলাধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করে দেয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কলেজে একবার পরীক্ষার ফি দিতে গিয়েছিলাম অফিসে। সেখানে দেখলাম আমার এক সহপাঠীকে অফিসের সবাই যা ইচ্ছা তা গালাগালি করছে। সাথে সহপাঠীর মা/বাবাকেও ফ্রিতে সেইসব গালাগালির অংশ দেয়া হচ্ছে। পারলে থাপ্পড় দেয়া হয় কেবল এটুকুই বাকী আছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম সে প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা যিনি হেড ক্লার্ক নামে পরিচিত তাকে স্যার ডাকেনি। বন্ধুকে আরো কয়েকটি গালি দিয়ে বললাম, “আরে ব্যাটা, তোর সাহস তো কম নয়! জন্মের পর থেকে স্যার ডাকতে ডাকতে মুখে ফেনা তুলে ফেললি, আজ কলেজের কেরানিকে স্যার ডাকতে পারলি না? তুই বেঁচে গেছিস যে এটি হাসপাতাল নয়। হাসপাতাল হলে দাঁড়োয়ান থেকে স্যার ডাকা শুরু করতি! গর্ধভ কোথাকার! কেরানিকে বললাম,”স্যার, গ্রামের ছেলে, এখনও সহজ সরল ভাবটা বিকিয়ে দিতে পারেনি। আপনি কিছু মনে করবেন না। ভুল করে ফেলেছে, এবারের মতো মাফ করে দিন। ওর পক্ষ থেকে আমি আপনাকে স্যার ডাকছি।” স্যার, স্যার বলে খটাস করে একখানা স্যালুট ঠুকে, বুক টানটান করে আবারও বললাম ‘স্যার’। স্কাউটের ট্রেইনিং কাজে লেগেছে, বন্ধুর হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে আসলাম।

এই ‘স্যার’ ডাকার সফটওয়্যার যখন একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে অন্তরে বসে গেছে তখনই ধাক্কা খেলাম। টিউশনি করে নিজের পকেট খরচ চালাই। ছাত্ররা স্যার ডাকে। এর আগে বুঝতে পারিনি এর মাহাত্ম্য। আরে! মজাতো! স্যার ডাকতে যত না মজা শুনতে আরো বেশী মজা। ও মা! ছাত্রদের গার্জিয়ানরাও স্যার ডাকে। এত মজা কোথায় রাখি? একবার ইচ্ছে হলো ছাত্রের গার্জিয়ানের ‘স্যার’ ডাকটি রেকর্ড করে সাথে রাখি; যখনই ইচ্ছে হবে রেকর্ড বাজিয়ে শোনা যাবে। আমি কি কম যাই? আমাকেও কেউ কেউ স্যার ডাকে! হাতের কাছে রেকর্ডার না থাকায় সে কাজটি করতে পারিনি। তবে, বাসার সাথেই চা-বাগানের ভেতরে দুটি উঁচু পাহাড় ছিলো। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে আওয়াজ করলে প্রতিধ্বনি ফেরত আসে। সেখানে গিয়ে যখন তখন নিজেই নিজেকে স্যার ডাকতাম আর তা প্রতিধ্বনি হয়ে ফেরত আসতো স্যার …!

পা মাটি ছেড়ে আকাশে উড়তে শুরু করলো। যে ছেলেটির কাছ থেকে নিয়মিত ডিম কিনি সেও স্যার ডাকে। বেসরকারি ব্যাংকের এক বড় কর্মকর্তা যেদিন প্রথম স্যার ডাকলেন সেদিন সত্যি সত্যিই আকাশে উড়াল দিলাম। গিয়েছিলাম একটি পে অর্ডার ইস্যু করতে। তিনি এসে বললেন, “স্যার, দুঃখিত, আমরা কোনো ক্লায়েন্টকে পাঁচ মিনিটের বেশী বসিয়ে রাখিনা, চেক হলে দুই মিনিট। আমাদের সিস্টেমে সমস্যা দেখা দিয়েছে, একটু বেশী সময় লাগতে পারে। আপনি কি এক কাপ লেবু চা নিবেন স্যার?”

আরে বাপস রে! আমাকেও কোনো কর্মকর্তা স্যার ডাকে। এতদিনের ধৈর্য্য তাহলে ফেরত আসা শুরু হয়েছে! কান ভরে এবার স্যার ডাক শোনা যাবে। খুব বেশিক্ষণ আকাশে উড়াউড়ি স্থায়ী হয়নি। একটানে আছাড় মেরে একেবারে ধরনীতে ছুঁড়ে মেরেছে।

বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা বার কয়েক স্যার ডেকে যে পে- অর্ডার হাতে ধরিয়ে দিলেন সেই একই পে অর্ডার জমা দেবার জন্য সরকারি ব্যাংকে গিয়েই নিজের আওকাত বুঝা গেলো। সেখানে হলো আসল রাজা প্রজার খেলা। নিজের আওকাত বুঝতে হলে সরকারি অফিসে যেতে হয়।

আবারও ধাক্কা খেলাম যখন বিদেশে আসলাম। এখানে সব অফিসার ক্লায়েন্টকে স্যার ডাকে। যত বড় অফিসার তত বেশী বিনয়ী। প্রতিটি কথায়ই বুঝা যায় যে সে রাষ্ট্রের মালিকের সাথে কথা বলছে। আমরা বিদেশি হিসেবেও একই ট্রিটমেন্ট পাই। পুলিশ কিংবা ট্রাফিক অফিসার যেখানেই তার অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য থামায়, সম্মানের সহিত ‘স্যার’ সম্মোধন করে এবং সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ দেয়। নাহ্! এদেরকে নিয়ে আর পারা যায়না। এরা বারবার মনে করিয়ে দেয় যে “জনগণই রাষ্ট্রের মালিক”।

মনসুর আলম

কবি,সাহিত্যিক,ও সহ-সম্পাদক,মহীয়সী ।

সাউথ আফ্রিকা প্রবাসী

 

 

আরও পড়ুন