দুঃখবিলাসী

ড. উম্মে বুশরা সুমনা

আজ তারা হ্যাং আউটে গেছে।দামি রেস্টুরেন্টে চেক ইন দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। হাসিমুখে কতগুলো ছবি আপলোড করেছে। শ্যামা তার ভাঙা অ্যান্ড্রয়েড সেটটাতে সুন্দরী কাজিন আশা আর জুয়েলের জুটিবদ্ধ হাসিমুখের ছবিগুলো দেখছে।কী সুন্দর! পিছনের জায়গাটা কত সুন্দর! নীল আকাশ, সবুজ মাঠ, আলো ঝলমলে সোনালি সকালে তাদের দুইজনকে কত রোমান্টিক আর সুন্দরই না লাগছে। আহঃ তার জীবনটা তো এমনই হতে পারত।এমন সুন্দর, রঙিন আর স্বাচ্ছন্দ্যময়।সাত সকালে এই রকম ছবি দেখে শ্যামার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

তার সংসারে স্পষ্ট দারিদ্র্যের ছাপ। দোচলা ঘরের মাঝে একটা পার্টিশন দিয়ে দুইটা রুম বানানো হয়েছে। একপাশের রুমে তারা স্বামী-স্ত্রী আর অন্য পাশের রুমে তার শাশুড়ি আর ননদ থাকে। টিনের চালে পুডিং দিয়ে বড় বড় ফুটা গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবুও ছোট ছোট ফুটা দিয়ে আলোর কিরণমালা ঘরে ঢুকে পরে। সেদিকে তাকিয়ে শ্যামা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ছুটির দিনে এরকম রৌদ্রজ্জ্বল সকালে ঘুরতে কার না ইচ্ছে করে। বিয়ের প্রায় একবছর হয়েছে, সবাই যখন হানিমুনে যায়, এখানে সেখানে ঘুরতে যায় আর চেক ইন লিখে ফেসবুকে ছবি আপলোড দিত শ্যামার তখন কান্না পায়।

তারও তো খুব ঘুরে বেড়ানোর শখ ছিল। স্বামীর হাত ধরে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে হাঁটুজল লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে থাকার ইচ্ছে ছিল। জ্যোৎস্না রাতে সমুদ্রজল আর চাঁদের মিতালী দেখার ইচ্ছে ছিল। উঁচু পাহাড়ে দুইজন গল্প করতে করতে চূড়ায় উঠার শখ ছিল। সেই নির্জন চূড়ায় দাঁড়িয়ে তার সঙ্গী চিৎকার করে ‘ভালোবাসি’ বলে ডাক দেবে, পাহাড়ে সে ডাক প্রতিধ্বণিত হয়ে ফিরে আসবে। কত রোমান্টিক চিত্রনাট্য সে মনে মনে এঁকেছিল। হায়! সবই গুড়েবালি।

শ্যামার প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে তার শাশুড়ি ডাকছেন। শীতের সকালে কাঁথার মধ্যে আরো কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে ফেসবুকিং করতে ইচ্ছে করছে। তা আর হলো না। নিতান্ত অনিচ্ছায় বিছানা ছেড়ে সে রান্না ঘরের দিকে হাঁটা দিল।

উঠোনে খরের চালার ছোট্ট রান্না ঘর। বাঁশের বেড়া দিয়ে একপাশে ঘেরা যাতে বাতাস এসে চুলা না নিভে যায়। রান্নাঘরে ঢুকতেই সে অবাক হয়ে গেল। তার শাশুড়ি বিভিন্ন রকমের পিঠে তৈরি করেছেন। তিনি সেগুলো মাটির পাতিলে সাজিয়ে রেখেছেন। ভাপা পিঠে, দুধচিতই পিঠে, তেলভাজা পিঠে, নকশী পিঠে, কুলি পিঠে আরো কত নাম না জানা সুদৃশ্য পিঠে। এতগুলো উনি একা একা কখন বানালেন। শাশুড়ি শ্যামার বিস্ময় মাখা মুখ দেখে বললেন, ‘বৌমা, দেখেছ, কত পিঠে বানিয়েছি। আব্দুল্লাহ নাকি তোমাকে নিয়ে আজ ঢাকা যাবে, তোমার বাবার বাড়িতে নিয়ে যাবে। দেখো, আমি তোমার আব্বা-আম্মার জন্য কত পিঠে বানিয়েছি।’

শ্যামা ঢোক গিলল। মিষ্টি কেনার মুরোদ নাই, মাকে দিয়ে সাত সকালে ছাইপাশ পিঠে ভেজে নিয়েছে। কঞ্জুস কোথাকার! শ্যামা চুপ হয়ে রইল। শাশুড়ি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি বউমা, তোমার আব্বা-আম্মা এগুলো খাবেন তো? তুমি না হয় শহরে বড় হয়েছ কিন্তু তারা তো গ্রাম থেকেই এসেছেন। তারা নিশ্চয় পছন্দ করবেন।’

শ্যামা হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, খুব পছন্দ করবেন। আমাকে দিন, আমি এগুলো বেঁধে ফেলি।’

পাতিলের মুখ পুরাতন পেপার আর পাটের দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল। শ্যামা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।হাঁড়িটার মতো তারও মাঝে মাঝে গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করে। লজ্জা আর দারিদ্র্যের অসম্মানতায়। সে কোনো আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়াতে যেতে পারে না। তার কোনোদামি শাড়ি নাই, গহনা নাই। তার প্রায় সব আত্মীয়দের ঢাকায় বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। তার সমবয়সী কাজিন আশা আর তার স্বামী জুয়েল কত জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে যায়, আত্মীয়রাও তাদের বাড়িতে আসে, পার্টি হয়, হই হুল্লোড়, খাওয়া দাওয়া হয়। ফেসবুকে খাবারসহ গ্রুপ ছবি, বেড়াতে যাবার ছবি, মজা করার ছবি আপলোড করে। টাকা আর প্রাচুর্যের দেখানোর প্রতিযোগিতা হয় যেন।

তার ধনী চাচারা, মামারা তাকে প্রায় ভুলেই গেছে। জন্মদিন, বিয়ে, আকিকা, ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী, বিভিন্ন অকেশনের গেট টুগেদারে সব কাজিনেরা এক হয়, শুধু শ্যামা বাদ থাকে। তারা জানে শ্যামা গরিব, আসার সামর্থ্য নাই, তাই তাকে কেউ ফোনও দেয় না। এখন আত্মীয়তাও মেইনটেইন হয় সম্পদের স্ট্যাটাস দেখে। একই স্ট্যাটাস বা উঁচু স্ট্যাটাসের আত্মীয়রা পূজনীয় আর নিচু স্ট্যাটাসের আত্মীয়রা যেন অচ্ছুৎ কিছু। এদের দেখলেও যেন বিরক্ত লাগে, মনে হয় হাত পাতার জন্য এসেছে। তাদের সাথে কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায় না। হাতে কিছু ধরিয়ে দিয়ে বিদায় দিতে ইচ্ছে করে।

শ্যামার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে গেল। দরিদ্রতার অসম্মান তাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু তার স্বামী ঠিক উল্টা। আব্দুল্লাহ রিযিকের সংকোচনকে ভালোবাসে। প্রায়ই বলে সম্পদ কম থাকাই ভালো, আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহিতা কম করতে হবে। আমার যা আছে তাতেই আলহামদুলিল্লাহ্‌। কত মানুষ না খেয়ে আছে, ঘর নাই, কাপড় নাই আমার তো সব আছে। আব্দুল্লাহকে কখনো হতাশ হতে দেখে নি সে। সব অবস্থায় মুখে একটু মৃদু হাসি লেগেই আছে। প্রশান্ত চেহারার অধিকারী সে।

আব্দুল্লাহ ঘরে এসে ঢুকেছে। এই শীতেও তার গায়ে একটা পাতলা গেঞ্জি। সবজি ক্ষেতে কাজ করে এসেছে বোধ হয়। ছুটির দিনে সকালে সে বাগানে কাজ করে। ফুল আর শীতের সবজিতে তার বাগান ভরে গেছে। ঘরে ঢুকে ভেজা হাত মুখ মুছতে মুছতে বলল, ‘শ্যামা, দ্রুত রেডি হও। আমরা তো আজকে ঢাকায় যাব।’

শ্যামা রাগ চেপে বলল, ‘গতরাতেই তো বলতে পারতে? ঢাকায় কি কোনো কাজ আছে? কলেজ সরকারীকরণের আন্দোলন, অনশন বা অফিসে ফাইল সাবমিটের দৌড়াদৌড়ি আছে নাকি?’

শ্যামার খোঁচাটা গায়ে না মাখিয়েই আব্দুল্লাহ বলল, ‘আরে না। কোনো কাজ নাই। তোমাকে অনেকদিন কোথাও নিয়ে যাই না। তাই একটু নিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম আর কী। মন টন কেমন খারাপ করে থাকো, তাই ভাবলাম মায়ের বাড়ি বেড়াতে নিয়ে গেলে হয়ত ভালো লাগবে।’

শ্যামা মুখে কটাক্ষের হাসি এনে বলল, ‘বাহ! আমার মনের তো ভালোই খবর রাখা শুরু করেছ?’

আব্দুল্লাহ শ্যামার রাগটা ভাঙার চেষ্টা করে বলল, ‘হুম, না রাখলে চলবে। তুমি তো আমার একমাত্র বউ।’

‘বউ কি মানুষের দশটা থাকে নাকি? একটাই তো থাকে।’

‘থাকে, থাকে, রাজা-বাদশাদের অনেক রানী থাকে। গল্পের বইয়ে পড় নাই, বড়রানী, মেজরানী, ছোটরানী, সুয়োরানী, দুয়োরানী আরো কতরানী!’

‘আপনি কি রাজা নাকি?’

আব্দুল্লাহ শ্যামার কাছে ঘনিষ্ট হয়ে কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘কেন? আমি কি তোমার রাজা নই? আমি তো এই কুঁড়ে ঘরের রাজা আর তুমি আমার হৃদয়ের রানী।’

শ্যামা হাত সটকে দূরে সরে গিয়ে বলল, ‘যত্তসব আদিখ্যেতা। যাব যে তা কী পরে যাব শুনি?’

‘কেন, বোরকা পরে যাবে?’

‘আরে, তার নিচে কী পরব?’

‘কি পরবে, জামা না হয় শাড়ি পরবে। তোমার যেটা ভালো লাগে।’

‘আমার কি ভালো কোনো জামা আছে না শাড়ি? সেই যে বিয়েতে দুইটা শাড়ি দিয়েছিলে আর কী দেবার নাম আছে? পুরাতন শাড়ি পরে গেলে মা ভাববে আমাকে তুমি ভালো রাখো নাই, বুঝলে?’

‘আহঃ, ভালো রাখার মানদণ্ড কি নতুন জামাকাপড়ে নাকি? কী যে সব উল্টা-পাল্টা বক না। নতুন কাপড় লাগবে আগে বললেই তো একটা না হয় কিনে দিতাম।’

‘থাক, লাগবে না। বলেছ তাতেই আমি উদ্ধার হলাম। পুরাতনটাই পরে যাব।’

‘হুম, ঝটফট রেডি হয়ে নিও। ঢাকায় যেয়ে জুমুআর জামাত ধরতে হবে।’

শ্যামা পুরাতন ট্রাংকটা খুলল। শীতের কাপড়ের সাথে তার শাড়ি দুটো উঁকি দিল। নীল সিল্কের শাড়ি আর গোলাপী কাতানটা টেনে বের করল। সিল্কের শাড়িটা মেলে ধরতেই একটা ছোট ফুঁটা দেখতে পেল। না, এটা পরা যাবে না। তেলাপোকা কেটেছে। শিরিন মামীর দেওয়া গোলাপী শাড়িটা যেটা পরে তার বিয়ে হয়েছিল, সেটাই পরতে হবে। গোলাপী ঝকমকে কাতানটা পরে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল, একটু কাজল আর লিপস্টিক দিল। শ্যামলা মায়াবতী মুখটা কী সুন্দর দেখাচ্ছে। সকালের ঝলমলে রোদে ঝকমকে সাজও দুঃখ বিলাসী শ্যামার মুখে হাসি ফুটাতে পারল না। নতুন শাড়ি না পাবার দুঃখে হাসিমুখটা নিমিষেই আঁধারে ছেয়ে গেল। একটা দুঃখের কথা মনে পড়লেই সব দুঃখ যেন মেঘের দলের মতো ছুটে আসা শুরু করে। হানিমুনে না নিয়ে যাবার দুঃখ, বিয়েতে দামি শাড়ি-গহনা না পরার দুঃখ, প্রাচুর্যহীন আটপৌরে টানাটানির জীবনের দুঃখ, মায়ের বাড়িতে মিষ্টি না নিয়ে যেতে পারার দুঃখ, আরো কত দুঃখ মিলেমিশে এক হয়ে কালো বিশাল মেঘের আকার ধারণ করে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকল।

মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারা একটা লক্করঝক্কর মার্কা বাসে উঠল। শ্যামা জানালার পাশে বসল। আব্দুল্লাহ খুব খুশি খুশি মনে পাশে এসে বসল। লোকটার মনে এত আনন্দ, সবসময় হাসিমুখে থাকে। পুরাতন পাঞ্জাবিটা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। এটা তো সেই পাঞ্জাবিটা যেটা পরে সে তাকে বিয়ে করতে এসেছিল। শ্যামার দেখে খুব মায়া লাগল, চোখে পানি চলে এল। আহঃ তার যদি টাকা থাকত তাহলে সে কয়েকটা নতুন শার্ট-প্যান্ট আর পাঞ্জাবি কিনে দিত। শ্যামা মায়াভরা চোখে আব্দুল্লাহকে দেখল। রোদ এসে মুখে পরেছে। ফর্সা সুন্দর, নিষ্পাপ প্রশান্ত মুখ। আব্দুল্লাহর ঠোঁট নড়ছে, বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছে। শ্যামা মায়াভরা কণ্ঠে ডাকল, ‘কী ভাবছ? কী পড়ছ মনে মনে?’

আব্দুল্লাহ চমকে উঠল, যেন সে অন্য কোনোজগৎ থেকে ফিরে এল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন খারাপ করা কণ্ঠে বলল, ‘সূরা কাহাফ পড়ছি। জুমুআ বারে সূরা কাহাফ পড়া একটা সুন্নাহ, তাহলে পরের জুমুআ বার পর্যন্ত ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।’

‘পুরোটা তোমার মুখস্ত?’

‘হ্যাঁ, আমি এটা অনেক ছোটবেলায় মুখস্ত করে ফেলেছি। ১১০টা আয়াত। আব্বা আমাদের দাদা বাড়ির মসজিদের ইমাম ছিলেন। প্রতি শুক্রবার সকালে মসজিদের চটে বসে তিনি এটা পড়তেন আর আমি পাশে বসে শুনতাম। শুনতে শুনতেই মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। আব্বা যখন পড়তেন আমিও তার সাথে মনে মনে ঠোঁট মিলাতাম।’

‘বাহ! তোমার তো অনেক মুখস্তশক্তি।’

‘আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমার শুধু মুখস্ত শক্তিই নয় আমার স্মরণ শক্তিও প্রখর। আমার আব্বার সাথে কাটানো সব স্মৃতি আমার মনে আছে অথচ তখন আমার বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। সেইসব স্মৃতি আমি সযত্নে তুলে রেখেছি।’

‘তুমি তখন কোন ক্লাসে পড়তে?’

‘আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়তাম। আব্বা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন, কখনো চোখের আড়াল হতে দিতেন না। আমি হবার পর আমার তিনজন ছোট ভাই বোন কী যেন রোগে আঁতুড় ঘরেই মারা গিয়েছিল। তাই হয়ত সবসময় হারানোর ভয়ে চোখে চোখে রাখতেন। শুক্রবারে ছুটির দিনে যখন আমার বয়সী ছেলেরা দল বেঁধে মাঠে ছুটে বেড়াত তখন আমি আব্বার সাথে মসজিদে থাকতাম। গল্প করতে করতে দুইজন মিলে মসজিদটা পরিষ্কার করতাম। তারপর অযু করে চটের উপর বসে আব্বা সূরা কাহাফ পড়তেন আর আমি আমপাড়া নিয়ে বসতাম। আব্বা ভরাট কণ্ঠে তেলোয়াত করতেন।কী সুর, মসজিদের ভাঙা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বণিত হয়ে ফিরে ফিরে আসত। আমিও তার সাথে মনে মনে ঠোঁট মিলাতাম। আমার পুরা সুরাটা মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু কখনো তাকে শুনাতে পারি নি। একদিন তাকে আড়াল থেকে শুনিয়েছিলাম।’

‘কেন? আড়াল থেকে কেন?’

‘এক গ্রীষ্মের শুক্রবারে আব্বা আর আমি বসে পড়ছিলাম। আব্বা পনেরো আয়াত পর্যন্ত পড়ে থেমে গেলেন। তার গা ঘামতে শুরু করল। আমার কাছে খাবার পানি চাইলেন। আমি বাহিরের কলপাড়ে যেয়ে পানি আনলাম। এসে দেখি আব্বা চটের উপর ডান কাত হয়ে শুয়ে আছেন। আমি কয়েকবার ডাকলাম, তিনি কোনো সাড়া দিলেন না। আমি চিৎকার করে ডাকলাম। আশেপাশের মানুষ ছুটে এল। সেই শুক্রবারে আমাদের মসজিদ থেকে জুমুআর আজান দেবার আগে আব্বার মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হলো। পাশের গ্রামের ইমাম সাহেব এলেন, দুই গ্রামের মানুষে ছোট্ট মসজিদটা ভরে গেল। মসজিদের মাঠটাতে জানাজা হলো। মসজিদের পাশের জায়গাটাতে আব্বাকে দাফন করা হলো। আকাশের মেঘ ঘন হয়ে জমতে থাকল। সবাই চলে গেল। আমি আব্বার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। সূরা কাহাফের ষোলো আয়াত থেকে তেলোয়াত করা শুরু করলাম। বৃষ্টি টপটপ করে পড়তে লাগল। আমি পড়ছি আর কাঁদছি, মাঝে মাঝে আকাশের দিকে চেয়ে আল্লাহকে ডাকছি, আমি এতিম, আমি অসহায়। আমার প্রিয় মানুষটা চলে যাবার কষ্টে আমি চিৎকার দিয়ে কাঁদছি। মেঘের গর্জনে আর বৃষ্টির শব্দে সেই কান্না কেউ শুনতে পারল না। পুরা সূরা তেলোয়াত শেষ হলে আমি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম।’

আব্দুল্লাহ পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে চোখের পানি মুছছে। শ্যামার চোখ দিয়ে কখন পানি গড়িয়ে পড়েছে, সে নিজেও জানে না। পিতৃহারা মানুষটার ভিতর এত চাপা দুঃখ আর কষ্ট লুকিয়ে আছে, সে তা কখনো দেখার চেষ্টা করে নি। নিজের আলগা দুঃখ সাজাতেই সে ব্যস্ত ছিল তাই এত কাছে থাকা মানুষটার দুঃখভরা সমুদ্রটা সে কখনো ছুঁয়েও দেখে নি।

 

টিকাঃশত কষ্টের মধ্যেও যারা আল্লাহ্‌র ফয়সালার উপর সন্তুষ্ট থাকেন আর প্রতি মুহূর্তেআল্লাহকে স্মরণ করেন, শুধু মাত্র তারাই প্রকৃত সুখী আর প্রশান্ত হৃদয়ের অধিকারী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ সুবহানা তায়াল বলেন, ‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় ( এরা তারাই) জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই কেবল চিত্ত প্রশান্ত হয়।’ (সূরা রাদঃ২৮)

ভোগ বিলাসে মত্ত বাহ্যিক কৃত্রিম হাসিমুখের মানুষেরাহ্যাং আউট, দামি রেস্টুরেন্টেরচেক ইন, খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি, আনন্দ ভ্রমণে ব্যস্ত। তাদেরকে বাহির থেকে দেখলে সুখী মনে হলেও আসলে তাদের ভিতরটা ফাঁকা।ভোগবাদী এইসব মানুষদের ভিতরেএতটুকু শান্তি নাই। আল্লাহ্‌র স্মরণ থেকে দূরে থাকা মানুষদের হৃদয় প্রশান্ত নয়। কেননা শুধুমাত্র আল্লাহর স্মরণ বা যিকিরেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও  একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক

আরও পড়ুন