প্রত্যাগত-(শেষ পর্ব)

-আবু সাইফা

আনোয়ার এবার পেছনদিকে ফিরে এসে এক বাড়ির আঙিনায় আমগাছের ছায়ায় এক মহিলাকে কুলোতে ধান ঝাড়তে দেখলো।বুকে সাহস সঞ্চয় করে মহিলার কাছে জানতে চাইল,–এ গ্রামে নওকর আলী বিশ্বাসের বাড়িটা কোথায়? ভদ্রমহিলা হাতের কুলো নামিয়ে রেখে দুইবাড়ি অন্তর একটা নারকেলগাছের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন — ঐ তো নওকর বিশ্বাসের বাড়ি।
আনোয়ার যেন কূল খুঁজেপেল। উঠানের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো বাড়িটার উপর একবার নজর বুলিয়ে নিল সে। তার মনেহলো সে যেন কোনো গোলাবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। উঠানের পরেই পূর্বপশ্চিম লম্বা আধাপাকা একটা গোয়ালঘর। তার সামনে দুইটা চাড়িতে গতকালের খড় ভিজানো লালচে পানিজমে আছে। মশাদের লার্ভা সাঁতারকাটছে চাড়ির পানিতে। চাড়িসংলগ্ন দুটি খুঁটিতে দুটি বাছুর বাঁধা। তাদের মায়েদের সম্ভবত মাঠে ঘাস খেতে পাঠানো হয়েছে।উঠানের ময়লাআবর্জনার স্তুপের মাঝে বিশ-বাইশ বছরের এক যুবতী দাঁড়িয়ে। তার সমস্ত মুখমণ্ডলজুড়ে ব্রণের ঘনত্বের কারণে মনেহলো গুটিবসন্তে যেন তার মুখমণ্ডল ছেয়েগেছে।গায়ের রং,রুক্ষতা আর চেহারায় সুস্পষ্ট পরিশ্রমের ছাপ দেখে আনোয়ারের কোনো চাতালশ্রমিক বলে ভুল হলো। ও ছিল আসলে নাসরিনের ছোটবোন পুতুল।  পুতুল তাকে দেখেও অত্যন্ত নিরুদ্বেগভাবে দাঁড়িয়ে থাকলো। আনোয়ারের বিস্ময়ের ঘোরের ভেতরেই এক পৌঢ়া রমনী এগিয়ে এলেন।জিজ্ঞেস করলেন — তুমি কি কাউকে খুঁজছো? –হ্যাঁ, এটা নওকর বিশ্বাসের বাড়ি?  আমি যশোর থেকে এসেছি। এতক্ষণে পুতুল বুঝলো, এই সেই মোবাইলফোনে কথাবলা লোকটা। সে কয়েক পা সামনে এসে বলল,– আমি পুতুল।
