সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের কানে কানে

পর্বঃ পরিবার, সন্তান সন্ততি থেকে দূরে থাকা নারী মিলিটারিরা

নাজমা বেগম নাজু

ডিনার শেষে সব ফিমেইল অফিসারদের নিয়ে ব্যানমেড চত্বরের ভেতরেই হাঁটছিলাম। রাত দশটার মত হবে।আকাশ জোড়া মেঘ। নিচে মেঘছোঁয়া মায়াময় বাতাস।মনের ভেতরে কিছুটা চাপা উদ্বিগ্নতা। আমাদের ইনটেনসিভ কেয়ারে এ্যাক্যুউট মায়োকার্ডিশাল ইনফার্কশনের একজন রোগী ভর্তি আছে।আমাদের করণীয় যা কিছু তার সবই করা হয়েছে।এখন আরো কিছু ইনভেস্টিগেশন এবল বেটার ম্যানেজমেন্টের জন্য তাকে লেবেল থ্রী হাসপাতালে পাঠাতে হবে।অফিসিয়াল ফর্মালিটিজ সবগুলো শেষ হয়েছে। আগামীকাল জাতিসংঘের বিশেষ বিমানে লেবেল থ্রী( উগান্ডায়) হাসপাতালের উদ্দেশ্যে উড়াল দেবে এই রোগী।তারপরেও টেনশনে থাকি। রাতে না আবার রোগির অবস্হা হঠাৎ করেই সংকটাপন্ন হয়।প্রাণভরে দোয়া করি– আল্লাহ তুমি সুস্হ রেখো তাকে। সুস্হ করে দিও।এর মাঝেও দেখি আমার জীবন জয়ী চিকিৎসকেরা টেবিল টেনিস খেলছেন। ওখান থেকে তাদের আনন্দময় কলহাস্যের সুর ভেসে আসছে।বুকের অতল স্পর্শ করে এই সুর।মনটা ভরে যায়। মন বলে আমরাই পারব—- জয় করব আমরাই।সবরকমের বৈরীতা, সংশয়, সংকট, বিপর্যয় সবকিছুকেই জয় করব আমরা। হঠাৎ করেই মেইন গেটের দিক হতে সম্মিলিত স্বরের কিছু কথাবার্তা ভেসে আসে। চোখ ফেরাতেই দেখি বেশ স্হূলকায় একজন ব্যক্তি সাথে ক্ষীণদেহী একজনকে নিয়ে ঝড়ের বেগে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। তাদের দুজনকেই খুব অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।প্রথমে কিছুটা ভড়কে গেলেও দ্রুত নিজেকে সামলিয়ে নিই।আমার সাথে সব ফিমেইল অফিসাররা রয়েছেন।আমি তাদের কমান্ডার।যে কোন পরিস্হিতিতে দৃঢ় মনোবলে অটল থাকতে হবে আমাকে। মূহুর্তেই আমার মুখোমুখি এসে অবস্হান নেন তারা।এবার চিনতে পারি। সেক্টরের চিফ এ্যাডমিন অফিসার এবং হেড অফ দা অফিস।দুজনকেই খুব বিব্রত দেখাচ্ছে।খুব বিনয়ী হয়ে বারবার বলতে থাকেন, এত রাতে কষ্ট দেয়ার জন্য ভীষণ দুঃখিত। কিন্তু এ ছাড়া আমাদের আর কোন উপায়ও ছিল না।আমাদের এখানে নতুন একজন নারী কর্মকর্তা এসেছেন। তিনি জার্মানীর।হঠাৎ করেই তার রুম থেকে চিৎকার এবং কান্নার শব্দ পেয়ে ছুটে যাই।দেখি তিনি মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে আর্তনাদ করছেন এবং অস্বাভাবিক কিছু আচরণ করছেন। অনেক বুঝিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করি।সাহস এবং সান্তনা দিতে সর্বোতভাবে চেষ্টা করেছি কিন্তু কোন লাভ হয়নি।শেষে তাকে অনুরোধ করেছি আমাদের সাথে হাসপাতালে আসতে কিন্তু আমাদের কোন কথাই তিনি শোনেননি।কান্নার কারণ জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছি কিন্তু কোন উত্তর করেননি। একটানা কেঁদেই যাচ্ছেন চিৎকার করে।দেখো আমরা পুরুষ মানুষ, আমরা তো তাকে জোর করতে পারি না। তোমরা যদি একটু যেতে। তোমাদের কথা হয়ত শুনবে।হয়ত হাসপাতালে আসতেও রাজি হবে।স্বজন- পরিজন- আত্মীয় কেউ না, তারপরেও এই বিদেশ বিভুঁইয়ে অচেনা অজানা একজন মহিলার কষ্টে তাদের প্রাণ কেঁদে উঠেছে— আমি সত্যিই শ্রদ্ধাবনত হই এই দুই কর্মকর্তার প্রতি।মুখের ভাষায় তা প্রকাশও করে ফেলি। অনেক অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি তাদের। আমার জীপ এবং এ্যাম্বুলেন্স বের করতে বলি।কর্নেল জেবুন, মেজর রাসেল এবং মেজর শিমুসহ সেক্টরের উদ্দেশ্যে রওনা দিই আমরা।পাঁচ মিনিটেই পৌঁছে যাই।

জার্মানীর সেই নারী কর্মকর্তা। ডরিস তার নাম। পুরো মুখ এবং চোখ দুটিও রক্তবর্ণ হয়ে আছে।অস্বাভাবিক দেখাচ্ছে তাকে। কথাবার্তাও অসংলগ্ন।আমাদের দেখতে পেয়েই রাগি কন্ঠে বলে উঠলেন– কেন এসেছো এখানে? আমি এখন কথা বলার মুডে নেই। ভুলেও কেউ কোন কথা বলবে না আমার সাথে। হাসি মুখে নরম স্বরে বলি, তোমাকে কোন কথা বলতে হবে না, কিছুই বলতে হবে না তোমাকে।শুধু শান্ত হয়ে এখানে – আমার পাশে একটু বসো। এবারে রাগের মাত্রা আরো একটু চড়িয়ে সে বলে উঠে– না– কিছুতেই বসব না আমি, তোমরা যাও- , আমি আমার পরিবারের সাথে একা কথা বলতে চাই।এবারে চিফ এ্যাডমিন অফিসার অনুরোধ করেন- উনারা তোমাকে নিতে এসেছেন। এরা সবাই লেবেল টু হাসপাতালের ডাক্তার।উনাদের সাথে যাও। তোমার ভাল লাগবে। তোমার মন ভাল করে দেবেন তারা। ওখানে ভীষণ সুন্দর এক পরিবেশ। একদিকে মিস্টি গানের সুর, আর এক দিকে মন মাতানো টেবিল টেনিস।এবারে ডরিস যেন ক্ষেপে উঠে।পাগলের মত করতে থাকে সে।আমি অনেক করে বুঝাই, চলো তোমার ভাল লাগবে।না হয় একটু ঘুরে এক কাপ চা খেয়েই চলে আসবে।আমি নিজেই তোমাকে রেখে যাব।উত্তরে অপ্রকৃতস্হের মত সে বলতে থাকে, আমি এখানে আসতে চাইনি, আমাকে জোর করে এখানে পাঠানো হয়েছে।বমি রাজধানী শহর বাংগুইতে থাকতে চেয়েছিলাম। আমার সাথে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। অনেক বেশি মানসিক চাপে রেখেছে তারা আমাকে।এত কাজের চাপ, এত বেশি পরিশ্রম, এত মানসিক নিপীড়ন আমি আর সহ্য করতে পারছি না। অনেক মমত্ব দিয়ে বলি, একটু ধৈর্য্য ধরো, সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রয়োজনে তোমার বসের সাথে কথা বলব আমি।এখন চলো– আমার সাথে হাসপাতালে, অনেক ভাল ঔষধ ও চিকিৎসা সেবা রয়েছে আমাদের।তোমার মানসিক চাপ কমিয়ে প্রশান্তি এনে দেবে।অনেক শান্তি নিয়ে ঘুমাতে পারবে তুমি।ডরিস জানায় সে ইতমধ্যেই অনেক ঔষধ খেয়েছে যা তাকে তার জার্মানীর চিকিৎসক দিয়েছেন।হাতে নিয়ে দেখি একগাদা এন্টি ডিপ্রেশনের ঔষধ। তার মানে একজন মানসিক রোগি সে।এই মানসিক অবস্হা নিয়ে এত বড় পদমর্যাদা এবং দায়িত্বপূর্ণ চাকরিতে এত বছর ধরে সে বহাল আছে কেমন করে? ডরিসের কন্ঠে ভাবনার ঘোর কাটে আমার। রুক্ষস্বরে সে বলে উঠে– তোমরা এখনো যাচ্ছ না কেন? আমি এখন আমার পরিবারের সাথে কথা বলব।

ডরিসকে আরো কিছুটা সময় বোঝানোর পরে আমার মোবাইল নাম্বার লিখে ওর হাতে দিই।বেশ যাচ্ছি আমরা, তুমি ভাল থেকো আর যে কোন প্রয়োজনে আমাকে রিং করো কেমন? আমরা দরজার কাছাকাছি আসার সাথে সাথেই দেখি সে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে তার রুম ঝাড়ু দিতে শুরু করেছে।দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে আমরা বাইরে এসে দাঁড়াই।চিফ এ্যাডমিন অফিসারকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মনে হলো। খুব অসহায়ের মত তিনি বলতে থাকেন– রাতে আবারো এমন করলে তাকে নিয়ে কি করব আমি? আমি তো সরাসরি ওর রুমেও যেতে পারব না, ওর কোনরকম বিপদেও পাশে থাকতে পারব না। কি করব আমি? তাকে সাহস দিয়ে বলি, তেমন কিছু হলে আমাদের রিং করো, তাৎক্ষণিক চলে আসব। কিচ্ছু ভেবো না তুমি, আমরা সবসময় পাশে আছি।চারজন চিকিৎসক ও দুই মেডিকেল সহ জীপ ও এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ফিরে আসি আমি।মনের গভীরে অনেকগুলো প্রশ্ন।ডরিস কি বিবাহিতা? ওর ছেলেমেয়ে ক’ জন? কতবড়? কোথায় আছে তারা? সত্যিই কি ওর পূর্ণাঙ্গ একটি পরিবার আছে? নাকি নিসঙ্গ এই যন্ত্রনাক্লীষ্ট জীবন বেছে নিয়েছে? কেন নিয়েছে? কেমন ছিল ওর ছেলেবেলার দিনগুলো? ওর বাবা মায়ের সম্পর্ক? বাবা মায়ের সাথে তার সম্পর্ক? কিছুই জানা হয়নি। যেহেতু আমাদের হাসপাতালে রোগী হয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে সে আসেনি তাই আগ বাড়িয়ে এসব প্রশ্ন করাটাও অশোভনীয় দেখায়।

কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে যায় আমার।আমার পোস্টিং ছিল ঢাকা সি এম এইচ এ। আমি তখন ফ্যামিলি উইং এর কমান্ডিং অফিসার।বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে একটি কোর্সে ছিলেন ক্রোয়েসিয়ান এয়ার ফোর্সের একজন ফিমেইল অফিসার।অল্পদিন পরেই মানসিক অবসাদ ভীষণভাবে গ্রাস করেছিল তাকে।এক পর্যায়ে বদ্ধ উন্মাদের মত আচরণ করতে শুরু করেন এই কর্মকর্তা।সার্বক্ষণিক সতর্ক প্রহরার মাঝে দিতে হয়েছিল তার চিকিৎসা সেবা।শেষ রক্ষা হয়নি তারপরেও। দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল তাকে।তার জায়গায় অন্য একজন নারী কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছিল।কোন এক রহস্যজনক কারণে সপ্তাহ খানেক পরেই তিনিও একই আচরণ করতে শুরু করেন। তিন জন আয়া তার সার্বক্ষনিক প্রহরায় নিয়োজিত ছিল, এমনকি তার গোসলের সময়টাতেও।একবার পল কাটার চাকু দিয়ে আত্মহননের চেষ্টাও করেছিলেন তিনি।উপায় না পেয়ে দেশে তার উর্ধতন কতৃপক্ষকে জানানো হয়।তার হাজবেন্ড( তিনিও এয়ার ফোর্সের একজন অফিসার) এসে নিয়ে যান তাকে।আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আজকের এই ঘটনা নতুন করে আবারো মনে করিয়ে দিল তাদের।একটা জিনিস নতুন করে ভাবতে হচ্ছে আমাকে।তা হলো পরিবার সন্তান সন্ততি থেকে দূরে থাকা নারী মিলিটারিরা একজন পুরুষের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি মানসিক চাপের মাঝে থাকে যা কিনা তারা সাফল্যের সাথে বহন করতে এবং উৎরে যেতে পারে।এটা তাদের অতিমানবীয় ধৈর্য্য এবং সহনশীলতারই প্রতিফলন। দু-একজনই তার ব্যতিক্রম যা ধর্তব্যের মাঝে আনা উচিত নয়।ধর্তব্যে যা আনতে হবে তা হলো এর কারণটা প্রকৃতি প্রদত্ত এটার অনেকগুলো পজিটিভ দিকও আছে। যেমন সন্তান থেকে মাকে বিচ্ছিন্ন করা হলে তার প্রভাব দুজনের উপরেই বিস্তার লাভ করে।এর অর্থ প্রকৃতি প্রদত্ত অবিচ্ছিন্ন এই সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা প্রকৃতি কখনোই মেনে নেয় না।এই বিচ্ছিন্নতায় নেমে আসে যত বিপত্তি আর বিপর্যয়।
এই বিপর্যয় রোধে জাতিসংঘে কর্মরত এইসব মায়েদের জন্য আরো কি কিছু করার আছে জাতিসংঘের? (চলবে)

জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট নারী কমান্ডার নাজমা বেগম নাজু

লেখকঃ সাহিত্যিক এবং জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট নারী কমান্ডার

 

 

 

 

আগের পর্ব – মাতৃত্বের কি অপূর্ব রূপ!

আরও পড়ুন