মৃত্যুর মোহনীয় রূপ

মৃত্যু যে এত সুন্দর হতে পারে,তা আমি আগে দেখিনি।
মৃত্যুর অনিন্দ্য সুন্দর রুপ দেখে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম।
আম্বিয়া বেগমের বয়স ৯০ বছর।
ছেলে মেয়ে নাতি নাতনী আত্মীয় স্বজনের অভাব নেই।
সবচেয়ে হৃদয়কাড়া ব্যাপার হলো আম্বিয়া বেগমের জন্য সবার আন্তরিক দরদ ও মায়া দেখে।
একটু অবহেলাও পাননি তিনি।
সবার চোখের মনি ছিলেন এই বৃদ্ধা নারী।
Acute Severe asthma with Acute inferior MI with HTN with CKD with severe anaemia with RTI
আম্বিয়া বেগমের ডায়াগনোসিস।
বাঁচার আশা কেউ করেননি।
যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার পরে তিনি যখন সুস্থ হয়ে উঠলেন তখন সকাল হবার অপেক্ষা।
সকাল হলেই বাড়ি ফিরবেন।
স্বজনদের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক।
রাতে একে একে সবার সাথে কথা বললেন।আনন্দ করলেন।
সবাইকে বললেন,তোমরা বাড়ি চলে যাও, আমি সকালেই বাড়ি আসতেছি।
আম্বিয়া বেগমের কাছে রাতে ছিলো উনার মেয়ে ও মেয়ের জামাই।
তিনি বিছানা থেকে নেমে চেয়ারে বসলেন।
মেয়ের জামাই ও মেয়ের সাথে হেসে হেসে অনেক গল্প করলেন।
তারা সব আলাপের ভিডিও ধারণ করলেন।
ভিডিওতে আম্বিয়া বেগমের হাসি দেখে মনে হবে কোন চপলা কিশোরী। মধ্যরাতে প্রেমিকের সাথে হেসে হেসে কথা বলা তরুণী আম্বিয়া বেগম।
অনেক রাত।
রাত তিনটা।
আম্বিয়া বেগম বললেন,মেয়েকে তোমরা ঘুমিয়ে যাও।
আমি আজ পাহারা দিবো তোমাদের।
মেয়ের জামাই আম্বিয়া বেগমকে বেডে শুইয়ে দিলেন।
তিনি বললেন, আমাকে ফ্লোরে শুইয়ে দাও।
এই বিছানাটা অনেক উঁচু মনে হচ্ছে।
তারপর তিনি ডান কাথে শুয়ে পড়লেন।
এক মিনিট পর বাম কাথে ফিরে মেয়ে ও মেয়ের জামাইয়ের দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলেন।
হঠাৎ করেই আম্বিয়া বেগমের চেহারার জ্যোতি বেড়ে গেলো।
মুচকি হাসি দিয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস নিলেন আম্বিয়া বেগম।
তারপর আর সাড়াশব্দ করেননি।
ইসিজির দিকে তাকিয়ে আছি আমি।
এলোমেলো ইসিজিটা এখন একেবারে সরল রেখায় চলে এসেছে।
আম্বিয়া বেগম রাতে কথা দিয়েছিলেন সকালেই তিনি বাড়ি ফিরবেন।
আম্বিয়া বেগম কথা রেখেছেন।
এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে।
আম্বিয়া বেগম নীরবে শুয়ে আছেন।
সবার চোখে অশ্রু।
৯০ বছরেও সবাইকে আগলে রেখেছিলেন আম্বিয়া বেগম।
ভোর রাত্রে বাড়ির দিকে ছুটে চললো এম্বুলেন্সটি।
আম্বিয়া বেগমকে রেফার করা হয়েছিলো আইসিইউতে।
আমার হাত ধরে জানালেন,তিনি কোথাও যাবেন না।
আল্লাহ বাঁচালে এখানেই বাঁচাতে পারেন।
হায়াত শেষ হলে দুনিয়ার কেউ উনাকে আটকে রাখতে পারবে না।
আমার হাত ধরে বললেন, তোমার যদি সমস্যা হয় আমাকে বাড়িতে নিয়ে যাবে আমার ছেলেরা।
কিন্ত আমি অন্য কোন ডাক্তারের কাছে যাবো না।
সবাই উনাকে বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
আম্বিয়া বেগমের সাফ কথা, আমি বাঁচলে তোমার চিকিৎসায় বাঁঁচবো,মরে গেলে তোমার কাছেই মরবো।
আমার উপর এত অগাধ আস্থা দেখে আমার চোখ ভিজে গেলো।
আম্বিয়া বেগমের কথা মনে পড়ে।
আম্বিয়া বেগমের কথা একজন ক্ষুদ্র চিকিৎসক হিসেবে আমৃত্যু স্মৃতির পাতায় উজ্জ্বল থাকবে।
   -আহমেদ জোবায়ের
    চিকিৎসক ও গল্পকার
আরও পড়ুন