তাদের বাড়িতে ঘর বলতে ঐ গোয়ালঘরটাই।তার উত্তরপশ্চিম কোনে মাটির টালিতে ছাওয়া একটা কুঁড়েঘর। কুঁড়েঘরের বারান্দায় পাতা একটা কাঠের চৌকিতে আধোশোয়া অবস্থায় পুতুলের বাবা অনবরত বিড়ি টেনে চলেছে। আনোয়ার তখনো ঘোরের মধ্যে — এই কি দারুচিনি দ্বীপেরদেশ! বনলতা সেনের আশা তখনো মনথেকে অন্তর্হিত হয়নি।পুতুলের মা পাশের হিন্দুবাড়ি থেকে চেয়ার চেয়ে এনে তাকে বসতে দিল। কিভাবে যে কী জিজ্ঞাসা করা যায় চরম সিদ্ধান্তহীনতায় আনোয়ার। পুতুলকে শুধু জিজ্ঞেস করলো– তোমার আপা কোথায়? — আপা কাপড়কাচতে গেছে।, আমি ডেকে আনছি, আপনি বসেন, বলে পুতুল পুকুরঘাটে চলেগেল। তার আপাসহ পনেরো মিনিট পর ফিরে এলো। ভেজা কাপড়ে বনলতা সেন! ডানহাত সামান্য উঁচুকরে সালাম দিল। জীবনানন্দ কোনো কথাই বলল না। নাসরিনকে তিরিশ সেকেন্ডধরে আপাদমস্তক দেখে নিল আনোয়ার। পাঁচ ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা, কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে নিচের কয়েকপাটি দাঁত প্রায়ই খয়ে গেছে। কপালে বেশ বড় একটা কাটাদাগ নির্দেশ করছে ছোটবেলায় মহিলা ডাংগুলি খেলায় পাকা ছিল।কপালে সাধারণত ডাংগুলি খেলাতেই ওরকম করে কাটে। ঐ কাটাদাগের সামান্য নিচে গরুর চোখেরমত দুটি গোল চোখ বসানো আছে।ঠোঁট দুটি অসম্ভব ধরণের পুরু। তার ওপর নাকটা বসে আছে যে কায়দায়, নিমেষেই নজরুল ইসলামের খাঁদুদাদু কবিতাটা চক্কোর দিয়েগেল আনোয়ারের মাথার মধ্যে। দেহের কোথাও কোনো নারীসুলভ ভাঁজ নেই। কাঁধের উপর থেকে নিতম্ব অবধি তালগাছের গুড়ির মত একাকার। বয়স তিরিশ পেরিয়ে গেছে।
ততক্ষণে আনোয়ারের মনের ভেতর ক্রমাগত ওয়াক থু! ওয়াক থু! শুরু হয়েগেছে। সে তার বনলতা সেনের এক নতুন নাম দিয়ে ফেলেছে, ‘ কদবানু’। কদবানু তাকে বৈদ্যুতিক পাখার বাতাস খাওয়াতে ঘরে নিয়ে গেল।ইত্যবসরে দুচারজন প্রতিবেশী আগন্তুককে একনজর দেখার জন্য এসেগেছে। শহরের মানুষ গ্রামে গেলে যেটা হয় আরকি। যত তাড়াতাড়ি প্রস্থান করা যায় তত মঙ্গল, এই চিন্তাই আনোয়ারের একমাত্র ভাবনা হয়ে দাঁড়ালো। সে স্পষ্টকরে বলল– দেখেন, আমার হাতে সময় একদমই কম, আমাকে একটার মধ্যে ফিরে যেতে হবে। তাছাড়া আমার অফিসিয়াল কাজের অনেক তাড়া রয়েছে। কদবানু কথাটা ষোলআনা বিশ্বাস করল।

কদবানুর মেয়েটি বড়, বয়স নয় বৎসর। সে তার মেঝো খালার বাড়ি বেড়াতে গেছে। কিছুক্ষণ বাদে সাড়েচার পাঁচ বছরের একটা নেংটা ছেলেশিশু দৌড়ে ঢুকলো ঠিক আনোয়ারের কোলের কাছে। তার গা চুইয়ে তখনো পানি ঝরছে। পুকুরের পানিতে ডুবেডুবে চোখ দুটি তার কানাকুয়োর মত লাল করে ফেলেছে। অন্তত শিশুটির সাথে দু চারটে কথাবলতে চাইল আনোয়ার। — তোমার নাম কি? — সুমন, চট্ করে শিশুটি উত্তর দিল, কোনরকম তোতলামি করলো না।– তোমার আব্বু নেই, তোমার আব্বু কোথায়?শিশুটি নিঃশঙ্কচিত্তে  বলল– আমার আব্বু গরুচোর। শিশুটির জন্মের পরই তার বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।আর এ কারণেই তার ভেতরে তার বাবা সম্পর্কে ঐ বাজে ধারনাটা সুপরিকল্পিতভাবে ঢুকিয়েছে কদবানুর পরিবার,  যে, ওর বাবা গরুচুরি করে জেলখানায় বন্দি আছে।
নওকর বিশ্বাস অবশ্য তার জামাতার জেলে যাওয়ার ওরকম একটা কাহিনী বর্ণনা করলো আনোয়ারের কাছে। আনোয়ার তার ব্যাগ থেকে একটা মিষ্টির প্যাকেট বের করে সুমনের হাতে দিল। তার দুই মিনিট পরই সে উঠে দাঁড়াল ফিরে আসার জন্য। আনোয়ারের ভাগ্য ভালো, তাকে জটিল কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হলো না।ফেরার পথে খানিটা পথ সাথেসাথে এগিয়ে এল কদবানু। পায়েচলা পথের শেষমাথায় এসে কদবানু ছোটকরে জানতে চাইল– আবার কবে আসবেন। আনোয়ার নৈতিকতাকে মূল্য দিতে উপদেশের মত করে কয়েকটি কথা বলল।সে বলল– দেখেন, এই দুনিয়ার মানুষ কত ধরণের কষ্টে আছে। মানুষের হাজার রকমের সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের উপায় উপকরণ  আমাদের অত্যন্ত সীমিত। একটা বিবেকসম্পন্ন মানুষ মন যা চায়, তাই করতে পারেনা। তবে আমি আন্তরিকভাবে আপনার সুখশান্তি কামনা করি। আসব, তবে কবে আসব তা এইমুহূর্তে বলতে পারছি না। কথা কয়টি বলে কদবানুর নিকট থেকে প্রায় দৌড়ে পাকা রাস্তায় উঠে এল আনোয়ার। বহিরাগত লোক দেখে একটা টাউট টাইপের লোক জানতে চাইল– ভাইজান,  কনে এয়েছেন? এই এখানেই, এই একটিমাত্র কথার ফাঁকে হঠাৎ যেন হাওয়ার মধ্যথেকে একটা ইজিবাইক বেরিয়ে এলো। সে অকস্মাৎ ঝাপদিয়ে প্রায় ইজিবাইকে চেপে বসলো। ইজিবাইক মাইলখানেক আসার পর তার মনেহলো — সমস্যার এক দুর্ভেদ্য জাল থেকে মুক্তিলাভ করলো ঠিক সেইরকম,  যেমন মাঝ নদীতে কোনো লঞ্চ  ডুবেগেছে, আনোয়ার সেই লঞ্চের পেটের ভেতর আটকা পড়ে শুধুই হাতড়ে বেড়াচ্ছে বাইরে বেরোনোর কোনো জানালা-দরোজা, কোনো পথ পাওয়া যায় কিনা। এদিকে তার দম দ্রুত নিঃশেষ হয়ে আসছে। আর মাত্র এক মিনিটের মধ্যে সে যদি বের হতে না পারে তাহলে সলিলসমাধি অবধারিত। এমব সময় হঠাৎকরেই সে একটা জানালাগলে বেরিয়ে এলো পানির অতল গহ্বর থেকে। যখন সে নদীর উপরিতলে মাথা তুলল, দুইটি ফুসফুস ভরে দম নিল এবং বলল– এ যাত্রা বেঁচে গেলাম! সে নিজেকে এতটাই মুক্ত মনে করল যে, এমন মুক্তির স্বাদ আটত্রিশ বছরের জীবনে আর কোনদিন অনুভব করেনি। এবার দুইজোড়া চোখের সাথে তার স্ত্রীর চোখজোড়াও নতুনভাবে দেখতে চেষ্টা করলো– যে চোখ পাখির নীড়ের মত নয়। নিষ্পাপ, মাসুম দুইজোড়া চোখ। তার চোখ আবার অশ্রুসিক্ত হলো। কিন্তু আশেপাশে অনেক লোক থাকায়  অনেক কষ্টে তার ঝর্ণাধারা লুকিয়ে ফেললো। কলারোয়া পৌঁছে সে পকেট থেকে আলতো করে তার সেলফোনটি বের করে অনেকক্ষণধরে দেখলো। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো– হায় সেলফোন! আর নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞা করল জীবনে কোনদিন কোনো অপরিচিত রমনীর সাথে ফোনে কথা বলবে না। নাসরিনের ফোন নম্বরটা চিরতরে মুছে দিল আনোয়ার।

                                     সমাপ্ত

আগের পর্বের লিংকঃ

আবু সাইফা কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন